Translate

Showing posts with label ভ্রমণ_travel. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমণ_travel. Show all posts

Wednesday, 18 May 2022

 

গাছবাড়িটা আর কিছু এলোমেলো গল্পঃ  

গাছবাড়ির গল্প/ explore arambag gach bari

    

সন্ধে নেমেছে অনেক আগেই,তবু গ্রিল ঘেরা বারান্দায় গরম হাওয়ার চলাচল অব্যাহত। টিপটিপ করে বিন্দু বিন্দু ঘাম জন্মাচ্ছে রোমকূপের গোঁড়ায় গোঁড়ায়। জানি একটু পরেই তারা বড়ো হয়ে গড়িয়ে পড়বে। চুল গুলো মাথার উপর চুড়ো করে বাঁধতেই ঘারের কাছটা ঠান্ডা অনুভব হল। ছেলের স্কুলের গ্রীষ্মের ছুটি চলছে।সারাদিন বাড়িতেই কেটে যাচ্ছে নানা ব্যস্ততায়। অন্ধকারে বারান্দায় বসে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে রাতের আকাশ দেখছি। যখন ভীষণ গরম লাগে,আমি কল্পনায় বরফ দেখার চেষ্টা করি। পছন্দের মতো একটা বরফের দেশ খুঁজে নিই,আর চোখ বন্ধ করে সেই জায়গায় পৌঁছে যাই। অচেনা জায়গা হলে ছবিতে দেখা সুন্দর জায়গাগুলোকে সেই জায়গার গায়ে বসিয়ে নিই। অবশ্য এমন কল্পনা যাপন আমার অবসরের একমাত্র বিনোদন। আকাশ দেখতে দেখতেই দেখলাম, বর্ধমান থেকে সাড়ে সাতটার ট্রেনটা ধীর গতিতে প্ল্যাটফর্ম ছুঁতে ছুঁতে থেমে গেল। একঝাঁক কোলাহল ধেয়ে এল মুহূর্তের মধ্যে। খানিক হুড়োহুড়ি ওঠা-নামার মাঝখানেই গঁ-অ-অ করে আওয়াজ করে ট্রেন চলমান হল। আমার কল্পনায় ব্যাঘাত ঘটল।

এ ট্রেনেই সে অফিস থেকে ফেরে। জুন মাসের চার-পাঁচ তারিখ চলছে। অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই সে বলল, ‘ গাছবাড়ি যাবে?’

--গাছবাড়ি? সেটা কোথায়?

--সে বলল, ‘ কাছেই পল্লিশ্রীতে,আরামবাগ’।

আমার কাছে পল্লিশ্রী মানেই গাছ। এবাড়িতে অজস্র গাছ আছে, যা আরামবাগ পল্লিশ্রী থেকে আনা। ঐ নার্সারিতেই নাকি গাছবাড়ি আছে।

সেবার যখন বেতলা জঙ্গলে গিয়েছিলাম, গাছবাড়িতে থাকার খুব ইচ্ছা ছিল। বুকিং করেও ক্যান্সেল করি। ঠিক থাকার উপযুক্ত ছিল না সেটা। গাছবাড়ির কথায় মনটা নেচে উঠল, কিন্তু গরমের কথা মনে হতেই ডিহাইড্রেশনের রোগীর মতো ঝিমিয়ে পড়লাম। এমন উত্তপ্ত দিনে লোকে দার্জিলিং, ডুয়ার্স যায়,গরমে গরম জায়গায় ঘুরতে যাওয়া একপ্রকার পাগলামি ছাড়া কিছু না। কিন্তু মাঝে মাঝে নিয়ম ভাঙার একটা আলাদাই আনন্দ আছে। দু-দিন আগেই খবরে বলছিল, নিয়ম মেনে ৮ই জুন বর্ষা ঢুকছে বঙ্গে। হিসেব মিললে,সোনায় সোহাগা হতে পারে। গাছবাড়িতে বসে,গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রিমঝিম বৃষ্টিরও দেখা মিলতে পারে।

গাছবাড়ির এক স্টাফের সাথে আমাদের পূর্বপরিচয় ছিল,বুকিং করতে গিয়ে জানতে পারলাম, ন’তারিখ জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে ভাড়ায় বিশেষ ছাড় চলছে। মধ্যবিত্তের পকেট চিরকালই এই বিশেষ ছাড় শব্দটি শোনার অপেক্ষায় থাকে,আর সেটা শুনতে পেলে একঝলক চওড়া হাসি ঝলকিয়ে ওঠে।

ন’তারিখ সকাল,চেনা শহর বর্ধমান যেন একটু একটু করে পিছনে সরে যাচ্ছে,গাড়ির কাচের ভিতর থেকে এশহরকে দেখিনি কখনও,কেমন যেন অন্যরকম। আরামবাগ রোড ধরে ছুটতে ছুটতে কত কল্পনায় যেন মনের আনাচেকানাচে ঘুরপাক খাচ্ছে। দামোদরের চরে বালি আর জলের আলপনাকে এমন জায়গায় সূর্যাস্তের একটা কল্পনা এঁকে নিলাম মনে মনে। কতদিন ভেবেছি,এক বিকেলে ছুঁতে যাব দামোদরকে।কত গল্পই তো শুনেছি তার। ছোঁয়া হয়নি সে ইচ্ছে। একে একে অনেক চেনা গ্রাম পেরিয়ে চলেছি। পথের দু-ধারে চোখ রেখে দেখছি জীবন! মুটে জীবন,কেরানী জীবন, চাষী জীবন,চলমান জীবন আবার বসে থাকা আড্ডা জীবন। বড়ো ছায়া বিলোনো গাছটির নিচে,উবু হয়ে বসা গ্রাম্য বৃদ্ধ আড্ডা। দুই হাঁটুর ফাঁকে লুঙ্গি গুঁজে, রোদে পোড়া কালো কাঁধে একফালি গামছা ফেলা। কি আলোচনা চলতে পারে? জীবন,সমাজ,নাকি অভাব? Desmond Morris এর ‘Man Watching’ গ্রন্থটির থেকে জেনেছিলাম অঙ্গভঙ্গি ও অঙ্গবিন্যাস বিষয়টি,কিন্তু এই মানুষগুলির মুখভঙ্গি বড্ড বেশি নির্লিপ্ত মনে হল,একঝলক দেখার ফাঁকেই। সরল ভাবলেশহীন জীবন বড্ড বেশি কম্পাউন্ড গেসচারের অংশ যেন!

একটা গ্রামের বাইরের সীমানা দিয়ে বয়ে চলা রাস্তা ঠিক কতটা আর গল্প শোনাতে পারে গ্রামের? আমরা তো বেশিরভাগ সময়ই ঐ অঙ্গবিন্যাস আর ভঙ্গি দেখেই বাকি গল্পটা আন্দাজ করে নিই। তবে অনেক সময় জড় বস্তুও তার গেসচার দিয়ে অনেক গল্প বলে। চলতে চলতেই নজরে এল বিস্তীর্ণ ফাঁকা প্রান্তরের মাঝে একটা পরিত্যক্ত পাকা বাড়ি। বেশ সুন্দরই তো দেখতে ছিল! একটা ছোট্ট খোলা বারান্দা। যদিও রোদ খেলছে সে বারান্দায়,তবু বিবর্ণ! কংক্রিট ভেদ করে গাছ জন্মেছে। কার্নিশে জমেছে শ্যাওলা! বুনো ঘাসের স্বর্গরাজ্য। বন্ধ জানালা যেন তার অঙ্গবিন্যাস দিয়ে ভিতরের গল্পটা জানাতে চাইছে! একটা পরিপূর্ণ বাড়ি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে নিঃসঙ্গ ইতিহাসের গল্পে।

 ভেবেছিলাম পথের ধারেই কোনও ঘুন্টি থেকে খাবার কিনে খাব, কিন্তু এপথে কেউ পসরা সাজিয়ে অপেক্ষা করে না পথিকের। খিদের সময় খাদ্য যদি,বিলাসিতার সোনার হরিণ হয়,তবে সে বড়ো যন্ত্রণার! এযন্ত্রণার অনুভব আমাদের নেই,কিন্তু জানি এই পথ চলার দু-পাশে অনেক চোখই খিদের সময় সোনার হরিণ খোঁজে! আমার গ্রামবাংলার অপরূপ রূপের মাঝে এ খিদের গান বড়ো বেদনার মতো বাজে। নিজের নামের সাথে মুশাফির লিখতে ইচ্ছা হয় খুব, কিন্তু আমি জানি,আমি মুশাফির নই। আমি এক ভ্রমণবিলাসী স্বল্প সময়ের পথিকমাত্র। সফর যতই ছোট হোক,পথচলার মাঝে দু-দন্ড থামা পথিকের ধর্ম। একটা জিরান-ঘুন্টিতে দাঁড়িয়ে উষ্ণ দুধ-চায়ে ভিজে ওঠা মাঠির ভাঁড়ের গন্ধ না নিলে, অসীম একটা শূন্যতা ভিড় করে মনে। একটু দূরেই একটা গনগনে আঁচ ওঠা উনুন। হালকা ধোঁয়ার একটা পরত উড়ছে তখনও। ঘুন্টির মালিক, উনুন আর আমদের মধ্যের সমস্ত প্রাচীর ভেদ করেছে একটি শব্দ প্রতীক্ষা। ওই উনুনের দিকে তাকিয়েই মনে হল, সে প্রতীক্ষায় আছে একটি জল ভর্তি কেটলির। ঘুন্টির মালিক খদ্দেরের আর আমরা, সেই তৃপ্তির এক চুমুকের। কখনও কখনও সময় কী ভীষণ ভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা সবাই একে অপরের পরিপূরক।

-গাড়ি থেকে নেমে বললাম, ‘চা হবে ভাই?’

--ছেলেটি জানতে চাইল, ‘কী চা দিদি? লাল চা, না দুধ চা?

-- আমি বললাম, দুটি লাল চা,আর দুটি দুধ চা। আমার ছানাটাও চা খেতে ওস্তাদ। দুধ চা ওর আর আমার।

হ্যান্ডেরলে কাপড়ের ব্যান্ডেজ জোড়ানো কেটলি চড়ে বসল গনগনে আগুনের মাথায়। দুধ মেশানো জলে চা-পাতা পড়তেই সতর্কবার্তা জারি করলাম, ‘ভাই, চিনি কিন্তু কম দেবেন’।

সবাই বলে, জিরান-ঘুন্টির চা নাকি একগজের হয়। মানে তিনবার ফোটানো। না না, এ চা একেবারে টাটকা। আমি চা-দোকানকে জিরান-ঘুন্টি বলি। পথিকের জিরান-ঘুন্টি।দু-দন্ড জিরানো তো যায়। আর মিনিট পঁচিশেক পথ বাকি।

পল্লিশ্রী মোড় থেকে  ডানদিকের রাস্তাটা বেঁকে গিয়েছে বাঁকুড়ার দিকে আর সামনের রাস্তাটা সোজা আরামবাগ বাসস্ট্যান্ড। গাছবাড়ি আমাদের খুব কাছেই...

