Translate

Monday, 27 September 2021

নেতারহাট থেকে বেতলার পথে Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.


ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

রাঁচি

রুমকি রায় দত্ত

নেতারহাট থেকে বেতলার পথেঃ

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.


গ্রামটির নাম মহুয়া। একটা রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে, আরেকটা রাস্তা বাঁ-দিকে গ্রামের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। যদিও বেতলা যেতে হলে আমাদের ঐ সোজা রাস্তা ধরেই এগোতে হবে, কিন্তু লোধ দেখতে হলে আমাদের ঐ গ্রামের মধ্যের রাস্তাটা ধরতে হবে। গ্রামে ঢোকার আগেই রাস্তার মুখে একটা ছোট্ট হোটেলে ড্রাইভারদা দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে এগিয়ে চললেন গ্রামের রাস্তা ধরে। 

মহুয়া গ্রাম থেকে বাইশ কিমি পথ যেতে হবে আমাদের। গ্রামের জনবহুল রাস্তা ছেড়ে আমরা নির্জন পথে নেমে এলাম। সরু পিছের রাস্তা দু’পাশে ধু ধু মাঠ, রোদে পোড়া হলদে ঘাস। রাস্তা ঢেউয়ের মতো আঁকা বাঁকাগাড়ি চলতে চলতে কখনও ঊর্ধমুখী আবার কখনও নিম্নমুখী। যেন ঢেউ এর ছন্দে পথচলা। 

নির্জন একটা গ্রামের মধ্যদিয়ে গাড়ি এসে পৌঁছাল একটা খোলা মাঠের সামনে। এরপর আর কোনো রাস্তা নেই। ওই মাঠ পেরোলে আবার একটা নতুন রাস্তা শুরু হবে। মাঠ পেরিয়ে যে রাস্তায় এসে পড়লাম,তার রূপ একেবারে অন্যরকম। সরু কালো রাস্তার দু’ধারে মানুষ সমান ঘন ঘাসের জঙ্গল। সে জঙ্গলের রং কোথাও সবুজ আবার কোথাও রোদে পুড়ে হলুদ। মাঝে মাঝে একটা দুটো বড় গাছ ন্যাড়া, পাতা নেই। আসলে মরশুমটাই তো পাতা ঝরার। কোথাও কোথাও দু-একটি দেহাতি মানুষ কাঠ সংগ্রহে ব্যস্ত। কিছুদূর যেতেই দূরে একটি পাহাড়ের দিকে হাত তুলে ড্রাইভারদা দেখালেন, ‘ঐ যে পাহাড়টা দেখছেন, আমরা ওখানেই যাব। ঐ পাহাড়েই রয়েছে লোধপ্রপাত।বর্ষার সময় হলে এই এখান থেকেই শুনতে পেতেন গর্জন’।

 গাছগাছালি ঘেরা হালকা জঙ্গলের পথ দিয়ে চলতে চলতে নজরে এল কোথাও জলের ধারা নালা থেকে নেমে পথের এপাশ থেকে ওপাশে বয়ে যাচ্ছে কুলু কুলু ছন্দে। এই জলধারা ঐ প্রপাত থেকে জঙ্গলের বিভিন্ন পথ ঘুরে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা জঙ্গলঘেরা পোড়ো জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল আমাদের গাড়ি। অসম্ভব রকমের নির্জন এই জায়গাটা। ঝরনার জলের গমগমে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। ড্রাইভারদা’র সাথে আরেকটি ছেলেও আমাদের এই পথের সঙ্গী ছিল। সে বলল, ‘সামনে সরু ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে হবে, আসুন আপনারা’। 

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.
লোধ প্রপাত ( lodth)


