ভ্রমণ ডায়েরির পাতা
রাঁচি
জলপ্রপাত ও মানব জীবন
Simple Guaidence For You In Ranchi :
কুলের পসরা
রাতের
নির্জন অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। একটা সাদা ঘোলাটে কুয়াশার চাদর ক্রমশ
প্রকাশিত হচ্ছে, যেন গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে থোকা থোকা মেঘ। উঠে পড়েছি সকাল সকাল।
স্নান আর ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পড়তে হবে। ব্যালকনি খুলে বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছি
কুয়াশা ভেজা প্রকৃতিকে। এখনও হরিণের দল মাঠে নামেনি। বাঁদরগুলো মুখ গুঁজে
ঝিমাচ্ছে।একটা দুটো মাঝে মাঝে পাশের ঘরের ব্যালকনির রেলিং থেকে ঝুলে পাক খেয়ে ফিরে
যাচ্ছে। কিছুটা দূরে তাকাতেই চোখ স্থির হয়ে গেল। বেশ অনেকটা দূরে হালকা অবয়ব। একটা
হাতি যাচ্ছে। বিস্মিত হলাম! এত সকালে বনের ভিতরে হাতি মানে! তবে কি জংলি হাতির
দর্শন পেলাম শেষে? চলে যাচ্ছে হাতিটা একা একা। পরে জানলাম না, ওটা জংলি হাতি নয়,
আনারকলি। সকালে খাবার খেতে এসেছে।
ঠিক ন’টা, গাড়ি হাজির। লটবহর গাড়িতে তুলে শুরু
করলাম ছোটা রাঁচির পথে। ড্রাইভার রফিকদা বললেন,যাওয়ার পথে একটা স্পট দেখাবেন
‘কেচকি সঙ্গম’। কালো পিচের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলল গাড়ি। বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতেই
সামনে দেখলাম একটা ছোট্ট ব্রিজ। গাড়ি ক্রমশ গতি কমাচ্ছে। ব্রিজ বলে কি! না, গাড়ি
গতি কমিয়ে বাঁ-দিকে বেঁকে গেল। একটা সরু কালো রাস্তা,মাঝে মাঝে ভাঙা।অদ্ভুত এক
নির্জনতায় ঘেরা এই পথ! যেন কোনো এক অচিনপুরের পথে ছুটে চলেছি আমরা। জনহীন নির্জন
একটা রেলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি। গল্পে পড়া ভূতুরে স্টেশনের চাক্ষুষ দর্শন। কোনো
প্রভেদ নেই! একটা অদ্ভুত আন্দোলন চলছে মনের মধ্যে। একটা মেলট্রেন ছুটে গেল সামনে
দিয়ে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, এবার নিশ্চয় গেট খুলবে! রফিকদা নেমে দাঁড়িয়ে আছেন
বাইরে। জিপের ভিতর থেকে আমরা তাকিয়ে আছি কোনো এক অজানা লোকের খোঁজে, ‘গেটম্যান’।
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি কাউকে দেখিনি। গেলেন কোথায় তিনি? রফিকদা এগিয়ে গিয়ে হাঁকডাক
করে ডেকে আনলেন তাকে।
এগিয়ে চললাম। এসে দাঁড়ালাম একটা বিস্তীর্ণ বালুভূমির সামনে।
এই সেই ‘কেচকি সঙ্গম’। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম নদীর অনেক কাছে। জল প্রায়
নেই,শুকনো। ডানদিক থেকে ‘কোয়েল নদী’ আর বামদিকে ‘ঔরঙ্গা নদী’ এসে মিশেছে। দূরে
আঙুল তুলে দেখালেন ড্রাইভার দা—ঐ যে সঙ্গমস্থল, আর নদীর ঠিক উলটো পাড়ে আছে এক
ডাকবাংলো, যেখানে বসে বুদ্ধদেব গুহ লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কোয়েলের কাছে’।
ভীষণ নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ছি যেন। মানস চোক্ষে দেখছি যেন সেই অরণ্যপুরুষকে। ভাবতে
চেষ্টা করলাম ঠিক কিরকম ভঙ্গিতে বসে তিনি উপন্যাসটি লিখেছিলেন? এ অরণ্য, এ