একটা বিরাট গেট দু-পাল্লার, ভিতরে দাঁড়িয়ে সিকিউরিটি গার্ড। গেটের গায়ে লেখা “আরামবাগ পল্লিশ্রী”। ড্রাইভার নামানো কাচদিয়ে মুখ বের করে বলল, ‘গাছবাড়ির বুকিং আছে’।

গেট খুলে গেল।

                                                    


একটু এগিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। দু-পাশে গাছ। মাথা তুলে দাঁড়ানো বড়ো গাছ ছাড়াও ছোটো ছোটো চারাগাছ। আর বড়ো বড়ো খাঁচার মধ্যে রঙ্গিন পাখির কিচিরমিচির। এখানেই নামতে হবে।বাকি পথ হেঁটে। কিন্তু, কোন দিকে? সামনে তো কোথাও গাছবাড়ি দেখতে পাচ্ছি না। ওদিকে চারাগাছ দেখে জিভ লকলক করছে আমার। স্বাভাবিক আকারের নার্সারির তুলনায় এই নার্সারির আকার বর্ণনা করা মুশকিল। কোনদিকে যাব ভাবছি যখন,ঠিক তখনই মুশকিল আসানের মতো একটা সাইকেল নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল একটি লোক। মুখজোড়া হাসি। আমাদের ব্যাগ-পত্তর সাইকেলে চাপিয়ে  আগে আগে সে চলতে লাগল,আর আমরা পিছে পিছে। একটা বিশালাকার খাটালে বৃহৎ আকারের খান আটেক গরু নিবিড় মনে খাচ্ছে। ডানপাশে গোবরের স্তুপ থেকে গন্ধ ছড়াচ্ছে। একঝাঁক মাছি ভনভন করে ঘুরে মরছে। কখনও কারোর কানে,অথবা থ্যাবড়া মুখের উপর জেগে থাকা নাকের ছিদ্রপথে প্রবেশের অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। গরুর লেজ,চামড়ের মতো এপাশ-ওপাশ দুলছে। ভাসাভাসা নির্লিপ্ত চোখের উদাস দৃষ্টি কোনদিকে বুঝে ওঠা মুশকিল। কোনও দিনও বুঝতে পারিনি, জাবর কাটতে কাটতে গরু ঠিক কোন দিকে তাকায়,অথবা কী ভাবে? গরু দেখেই মনে এল দুধের কথা। আমাদের পথপ্রদর্শককে বললাম-

খাঁটি দুধের চা পাওয়া যাবে এখানে?

লোকটি হেসে বললে, ‘ হ্যাঁ, ম্যাডাম।চা তো পাবেনই,চাইলে দুধও খাওয়াতে পারি’।

শুনেই লোভ হল। এমনিতেই আমি দুধ-চা লোভি মানুষ। অচেনা কারোর বাড়িতে চট করে চা খেতে ভয় লাগে, কারণ চা-বিলাসি মানুষতো, একটু উনিশ-বিষ হলেই মনে হয়,চা-টাই মাটি হল। মন খারাপ হয়ে যায়।

খাটালের প্রাচীর কেটে একটা ছোট্ট সিঁড়ি উপরে উঠে গিয়েছে। উপরে রাস্তা। দারকেশ্বর নদের পাড়ের বাঁধ এটা। দূরের গ্রামের সাথে মূল সড়কের সংযোগ ঘটিয়েছে একটা কালো পিচের রাস্তা। সাইকেল,মোটরসাইকেল যাওয়া-আসা করছে। পুরো প্রকৃতি জুড়ে একরাশ নিস্তব্ধতা! ঘন ঘাছের জঙ্গলের বুক চিঁড়ে এরাস্তা চলে গিয়েছে কোনখানে! সরু রাস্তা পেরিয়ে ওই বাঁধের ঢাল বেয়ে নেমে গিয়েছে সিঁড়ি।একটা তারকাঁটার গেট খুলে লোকটির পিছু পিছু ভিতরে প্রবেশ করলাম।

 ‘এ কোথায় এলাম!’

                                                          


বিস্মিত আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম। এক কোন মায়াবী আশ্রম, নাকি পবিত্র তপোবন! সুউচ্চ বৃক্ষরাজি সারি সারি মাথা তুলে আকাশমুখী। একটা ঘনছায়া ঝিরঝির করে ঝড়ে পড়ে বনময় ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রখর গ্রীষ্মের দাপটকে ম্লান করে শীতলপাটি বিছিয়ে দিয়েছে যেন। গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছায়া মাখতে মাখতে এগিয়ে চললাম। বড়ো বড়ো গাছের পাদদেশে দলবেঁধে দুলছে ঝোঁপ-ঝাড়। একটা ছোট্ট ঝোরার মতো নালার উপর বাহারি ছোট্ট বাঁধ পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম গাছ-বাড়ির সামনে। তারকাঁটার সীমানার গা-ঘেঁঘে পরপর চারটি তালগাছের উপর দাঁড়িয়ে আছে গাছবাড়ি। ফরাক্কায় থাকতে আমাদের সামনের কোয়ার্টারে একটা খেজুর গাছে ঝুলতে দেখতাম বাবুই পাখির বাসা। নিখুঁত বুনন। গাছবাড়ি গুলি দেখেই মনে মনে হল পাখিরবাসার মতো বাড়িগুলি যেন মানুষের বাসা। প্রতিটি বাড়ির গায়ে লাগা একটি করে আমগাছ। ডালপালা দিয়ে বাসাগুলি যেন ঘিরে রেখেছে, চাটাইয়ের দেওয়াল, কাঠের সিঁড়ি আর বাঁশের সরু বারান্দা। হাঁটলেই মচমচ শব্দ হয়। চারটি বাড়ির একটি রেস্টুরেন্ট। দুটি করে জোড়া। ভারি সুন্দর নাম বাড়িগুলির। ‘আম্রপালি’, ‘গোলাপখাস’, ‘তোতাপুরি’, আর রেস্টুরেন্টের নাম ‘ হিমসাগর’।

‘আম্রপালি’ আমাদের আগামী দু’দিনের বাসস্থান। হিমসাগর আর আম্রপালির একটি কমন কাঠের সিঁড়ি। কিছুটা উঠে ডানদিকে আম্রপালি আর বামদিকে হিমসাগর। ঠিক একই ভাবে যুক্ত পরের বাড়ি দুটির নাম “ গোলাপখাস” আর “তোতাপুরি”। সবই আমের নাম।

তখনও রেস্টুরেন্টের ভিতরটা দেখিনি, আমগাছের বনে দাঁড়িয়ে আছি। সাইকেলে যিনি লাগেজ নিয়ে এলেন, তিনি লাগেজগুলো একটা টেবিলে রেখে সামনেই রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ বাইরেই অপেক্ষা করতে হবে,বুঝলাম ঘর আমাদের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। চারিপাশের ছায়ামেদুর বনানী জুনের তীক্ষ্ণ তাপকে শুষে নেওয়ের পরও যেন তাপের হলক লাগছে। তবু মনজুড়ে প্রসন্নতা। হঠাৎ দেখি তিনটি শাঁসওয়ালা ডাব নিয়ে একটি ছেলে এগিয়ে এল। এখানে অতিথিদের এভাবেই আপ্যায়ন করা হয়। একটু দূরেই রেস্টুরেন্টের বাইরে,রান্নাঘরের ঠিক সামনেই পাতা আছে একটা কাঠের টেবিল। চারটে চেয়ার গোল গোল কাঠ জোড়াদিয়ে তৈরি। বন্য আভিজাত্য রয়েছে একটা। ফুট কয়েকদূরে তারের বেড়া, ওপারে দারোকার ক্ষীণ স্রোত!

 আমরা আম্রপালির অন্দরে ঢুকে চমকে গেলাম। সব সুযোগসুবিধা যুক্ত সুসজ্জিত রুম। কাচের ঘেরা জানালার ওপাশে দেখতে পেলাম সবুজ গাছের ডাল জানালা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে। জানালা খুলে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে সে সবুজ। পাতার ফাঁকে চোখ আটকাল খুব কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণকায় দারকেশ্বর নদ। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে জল প্রায় নেই। বুকে জমে আছে ময়লা! স্নান সেরে বাইরে এসে বসলাম ঐ উন্মুক্ত কাঠের চেয়ারে। একরাশ প্রশান্তি মন জুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে। এমন নির্জনতায় গা-ভাসাব বলেই তো এই গরমেও ছুটে আসা। সামনেই রান্নাঘর। একটা টেবিল ঘিরে দু-তিনজন স্টাফ নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। এক’টা প্রায় বেজে গিয়েছে,পেটে ছুঁচোর ডন চলছে। খাওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করতেই স্টাফেদের একজনের মুখটা ছোট্ট হয়ে গেল। বলল—

ম্যাডাম, আর একটু অপেক্ষা করতে হবে।

বললাম, এখনও খাবার হয়নি?

লোকটি কাচুমাচু মুখে জানাল, হয়েছে তবে, রেস্টুরেন্টে যাঁরা খাচ্ছেন,তাঁরা অন্য কোনো গেস্টকে ঐ মুহুর্তে সেখানে না পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

মানে! এটা আবার কেমন আচরণ! রেস্টুরেন্টে একটা বিশাল বড় টেবিলে ছ-সাত জন খেতে বসতে পারে। একটাই টেবিল,তবে বাকি অংশে যে কেউ বসতে পারে। কীভাবে একটা পরিবার সেই কমন স্পেসকে পার্শোনাল করতে পারে! বিস্মিত হলাম, কিন্তু রাগ দেখালাম না। কারণ, এখানে যাঁরা কাজ করেন কেউ প্রফেশনাল নয়। সবাই গ্রামের মানুষ। তাঁদের সাহস কোথায় শহুরে বাবুদের প্রশ্ন করার বা আদেশ অমান্য করার। আমাদের সহযোগিতায় যেন লোকটি বড়ো করে শ্বাস নিল। বলল—

মালিককে বলা হয়েছে,এই সমস্যার কথা। আপনারা সত্যিই ভালোমানুষ!

 ভালো মানুষ কিনা জানি না, তবে মানুষর অসহায়তা বোঝা মানুষেরই ধর্ম। কিছুক্ষণ পর সেই পরিবারের দুই মহিলা সদস্য ও এক পুরুষ সদস্য গটমট করে নেমে এল কাঠের সিঁড়ি দিয়ে। বাইরে বসার ইচ্ছায় আমরা যেখানে বসে আছি সেই দিকে একবার তাকিয়ে দেখেও নিল। ভাবলাম হয়তো এবার আঙুল নেড়ে বলবে –‘এই ওঠ ,ওখানে আমরা বসব’। না  আমাদের বলার সাহস বোধহয় জোটাতে পারেনি, তবে স্টাফেদের একটি ছেলেকে আঙুল নেড়ে তুই সম্বোধনে কাছে ডেকে কিছু একটা বলল। হায়রে...বাবুয়ানি! মনে মনে একরাশ করুণা ছুঁড়ে দিলাম ঐ পরিবারকে। রবিরার দুপুরের পর পুরো ফাঁকা জায়গাটা। পুরোটা জুড়েই যেন আমাদের রাজত্ব। একটি স্টাফ ফুচুদা বললেন, ‘স্যার, আর কোনো অসুবিধা হবে না। যা খাবেন শুধু আগে থেকে বলে দেবেন,না হলে জোগাড় করা মুশকিল। বললাম, শাঁস আছে এমন ডাব আর পাওয়া যাবে?