দেখলাম একটা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক-দেড় ফুট চওড়া ভাঙা হাতে তৈরি সিঁড়ি নীচে নেমে গিয়েছে। চারপাশের ঝোঁপ এমনভাবে রয়েছে যে, সে সিঁড়ি প্রায় দেখাই যায় না। অনেক কষ্টে দেওয়াল ঘেঁষে ঝোঁপ সরিয়ে কিছুটা নীচে নেমে দেখলাম, এরপর বেশ কয়েকধাপ সিঁড়ি উপরে উঠে গিয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আবার নীচে নামতে নামতে প্রায় দুশোটা সিঁড়ি পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম সেই অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের সামনে, যার সামনে এক কথায় মাথা নত করা যায়। প্রায় ৪৪৫ ফুট উচ্চতা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বুঢ়ানদী। ঝারখন্ড আর ছত্তিশগড়ের সীমানায় এ নদীর উৎস। কি অপূর্ব এই রূপ! এ কেবল চোখেই ধারণ করা যায়।  চারপাশের পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঝরণার জল পাহাড়ের পাদদেশে সৃষ্টি করেছে ঘন সবুজ জলাশয়ের। মাঝে মাঝে মাথা তুলে আছে পাথর। টলটলে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে মন চাই। বসলাম একটা উঁচু পাথরে। নিমেষের মধ্যে চোখমুখ ভরে উঠল বিন্দু বিন্দু জলকণায়। এক অদ্ভুত তৃপ্তি সারা মন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ফিরতে মন চায় না তবু ফিরতে তো হবেই। এখনও কত বিস্ময় যে বাকি আছে।

 আবার একই পথে ফিরে এলাম ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আবার এসে দাঁড়ালাম সেই মহুয়া গ্রামের হোটেলটির সামনে। খাবার কথা আগেই বলা ছিল। সামান্য নিরামিষ ভাত খেয়ে আবার শুরু হল পথচলা। এপথের শেষ হবে বেতলায়। বেশ ঘন্টাখানেকের পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম একটা ছোট্ট গ্রাম বরেসাঁড়। এখানে ভালো ক্ষীরের পেঁড়া পাওয়া যায়। জঙ্গলে মিষ্টিমুখ ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ভালো। সঙ্গে নিলাম পেঁড়া। গ্রাম ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা পথে এগিয়ে এসেছি বেতলার পথে,হঠাৎ দূর থেকে দেখতে পেলাম, একটা জঙ্গলের সীমানা। গাড়ি আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ল ‘মারোমার’ জঙ্গলের পথে।

 নির্জন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে শুয়ে আছে কালো পিচের রাস্তা, ঝকঝকে পরিষ্কার। একটা অদ্ভুত জীবন্ত অনুভূতি! চারিদিকে অজস্র প্রাণের স্পন্দন জেগে আছে,কিন্তু শুধু অনুভবে। সব প্রাণ জেগে আছে অন্তরালে, সবুজ গাছের পাতায় পাতায়,ডালে ডালে। অজানা আচেনা শব্দের গায়ে, লুকিয়ে থাকা বন্য জন্তুর উপস্থিতির অনুভবে। রাস্তায় পড়ে আছে টাটকা হাতির বিষ্ঠা। পথের দু’পাশে বাঁশের ঝারে যেন ঘূর্ণিমাতন বয়ে গিয়েছেহয়তো মিনিট কয়েক আগেই এপথে জংলি হাতির দল গিয়েছে, আর যাবার আগে রেখে গিয়েছে তাদের দামালপনার চিহ্ন। বাঁশ হাতির প্রিয় খাদ্য। চোখ,কান, মস্তিষ্ক যেন সজাগ হয়ে আছে,যদি কারোর দেখা মেলে! একটা অদ্ভুত শিহরণ বুকে নিয়ে ছুটে চলেছি আমরা মারোমার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। রাস্তার বাঁ-দিকে পড়ে আছে একটা পোড়া জিপের কাঠামো। 