নদী-প্রকৃতি আমারও বড্ড প্রিয়। ওখান থেকে ফেরার পর লিখেছিলাম এক গল্প। একটা নয়,
দু-দুটো গল্প। বালির ফাঁকদিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে চলেছে। দেখছি দু’চোখ ভরে। সময়ও বয়ে
চলেছে, তাই ফিরতে হবে।
 |
| নদী আর বালির আলপনা |
ফিরিতি পথে এসে দাঁড়ালাম সেই ব্রিজটার সামনে। দু’পাশে বালির
মাঝে মাঝে জল দাঁড়িয়ে অপূর্ব কারুকার্য ফুটে উঠেছে। না দেখলে কল্পনা করা যায় না।
কোয়েল নদী বালির গায়ে প্রাকৃতিক আল্পনা এঁকেছে। বিচিত্র এই প্রকৃতির কোথায় কেমন
খেয়াল বোঝা মুশকিল। ছুটতে ছুটতে গাড়ি এসে দাঁড়াল ডাল্টনগঞ্জ বাজারে। এখান থেকেই
রাঁচির বাসে তুলে দিয়ে রফিকদা ফিরে গেলেন।
রাঁচিতে
আমাদের হোটেল ঠিক করা ছিল না। নেতারহাটে এক ট্যুরিস্ট যোগাযোগ করে দিয়েছিল নটরাজ
হোটেলের সাথে। সেইমত রাঁচি নেমে রিকশা নিয়ে চলেছি। কিন্তু কোথায় সেই হোটেল? যে পথে
চলেছি সেখানে শুধু বড়ো বড়ো বাড়ি। প্রায় আধঘন্টা পর একটা প্রাচীন জীর্ণ হোটেলের
সামনে নামিয়ে দিল রিকশাওয়ালা। বাইরে থেকে দেখে কেমন যেন লাগছে। ভিতরটা যদিও আধুনিক
সজ্জিত তবে, কেমন যেন রহস্যময় মনে হল। না, ঠিক পছন্দ হল না। বেরিয়ে এসে
রিকশাওয়ালাকেই বললাম, ‘ভাই একটা ভালো হোটেলে নিয়ে চলো’।
সে বলল, ‘
আমি শুনেই ভাবছিলাম, আপনারা এখানে কেন থাকতে চাইলেন। এই এলাকাটা ভালো না একদম।
রাতে একা বেরতেই পারতেন না’।
জানি না,
কতটা ভয়ঙ্কর সেই জায়গা। আদেও সত্যিই রাঁচিতে এমন জায়গা আছে কিনা! রিকশাওয়ালা নিয়ে
এলো আমাদের ‘হোটেল সাঁই’। আমাদের ওভার বাজেটের হোটেল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আর অন্য
কোথাও যেতে ইচ্ছা করছিল না। হোটেলের ঘরে ঢুকে হাতে,পায়ে জল ছোঁয়াতেই বেশ এনার্জি
ফিরে পেলাম। পেটে তখন ছুঁচো মারছে ডন। ভালো মতো পেটপুজো করে চারটের দিকে বেরিয়ে
পড়লাম বাইরে। এই অঞ্চলটা রাঁচির প্রধান অঞ্চল। বাজার-হাট, বড়ো ও মাঝারি মাপের
হোটেলে ঠাঁসা। সামনে দূরন্ত রাস্তা। অবিরাম ছুটে চলেছে গাড়ি। খুব কাছেই স্টেশন।
বেশ ভালোই হল। ফেরার পথে ট্রেন ধরতে সুবিধা হবে। রাঁচির পথ পায়ে হাঁটছি আমরা। এভাবে
কত অজানা পথ হাঁটতে হাঁটতে চিনে ফেলেছি। হঠাৎ মাথায় এল, কটা হোটেল ঘুরে দেখলে কেমন
হয়? একটু যদি বাজেটটা কমানো যায়? অনেক হোটেল আছে। এমনই একটা বাজেটের হোটেলে কথা
বার্তা পাকা করে নিলাম পরের তিনদিন থাকব।
পরেরদিন বেশ
সকাল সকাল নতুন হোটেলে এসে উঠলাম। এখানেই স্নান,ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে ন’টার মধ্যে
বেরিয়ে পড়ব রাঁচির জোনহা আর হুড্রু ফলস দেখতে। এই হোটেল থেকে একটু এগোতেই
অটোস্ট্যান্ড। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো এখানে ঘুরে দেখার জন্য অটো অথবা
ট্যাক্সি নিতে হয় দিনপ্রতি হিসাবে ভাড়া। দুটি পরিবার হলে ট্যাক্সি নেওয়া লাভজনক।
আমরা অটো ঠিক করলাম। ঠিক সাড়ে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম জোনহা ফলসের পথে। রাঁচি
থেকে প্রায় পনেরো কিমি রাস্তা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এই সময় রাঁচিতে যথেষ্ট