উঁনি জানালেন আনিয়ে রাখবেন। সন্ধের স্ন্যাক্স আর রাতের মেনুও দুপুরেই জেনে নিলেন। বেলার দিকে গরমের তীব্রতা উপেক্ষা করা দায়। এসিরুমে সারাটা দুপুর কাটিয়ে ঠিক বিকালে নেমে এলাম নীচে খোলা লনে। পায়ের নীচে ঘাসহীন মাটি। মাথার উপর গাছের ছায়া। সামনেই অবারিত উন্মুক্ত প্রকৃতি। সন্ধে হওয়ার আগেই ছোটু বলে ছেলেটি নার্সারি দেখে আসার কথা বলতেই পা বাড়ালাম ঐ দিকে। নার্সারির মালিকের অদ্ভুত সখ। অসংখ্য পাখির খাঁচা। ম্যাকাউ থেকে অনেক অজানা রঙিন পাখির প্রতিটি খাঁচা দেখার জন্য আলাদা লোক আছে। আমরা যেতেই একটা বিশেষ জীবাণুনাশক ওষুধ স্প্রে করে আমাদের খাঁচার ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হল। এমন অভিজ্ঞতা নতুন আর বড় অদ্ভুত। হাতে পাখির খাবার নিতেই একসাথে অনেক পাখি এসে বসল হাতের উপর। হাত থেকে খুঁটে খুঁটে খেতে লাগল দানা। এক অদ্ভুত অনুভূতি!



ধীরে ধীরে সন্ধে নেমে এল। ফিরে এলাম আগের জায়গায়। অদ্ভুত মায়াময় লাগছে জায়গাটাকে। রান্নাঘরের সামনে একটা ছোট্ট আলোয় চারিদিকে এক আলো-আঁধারি খেলায় গা-ভাসিয়ে এক অনন্ত শূন্যের দিকে অলস ভাবে চেয়ে থাকা আর একটু একটু করে ক্ষয়ে যাওয়া সময়কে উপভোগ করার যে একান্ত অনুভূতি,তা বোধহয় শব্দে সঠিক প্রকাশ সম্ভব নয়! ঝিঝিঁর ডাকে নিস্তব্ধতার অস্তিত্ব প্রমাণ করছে প্রকৃতি। ঘরোয়া পকোড়ার সাথে,খাঁটি দুধের ঘন চা বিলাসিতার গায়ে যেন নক্সা চাদর! পরের দিনের জন্য তিন গ্লাস খাঁটি দুধ অর্ডার দিয়ে রাখলাম। রাধুনি প্রফেশনাল নন,কিন্তু অসাধারণ তাঁর হাতের রান্না! সম্পূর্ণ বাড়ির পরিবেশ যেন। টুকরো টুকরো হাসি ঠাট্টা, দোলনায় বসে গান শোনা, যেন ব্যস্ত জীবনের মাঝে স্বপ্নের বাস্তবতা। উপরের দিকে মুখ তুলে চাইতেই দেখলাম, ঝাঁক ঝাঁক জোনাকি আলো জ্বলিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। জোনাকির আলো আসলে সঙ্গীকে সঙ্গমে আকৃষ্ট করার জন্য। একটা ছোট্ট পতঙ্গের জীবনচক্র প্রকৃতির শোভা হতে পারে,তা জোনাকিকে এমন উন্মুক্ত ভাবে জ্বলতে না দেখলে কল্পনা করা সম্ভব নয়।

রেস্টুরেন্টটি কিন্তু ভীষণ সুন্দর! আর রোমান্টিক। ভিতরের মৃদু আলোয় মায়াবী মুহূর্তরা ভিড় করে,আর কাচের দেওয়ালের ওপারে আধজাগা সভ্যতার টিমটিম করা আলো এক অন্য জগতের অনুভূতি জাগায়। পরেরদিন এই গ্রাম্য মানুষগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ছোট্ট করে আনন্দে মাতলাম! জীবনের সাথে একটা নতুন বসন্ত জুড়ে যাওয়ার আনন্দ উদ্‌যাপন। জীবনকে এভাবেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা। এখানে জীবন আর প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক যেন। দু’হাতে তোলো আর মেখে নাও। চাওয়া আর না-পাওয়ার অতলে হারাতে হারাতে দুটি দিনের জীবনকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দ আরোও দ্বিগুণ হল, যখন জানলাম আমাদের মতো ঘুরতে আসা অসংখ্য মানুষের বিলাস যাপনের টাকায় পরিচালিত হয় একটি অনাথ আশ্রম “ উত্তরায়ণ”।

হ্যাঁ, এটা একদম একশ শতাংশ সত্যি। এই তিনটি গাছবাড়ির ভাড়া, অতিথিদের খাওয়া থেকে যে উপার্জন হয়,সেই টাকায় একটি অনাথ আশ্রমের অসংখ্য বাচ্চার প্রতিপালন হয়। আঁকা হয় স্বপ্ন সেই অনাথ শিশুদের চোখে।

দোলনায় দুলতে দুলতে পার করতে ইচ্ছা করে রাত, অথাবা শতাব্দীর পর শতাব্দী। কালের নিয়মে ভোর আসে। শুরু হয় ব্যস্ততা রোজকার জীবনে ফেরার। লাগেজ গুছিয়ে নীচে নামি। বিদায় বলতে ভালো লাগে না। বেরোনোর আগে বললাম, ‘আবার আসব’ যদিও জানি কিছু পথ থাকে,যে পথে ফেরা হয় না আর, অথবা ফিরতে নেই, শুধু রেখে যেতে হয় পদচিহ্ন। গাড়ি আবার ছুটতে থাকে শহরের ব্যস্ততায়।

যোগাযোগঃ Aambagan, (pallisree, arambag)

Contact no: 9230085084

 

Sunday, 30 January 2022

ষোলোভূজা দেবী ও দশম প্রপাতের গল্প :Simple Guidance For You In Ranchi:

 


ভ্রমণ ডায়েরির পাতা

রাঁচি

ষোলোভূজা দেবী ও দশম প্রপাতের গল্পঃ A Simple Guidance For You In Ranchi:



Click on video button 👆

রাঁচি ভ্রমণের কিছু ছবি ভিডিও আকারে দেওয়া হল। 

:Simple Guidance For You In Ranchi: deuri temple, dasam falls


শহুরে ব্যস্ততা ও উষ্ণতা ছেড়ে আমরা ক্রমশ প্রবেশ করছি গ্রাম্য শীতলতায়। রাঁচি থেকে প্রায় ঘন্টাখানেক যাওয়ার পরই একটা মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল আমাদের অটো।

 দাদা বললেন--

“রাঁচির বিখ্যাত ‘দেউরি মন্দির’ এটা। আমি এখানেই দাঁড়াচ্ছি,আপনারা গিয়ে দেখে আসুন”। 

অটোতেই জুতো খুলে শালপাতার ঠোঙায় ফুলের মালা আর প্রসাদ নিয়ে এগিয়ে গেলাম মন্দিরের দিকে। লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দিতে গেলে সারাদিন লেগে যাবে। সেদিন কোনো একটা বিশেষ তিথি ছিল। দূর দূর থেকে স্থানীয় দেহাতি মানুষের ভিড়ে ঢেকে আছে মন্দির। ভিতরের মন্দিরটি বহু প্রাচীন কালো বালিপাথরের। মন্দিরের ভাঙাচোরা ও কালো বর্ণ বুঝিয়ে দেয় এই মন্দির অনেক ইতিহাসের সাক্ষী।

সত্যিই তো এই মন্দিরের একটা প্রাচীন গল্প আছে,সে গল্পে এক আদবাসী রাজাও আছেন। রাজা 'কেরা'। প্রায় ১৩০০ সাল তখন, সিংভূমের তখন মুন্ডারাজা কেরা রাজত্ব করছেন। ছামরু পান্ডা নামের এক ব্রাহ্মণ পুরোহিত বছরে দু-বার এই রাজ্য পরিদর্শনে আসতেন। সেবার রাজা কেরা এক যুদ্ধ জিতে রাজ্যে ফিরেছেন সবে। সে সময় দেখা করতে এলেন ছামরু পান্ডা। রাজা তাঁকে নিজের রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুরোধ জানালে, রাজার সম্মানার্থে ছামরু পান্ডা সেখানেই থেকে গেলেন। পুজোপাঠ ও সাধনায় অতিবাহিত করতে লাগলেন দিন। জঙ্গলের এক পরিত্যক্ত অংশে ছমরু পুরোহিত প্রতিদিন দেবতার আরাধনা করতেন। একদিন তিনি তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। এমন সময় দেবী দুর্গা তাঁকে দর্শন দিলে, সে কথা তিনি মহারাজকে জানালেন। এই ঘটনার পরেরদিন থেকেই রাজা কেরা, সেই স্থান পরিষ্কার করার কাজে লোক নিযুক্ত করলেন।সেখানে কাজ করার সময় হঠাৎ তারা আবিষ্কার করল একটি কালো পাথর। তারা ভয় পেয়ে সকলেই ফিরে গেল, কিন্তু পরেরদিন আবার কাজে এসে তারা দেখল এক আশ্চর্য দৃশ্য। সেই স্থানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে এক কালো পাথরের মন্দির। ভিতরে রয়েছেন ষোলো ভূজা দেবী।

 দেবী দুর্গার অবতার বলেই মানা হয় এই ষোলোভূজা দেবী কালিকাকে। স্থানীয় আদিবাসী মানুষরা এখানে নিত্য পুজো দেন। বাঁশের খুঁটিতে হলুদ ও লাল সুতো বেঁধে তাঁরা মানত করেন ঈশ্বরের কাছে। সপ্তাহে ৬দিন পুজো করেন আদিবাসী পুরোহিতরা ও একদিন পুজো করেন ব্রাহ্মণ পান্ডা। এইটা এই মন্দিরের পুজোর রীতি

Simple Guidance For You In Ranchi: deuri temple,dasam falls


মন্দিরের স্থাপত্যের বিশেষত্ব হল এই গঠন পদ্ধতি। কোনোরকম বালি সিমেন্ট বা সংযুক্তকারী উপাদান ছাড়াই শুধুমাত্র পাথরের সাথে পাথরের ইন্টারলক সিস্টেমের মাধমে এই মন্দিরটি গঠিত হয়েছিল পায় ৭০০ বছর আগে। অনেকে বিশ্বাস করেন, মন্দিরের আসল নির্মানকর্তা আসলে রাজা অশোক। যখন তিনি কলিঙ্গদেশে সামরিক অভিযানে যাচ্ছিলেন, তখন এই মন্দিরের নির্মাণ করেন। মন্দিরের ষোলোভূজা দেবী মুর্তিটি কালো বর্ণ ও উচ্চতেয় ৩ফুট। মন্দিরের আকৃতি ও গঠন ওড়িশার বিভিন্ন মন্দিরের আদলেই।

  মন্দিরের বাইরে তৈরি হয়েছে রঙিন আধুনিক মন্দির,যার দেওয়ালে ছাদে আঁকা রঙিন দেবদেবীর ছবি। একসময় এই প্রাচীন মন্দিরটির কথা অনেকেই জানতেন না। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের তৎকালীন ক্যাপ্টেন ধোনি ও তাঁর পরিবার প্রতিদিন আসতেন এই মন্দিরে পুজো দিতে এমনিটাই জানাগেল স্থানীয় মানুষদের মুখথেকে।

মন্দির দর্শন ছেড়ে আমরা আবার এগিয়ে চললাম। এই রাস্তাটা রাঁচি জামশেদপুর জাতীয় সড়ক। আমাদের গন্তব্য দশম প্রপাত। পথে দেখে নিলাম রাঁচির বিখ্যাত সূর্যমন্দির। ১৮টা চাকার রথ টেনে নিয়ে যাচ্ছে সাতটা ঘোড়া। রথের আকারে গড়ে তোলা মন্দিরটা পুরোটাই শ্বেত পাথরের তৈরি। ভিতরের আরাধ্য দেবতা সূর্যদেব। অপূর্ব স্থাপত্যের নিদর্শন এই মন্দির! 