সালটা ঠিক মনে পড়ছে না, তবে সম্ভবত ১৯৯৯ হবে, মাওবাদীদের আক্রমণে পুড়ে গিয়েছিল এই জিপগাড়িটি ও মারোমার বনবাংলো। বেশ দীর্ঘপথ পেরিয়ে তখন ঘড়িতে সাড়ে তিনটে প্রায়, এসে পৌঁছালাম বেতলায়। নেতারহাট থেকেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাছবাড়িটি আমাদের বুকিং করা হয়েছিল। গাড়ি একটা বড় গেটে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। সামনে তাকিয়ে দেখলাম একটা উঁচু টিলার উপর রয়েছে বনদপ্তরের লজ। বাইরে থেকে দেখতে বেশ সাজানো গোছানো। ছোট্ট কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলাম। লজের এরিয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। উপরে উঠেই বাঁদিকে একটা পায়ে হাঁটা রাস্তা চলে গিয়েছে। একটি ছেলে এসে আমাদের জিনিস নিয়ে ঐ পথে হাঁটছে দেখে আমরাও পিছন পিছন গেলাম। একটা বড় গাছ, তার মাঝ থেকে পিলারের উপর রয়েছে একটা বাড়ি। একটা কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপরে। ছেলেটি ঐ সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে ঘরের তালা খুলল। সিঁড়িটি ভাঙা, ঘরটির বারান্দায় অসম্ভব নোংরা ছড়ানো। বাঁদরের পায়খানা। সিঁড়িতে, ছাদে, বারান্দার রেলিং এ এদিক ওদিকে দিয়ে ঝুলে আছে বাঁদর। কোনো রকমে ভয়ে ভয়ে প্রবেশ করলাম ঘরে ভিতর। ভীষণ অন্ধকার। ভিতরে দুটি রুম। পুরো কাঠের তৈরি, কিন্তু বারান্দায়, দরজায় সূক্ষ্ণ তারের নেট লাগানো। কেমন যেন একটা গা ছমছমে পরিবেশ। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই মনে হল, হাঁপিয়ে যাচ্ছি। ছেলেটি জানাল এটাই আমাদের বুকিং ছিল। বাথরুমে গরমজল পাওয়া যাবে না। জানালা লাগিয়ে না রাখলে মশা ঢুকবে। ঘরটার শূন্যতা দেখে বুকের ভিতরে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা বোধ হতে লাগল। দুটোদিন এই ঘরে কাটাব কেমন করে! ঠিক করলাম,এই ঘরে থাকব না আমরা। ছেলেটিকে জানাতেই সে বলল, ‘তবে চলুন অফিসে, কেয়ারটেকারকে বললে তিনি অন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দেবেন। দরজায় তালা দিয়ে ছেলেটি নেমে চলে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে গিয়ে হঠাৎ বাঁ-দিকের জঙ্গলের দিকে চোখ আটকে গেল। বিস্ময়ের বিস্ময়! পঞ্চাশ-ষাট ফুট দুরেই একপাল চিতলহরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে আপন মনে। ঘাস খাচ্ছে। এভাবে গরুর পাল, ছাগলের পালকে দেখেছি অনেক কিন্তু চিতলহরিণের এমন সমাবেশ এত প্রাকৃতিক ভাবে এই প্রথম। বিস্ময়ে চোখ ফেরাতে পারলাম না। তাকিয়ে রইলাম ওদের দিকে। মুগ্ধটা এতটাই ছিল যে, ফটো তুলতেই ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে পড়তেই দ্রুত ক্যামেরায় তাক করলাম।

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.
betla forest (বেতলা জঙ্গল)


ঢোকার মুখে লজের যে দিকটা দেখেছিলাম, সেখানেই লজের কেয়ারটেকার একটা ভালো রুমের ব্যবস্থা করে দিলেন। ডাল্টনগঞ্জের অফিসে ফোন করে রুমটা তিনিই বুক করে দিলেন। ঘরে ঢুকেই মন ভরে গেল। বেশ বড় ঘরটা। মাঝ বরাবর একটা স্ট্যান্ড দেওয়া খাট। পাশের দুটো সোফা,মাঝে কাচ লাগানো বেতের টেবিল। খাটের উলটো দিকের দেওয়ালে টাঙানো একটা ৩২ ইঞ্চির টিভি। একটা কাঠের আলমারি। ভিতরের দিকে দরজা দেখে সেটা খুললাম। দরজার ওপাশে জঙ্গলের দিকে একটা খোলা বারান্দা। দারুণ ব্যপার। মন আনন্দের নেচে উঠল। জিনিসপত্র ভিতরে রেখে দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। তখনও সন্ধ্যা নামেনি। লজের সামনের দিকেই আছে খাবার,রান্নার জায়গা। সামনে বাঁধানো চাতালে চেয়ার পাতা। আমরা হাঁটতে হাঁটতে লজের পিছনের দিক দিয়ে জঙ্গলের এড়িয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছি নিজের অজান্তেই। অনতিদূরে বড় শিংওয়ালা একপাল হরিণ দেখে সেই দিকেই হাঁটছি, হঠাৎ পিছন থেকে ডাক এল, ‘উধার যানা মানা হ্যয়’। ভয়ে আর এগোলাম না