ঠান্ডা। অটোতে ভালো করে নাক-মুখ ঢেকে বসে আছি। ছুটছে অটো। দু’পাশে সবুজের বাহার
ছুটে চলেছে আমাদের সাথে। অপূর্ব পথশোভা! দশ-বারো কিমি যাওয়ার পর বাঁ-দিকে বেঁকে
যাওয়া একটা কাঁচা রাস্তা দেখিয়ে অটো ড্রাইভার রাম কুমার সিংহ বললেন, ‘ইস রাস্তে সে
হুড্রু যানা পরতা হ্যয়। হাম পহেলে জোনহা দেখেঙ্গে। ফিরতে ওয়াক্ত হুড্রু দেখেঙ্গে’।
বললাম, ঠিক
আছে। আপনি যেটা ভালো বুঝবেন
সেটাই করুন। কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে একটা কাঁচা
রাস্তায় নেমে গেল অটো। গ্রামের ভিতরে আঁকাবাঁকা পথে ছুটে চলেছি। হঠাৎ একজায়গায়
দেখলাম কয়েকটি বাচ্ছা ছেলে পলিপ্যাকে করে কুল বিক্রি করছে। এই সময় কুলের। এভাবে
ঘুরতে আসা মানুষদের কাছে কুল বেচে দু’পয়সা উপার্জন হয় ওদের। চারিপাশে একটা
অর্থনৈতিক অনটনের ছবি যেন। বিভিন্ন পথ ঘুরে এসে
পৌঁছালাম জোনহার সামনে। তখনও সে অদৃশ্য। অটো পার্কিং এর টাকা মিটিয়ে সামনে
এগিয়ে চলেছি হঠাৎ পিছন থেকে ডাক ‘ হেঁই দিদিমণি’। ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম একটি অল্প
বয়সের হাট্টা গাট্টা চেহারার ছেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। গায়ের রং
বেশ কালো। মাথায় ঝাঁকরা চুল। বলল, ‘ তুমরা দোপহরে খাবে না?’
বললাম, খেতে
তো হবে, কিন্তু এখানে কোথায় খাবার পাব। ফেরার পথে খেয়ে নেব কিছু।
ছেলেটি বলল,
‘ এখানেই পাবে। আমি খাবার রেঁন্ধে দেব। কি খাবে বলো। মুরগা নাকি আন্ডা কারি?’
তুমি রেঁধে
দেবে?
হ্যাঁ,
দিদি। সবাই এখানে এসে এভাবেই খায়।
বলে দিমাল
ঠিক আছে আন্ডা কারি বানাও। এক-দেড় ঘন্টার মধ্যে চাই কিন্তু।
সে মাথা
নেড়ে চলে গেল। সামনে সুন্দর বাঁধানো সিঁড়ি ধাপে ধাপে উপরে উঠে গিয়েছে। বেশ কিছুটা
উপরে ওঠার পর খাড়া ভাবে নীচে নেমে গিয়েছে। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে জোনহাকে। ঝিরঝির
করে জলের ধারা নেমে আসছে, তবে ধারার বেগ অনেক কম। আসলে এইসময় নদীতে জল কমে যায়। নীচে
জমে আছে পাথরের খাঁজে খাঁজে ঘনসবুজ জল। পরপর বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটায় ওখানে নেমে
স্নান করা নিষেধ।
কিছুটা পর থেকেই কাঁটা তারের ঘেরা। কিন্তু সেসব উপেক্ষা করেই বেশ
কয়েকটি ছেলে জলে নেমে হুল্লোড় করে চলেছে। ওদের চিৎকার পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে
ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। ভেঙে যাচ্ছে নীরবতার জাল। এমন পরিবেশে কথা ভালো লাগে না।
নীরবতা আর ঝরণার গর্জন ছাড়া কিচ্ছু ভালো লাগে না। বিরক্ত হয়ে উঠছি ওই দলটির দিকে
তাকিয়ে। উপায় নেই, সহ্য করতেই হবে। প্রকৃতি তো আমার একার নয়। নামতে লাগলাম সিঁড়ি
বেয়ে নীচে। একেবারে শেষ সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে পড়লাম একটা বড়ো পাথরের গায়ে। একটু নীচেই
জল। ক্যামেরায় বন্দি করতে লাগলাম প্রকৃতিকে।
ওই পাথর থেকে নেমে সামনের দিকে কিছুটা
গেলেই ঝরণার জল নদীর মতো বয়ে চলেছে। খুব ইচ্ছা হচ্ছে পা ডুবিয়ে বসি কোনো এক পাথরের