এরপর আরও কিছুটা পথ এগিয়ে যাওয়া। সামনে অপেক্ষারত দশম প্রপাত। অপেক্ষারত বলাটা ঠিক হল কিনা জানি না, কে কার অপেক্ষা করছে! আমরা অপেক্ষায় আছি দু’চোখে ভরে নেব এই প্রকৃতির খেয়ালকে। একটা গ্রাম্য পথ বেয়ে টোটো যেখানে এসে দাঁড়াল,জায়গাটায় চারপাশে বেশ কয়েকটি দোকানপাট। না, দোকান মানে মোটেই শহুরে দোকান বা পরিবেশ নয়। একেবারে খাঁটি গ্রাম্য পরিবেশ। ছোটো ছোটো দোকানপাট খাবারের। মাঝ-দুপুর প্রায়। প্রচণ্ড খিদে পেটে। চারপাশের দোকানগুলোতে টুকটাক খাবার ছাড়া তেমন কিছু নজরেই এল না প্রথমে।

 একটু এগোতেই দেখলাম, কয়েকজন একটা কাপড় দিয়ে ঘেরা স্থানে চেয়ারে বসে কিছু খাচ্ছে। এগিয়ে গেলাম। নয়া, কোনো হোটেল নয়। একজন দেহাতি মহিলা নিজেদের সামান্য খাবার বেশি পরিমানে বানিয়ে রেখেছে। কেউ খেতে চাইলে সেটাই অর্থের বিনিময়ে খাওয়াচ্ছে। দর্শনধারী না সে খাবার,  তবে গুণবিচার ? খিদের মুখে দু’গ্রাস মুখে ঢুকাতেই মনে হল যেন অমৃত। না, এ খিদের মুখে খাওয়ার জন্য মনে হওয়া নয়। বাঁধাকপির ট্যালট্যালে ঝোল, বেশ শক্ত মোটা চালের ভাত আর আলুমাখা। বাঁধাপকপির ঝোল যে এত সুস্বাদু হতে পারে, না-খেলে সত্যিই জানতে পারতাম না। 

এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে দশম জলপ্রপাতকে। উপর থেকে নীচের দিকে লাফিয়ে পড়ছে। প্রবল গর্জন আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। খুব ইচ্ছা করছে ঐ জলের কাছে যেতে। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, খাদের মধ্যে সবুজ জল জমে আছে, কিন্তু কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। এখানে আসার আগেই শুনেছিলাম, এখন আর নীচে জল্প্রপাতের সৃষ্ট ঐ জলাশয়ে স্নান করতে দেওয়া হয় না। অতটা উচ্চতা থেকে লাফিয়ে পড়া জলের ধারায় সৃষ্ট গভীর খাদের সবুজ জলাশয়ের যতই আকর্ষণ থাকুক, বিপদ তার থেকেও অনেক বেশি। 

Simple Guidance For You In Ranchi: deuri temple,dasam falls


প্রচুর মানুষ তলিয়ে গিয়েছেন ঐ জলে। আমরা আসার একমাস আগেই সেখানে এক যুবক তলিয়ে যায়, তারপর থেকেই ঐ কাঁটাতারের ব্যবস্থা। একটা স্থানীয় লোক আমাদের পথ দেখাল। আমরা নীচে না নেমে, একটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রপাতের উপরের অংশে পৌঁছালাম। ভয়ঙ্কর সেই রাস্তা। এতক্ষণ আমরা যেখান থেকে জলের ধারাকে লাফিয়ে নীচে নামতে দেখছিলাম, দেখলাম আমরা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের পায়ের তলা দিয়েই বয়ে যাওয়া জলধারাই লাফিয়ে নামছে নীচে। একহাত দূরেই রয়েছে খাদের কিনারা। ভয়ঙ্কর সেই পথ! কীভাবে গেলাম সেখানে এখন ভাবলেই বুকের ভিতরে দ্রুত হৃদ্গতির শব্দ শুনতে পাই। স্বচ্ছ কাচের গুলির মতো চকচকে জল, জমে আছে পাথরের খাঁজে খাঁজে। বাইরে রোদের তীব্রতা তখন যথেষ্ট। জুতোর ভিতরে পা ঘেমে উঠছে। জুতো খুলে সেই স্বচ্ছজলে পা ডুবিয়ে বসতেই শরীর জুড়ে নেমে এল শীতলতা।

 বড় বড় পাথর পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের অলিতে গলিতে এঁকে বেঁকে বয়ে চলেছে জলধারা। এক পাথর থেকে আরেক পাথরে যেতে হলে ডিঙাতে হবে বহমান জলধারা। কীভাবে যেন হাঁটতে হাঁটতে এমন জায়গায় এসে পৌঁছালাম চারিদিকে বড় বড় পাথর শুধু। যেদিকেই যাচ্ছি সামনে বিশালাকার পাথর। কাছাকাছি কাউকে দেখতেই পেলাম না। ক্ষণিকের জন্য মনে হল,পথ হারিয়ে ফেলেছি। একটা অজানা ভয়ের সাথে রোমাঞ্চ জুড়ে তখন মনের এক অদ্ভুত অবস্থা। দেখলাম একটা পাথরের পিছন দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। ঐধারা ডিঙিয়ে ওপারে যেতে পারলেই রাস্তা পাব। পেরতে গিয়ে পা পিছলে গেল। ঠান্ডা কনকনে জলে ভিজে গেল জুতো। তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে। ভেজা জুতোয় বেশ কাঁপুনি ধরে গেল। উপর থেকেই দেখতে পেলাম সূর্যটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছে যেন,আর ভীষণ রকম লাল দেখাচ্ছে। আসলে দিগন্ত ছোঁয়ার প্রস্তুতি। আস্তে আস্তে নেমে এলাম সেই গ্রামের পথে। অটো আমাদের নিয়ে ফেরার পথ ধরল। রাস্তায় ধারে অজানা গাছে লাল লাল কচি পাতা ধরেছে। ছুটে চলতে চলতে দেখতে পেলাম,লাল কচি পাতার আড়ালে ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ছে সূর্য। একটা দিন বিদায় নিচ্ছে, নতুন দিনের জন্ম দেবে বলে। কোথা দিয়ে যেন কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। হাতে আর মাত্র একটা দিন। আগামীকালই রাঁচিতে আমাদের শেষ দিন। অনেক জায়গা দেখা বাকি। মনটা কেমন যেন বিষন্ন হয়ে উঠছে...সারা দিন প্রকৃতির কোলে কাটিয়ে ফিরে এলাম আবার রাঁচির শহুরে ব্যস্ত জনস্রোতের মাঝে।

ক্রমশ...।।

 

Tuesday, 11 January 2022

মানব জীবন ও জলপ্রপাত Simple Guaidence For You In Ranchi


ভ্রমণ ডায়েরির পাতা

রাঁচি

 জলপ্রপাত ও মানব জীবনঃ

Simple Guidance For You In Ranchi: hudru falls
কাঠের শিল্পকলা



আর কিছুটা পথ এগোতেই পৌঁছে গেলাম হুড়্রুর সামনে, মানে যেখান থেকে প্রায় সাতশ সিঁড়ি নীচে নেমে যেতে হবে আমাদের। ছেলের বয়স তিন বছর। মনে মনে ভাবলাম এই এত সিঁড়ি পুচকেটা কীভাবে নামবে? ওকে কোলে নিয়েই বা আমরা কীভাবে নামব? সব ভাবনায় জল ঢেলে সে দিব্বি হাত ছাড়িয়ে ছুটে নামার চেষ্টা করতে লাগল। কুটুর কুটুর পায়ে কখন যে ওর সামনে আর পিছনে আমরাও নীচে নেমে এলাম বুঝতেই পারলাম না। এক মাঝবয়সের দম্পতির মধ্যে তখন রাগারাগি চলছে। রেগে গিয়ে মহিলা তাঁর স্বামীকে বললেন,

-- ‘ঐ টুকু বাচ্চা কেমন সাতশো সিঁড়ি গড়গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে,আর তুমি পারছ না’!

ভদ্রলোক বললেন,

--‘তোমারও যেমন বুদ্ধি, ওর সাথে আমার তুলনা করছ? আর আমি তো পারব না বলিনি। একটু ভয় লাগছে,উঠতেও তো হবে’।

যাইহোক নীচে নেমেই ভেবেছিলাম দেখা পাব তার। ও বাবা! দেখি সহজে তো পৌঁছানো যাবে না তার কাছে। সামনে একটা বড়ো উঁচু পাথর। পাথরে উঠতেই হতবাক! একেবারে কাছে যাওয়ার তো কোনো রাস্তা নেই! না- ছুঁয়ে দূর থেকে দেখে কি মন ভরে?

 দেখলাম, একজন ভদ্রলোক হাত ধরে অস্থায়ী বাঁশের পাটাতনের উপর দিয়ে নীচে নামাচ্ছেন তাঁর স্ত্রীকে। আমরাও ঐপথে পৌঁছে গেলাম হুড়্রুর খুব কাছে। একটা পাথর ঘেরা কুপের মধ্যে জল নেমে আসছে উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে। কি অপরূপ শোভা সে জলধারার! পাথরের দেওয়ালের মতো চারিদিকে ঘিরে আছে। কোনো আদিম মানবের গুহা কি? এই পাথরের গঠনগত একটা ভিন্নতা ভীষণ ভাবে চোখে পড়ল। জোনহার পাথরের গঠন এবড়োখেবড়ো। হলদেটে একটা ভাব। আর এই পাথরগুলোর গা মসৃণ। কালচে দেহে স্তরে স্তরে বিভিন্ন শিলার গঠন শৈলী আঁকা। কোথাও কোথাও ঐ শৈলীর উপর দিয়ে নেমে আসছে দুরন্ত জলধারা। মনে হল গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি ঐ জলধারার নীচে। ভূগোলের শিক্ষিকা কিংবা নিদেনপক্ষে যদি ছাত্রীও হতাম,তবে নিশ্চিত এপাথরের গঠন বৈশিষ্ট্য নিয়ে ছোট্ট একটা গবেষণা সেরে ফেলতাম। এই যে প্রস্তর বৈচিত্র, এ আমার মতো সাধারণ চোখে দেখেই বুঝতে পারলাম,এর ভৌগলিক মূল্য কম নয়। বসে পড়লাম জলধারার এপারে বড়ো একটা পাথরের উপর। একটু ঝুঁকে নৌকার দাঁড়ের মতো হাত নাড়তেই ছলেৎ... জল ছুঁয়ে ফেললাম। বেশ কিছুক্ষণ তিনজনে নীরবতার বুকে কান পেতে শুনতে লাগলাম জল আর পাথরের ভালোবাসার গল্প কত শতাব্দী ধরে যে ওরা একে অপরকে ভালো বেসে আসছে,সে ইতিহাস বুঝি ঐ পাথরের গায়ের দাগে দাগে লেখা। এ প্রেম কাহিনির অন্তরালে যে আরও কত প্রেম জেগে আছে,তা এ অঞ্চলের মানুষ আর মাটিই বুঝি জানে। তবে সুখ তো কপালে বেশিক্ষণ সয় না! কোথা থেকে একে একে জুটতে লাগল কথা বলা পাবলিক। উফ্‌! এমন নির্জনে এসেও কেন যে এদের কথা ফুরোয় না!