টিলার নিচ দিয়ে ঘুরে এসে বসলাম লজের রান্নাঘরের সামনের চেয়ারে। এবার একটু একটু করে যেন নেমে আসছে সন্ধে। ঠান্ডাটাও বেশ জোরাল হচ্ছে। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিয়ে কিছুক্ষণ গল্প চলল আমাদের। ঠিক সন্ধের মুখে রুমে ফেরার ঠিক আগেই কেয়ারটেকার এসে হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা ছয় ইঞ্চির মোমবাতি। কারণ জানতে চাইলাম। বললে, ‘রাখ লিজিয়ে, কাম আয়েগা’। রুমে ফিরে ব্যলকনির দরজা খুলতেই চমকে উঠলাম! আর কত বিস্ময় লুকানো আছে এই বেতলার জঙ্গলে? ব্যলকনির খোলা রেলিং থেকে হাত দশেক দূরেই ঘুরে বেরাচ্ছা চিতলহরিণের দল। এতকাছে! জীবনে কখনও আর এমন কি দেখাতে পাবো? বন্য হরিণ প্রাকৃতিক ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের এত কাছে! সামান্য নিঃশ্বাসটাও যেন জোরে নিতে পারছি না তখন। একটু আওয়াজেই সরে যাচ্ছে ওরা দূরে। ছোটো ছোটো ঘাসে মুখ ডুবিয়ে খেয়ে চলেছে একমনে। ক্রমশ অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। মিশে যাচ্ছে হরিণের দল অন্ধকারের সাথে। ব্যলকনি বন্ধ করে ভিতরে এলাম। গোটা ঘর জুড়ে ঝকঝকে আলো। রাতের খাবারে ফ্রাইডরাইস আর চিলিচিকেন বলা আছে। ঐ একটাই মেনু আজ সবার জন্য। বলেছে সন্ধের দিকেই খাবার দিয়ে যাবে। ঘড়িতে ছটা বাজে। টিভিটা খুলতে গেলাম, কিন্তু কিছুতেই চলল না। হঠাৎ দেখলাম, সব অন্ধকার! 

তারপর কী হল...? থাকবে পরের পর্বে

Sunday, 19 September 2021

নেতারহাটের নির্জনতা The Ultimate Guide to Netarhat

 

                                    ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

                                               রাঁচি

                                          রুমকি রায় দত্ত

Thtনেতারহাটের নির্জনতা ঃ (দ্বিতীয় পর্ব)The Ultimate Guide to Netar


The Ultimate Guide to Netarhat


ঘুমের মাঝে বিশ্রামরত মস্তিষ্ক কিযেন একটা সংকেত পাচ্ছে! আস্তে আস্তে স্পষ্ট হলো সে সংকেত। উঠতে হবে।

 সূর্য ওঠার সময় হয়ে এসেছে। ভোর হওয়ার আগেই দোর খুলতে হবে,তা না হলে সূয্যিমামার হামাদেওয়া দেখব কি করে। ভোরের আলো ফোটার আগেই গিয়ে দাঁড়ালাম লাগোয়া ব্যালকনিতে। নিশি শেষে কুয়াশা মাখা শাল-পিপুলের জঙ্গল ফিসফিস করে কত কথা যেন বলে চলেছে। পূবের আকাশটায় কি রং লাগছে!—ক্যামেরা নিয়ে ছুটলাম ছাদে।---উন্মুক্ত তমসাচ্ছন্ন আকাশ পানে চাতকের পিপাসা নিয়ে, সূর্যমামার হামা দেওয়ার সেই দুর্ল দৃশ্যসন্ধিক্ষণ শুধু আমার মস্তিষ্কের দৃশ্যপটে নয়,উন্নত প্রযুক্তির সুমিষ্ট ফল ব্যাটারী চালিত ফটোবাক্স নামক বস্তুটিতেও তাকে বন্দি করার অভিপ্রায়ে। ধীরে ধীরে ঘন অন্ধকারে ফিকে গোলাপি রঙের আবির ছড়ালো। তারপর উজ্বল হলুদ,ফিকে বেগুনি,উজ্বল কমলা---রঙে রঙে দিগন্তরেখা রঙীন হয়ে উঠল। শুরু হল ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক—যেন কোনো লাস্যময়ী নারীর শরীরের সুন্দর ভঙ্গিমা হারিয়ে যাওয়ার আগে সংগ্রহ করার পাগলামি। রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেদ করে কানে এসে পৌঁছাতে লাগলো পাখির কূজন