গায়ে। কিন্তু কিছুটা এগোতেই দেখলাম আর পথ নেই। একটু উপরে পাহাড়ের গায়ে খোদায় করা
সিঁড়ির রেখা বেয়ে নেমে এলো একটি ছেলে আর মেয়ে। ওই পথেই যেতে হবে ওপারে ওই পাহাড়ি
নদীর কাছে। ধীরে ধীরে পৌঁছেলাম নদীর কাছে। বড়ো বড়ো পাথরের ফাঁকে নদী বয়ে চলেছে।
স্বচ্ছ জল। নীচের শ্যাওলাধরা পাথর গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হালকা ডোবালাম পা।
পায়ের নখে লাগানো সবুজ নেলপালিশ স্পষ্ট দেখাচ্ছে। ঠান্ডা চিনচিনে জলটা। পা থেকে ঠান্ডা অনুভূতিটা
ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। অসম্ভব এক তৃপ্তি। দূর থেকে হেঁটে আসছে একটা আদিবাসী মেয়ে
কাপড়ের বোঝা নিয়ে। দূরত্ব ক্রমশ কমছে। খুব কাছে এসে পড়েছে সে। কেমন যেন নিজেকে
শহুরের উপন্যাসের নায়িকা মনে হচ্ছে। মেয়েটি তার কাপড়ের বোঝা জলে ভিজিয়ে সাবান ঘষছে। একে একে আছাড় মারছে পথরের গায়ে। ফেনা মেশানো কালো জল
বয়ে যাচ্ছে। স্বছ পাহাড়ি নদীটি তার বুকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে সাবানের ফেনা। বেশ দূর
পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সাবানের ফেনা। তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন...
হালকা একটা ফিনফিনে হাওয়া বইছে। পাথরের উপর বসে শুনছি, জল
আর পাথরের ভালোবাসার গল্প। জলের ছুঁয়ে যাওয়াতে সুখ আর পাথরের ছোঁয়া পাওয়াতে। অনন্তকাল
ধরে এভাবেই তো ভালোবেসে আসছে একে অপরকে। সিঁড়ির উপর থেকে একটা ডাক শুনলাম। ফিরে
তাকাতেই দেখলাম,হাত নেড়ে ডাকছে সেই ছেলেটি। কি যেন নাম বলেছিল, শুকরা
লহরা। ডাকছে আমাদের খাবার প্রস্তুত করে। আসতে আসতে উঠে এলাম উপরে। একটা ছোট্ট ঘর,
তার ভিতরে রাখা ছিল চেয়ার-টেবিল। সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। আমরা বসতেই সামনে
সাজিয়ে দিল শালপাতার থালা তিনটি। দুটো আমাদের আর একটা নিরামিষ আমাদের অটোর
ড্রাইভারের জন্য। হাতে তৈরি শালপাতার থালায় সাজানো, ঝরঝরে সাদা ভাত, পেঁয়াজ
দিয়ে আলুমাখা, একটা শালপাতার ঠোঙায় ডাল আর আরেকটা ঠোঙায় ডিমের ঝোল।
আমাদের ছোটোবেলায় বিয়ে বাড়িতে দেখতাম শালপাতার চল ছিল। তখন
এমন থার্মোকলের থালা বা চীনেমাটির প্লেটের তেমন চল ছিল না। শালপাতার একটা
নিজস্ব গন্ধ আছে। খাবারের সাথে সেই গন্ধটা মিশে গেলে একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরি হয়।
ছোটো থেকেই ঐ গন্ধটায় আমার ভীষণ ভয় ছিল। ঐ গন্ধে বিয়েবাড়ি ঢোকার আগেই দুপুরের খাবার বাইরে বেরিয়ে আসত। বেশ বড়ো পর্যন্ত এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ বছর পর সামনে অমন শালপাতার
থালায় সাজানো খাবার দেখে প্রথমে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু একবার খাবার মুখে দিতেই
আমার সব ভয় উড়নছুঁ। একটা অসাধারণ তৃপ্তি যেন ছড়িয়ে পড়ল মন জুড়ে। অসাধারণ স্বাদ সেই
রান্নার! আজও ভুলতে পারিনি। খাওয়া শেষে পাতা তুলতে যেতেই চেপে ধরল হাত। কিছুতেই
ফেলতে দিল না।
 |
| স্থানীয় খাবার |
বললাম, কে রান্না
করেছে শুকরা?