Simple Guidance For You In Ranchi: hudru falls


বেলা গড়িয়ে চলেছে,তবু মন থেকে যেতে বলছে। কোথায় থাকব? প্রকৃতি কি এই শহুরে মানুষদের বুকে ঠাঁই দেবে? শহরের বিলাসিতা আমাদের বন্যতা কেড়ে নিয়েছে। বনের জীবন ফেলে আমরা এতটা পথ এগিয়ে এসেছি যে, সে পথে কেবল মনে মনেই ফেরা যায়। এই যেমন একটু আগেই মনে মনে ঝরণার নীচে দাঁড়িয়ে ভিজছিলাম। কিছুক্ষণ আগেই দুই পাথরের দুরূহ খাঁজে লুকিয়ে ছিলাম মনে মনে। নাহ্‌! ক্রমশ মানুষের কথার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে নির্জনতা। আর ভালো লাগে না বসে থাকতে। উঠে পড়াই ভালো। ফিরতি পথের দু-ধারে কিছু মানুষ পসরা সাজিয়ে বসে আছে। কেউ কেউ কাঠ কেটে তৈরি করছে ঘর সাজানো সামগ্রী। কেউ কিনলে দু-পয়সা ঘরে আসে ওদের। শিল্প আছে,শিল্পী আছে, কদর আছে কি? প্রশ্ন করলাম নিজের মনকে। মন বলল, কিছু না থাক, এদের আছে জীবন আর যুদ্ধ, আর আছে শিল্পী সত্ত্বা। দেখলাম, দু-একজন মহিলা বড়োড়ো হাঁড়ি নিয়ে বসে আছে পথের ধারে। জানতে চাইলাম, ‘এটাতে কি আছে?’

সে বলল, হাঁড়িয়া’।

শুনেছি এতে নাকি অসম্ভব নেশা হয়। দু-একজন ছেলে ছোকরা আসেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে প্লাস্টিকের গ্লাসে ঢুকু ঢুকু  করতে শুরু করেছে এই ফাল্গুন মধুমাস, সঙ্গে এমন মধুরস। ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগলাম। এবার মজা টের পাচ্ছি। কিছুটা উঠেই দাঁড়াতে হচ্ছে। পায়ের পেশি যেন ক্লান্ত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। অবশেষে সাতশো সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠে এলাম। উপরে তখন গ্রাম্য হাটের মতো জমে উঠেছে দোকানপাট। মনে হচ্ছে কোনো এক রূপকথার অচিনপুরী থেকে ফিরে যাচ্ছি বাস্তবের অঙ্গনে। ফিরতেই হয়,এভাবেই তো ফিরতে হয় আমাদের...।

এক রাঁচিতেই কতকিছু যে দেখার আছে,জানতামই না। সন্ধের একটু আগেই হুড্রু থেকে হোটেলে ফিরেছি। না, যতই ক্লান্তি থাকুক শহরটাকে পায়ে হেঁটে না দেখলে যেন কিছুতেই মন ভরে না। যথারীতি বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। আমরা ছিলাম,শহরের একেবারে প্রাণ কেন্দ্রে। অসম্ভব ব্যস্ত হয়ে যায় এই শহর সন্ধের ঠিক পরেই। প্রচণ্ড যানজট। সন্ধের চা টা তখনও খাওয়া হয়নি। ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহে রাঁচি বেশ ঠান্ডা। দুপুরের দিকে সোয়েটার গায়ে রাখা না গেলেও,সন্ধের পর শুধু সোয়াটার নয়, টুপিও মাথায় দিতে হয়। রাস্তার ভিড় কাটিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছি। রাস্তার ধারে ফাস্টফুডের ঠেলা। দু’চোখ ঘুরিয়ে একটু খুঁজতেই দেখলাম, একটা দোকানের সামনে লোকজন হাতে পেপারকাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে গল্পের ফাঁকে চুমুক দিচ্ছে। বুঝলাম ওখানেই আছে আমাদের অমৃত। আমি চিরকালই একটু চা-খোর টাইপের। একটা ফিনফিনে ঠান্ডা, চায়ের কাপ হাতে, চোখের সামনে ভেসে চলেছে ব্যস্ত শহরের জনস্রোত। শুরু হল দোকানে দোকানে ঢুঁ মারা। ঝারখন্ড হ্যান্ডলুমের দোকানটি মনকাড়া। কিছু না কিনলে মন ভালো লাগে না। ঝোলা ভরে ফিরলাম হোটেলে। সকালে একটা নতুন রাঁচির পথে ছোটার অপেক্ষা নিয়ে একটা ক্লান্তির ঘুম।

Simple Guidance For You In Ranchi: hudru falls


ঠিক ন’টা। অটো দাদা হোটেলের সামনে এসে ফোন করলেন। আমরাও প্রস্তুত ছিলাম,বেরিয়ে পড়লাম। আগের দিন যেদিকে গিয়েছিলাম,এবার চলেছি ঠিক তার বিপরীত দিকে। দশম প্রপাতের পথে। আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে বাইরের প্রকৃতি। শহুরে ব্যস্ততা ও উষ্ণতা ছেড়ে আমরা ক্রমশ প্রবেশ করছি গ্রাম্য শীতলতায়।

ক্রমশ...।।

Wednesday, 24 November 2021

জলপ্রপাত ও মানব জীবন Simple Guaidence For You In Ranchi

ভ্রমণ ডায়েরির পাতা

রাঁচি

জলপ্রপাত ও মানব জীবন 

Simple Guaidence For You In Ranchi :

Simple Guaidence For You In Ranchi

     কুলের পসরা


রাতের নির্জন অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। একটা সাদা ঘোলাটে কুয়াশার চাদর ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে, যেন গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে থোকা থোকা মেঘ। উঠে পড়েছি সকাল সকাল। স্নান আর ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পড়তে হবে। ব্যালকনি খুলে বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছি কুয়াশা ভেজা প্রকৃতিকে। এখনও হরিণের দল মাঠে নামেনি। বাঁদরগুলো মুখ গুঁজে ঝিমাচ্ছে।একটা দুটো মাঝে মাঝে পাশের ঘরের ব্যালকনির রেলিং থেকে ঝুলে পাক খেয়ে ফিরে যাচ্ছে। কিছুটা দূরে তাকাতেই চোখ স্থির হয়ে গেল। বেশ অনেকটা দূরে হালকা অবয়ব। একটা হাতি যাচ্ছে। বিস্মিত হলাম! এত সকালে বনের ভিতরে হাতি মানে! তবে কি জংলি হাতির দর্শন পেলাম শেষে? চলে যাচ্ছে হাতিটা একা একা। পরে জানলাম না, ওটা জংলি হাতি নয়, আনারকলি। সকালে খাবার খেতে এসেছে।

 ঠিক ন’টা, গাড়ি হাজির। লটবহর গাড়িতে তুলে শুরু করলাম ছোটা রাঁচির পথে। ড্রাইভার রফিকদা বললেন,যাওয়ার পথে একটা স্পট দেখাবেন ‘কেচকি সঙ্গম’। কালো পিচের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলল গাড়ি। বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতেই সামনে দেখলাম একটা ছোট্ট ব্রিজ। গাড়ি ক্রমশ গতি কমাচ্ছে। ব্রিজ বলে কি! না, গাড়ি গতি কমিয়ে বাঁ-দিকে বেঁকে গেল। একটা সরু কালো রাস্তা,মাঝে মাঝে ভাঙা।অদ্ভুত এক নির্জনতায় ঘেরা এই পথ! যেন কোনো এক অচিনপুরের পথে ছুটে চলেছি আমরা। জনহীন নির্জন একটা রেলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি। গল্পে পড়া ভূতুরে স্টেশনের চাক্ষুষ দর্শন। কোনো প্রভেদ নেই! একটা অদ্ভুত আন্দোলন চলছে মনের মধ্যে। একটা মেলট্রেন ছুটে গেল সামনে দিয়ে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, এবার নিশ্চয় গেট খুলবে! রফিকদা নেমে দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। জিপের ভিতর থেকে আমরা তাকিয়ে আছি কোনো এক অজানা লোকের খোঁজে, ‘গেটম্যান’। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি কাউকে দেখিনি। গেলেন কোথায় তিনি? রফিকদা এগিয়ে গিয়ে হাঁকডাক করে ডেকে আনলেন তাকে। 

এগিয়ে চললাম। এসে দাঁড়ালাম একটা বিস্তীর্ণ বালুভূমির সামনে। এই সেই ‘কেচকি সঙ্গম’। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম নদীর অনেক কাছে। জল প্রায় নেই,শুকনো। ডানদিক থেকে ‘কোয়েল নদী’ আর বামদিকে ‘ঔরঙ্গা নদী’ এসে মিশেছে। দূরে আঙুল তুলে দেখালেন ড্রাইভার দা—ঐ যে সঙ্গমস্থল, আর নদীর ঠিক উলটো পাড়ে আছে এক ডাকবাংলো, যেখানে বসে বুদ্ধদেব গুহ লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কোয়েলের কাছে’। ভীষণ নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ছি যেন। মানস চোক্ষে দেখছি যেন সেই অরণ্যপুরুষকে। ভাবতে চেষ্টা করলাম ঠিক কিরকম ভঙ্গিতে বসে তিনি উপন্যাসটি লিখেছিলেন? এ অরণ্য, এ নদী-প্রকৃতি আমারও বড্ড প্রিয়। ওখান থেকে ফেরার পর লিখেছিলাম এক গল্প। একটা নয়, দু-দুটো গল্প। বালির ফাঁকদিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে চলেছে। দেখছি দু’চোখ ভরে। সময়ও বয়ে চলেছে, তাই ফিরতে হবে।

Simple Guaidence For You In Ranchi
নদী আর বালির আলপনা


 ফিরিতি পথে এসে দাঁড়ালাম সেই ব্রিজটার সামনে। দু’পাশে বালির মাঝে মাঝে জল দাঁড়িয়ে অপূর্ব কারুকার্য ফুটে উঠেছে। না দেখলে কল্পনা করা যায় না। কোয়েল নদী বালির গায়ে প্রাকৃতিক আল্পনা এঁকেছে। বিচিত্র এই প্রকৃতির কোথায় কেমন খেয়াল বোঝা মুশকিল। ছুটতে ছুটতে গাড়ি এসে দাঁড়াল ডাল্টনগঞ্জ বাজারে। এখান থেকেই রাঁচির বাসে তুলে দিয়ে রফিকদা ফিরে গেলেন।