The Ultimate Guide to Netarhat
সূর্যোদয়ের মুহূর্ত



নেতারহাটে আলাদা করে বিশেষ কিছু দেখার নেই। আপার ঘাগরি আর লোয়ার ঘাগরি বলে দুটো ছোটো জলের ধারা আছে,আর একটা বড় প্রাকৃতিক ঝিল। এখানকার প্রকৃতিই আসলে দর্শনীয়। কি আছে প্রকৃতিতে সেটা নেতারহাট না এলে সঠিকভাবে অনুভব করা সম্ভব নয়। সূর্যোদয় দেখে নেমে এলাম একেবারে নীচে। হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে কুয়াশা মেখে হাঁটতে বেশ লাগল। রেস্টুরেন্টে সকালের চায়ের সাথে শীতের অনুভব নেওয়া এক অনবদ্য পাওনা। ঘাগরি দুটিতে এই ফেব্রুয়ারিতে জল থাকে না,তাই সেটা দেখার কোনো আগ্রহ এল না। স্নান সেরে তিনজনে বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। পাশদিয়ে তখন হুসহুস বেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। যারা গতকাল এসেছিল তারা ফিরছে। এখানে সাধারণত শনিবার এক দিনের জন্যই লোকজন আসে। আমাদের মত দু’তিন দিন থাকার পাবলিক খুব কম, এমনটা জানিয়েছিলেন হোটেলের ম্যানেজার স্বয়ং। হাঁটতে এসে পড়লাম গাছগাছালি ঘেরা একট পিচ রাস্তায়। রাস্তার গায়ে আলোছায়ায় বিচিত্র এক নকশা পায়ের নিচে ফেলে হেঁটে চলেছে তিনটি বাচ্ছা মেয়ে। মাথায় তাদের কাঠের বোঝা। বললাম, ‘এই তোদের একটা ছবি তুলছি’। ওরা হাঁসল। দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠল। এটাই এখানকার প্রকৃত চিত্র। বনের কাঠ বেচে উপার্জন এখানকার অনেক মানুষের। কেউ শহরে গিয়েছে রাজমিস্ত্রির কাজে। অনেকে কাজ করে বক্সাইট খনিতে। কিছু আধুনিক যুবক আমাদের মত ট্যুরিস্টদের গাড়ি ভাড়া দিয়ে উপার্জন করে। তবে যেহেতু এখানে ট্যুরিস্টরা শনিবার বেশি ভিড় জমায়, তাই ঐ একদিন বা দু’দিনই যা ইনকাম হয়। বাকি দিনগুলো গাড়ি নিয়ে ওরা যায় শহরে। আর নতুন শহরে বাবুদের দেখলে, ছোটো ছোটো বাচ্চারা টাকা চায়। একটাও একটা উপার্জনের পথ।

আমরা একটা গাছ ঘেরা মাঠের ভিতর দিয়ে হেঁটে পৌঁছালাম সেই বড় রাস্তায়,যেখানে গত দিন বাস থেকে নেমে ছিলাম। যানবাহনের আধিক্য নেই কোনো। মাঝে মাঝে একটা দুটো গাড়ি বা মটরসাইকেল যাচ্ছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম একটা আবাশিক আশ্রমের সামনে। পথের দু’ধারে গাছ আর মাঝে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি আমরা। একেকটা কুটিরের মত বাগান ঘেরা ছাত্রদের একেকটা থাকার জায়গা। একটি ছাত্রর কাছে জানতে পারলাম এখানে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়তে আসে ছাত্ররা। পথে নজরে এসেছিল একটি বালিকা বিদ্যালয়,একটি National Residential School  হাঁটতে হাঁটতে এই সুন্দর পথে কখন যে দুপুর হয়ে গিয়েছে মনেই ছিল না।

