ভ্রমণ ডায়েরির পাতা
রাঁচি
Simple Guidanc For You In Ranchi:
শেষ পর্ব
সকাল থেকেই
মনটা বিষাদগ্রস্ত,যেন শরীর জুড়ে ক্লান্তি। আসলে ক্লান্তি তখনই মানুষকে বেশি চেপে
ধরে যখন মনও ক্লান্ত হয়। বুঝতে পারছিলাম,এক্লান্তি যতটা না শরীরে, তার থেকে অনেক
বেশি মনে। রাত ন’টায় ফেরার ট্রেন! আবার ফিরে যাওয়া ব্যস্ততা আর অবসাদের ভিড়ে।
রাঁচির বিশুদ্ধ প্রকৃতি যেন বেঁধে ফেলেছে মনকে। সারাদিন ঘুরব বাকি জায়গা গুলোতে।
সকাল ন’টা বাজতেই প্রতিদিনের মতো বেরিয়ে পড়লাম। অটোর ড্রাইভারদাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘আজ কাঁহা জায়েঙ্গে হামলোগ?’
বললেন, ‘ ভগবান বিরসা বায়োলজিক্যাল পার্ক’।
রাঁচি শহর
থেকে কুড়ি মিনিটের রাস্তা। সকাল থেকেই মেঘলা ছিল আকাশ। পার্কের সামনে পৌঁছাতেই
টিপটিপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। এই পার্ক সম্পর্কে কিছু বলার আগে একটাই কথা বলব, যদি
কেউ রাঁচি আসেন, তবে অবশ্যই এই পার্কটিকে না দেখে যাবেন না। এতে কি আছে আমি লিখে
বোঝাতে পারব না, কারণ প্রকৃতিকে লিখে বোঝানো যায় না। শুধু অনুভব করতে হয় মনে মনে।
গভীর অরণ্যের মাঝে প্রাণবন্ত বন্যপ্রাণীর দল। খাঁচার ঘেরাটোপের বাইরে খালিচোখে বাঘ
দেখতে হলে এখানে অবশ্যই যেতে হবে। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। সাদা হরিণের দল
লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। চিতল হরিণ,কৃষ্ণসায়রের কাজল কালো চোখের দিকে একবার তাকালে আর
কোনো দিন মুছে ফেলা যাবে না মনথেকে। ভল্লুক,হাতি,নীলগাই,বনবিড়াল...না, লিখতে লিখতে
ক্লান্ত হয়ে যাব আমি। কোথা থেকে যেন বয়ে গেল তিন ঘন্টা। একরাশ ভালোলাগা নিয়ে ফিরে
চললাম রাঁচি শহরের দিকে। সোজা রাঁচির রকগার্ডেন। পাথরেও যে প্রাণের স্পন্দন জাগে,
এখানে এসে প্রথম অনুভব হল। অপূর্ব এই জায়গা! থরে থরে সাজানো পাথরের খাঁজে খাঁজে
সবুজ গাছপালা মুকুটের মতো সেজে রয়েছে। উপর থেকে চোখে পড়ল বিস্তৃত স্থির জলরাশি।
কাঁখে ড্যাম। ফুরফুরে হাওয়ায় মন বারবার উদাস হতে চায়। কিছুটা সময় নীরবে বয়ে যায়। রকগার্ডেন
থেকে সোজা ‘নক্ষত্র গার্ডেনে’ রাঁচির গোলাপ বাগান। অজস্র গোলাপ! সময় দ্রুত এগিয়ে
চলেছে। ড্রাইভার দা আগেই বলেছিলেন, এখানে পাহাড়ি মন্দির বলে একটা বিখ্যাত মন্দির
আছে। সন্ধের একটু আগেই সেখানে পৌঁছালাম। অনেক সিঁড়ি,প্রায় ২০০ তো হবেই। ক্লান্ত
শরীরে শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই জুড়িয়ে গেল মন। কি শান্ত! চূড়ায় একটা ছোট্ট মন্দিরে
রয়েছে একটা শিবলিঙ্গ। ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে নেমে এলাম নীচে। অনতিদূরেই রয়েছে
জগন্নাথ মন্দির। সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। আর মাত্র কয়েকটা ঘন্টা এই রাঁচি শহরে। কেমন
যেন এক আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে উঠেছে ঐ অটোচালকের সঙ্গে। মাত্র তো তিনদিন! আসলে মনের
