ভ্রমণ ডায়েরির পাতা
রাঁচি
জলপ্রপাত ও মানব জীবনঃ
| কাঠের শিল্পকলা |
আর কিছুটা পথ এগোতেই পৌঁছে গেলাম হুড়্রুর সামনে, মানে যেখান
থেকে প্রায় সাতশ সিঁড়ি নীচে নেমে যেতে হবে আমাদের। ছেলের বয়স তিন বছর। মনে মনে
ভাবলাম এই এত সিঁড়ি পুচকেটা কীভাবে নামবে? ওকে কোলে নিয়েই বা আমরা কীভাবে নামব? সব ভাবনায় জল
ঢেলে সে দিব্বি হাত ছাড়িয়ে ছুটে নামার চেষ্টা করতে লাগল। কুটুর কুটুর পায়ে কখন যে
ওর সামনে আর পিছনে আমরাও নীচে নেমে এলাম বুঝতেই পারলাম না। এক মাঝবয়সের
দম্পতির মধ্যে তখন রাগারাগি চলছে। রেগে গিয়ে মহিলা তাঁর স্বামীকে বললেন,
-- ‘ঐ টুকু বাচ্চা কেমন সাতশো সিঁড়ি
গড়গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে,আর তুমি পারছ না’!
ভদ্রলোক বললেন,
--‘তোমারও যেমন বুদ্ধি, ওর
সাথে আমার তুলনা করছ? আর আমি তো পারব না বলিনি। একটু ভয় লাগছে,উঠতেও তো হবে’।
যাইহোক নীচে নেমেই ভেবেছিলাম দেখা পাব তার। ও বাবা! দেখি
সহজে তো পৌঁছানো যাবে না তার কাছে। সামনে একটা বড়ো উঁচু পাথর। পাথরে উঠতেই হতবাক!
একেবারে কাছে যাওয়ার তো কোনো রাস্তা নেই! না- ছুঁয়ে দূর থেকে দেখে কি মন ভরে?
দেখলাম, একজন
ভদ্রলোক হাত ধরে অস্থায়ী বাঁশের পাটাতনের উপর দিয়ে নীচে নামাচ্ছেন তাঁর স্ত্রীকে।
আমরাও ঐপথে পৌঁছে গেলাম হুড়্রুর খুব কাছে। একটা পাথর ঘেরা কুপের মধ্যে জল নেমে
আসছে উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে। কি অপরূপ শোভা সে জলধারার! পাথরের দেওয়ালের মতো
চারিদিকে ঘিরে আছে। কোনো আদিম মানবের গুহা কি? এই পাথরের গঠনগত একটা ভিন্নতা ভীষণ
ভাবে চোখে পড়ল। জোনহার পাথরের গঠন এবড়োখেবড়ো। হলদেটে একটা ভাব। আর এই পাথরগুলোর গা
মসৃণ। কালচে দেহে স্তরে স্তরে বিভিন্ন শিলার গঠন শৈলী আঁকা। কোথাও কোথাও ঐ শৈলীর
উপর দিয়ে নেমে আসছে দুরন্ত জলধারা। মনে হল গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি ঐ জলধারার নীচে। ভূগোলের শিক্ষিকা কিংবা নিদেনপক্ষে যদি
ছাত্রীও হতাম,তবে নিশ্চিত এপাথরের গঠন বৈশিষ্ট্য নিয়ে ছোট্ট একটা গবেষণা সেরে ফেলতাম।
এই যে প্রস্তর বৈচিত্র, এ আমার মতো সাধারণ চোখে দেখেই বুঝতে পারলাম,এর ভৌগলিক মূল্য
কম নয়। বসে পড়লাম জলধারার
এপারে বড়ো একটা পাথরের উপর। একটু ঝুঁকে নৌকার দাঁড়ের মতো হাত নাড়তেই ছলেৎ... জল ছুঁয়ে
ফেললাম। বেশ কিছুক্ষণ তিনজনে নীরবতার বুকে কান পেতে শুনতে লাগলাম জল আর পাথরের
ভালোবাসার গল্প। কত শতাব্দী ধরে যে ওরা
একে অপরকে ভালো বেসে আসছে,সে ইতিহাস বুঝি ঐ পাথরের গায়ের দাগে দাগে লেখা। এ প্রেম কাহিনির
অন্তরালে যে আরও কত প্রেম জেগে আছে,তা এ অঞ্চলের মানুষ আর মাটিই বুঝি জানে। তবে সুখ তো কপালে বেশিক্ষণ সয় না!
কোথা থেকে একে একে জুটতে লাগল কথা বলা পাবলিক। উফ্! এমন নির্জনে এসেও কেন যে এদের
কথা ফুরোয় না!
বেলা গড়িয়ে চলেছে,তবু মন থেকে যেতে বলছে। কোথায় থাকব?