দুপুরের খাওয়া সেরে অপেক্ষায় তখন ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট দেখতে যাবার। গাড়ি তো বলা আছে। ঠিক সাড়ে তিনটে, অপেক্ষা গাড়ি এলেই ছুটবো সেখানে। ঘড়ির কাঁটা সরতে লাগল, কিন্তু গাড়ি আর এল না। এ এক ভেস্তে যাওয়া পরিকল্পনা আর মন খারাপের গল্প। সত্যি আর এলো না গাড়ি। অনেক ছোটাছুটি করলাম, বড় রাস্তায় গিয়ে দোকান গুলোতে বললাম। হলো না নতুন কোনো গাড়ির যোগাড়। গাড়ির ড্রাইভার কথা দিয়ে কথা রাখলো না। আসলে আসার পথে রাস্তায় পারহেড হিসাবে প্যাসেঞ্জার পেয়ে সে বেমালুম ভুলে গেল আমরা তাকে বুক করে রেখেছি। বড় রাস্তার ধারে প্রতি বুধবার হাট বসে। পড়ে থাকা হাটের কাঠামোর চারপাশ ঘুরে, ফিরে এলাম হোটেলে। সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে আকাশের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম। কালো থোকা মেঘের মাঝাখান থেকে একটা রক্তাভ আলোর চ্ছ্বটা হোটেলের লনে বসেই দেখা যাচ্ছে। ছবি তুললাম সেই মেঘের। ভিতরে তখন তীব্র না পাওয়ার যন্ত্রণা! ভীষণ মনখারাপ লাগছে, ভীষণ... ভীষণ! সূর্যটা ডুবে গিয়ে নেমে এলো রাত। নিস্তব্ধ নির্জন প্রকৃতির মাঝে ভেস্তে যাওয়া পরিকল্পনার যন্ত্রণাটা ক্রমশ মিশে যেতে লাগল। পরেরদিন রওনা হবো বেতলা। যতই মনখারাপ হোক, মনখারাপের রাতটা গুছিয়ে রাখলাম অন্তরে। যা পেয়েছি তাই বা কম কি! নেতারহাট সত্যিই ‘নেচারহাট’ কোনো সন্দেহ নেই।

আবার একটা নতুন সূর্যের উদয় দেখে শুরু হল আমাদের নতুন একটা দিন। ন’টার মধ্যেই স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে তৈরি আমরা। হোটেলের ম্যানেজারের ভাই বেতলায় থাকেন,সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে আসছেন। আমাদের বেতলা নিয়ে যাবেন। প্রায় পুরো দিনটাই আমাদের পথে পথে কাটবে। ঠিক ন’টা বাজে তখন, একটা জিপ এসে দাঁড়াল। হোটেলের ছেলে গুলোই আমাদের জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে দিল। যাত্রাপথে কয়েকটি স্পট দেখে নেব এমনই কথা আছে ড্রাইভারের সাথে। বললাম, ‘দাদা এখানে একটা প্রাকৃতিক ঝিল আছে শুনেছিলাম, একবার ওটা দেখাতে নিয়ে যাবেন?’ ড্রাইভার দা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ ঠিক হ্যয়, চলিয়ে,মগর ইয়াদা টাইম নেহি হ্যয় ম্যাডামজি’।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, বেশি সময় নেব না। একটু ফটো তুলেই চলে আসব’।