বন্ধন যদি খাঁটি হয়,তা তিন মিনিটেই গড়ে তোলা যায়। হোটেলে ফিরলাম তখন সাড়ে ছ’টা
বাজে। ট্রেন ধরার আগে সবসময় একটা অস্থিরতা কাজ করে। আসার সময়ও ছিল এমন অস্থিরতা,
কিন্তু তারমধ্যে একটা আনন্দ মিশে ছিল। আর ফেরার মুহূর্তে মিশে আছে বিষাদ। ঠিক
আটটায় অটোয় চেপে বসলাম। আধঘন্টা সময় লাগবে স্টেশন পৌঁছাতে। চলতে চলতে একটা দোকানের
সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল অটোটা। ড্রাইভারদা দোকান থেকে একটা বড় ক্যাডবেরী কিনে
ধরিয়ে দিলেন আমার ছেলের হাতে। অজান্তেই চোখের কোণটা যেন ভিজে এল। এভাবেই গড়ে ওঠে
বন্ধন। মনুষ্যত্বের বন্ধন,যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। ব্যাগ গুলো প্ল্যাটফর্ম
পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ফিরে যেতে যেতে ঘুরে তাকালেন একবার। হাসি বিনিময়ের শেষে
অজান্তেই হাত নেড়ে বিদায় জানালাম একে অপরকে।
সমাপ্ত।
বিশেষ তথ্যঃ হাওড়া থেকে
আমরা রাঁচি গিয়েছিলাম হাতিয়া এক্সপ্রেসে। এটা বেশ সুবিধাজনক, কারণ ভোরবেলায় রাঁচি পৌঁছায়।
আমাদের ভ্রমণ ছিল [ নেতারহাট ২দিন যেদিন
পৌঁছালাম আর পরের দিন >>> ওখান থেকে ভাড়ার জিপে বেতলা। পথে লোধ জলপ্রপাত কে
দেখে নেওয়া >>> বেতলার নির্জনতায় ২দিন অর্থাৎ জার্নির দিন ও পরের পুরোদিন>>>
ওখান থেকে রাঁচি পৌঁছালাম ঠিক সন্ধের মুখে। ৩দিন রাঁচিতে। দুটি পুরোদিন ও একটি অর্ধদিন।
শেষদিন রাতের ট্রেনেই ফেরা।
ট্র্যুরটি দুটি ভাগেও আপনারা করতে পারেন।হাতে
সময় কম থাকলে নেতারহাট ও বেতলা। অন্য একটি ট্যুরে রাঁচি।
নেতারহাটে কী দেখবেন ও কোথায় থাকবেন?
ম্যাগনোলিয়া সানসেট পয়েন্ট, আপার ঘাগরি,
লোয়ার ঘাগরি, পায়ে হেঁটে এখানকার প্রকৃতিকে উপভোগ করা ও জনজীবন দেখা।
থাকার জায়গাঃ সরকারি নিবাস
হোটেল “প্রভাত বিহার” এখান থেকেই সব থেকে ভালো সূর্যোদয় দেখা যায়। এছাড়াও কাছাকাছি
২/৩টি হোটেল আছে। বুকিং অনলাইন করা যায়।
বেতলাঃ জঙ্গল সাফারি অবশ্যই
করবেন। বেশি মজা এলিফ্যান্ট সাফারিতে। ২টি হাতি আছে,প্রতিদিন দুটো সাফারি হয়,বুকিং
আগেরদিন বিকালেই করে রাখতে হয়। কাছাকাছি একটি ফোর্ট আছে, ফরেস্ট থেকে হাঁটা পথে একটা
মিউজিয়াম আছে।
ফরেস্টের লজ ছাড়াও রাস্তার পাশেই বেশ
ভালো কয়েকটি প্রাইভেট হোটেল আছে।
রাঁচি থাকা ও দেখার জায়গাঃ রাঁচি মেইন
স্টেশন রোডের উপরেই বিভিন্ন মানের ও দামের পছন্দসই হোটেল আছে।
ঘোরার জন্য এখানে অটোস্ট্যান্ড থেকে অটো
বা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে ট্যাক্সি পেয়ে যাবেন।
জোনহা জলপ্রপাত, হুন্ড্রু জলপ্রপাত, দশম জলপ্রপাত,সূর্যমন্দির,
দেউরি মন্দির, ভগবান বিরসা বায়োলজিক্যাল পার্ক, রক গার্ডেন, নক্ষত্র গার্ডেন, পাহাড়ি
মন্দির, টেগর হিল, কাঁখে ড্যাম।
এই সমস্ত জায়গাগুলি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন এই ব্লগের
রাঁচি ভ্রমণের বিভিন্ন পর্বে। ব্লগের ভ্রমণ লেবেলে ক্লিক করলে সব ভ্রমণ দেখতে পারবেন।
এই পর্বেই শেষ হল রাঁচি ভ্রমণ।
No comments:
Post a Comment