রাঁচিতে আমাদের হোটেল ঠিক করা ছিল না। নেতারহাটে এক ট্যুরিস্ট যোগাযোগ করে দিয়েছিল নটরাজ হোটেলের সাথে। সেইমত রাঁচি নেমে রিকশা নিয়ে চলেছি। কিন্তু কোথায় সেই হোটেল? যে পথে চলেছি সেখানে শুধু বড়ো বড়ো বাড়ি। প্রায় আধঘন্টা পর একটা প্রাচীন জীর্ণ হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল রিকশাওয়ালা। বাইরে থেকে দেখে কেমন যেন লাগছে। ভিতরটা যদিও আধুনিক সজ্জিত তবে, কেমন যেন রহস্যময় মনে হল। না, ঠিক পছন্দ হল না। বেরিয়ে এসে রিকশাওয়ালাকেই বললাম, ‘ভাই একটা ভালো হোটেলে নিয়ে চলো’।

সে বলল, ‘ আমি শুনেই ভাবছিলাম, আপনারা এখানে কেন থাকতে চাইলেন। এই এলাকাটা ভালো না একদম। রাতে একা বেরতেই পারতেন না’।

জানি না, কতটা ভয়ঙ্কর সেই জায়গা। আদেও সত্যিই রাঁচিতে এমন জায়গা আছে কিনা! রিকশাওয়ালা নিয়ে এলো আমাদের ‘হোটেল সাঁই’। আমাদের ওভার বাজেটের হোটেল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আর অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছা করছিল না। হোটেলের ঘরে ঢুকে হাতে,পায়ে জল ছোঁয়াতেই বেশ এনার্জি ফিরে পেলাম। পেটে তখন ছুঁচো মারছে ডন। ভালো মতো পেটপুজো করে চারটের দিকে বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। এই অঞ্চলটা রাঁচির প্রধান অঞ্চল। বাজার-হাট, বড়ো ও মাঝারি মাপের হোটেলে ঠাঁসা। সামনে দূরন্ত রাস্তা। অবিরাম ছুটে চলেছে গাড়ি। খুব কাছেই স্টেশন। বেশ ভালোই হল। ফেরার পথে ট্রেন ধরতে সুবিধা হবে। রাঁচির পথ পায়ে হাঁটছি আমরা। এভাবে কত অজানা পথ হাঁটতে হাঁটতে চিনে ফেলেছি। হঠাৎ মাথায় এল, কটা হোটেল ঘুরে দেখলে কেমন হয়? একটু যদি বাজেটটা কমানো যায়? অনেক হোটেল আছে। এমনই একটা বাজেটের হোটেলে কথা বার্তা পাকা করে নিলাম পরের তিনদিন থাকব।

পরেরদিন বেশ সকাল সকাল নতুন হোটেলে এসে উঠলাম। এখানেই স্নান,ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে পড়ব রাঁচির জোনহা আর হুড্রু ফলস দেখতে। এই হোটেল থেকে একটু এগোতেই অটোস্ট্যান্ড। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো এখানে ঘুরে দেখার জন্য অটো অথবা ট্যাক্সি নিতে হয় দিনপ্রতি হিসাবে ভাড়া। দুটি পরিবার হলে ট্যাক্সি নেওয়া লাভজনক। আমরা অটো ঠিক করলাম। ঠিক সাড়ে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম জোনহা ফলসের পথে। রাঁচি থেকে প্রায় পনেরো কিমি রাস্তা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এই সময় রাঁচিতে যথেষ্ট ঠান্ডা। অটোতে ভালো করে নাক-মুখ ঢেকে বসে আছি। ছুটছে অটো। দু’পাশে সবুজের বাহার ছুটে চলেছে আমাদের সাথে। অপূর্ব পথশোভা! দশ-বারো কিমি যাওয়ার পর বাঁ-দিকে বেঁকে যাওয়া একটা কাঁচা রাস্তা দেখিয়ে অটো ড্রাইভার রাম কুমার সিংহ বললেন, ‘ইস রাস্তে সে হুড্রু যানা পরতা হ্যয়। হাম পহেলে জোনহা দেখেঙ্গে। ফিরতে ওয়াক্ত হুড্রু দেখেঙ্গে’।

বললাম, ঠিক আছেআপনি যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই করুন। কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে একটা কাঁচা রাস্তায় নেমে গেল অটো। গ্রামের ভিতরে আঁকাবাঁকা পথে ছুটে চলেছি। হঠাৎ একজায়গায় দেখলাম কয়েকটি বাচ্ছা ছেলে পলিপ্যাকে করে কুল বিক্রি করছে। এই সময় কুলের। এভাবে ঘুরতে আসা মানুষদের কাছে কুল বেচে দু’পয়সা উপার্জন হয় ওদের। চারিপাশে একটা অর্থনৈতিক অনটনের ছবি যেন। বিভিন্ন পথ ঘুরে এসে  পৌঁছালাম জোনহার সামনে। তখনও সে অদৃশ্য। অটো পার্কিং এর টাকা মিটিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছি হঠাৎ পিছন থেকে ডাক ‘ হেঁই দিদিমণি’। ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম একটি অল্প বয়সের হাট্টা গাট্টা চেহারার ছেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। গায়ের রং বেশ কালো। মাথায় ঝাঁকরা চুল। বলল, ‘ তুমরা দোপহরে খাবে না?’

বললাম, খেতে তো হবে, কিন্তু এখানে কোথায় খাবার পাব। ফেরার পথে খেয়ে নেব কিছু।

ছেলেটি বলল, ‘ এখানেই পাবে। আমি খাবার রেঁন্ধে দেব। কি খাবে বলো। মুরগা নাকি আন্ডা কারি?’

তুমি রেঁধে দেবে?

হ্যাঁ, দিদি। সবাই এখানে এসে এভাবেই খায়।

বলে দিমাল ঠিক আছে আন্ডা কারি বানাও। এক-দেড় ঘন্টার মধ্যে চাই কিন্তু।

সে মাথা নেড়ে চলে গেল। সামনে সুন্দর বাঁধানো সিঁড়ি ধাপে ধাপে উপরে উঠে গিয়েছে। বেশ কিছুটা উপরে ওঠার পর খাড়া ভাবে নীচে নেমে গিয়েছে। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে জোনহাকে। ঝিরঝির করে জলের ধারা নেমে আসছে, তবে ধারার বেগ অনেক কম। আসলে এইসময় নদীতে জল কমে যায়। নীচে জমে আছে পাথরের খাঁজে খাঁজে ঘনসবুজ জল। পরপর বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটায় ওখানে নেমে স্নান করা নিষেধ। 

কিছুটা পর থেকেই কাঁটা তারের ঘেরা। কিন্তু সেসব উপেক্ষা করেই বেশ কয়েকটি ছেলে জলে নেমে হুল্লোড় করে চলেছে। ওদের চিৎকার পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। ভেঙে যাচ্ছে নীরবতার জাল। এমন পরিবেশে কথা ভালো লাগে না। নীরবতা আর ঝরণার গর্জন ছাড়া কিচ্ছু ভালো লাগে না। বিরক্ত হয়ে উঠছি ওই দলটির দিকে তাকিয়ে। উপায় নেই, সহ্য করতেই হবে। প্রকৃতি তো আমার একার নয়। নামতে লাগলাম সিঁড়ি বেয়ে নীচে। একেবারে শেষ সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে পড়লাম একটা বড়ো পাথরের গায়ে। একটু নীচেই জল। ক্যামেরায় বন্দি করতে লাগলাম প্রকৃতিকে।

 ওই পাথর থেকে নেমে সামনের দিকে কিছুটা গেলেই ঝরণার জল নদীর মতো বয়ে চলেছে। খুব ইচ্ছা হচ্ছে পা ডুবিয়ে বসি কোনো এক পাথরের গায়ে। কিন্তু কিছুটা এগোতেই দেখলাম আর পথ নেই। একটু উপরে পাহাড়ের গায়ে খোদায় করা সিঁড়ির রেখা বেয়ে নেমে এলো একটি ছেলে আর মেয়ে। ওই পথেই যেতে হবে ওপারে ওই পাহাড়ি নদীর কাছে। ধীরে ধীরে পৌঁছেলাম নদীর কাছে। বড়ো বড়ো পাথরের ফাঁকে নদী বয়ে চলেছে। স্বচ্ছ জল। নীচের শ্যাওলাধরা পাথর গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হালকা ডোবালাম পা। পায়ের নখে লাগানো সবুজ নেলপালিশ স্পষ্ট দেখাচ্ছেঠান্ডা চিনচিনে জলটা। পা থেকে ঠান্ডা অনুভূতিটা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। অসম্ভব এক তৃপ্তি। দূর থেকে হেঁটে আসছে একটা আদিবাসী মেয়ে কাপড়ের বোঝা নিয়ে। দূরত্ব ক্রমশ কমছে। খুব কাছে এসে পড়েছে সে। কেমন যেন নিজেকে শহুরের উপন্যাসের নায়িকা মনে হচ্ছে। মেয়েটি তার কাপড়ের বোঝা জলে ভিজিয়ে সাবান ঘষছে। একে একে আছাড় মারছে পথরের গায়ে। ফেনা মেশানো কালো জল বয়ে যাচ্ছে। স্বছ পাহাড়ি নদীটি তার বুকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে সাবানের ফেনা। বেশ দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সাবানের ফেনা। তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন...

হালকা একটা ফিনফিনে হাওয়া বইছে। পাথরের উপর বসে শুনছি, জল আর পাথরের ভালোবাসার গল্প। জলের ছুঁয়ে যাওয়াতে সুখ আর পাথরের ছোঁয়া পাওয়াতে। অনন্তকাল ধরে এভাবেই তো ভালোবেসে আসছে একে অপরকে। সিঁড়ির উপর থেকে একটা ডাক শুনলাম। ফিরে তাকাতেই দেখলাম,হাত নেড়ে ডাকছে সেই ছেলেটি। কি যেন নাম বলেছিল, শুকরা লহরা। ডাকছে আমাদের খাবার প্রস্তুত করে। আসতে আসতে উঠে এলাম উপরে। একটা ছোট্ট ঘর, তার ভিতরে রাখা ছিল চেয়ার-টেবিল। সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। আমরা বসতেই সামনে সাজিয়ে দিল শালপাতার থালা তিনটি। দুটো আমাদের আর একটা নিরামিষ আমাদের অটোর ড্রাইভারের জন্য। হাতে তৈরি শালপাতার থালায় সাজানো, ঝরঝরে সাদা ভাত, পেঁয়াজ দিয়ে আলুমাখা, একটা শালপাতার ঠোঙায় ডাল আর আরেকটা ঠোঙায় ডিমের ঝোল।

আমাদের ছোটোবেলায় বিয়ে বাড়িতে দেখতাম শালপাতার চল ছিল। তখন এমন থার্মোকলের থালা বা চীনেমাটির প্লেটের তেমন চল ছিল না। শালপাতার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। খাবারের সাথে সেই গন্ধটা মিশে গেলে একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরি হয়। ছোটো থেকেই ঐ গন্ধটায় আমার ভীষণ ভয় ছিল। ঐ গন্ধে বিয়েবাড়ি ঢোকার আগেই দুপুরের খাবার বাইরে বেরিয়ে আসত। বেশ বড়ো পর্যন্ত এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ বছর পর সামনে অমন শালপাতার থালায় সাজানো খাবার দেখে প্রথমে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু একবার খাবার মুখে দিতেই আমার সব ভয় উড়নছুঁ। একটা অসাধারণ তৃপ্তি যেন ছড়িয়ে পড়ল মন জুড়ে। অসাধারণ স্বাদ সেই রান্নার! আজও ভুলতে পারিনি। খাওয়া শেষে পাতা তুলতে যেতেই চেপে ধরল হাত। কিছুতেই ফেলতে দিল না।

Simple Guaidence For You In Ranchi
স্থানীয় খাবার


 বললাম, কে রান্না করেছে শুকরা?