প্রকৃতি কি এই শহুরে মানুষদের বুকে ঠাঁই দেবে? শহরের বিলাসিতা আমাদের বন্যতা কেড়ে
নিয়েছে। বনের জীবন ফেলে আমরা এতটা পথ এগিয়ে এসেছি যে, সে পথে
কেবল মনে মনেই ফেরা যায়। এই যেমন একটু আগেই মনে মনে ঝরণার নীচে দাঁড়িয়ে ভিজছিলাম।
কিছুক্ষণ আগেই দুই পাথরের দুরূহ খাঁজে লুকিয়ে ছিলাম মনে মনে। নাহ্! ক্রমশ মানুষের
কথার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে নির্জনতা। আর ভালো লাগে না বসে থাকতে। উঠে পড়াই ভালো। ফিরতি পথের দু-ধারে কিছু মানুষ পসরা সাজিয়ে বসে আছে। কেউ কেউ কাঠ কেটে তৈরি করছে ঘর সাজানো সামগ্রী। কেউ কিনলে দু-পয়সা ঘরে আসে ওদের। শিল্প আছে,শিল্পী আছে, কদর আছে কি? প্রশ্ন করলাম নিজের মনকে। মন বলল, কিছু না থাক, এদের আছে জীবন আর যুদ্ধ, আর আছে শিল্পী সত্ত্বা। দেখলাম, দু-একজন মহিলা বড়ো বড়ো হাঁড়ি নিয়ে বসে আছে
পথের ধারে। জানতে চাইলাম, ‘এটাতে কি আছে?’
সে বলল, ‘হাঁড়িয়া’।
শুনেছি এতে নাকি অসম্ভব নেশা হয়। দু-একজন ছেলে ছোকরা
আসেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে প্লাস্টিকের গ্লাসে ঢুকু ঢুকু করতে শুরু করেছে। এই ফাল্গুন মধুমাস, সঙ্গে এমন মধুরস। ধীরে ধীরে উপরে উঠতে
লাগলাম। এবার মজা টের পাচ্ছি। কিছুটা উঠেই দাঁড়াতে হচ্ছে। পায়ের পেশি যেন ক্লান্ত
হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। অবশেষে সাতশো সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠে এলাম। উপরে তখন
গ্রাম্য হাটের মতো জমে উঠেছে দোকানপাট। মনে হচ্ছে কোনো এক রূপকথার অচিনপুরী থেকে
ফিরে যাচ্ছি বাস্তবের অঙ্গনে। ফিরতেই হয়,এভাবেই তো ফিরতে হয় আমাদের...।
এক রাঁচিতেই কতকিছু যে দেখার আছে,জানতামই না। সন্ধের একটু আগেই হুড্রু থেকে হোটেলে ফিরেছি। না, যতই
ক্লান্তি থাকুক শহরটাকে পায়ে হেঁটে না দেখলে যেন কিছুতেই মন ভরে না। যথারীতি
বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। আমরা ছিলাম,শহরের একেবারে প্রাণ কেন্দ্রে। অসম্ভব ব্যস্ত
হয়ে যায় এই শহর সন্ধের ঠিক পরেই। প্রচণ্ড যানজট। সন্ধের চা টা তখনও খাওয়া হয়নি।
ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহে রাঁচি বেশ ঠান্ডা। দুপুরের দিকে সোয়েটার গায়ে রাখা না
গেলেও,সন্ধের পর শুধু সোয়াটার নয়, টুপিও মাথায় দিতে হয়। রাস্তার ভিড় কাটিয়ে পায়ে
পায়ে এগিয়ে চলেছি। রাস্তার ধারে ফাস্টফুডের ঠেলা। দু’চোখ ঘুরিয়ে একটু খুঁজতেই
দেখলাম, একটা দোকানের সামনে লোকজন হাতে পেপারকাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে গল্পের
ফাঁকে চুমুক দিচ্ছে। বুঝলাম ওখানেই আছে আমাদের অমৃত। আমি চিরকালই একটু চা-খোর
টাইপের। একটা ফিনফিনে ঠান্ডা, চায়ের কাপ হাতে, চোখের সামনে ভেসে চলেছে ব্যস্ত
শহরের জনস্রোত। শুরু হল দোকানে দোকানে ঢুঁ মারা। ঝারখন্ড হ্যান্ডলুমের দোকানটি
মনকাড়া। কিছু না কিনলে মন ভালো লাগে না। ঝোলা ভরে ফিরলাম হোটেলে। সকালে একটা নতুন
রাঁচির পথে ছোটার অপেক্ষা নিয়ে একটা ক্লান্তির ঘুম।
ঠিক ন’টা।
অটো দাদা হোটেলের সামনে এসে ফোন করলেন। আমরাও প্রস্তুত ছিলাম,বেরিয়ে পড়লাম। আগের
দিন যেদিকে গিয়েছিলাম,এবার চলেছি ঠিক তার বিপরীত দিকে। দশম প্রপাতের পথে। আস্তে
আস্তে পালটে যাচ্ছে বাইরের প্রকৃতি। শহুরে ব্যস্ততা ও উষ্ণতা ছেড়ে আমরা ক্রমশ
প্রবেশ করছি গ্রাম্য শীতলতায়।
ক্রমশ...।।
No comments:
Post a Comment