গাড়ি মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই এসে দাঁড়াল একটা বিশাল আকৃতির ঝিলের সামনে। স্বচ্ছ সাদা জলে সূর্যের আলো চকচক করছে। বেশ কিছুটা দূরে বড় বড় গাছগুলোর শান্ত ছায়া ছবির মতো আঁকা রয়েছে ঝিলের বুকে। কি প্রশান্তি! দীর্ঘক্ষণ সেই দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে মন চাই। বেশ কিছু ফটো তুলে গিয়ে বসলাম গাড়িতে। না, আর সময় নষ্ট করা যাবে না। কিন্তু কপালে যদি সময় নষ্ট লেখা থাকে তবে? ঠিক সেটাই ঘটল। গাড়ি বেশ ছুটে চলছিল সরু কালো পিচের রাস্তার উপর দিয়ে। কোথাও দু’পাশে ধু ধু মাঠ, কোথাও বা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাছ। মাঝে মাঝে বক্সাইট খনি থেকে মাল বোঝাই ট্রাককে সাইড দিয়ে আমাদের গাড়ি বেশ ভালোই ছুটছিল, হঠাৎ ব্রেক লাগিয়ে থেমে গেল গাড়ি। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, আগে দুটো ট্রাক দাঁড়িয়ে। যা ঘটেছে তার ঠিক আগে। কি ঘটেছে জানার আগেই আমাদের পিছনে অনন্ত চারখানা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ড্রাইভার এসে জানালেন, সামনে একটা ট্রাকের চাকা এমন ভাবে ফেটেছে যে, সে গাড়ি রাস্তায় আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পাশ দিয়ে খুব বেশি হলে একটা মানুষ যাওয়ার রাস্তা আছে। জানতে চাইলাম, ‘কি হবে এবার?’

The Ultimate Guide to Netarhat
প্রভাত বিহারের পিছনের ব্যালকনি দৃশ্য



ড্রাইভার জানালেন, ষাট কিমি দূরে একটা গ্রাম আছে, সেখান থেকে মেকানিক আসবে তবে রাস্তা পরিষ্কার হবে। বললাম, ‘বিকল্প কোনো রাস্তা নেই?’ উনি জানালেন না। দু’পাশে ঝোঁপে ভরা মাঠ, তাও রাস্তা থেকে অনন্ত দু’হাত নিচু, সুতরাং পাশ দিয়ে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই। যা বুঝলাম, দুপুর দুটোর আগে এপথে এগোনো সম্ভব নয়, আর এমনটা হলে আমাদের আর ‘লোধ’ জলপ্রপাতটা দেখতে যাওয়া হবে না। উফ্‌! এবার সত্যিই বিরক্ত হলাম,আর ভীষণ কান্না পেল আমার। এই ভ্রমণে কি শুধুই ভেস্তে যাবে সব! প্রায় ঘন্টাখানেক পর দেখলাম, পিছন থেকে দু-একটা গাড়ি ব্যাকগিয়ারে পিছনের দিকে যাচ্ছে। কিছু তো কারণ আছে। ড্রাইভারদা জানালেন, ‘একটা রাস্তা পাওয়া গিয়েছে,কিন্তু সব ধরণের গাড়ি যেতে পারবে না। দেখি একবার চেষ্টা করে’। পিছাতে লাগল আমাদের গাড়িও। বেশ কিছুটা ব্যাকে এসে দাঁড়াতেই দেখলাম, রাস্তার ডানদিকে এবড়োখেবড়ো উঁচু নিচু ঢিবি ও ঝোঁপের মাঝখান দিয়ে একটা গাড়ি যাচ্ছে। পাশের জমিটা রাস্তা থেকে হাতখানেক নিচু। জিপের মতো শক্তপোক্ত গাড়ি ছাড়া সত্যিই ওই পথে কোনো গাড়ির যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের গাড়িও ঢকাম ঢকাম করে লাফাতে লাফাতে কিছুটা এগোতেই একটা ঢিবিতে গেল আটকে ড্রাইভার স্টেয়ারিং এ বসে থাকল, দুজন লোক পিছন থেকে ধাক্কা দিতেই সেই গাড়ি আবার লাফাতে লাফাতে চলতে শুরু করল। অবশেষে আবার এসে উঠলাম পিচের রাস্তায়। জানি না সামনের পথে আর কি কি বাকি আছে,তবে মনটা আবার আনন্দে ভরে উঠল কারণ, লোধ দেখা হবে। ভেস্তে যেতে যেতেও ভেস্তে না যাওয়া ভ্রমণের গল্প এটা। গাড়ি আপন গতিতে ছুটে চলল। প্রায় ষাট কিমি পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম এই পথের একমাত্র বর্ধিষ্ণু গ্রামে। গ্রামটির নাম ‘মহুয়া’। নেতারহাটের মানুষ সপ্তাহে একদিন এই গ্রামে এসেই সারা সপ্তাহের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিয়ে যায়। এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি।