সে বলল, আমি আর আমার বউ, দুজনে মিলে।

বললাম, বউকে বলো, দারুণ রান্না হয়েছে।

কথাটা শুনেই সে বলে উঠল, ‘আজই চইলে যাবেন? থেইকে গেলে ছোঁ-নাচ দেখতে পেতেন। কাল এখানে সারা রাত ধরে ছোঁ-নাচ চইলবে। পুরুলিয়া থেইকে ছোঁ-নাচের শিল্পীরা আসবে। প্রতিবছর এই সময় এখানে ছোঁ-নাচ হয়’।

বললাম, না ভাই, থাকার উপায় নেই। কালই আমাদের ফেরার টিকিট কাটা।

দেখলাম একটা গাছতলায় বসে এক শিল্পী আপন মনে বসে বসে কাঠ কেটে জিনিস বানাচ্ছে। একটা বয়স্ক মহিলা পাকা কুলের পসরা সাজিয়ে বসেছে। ক’টা কুল কিনে মুখে দিয়েই মনটা ভালো হয়ে গেল। শুনেছিলাম, রাঁচির কুল নাকি দারুণ স্বাদের। সত্যিই প্রমাণিত হল সেকথা। এমন স্বাদের কুল সত্যিই আগে খাইনি। বেশি সময় এখানে ব্যয় করা যাবে না। এখনও বাকি হুড্রু জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া। জোনহা থেকে ফিরতি পথ ধরলাম। পথে সেই বাচ্ছাগুলো তখনও প্যাকেট ভর্তি কুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। কিনে নিলাম ওদের থেকে প্রায় তিন কেজি কুল। বাড়ি ফিরে আচার বানাব।

শুকরাকেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম ওদের কীভাবে দিন চলে। এখানে ঘুরতে আসা মানুষদের সবাই যে খাবার খায় এমনতো নয়! সব সারা বছর ধরে যারা এখানে ঘুরতে আসে সবাই তো আর দূর থেকে ঘুরতে আসে না। রাঁচির আসে পাশের মানুষজন ছুটির দিনে এসে হয়তো কিছুটা সময় কাটায়, তাদের তো আর ভাত খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। আর জায়গাটা বেশ রোমান্টিকও তাই কলেজ পালানো প্রেমিক যুগলদের ভিড় নেহাত মন্দ নয়। ফিরতি পথেই তো চোখে পড়েছে বেশ কয়েকজোড়া।

হেসে ছিল শুকরা। কত সাবলীল ভাবে বলেছিল, ‘ চলে যায় এভাবেই আমাদের। যখন ট্যুরিস্টদের সিজন চলে তখন আমি এদিকেই থাকি। এক ফসলের জমিতে মাঝে মাঝে কাজ হয়। ফাঁকে ফাঁকে কাঠ কেটে নিয়ে আসি বিক্রি করি। আমাদের মধ্যে অনেকে চলে গিয়েছে বড়ো শহরে, কোলকেতায়। মিস্ত্রির কাজ করে সেখানে। আবার অনেকে বক্সাইট খনিতেও শ্রমিকের কাজ করে। শুধু শুকরা নয়, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই এভাবেই বেঁচে থাকে টুকরো টুকরো পাওয়ার মাঝে একমুখ হাসি নিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই কথা বলে আসা শুকরার কথা ভাবতে ভাবতে এখানকার মানুষের জীবনের যাপনের কাল্পনিক এক রূপরেখা আঁকতে আঁকতে কখন যে হুড়্রুর কাছে চলে এসেছি খেয়ালই করিনি। তবে যাত্রাপথে মাঝে মাঝেই বাইরে চোখ পড়তেই একটা জিনিস ভীষণ ভাবে নজরে আসছিল, কয়েক কিলোমিটার অন্তর অন্তরই স্কুল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পড়ুয়া। কোনো এক অজানা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্ন কী ওদের বুকে ঘর বেঁধেছে! কি জানি! জানি না তো!

ক্রমশ...।।

Thursday, 28 October 2021

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান Simple Guaidence For You In Betla Forest

 ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

 রাঁচি

রুমকি রায় দত্ত

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান

  Simple Guaidence For You In Betla Forest

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান  Simple Guaidence For You In Betla Forest
elephant safari


হঠাৎ দেখলাম, সব অন্ধকার! কারেন্ট চলে গিয়েছে। মোমবাতির প্রয়োজনীয়তা এবার বুঝতে পারলাম। অন্ধকারে কিছুক্ষণ ভূতের মতো বসে থেকে মোমবাতি জ্বালালাম। ঘড়িতে সাতটা বাজে। দরজায় খটখট আওয়াজ। খুলতেই ভিতরে ঢুকল একটি ছেলে, হাতে ধরা রাতের খাবার। চক্ষু তখন চড়কগাছ। এই সন্ধেবেলা ডিনার! বলতেই ছেলেটি হেসে বলল, ‘ রাতমে অউর কুছ নেহি মিলে গা’। আমি বললাম কফি? সে মাথা নাড়ল। ‘হাম সব ঘর চল যায়েঙ্গে। হামলোগ সাত বাজেই খানা দে দেতে হ্য’।

আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কারেন্ট কখন আসবে?’

সে বলল, ‘দশ বাজে। ইঁহা ছে বাজে কারেন্ট যাতে হ্যয় অউর দশ বাজে আতে হ্যয় রোজ’।

একটা বড়ো করে ঢোঁক গিলে বললাম, ‘আর টিভি? সেটা চলল না কেন?’

ছেলেটি হা হা করে হেসে বলল, ‘সব বান্দরকা কামাল হ্যয় ম্যাডামজি’।

বান্দরকা কামাল!!

বান্দরকা কামাল! কিছুই বুঝলাম না, তখনও রহস্য অনেক বাকি। কিন্তু সমস্যা হল এই নির্জনে মোমের আলোয় সেই রাত দশটা পর্যন্ত সময় কাটবে কী করে? একটু আগেই দিয়ে যাওয়া খাবারের পাত্রের ঢাকা খুলে দেখলাম, দলা পাকানো ফ্রাইড রাইস। এ খাবার যে ঠান্ডা হলে আর খাওয়া যাবে না,তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঘড়িতে সন্ধে সাতটা তখন। আইপ্যাডে একটা সিনামা লোড করা ছিল। অন্ধকারে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, সাথে সিনামা আর বাইরে জঙ্গল। আহা! এমন মেলবন্ধন কি সহজে হয়?

 সাড়ে আটটা বাজতে না বাজতেই মনে হল কিছু খেলে হত, একটু চা বা কফি! কোনো চান্স নেই। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। লম্বা করিডোর পুরো ফাঁকা। সুন্দর সাজানো ঝকঝকে পরিবেশে বাঁধানো রাস্তায় সোলারে আলো জ্বলছে। বাইরে বেশ ঠান্ডা। চাদর গায়ে একটু বেরিয়ে এলাম। একটু এগোতেই বাঁ-দিকে একটা দরজাহীন ঘরে দেখলাম জনা তিনেক লোক গভীর ঘুমে আচ্ছান্ন। আকাশে মায়াবী চাঁদ, দূরে কালো জঙ্গলের অবয়ব গায়ে কুয়াশা মেখে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হিমভেজা গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসের গায়ে। এই নিঃশব্দতার মধ্যে হঠাৎ মনে হল,জঙ্গল থেকে যদি কোনো বাঘ ঢুকে পড়ে এখনই! বাঘ আছে কি এই জঙ্গলে? নিজের হাঁটার শব্দ বারবার ফিরে আসতে লাগল নিজের কানে। এসবের মাঝে কখন যে দশটা বেজে গিয়েছে মাথায় ছিল না। হঠাৎ ঘরের লাইটটা জ্বলে উঠতেই বদলে গেল পরিবেশটা। না, বেশ ক্লান্ত তখন আমরা। সারাদিনের ক্লান্তি চোখের পাতা জুড়ে,তাছাড়া খুব ভোরে উঠতেও হবে। সকালে এলিফ্যান্ট সাফারি আছে। এখানে দুটি হাতি আছে। একটার নাম আনারকলি, আরেরকটার নাম জুঁহি। দুটো হাতিই সকালে দু’বার সাফারি করায়, তাই আগের দিন বিকেলেই বুকিং করে রাখতে হয় হাতি। একটা হাতিতে চারজন বসার জায়গা। আমাদের সাফারি টাইম সকাল সাড়ে ছ’টা।

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান  Simple Guaidence For You In Betla Forest
জংগলে জলাশয় betla forest



ঘুম ভেঙে বাইরে এসে দেখলাম, চারিদিকে ঘন কুয়াশা। কুয়াশা হালকা না হলে সাফারি শুরু হবে না, তবু সময়েই পৌঁছে গেলাম স্পটে। জঙ্গলের এলাকার মধ্যেই একটা উঁচু কাঠের বাড়ির মতো করা। সেখানে টিকিট দেওয়া হল আমাদের। হাতি এসে দাঁড়াল ঠিক সাতটা। হাতির পিঠের সমান উচ্চতায় তখন দাঁড়িয়ে আছি আমরা।একটা ছোট্ট গেট খুলে কাঠের বাড়ির বারান্দা থেকে উঠে বসলাম হাতির পিঠে আমরা তিনজন, তিনজন বলাও ভুল। আমরা আড়াই জন। অনুরাগ তখন তিন। হাতির কানের পিছনে বসে আছে মাহুত। সামনের গেট খুলে যেতেই নড়ে উঠলাম আমরা। হাতি চলছে আর তার চলনের সাথে তালে তালে দুলতে দুলতে চলেছি আমরা। ঘন কুয়াশা ক্রমশ গায়ে লেগে দূরে সরে সরে যাচ্ছে। বড়ো বড়ো গাছের মাঝ দিয়ে আঁকা আছে পথে রেখা, সেই পথে চলেছি আমরা।

 গতদিন শেষ দুপুরে যেখানে হরিণ ছিল, সেখানে শুরু হয়েছে একটা দুটো হরিণের আনাগোনা। একটা ছোট্ট জলার পাশে দাঁড়ানো গাছের গায়ে প্রভাত কিরণে ফুটে উঠছে আলোর নকসাঁ। জলে চকচকে রোদ্দুর একফালি। ধীরে ধীরে যেন ঘুম ভাঙছে প্রকৃতির। পথের পাশে বাঁশঝাড় দেখে হাতি আনারকলি বেঁকে গেল সেই দিকে। মাহুতের শাসনে আবার সোজা চলতে শুরু করল। কিছুটা এগোতেই ডানদিকে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল হাতি। গভীর জঙ্গল! এলোমেলো দাঁড়িয়ে থাকা বড়ো বড়ো গাছের ডালপালা দু’হাতে ঠেলে খুব সাবধানে আমরা বসে রইলাম হাতির পিঠে। 

একেই হাতির দুলকি চালে পিঠে সুষ্ঠভাবে বসে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, তাতে আবার জঙ্গলের এবড়োখেবড়ো পথ,পুরো বোতলে রাখা জলের মতো নাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের। ছোট্ট বাচ্ছা নিয়ে নিজেকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। গভীর জঙ্গলে কোথাও মস্ত বেলগাছে তার ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরও গভীরের দিকে চলেছি আমরা। একটা অদ্ভুত এ্যডভেঞ্চার বোধ কাজ করছে মনের ভিতরে। হঠাৎ দেখলাম মাহুত ঝুপ করে নেমে পড়ল হাতির পিঠ থেকে। চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে আরে... করছেন কী? তিনি মুখে অদ্ভুত একটা শব্দ করে নীচ থেকেই হাতিকে পরিচালনা করতে লাগলেন, আর আমাদের বললেন, ‘আগর জংলি হাতি দিখায়ি দিয়া তো মুঝে বাতানা’। শুনেই বুক কেঁপে উঠল। মানে এখানে জংলি হাতিও আছে নাকি? 