সে বলল, আমি আর আমার বউ, দুজনে মিলে।
বললাম, বউকে বলো, দারুণ রান্না হয়েছে।
কথাটা শুনেই সে বলে উঠল, ‘আজই চইলে যাবেন? থেইকে গেলে
ছোঁ-নাচ দেখতে পেতেন। কাল এখানে সারা রাত ধরে ছোঁ-নাচ চইলবে। পুরুলিয়া থেইকে
ছোঁ-নাচের শিল্পীরা আসবে। প্রতিবছর এই সময় এখানে ছোঁ-নাচ হয়’।
বললাম, না ভাই, থাকার উপায় নেই। কালই আমাদের ফেরার টিকিট
কাটা।
দেখলাম একটা গাছতলায় বসে এক শিল্পী আপন মনে বসে বসে কাঠ
কেটে জিনিস বানাচ্ছে। একটা বয়স্ক মহিলা পাকা কুলের পসরা সাজিয়ে বসেছে। ক’টা কুল
কিনে মুখে দিয়েই মনটা ভালো হয়ে গেল। শুনেছিলাম, রাঁচির কুল নাকি দারুণ স্বাদের।
সত্যিই প্রমাণিত হল সেকথা। এমন স্বাদের কুল সত্যিই আগে খাইনি। বেশি সময় এখানে ব্যয়
করা যাবে না। এখনও বাকি হুড্রু জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া। জোনহা থেকে ফিরতি পথ ধরলাম।
পথে সেই বাচ্ছাগুলো তখনও প্যাকেট ভর্তি কুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। কিনে নিলাম ওদের থেকে
প্রায় তিন কেজি কুল। বাড়ি ফিরে আচার বানাব।
শুকরাকেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম ওদের কীভাবে দিন চলে। এখানে
ঘুরতে আসা মানুষদের সবাই যে খাবার খায় এমনতো নয়! সব সারা বছর ধরে যারা এখানে ঘুরতে
আসে সবাই তো আর দূর থেকে ঘুরতে আসে না। রাঁচির আসে পাশের মানুষজন ছুটির দিনে এসে
হয়তো কিছুটা সময় কাটায়, তাদের তো আর ভাত খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। আর জায়গাটা বেশ
রোমান্টিকও তাই কলেজ পালানো প্রেমিক যুগলদের ভিড় নেহাত মন্দ নয়। ফিরতি পথেই তো
চোখে পড়েছে বেশ কয়েকজোড়া।
হেসে ছিল শুকরা। কত সাবলীল ভাবে বলেছিল, ‘ চলে যায় এভাবেই
আমাদের। যখন ট্যুরিস্টদের সিজন চলে তখন আমি এদিকেই থাকি। এক ফসলের জমিতে মাঝে মাঝে
কাজ হয়। ফাঁকে ফাঁকে কাঠ কেটে নিয়ে আসি বিক্রি করি। আমাদের মধ্যে অনেকে চলে গিয়েছে
বড়ো শহরে, কোলকেতায়। মিস্ত্রির কাজ করে সেখানে। আবার অনেকে বক্সাইট খনিতেও
শ্রমিকের কাজ করে। শুধু শুকরা নয়, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই এভাবেই বেঁচে থাকে
টুকরো টুকরো পাওয়ার মাঝে একমুখ হাসি নিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই কথা বলে আসা শুকরার কথা
ভাবতে ভাবতে এখানকার মানুষের জীবনের যাপনের কাল্পনিক এক রূপরেখা আঁকতে আঁকতে কখন
যে হুড়্রুর কাছে চলে এসেছি খেয়ালই করিনি। তবে যাত্রাপথে মাঝে মাঝেই বাইরে চোখ
পড়তেই একটা জিনিস ভীষণ ভাবে নজরে আসছিল, কয়েক কিলোমিটার অন্তর অন্তরই স্কুল।
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পড়ুয়া। কোনো এক অজানা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্ন কী ওদের বুকে
ঘর বেঁধেছে! কি জানি! জানি না তো!
ক্রমশ...।।