মাহুত জানাল সেখানে মাঝে মাঝেই জংলি হাতি চলে আসে, আর ওরা পোষা হাতি দেখলে বিপদ হতে পারে। যাই হোক দুরুদুরু বুকে তখন সামনে এগোতেই ভয় লাগছে, অথচ পিছোনোর পথ নেই। মালভূমির পথ এমনিতেই উঁচুনিচু সেই পথে হাতির পিঠে যে কত ভয়ানক পরিস্থিতি হতে পারে তা তখনও আমাদের জানা ছিল না। গভীর জঙ্গলে অসংখ্য কাঁটা ঝোপের ভিতর দিয়ে চলেছি। হঠাৎ হাতি দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনের পথ প্রায় ফুট তিনেক নিচে। মাহুত বলল, ‘পিছে খিঁচকে ব্যইঠিয়ে, সিট কো আচ্ছেসে পকড়কে’। হাতি একটা পা নীচে দিতেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লাম আমরা। দু’হাতে সামনের ধরার জায়গাটাতে ভর দিয়ে দেহের ভার সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলাম, নিজের সাথে বাচ্চার ভার সামলানো যে কত কঠিন! ঠিক সেই মুহূর্তে একবার সত্যিই মনে হল বড্ড বেশি সাহস দেখিয়ে ফেলেছি আমরা। নিজেদের সামলানোর আগেই হাতি হুড়মুড় করে প্রচন্ড দুলুনি দিয়ে নেমে পড়ল নীচে। সামনে অজানা পথ, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যদি পড়ে যাই নিশ্চিত মৃত্যু। বেশ কিছুটা এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম এক নির্জন জলাশয়ের সামনে। সত্যি বলতে বাঁধা নেই, ঠিক সেই মুহূর্তে অপরূপ প্রকৃতির মাঝেও অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করে চলেছে। পাশের পাহাড়ের মতো উঁচু একটা জায়গা দেখিয়ে মাহুত বলল, ঐ গুহাতে আগে বাঘ বাস করত। জানতে চাইলাম, ‘এখন বাঘ থাকে না?’ উত্তর এল,

--আভি বো ইধার নেহি রহেতা

---আপনি কখনও বাঘ দেখেছন?

--হাঁ, ইসি জাগাপে। বহুতবার দেখা। শের ইঁহা পানি পিনে আতা থা।

-- জলাশয়ের উলটো দিকে একটা ছোট্ট পাঁচ বাই পাঁচ ফুটের ঘরের মতো জায়গা দেখিয়ে বলল, শিকারি লোগ পহলে উঁহা পর ছুপা রহেতে থে। শের ইঁহা পর পানি পিনে আতে থে।

হাতিটা ততক্ষণে জলাশয়ে শুঁড় ডুবিয়ে জল খেতে শুর করেছে। খেলছে জল নিয়ে। আমার মনে কেমন যেন একটা অজানা ভয় কাজ করছে তখন। আগে বাঘ থাকত, কিন্তু যদি হঠাৎ করে এই মুহূর্তে সত্যিই বাঘ চলে আসে! যেমন মাঝে মাঝেই শোনা যায় লোকালয়ে কোথা থেকে বাঘ এসে হাজির। এটা তো তার নিজের আস্তানা। ভয়ে ভয়ে মাহুত কে জিজ্ঞাসা করলাম, যদি হঠাৎ বাঘ চলে আসে?

সে বলল, হাতি সে বাঘ ডরতে হ্যয়। হাতি কে পিঠ মে বাঘ কুছ নেহি কর পায়ে গা।

তবু কি ভয় যায়! সঙ্গে বাচ্চা আছে যে, মাথায় আবোলতাবোল ভাবনা আসতে লাগল। হাতি জল খেয়ে ছোট্ট জলাটা পেরিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। আবার সেই উঁচুনিচু পথ! এক ঘন্টারও অধিক সময় আমরা এভাবে চলছি। এক অন্য সবুজ পথে এবার ফিরতে লাগলাম। ঘড়িতে তখন প্রায় ন’টা বাজতে চলেছে। দ্বিতীয় হাতিটিও ততক্ষণে একদল সাওয়ারী নিয়ে ফিরছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার দুজনে নতুন যাত্রী নিয়ে জঙ্গলে যাবে। এক প্যাকেট বিস্কুট হাতির নরম মুখে ঢুকিয়ে দিতেই সে শুঁড় মাথায় তুলল। আসলে পশুরা মানুষ নামক পশুর থেকে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হয়, সেটা আবার প্রমাণ হল।

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান  Simple Guaidence For You In Betla Forest
অলস যাপন


সারাটা দিন আজ শুধু নির্জনবাস। এখানে দেখার মূল আকর্ষণ এই জঙ্গলই। এছাড়া আছে একটা জীর্ণ দুর্গের অবশিষ্ঠ অংশ। না আজ আর কোথাও যাব না, পায়ে হেঁটে ঘুরব এই জায়গাটা। সাফারি সেরে সামনেই লজের ক্যান্টিনে চা পান করলাম। আজ যেন প্রকৃতই একটা অবসর যাপন। স্নানের তাড়া নেই, কাজের তাড়া নেই, নেই কোথাও যাওয়ার তাড়া। ক্যান্টিনের সামনে বসেই রইলাম, দেখলাম ক্রমশ ট্যুরিস্টরা আসছে। ভিড় বারছে।

 আসে পাশে বাঁদরের দল যেন মিছিল করছে। ভিড় ভালো লাগছিল না, ফিরে গেলাম ঘরে, খোলা ব্যলকনিতে চেয়ার নিয়ে বসার উপায় নেই, বাঁদর ঝুলছে রেলিং ধরে, জানালা খুলতেই একটা এসে টুকি দিয়ে গেল ঘরের ভিতরে। দাঁত খিঁচিয়ে মুখ ভেঙাল না, ভালোবাসল বুঝতেই পারলাম না। স্নান সেরে বারোটার দিকে শীতের মিঠে রোদ পিঠে মেখে বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের ক্যাম্পাস ছেড়ে রাস্তায়। একটু এগোতেই একটা ছোট্ট ঘুনটি। পান, সিগারেটের দোকান। 

পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ধরে কিছুটা এগোতেই বিকট গন্ধ নাকে এল। দেখলাম, একটা বাড়িতে রোদে শুকাচ্ছে পাঁপড়ের মতো কিছুজানতে চাইলাম কি ওটা, নামটা বলল, কিন্তু আমার মগজ থেকে নিমেষে উড়ে পালাল সেটা। আমার মগজটা এমনই একটু, যেটা মনে ধরে না, সেটাকে কিছুতেই স্থান দেয় না। এখন স্মার্ট ফোনের দৌলতে এমন অনেক মনে রাখতে না পারা কথা রেকর্ড করে রাখি তাই। বেরোনোর সময় শুনেছিলাম মিনিট পাঁচেকের পথ মেইন রাস্তা ধরে এগোলেই আছে একটা জঙ্গলের প্রাণীদের সংগ্রহশালা। চললাম, সেই পথে। একটা ছোট্ট সংগ্রহশালা। ফিরতে ফিরতে দুপুর একটা।

 ক্যান্টিনেই খাওয়া সেরে রোদে নির্জীবের মতো ঝিমানো, বেশ আরামের কিন্তু। ধীরে ধীরে কমছে ট্যুরিস্টদের ভিড় শীতের নরম রোদের বিকেলে এক ভাঁড় গরম চা খেয়ে উঠে পড়লাম আমরা, বিকেলে আবার যাব জঙ্গলে জিপ সাফারি। যে দাদা আমাদের নেটারহাট থেকে বেতলা এনেছিলেন তিনিই নিয়ে যাবেন। পৌনে চারটের দিকে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের পথে। জঙ্গলের ভিতরে আঁকা পথরেখা দেখে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি। সন্ধের এই সময়ে সাধারণত অনেক জীব-জন্তু দেখা যায়। ড্রাইভার দা জানালেন, কপালে থাকলে তবেই দেখা মেলে তাদের। জঙ্গলের মাঝে কোথাও ফাঁকা মাঠ, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ জলাশয়। 

ঝোপঝাড়ের দিকে চোখ পড়লেই মনে হচ্ছিল এই বুঝি দুটো জ্বলজ্বলে চোখ দেখতে পাব ঝোপের আড়াল থেকেনা, কোনো চোখ দেখা আমাদের ভাগ্যে ছিল না,তবে দেখলাম ময়ূর। চলতে চলতে দেখতে পেলাম গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে কেমন ঝুপ ঝুপ করে নেমে আসছে সন্ধে রং। ঠিক সন্ধের মুখে ফিরে এলাম বনবাংলোয়। সোলার গুলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে, আবার গিয়ে বসলাম ক্যান্টিনের সামনে। হাতগুলো বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠছে। আকাশে গাছের ফাঁক দিয়ে উজ্জ্বল চাঁদের আলো উঁকি মারছে কি মায়াবী সেই চাঁদের আলো। গরম চায়ে চুমুক দিয়েছি সবে আবার চলে গেল ক্যারেন্টবিকল্প উপায়ে ক্যারেন্টের ব্যবস্থা যদিও ছিল,কিন্তু সব সোলার প্যানেল গুলো খারাপ হয়ে পড়ে আছে। আগের থেকেই আরও কিছু মোমবাতির জোগাড় করেই রেখেছিলাম। দশটা পর্যন্ত চলে যাবে। একটা মন খারাপের অন্ধকার রাত। সকাল হলেই চলে যাব এই নির্জনতার কোল থেকে...রাঁচির পথে। আবার নতুন একটা পথ। 

ক্রমশ......