এরপরেই আছে অ্যাডভেঞ্চারের এক যাত্রা লোধের পথে... পরের পর্বে আগামী রবিবার

 

Sunday, 12 September 2021

নেতারহাটের নির্জনতা

 

ভ্রমণ ডায়ারির পাতা থেকে

রাঁচি

রুমকি রায় দত্ত

নেতারহাটঃ

নেতারহাতের সমাজচিত্র


হাতিয়া এক্সপ্রেস রাঁচি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁতেই নেমে পড়লাম আমরা। বেশ অনেকটা ব্যাগ টেনে পৌঁছালাম প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে। তারপর ওভারব্রিজ পেরিয়ে ওপারে। ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা প্রায়। একটা তরতাজা চনমনে স্টেশন। অসংখ্য ট্যাক্সি,অটো। আমাদের প্রথম দিনের গন্তব্য নেতারহাট। আগেই শুনেছিলাম, স্টেশন থেকেই ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় নেতারহাট। এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে জানতেই সে বলল, যাওয়া-আসা মিলিয়ে চার হাজার টাকা নেবে। কিন্তু সমস্যা হল আমরা আর এপথে ফিরব না। আমাদের ভ্রমণসূচি অনুসারে নেতারহাট থেকে বেতলা, সেখান থেকে রাঁচি। ট্যাক্সি ড্রাইভারই সমস্যার সমাধন করে দিলেন। জানালেন, স্টেশন থেকে অটোতে বাস স্ট্যান্ড চলে যেতে, সেখান থেকে ভালো বাস প্রতিদিন নেতারহাট যায়। তবে তাই হোক, বলে একটা অটো ঠিক করলামসকালের ব্যস্ত, চলমান রাঁচি শহরের মধ্যদিয়ে ছুটে চলল অটো। নেতারহাটের কথা শুনেই অটোওয়ালা আপ্লুত হয়ে প্রসংশা করতে লাগলেন। বললেন, ‘দুনিয়ামে যাঁহা ভি যাউ,ইতনা আচ্ছা সানরাইজ নেহি দিখনে মিলেগা কভি। উঁহা তো মানো বগল সে নিকলে গা সূরিয়’তার কথা শুনতে শুনতেই একটা কল্পনার ছবি যেন আঁকা হয়ে যাচ্ছিল মনে। প্রায় আটটার দিকে পৌঁছালাম বাস স্ট্যান্ড। বাস দাঁড়িয়ে আছে দেখে অটো ড্রাইভার নিজেই ব্যাগ গাড়িতে তুলে দিলেন।

 গতরাতে প্রায় আটটায় খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম, পেটে ছুঁচো দৌড়ানো শুরু করেছে। সামনেই একটা পুরীর দোকানে সবে খাব বলে ঢুকেছি,এমন সময় বাস হর্ণ দিতে শুরু করল। একদিকে খাবার থালা আরেক দিকে বাসের হর্ণ, দু’দিক থেকে দুজনের ডাকে পুরো কনফিউজড তখন। ভাবলাম পরের বাসে যাব তবে,কিন্তু কপালে খাবার না থাকলে যা হয়; সেদিন ঠিক তাই ঘটল। জানলাম, এই আটটার বাসের পর আবার দুপুর দুটোতে বাস আছে নেতারহাট যাওয়ার। কী আর করা অগত্যা খালি পেটেই চেপে বসলাম বাসে। মনে মনে ভাবলাম, পথে কোথাও বাস দাঁড়ালে খেয়ে নেব কিছু। যেহেতু দূরত্বের জার্নি,তাই বাসের সিটগুলো বেশ আরামদায়ক। এ যাত্রায় আমরা তিনজনই ( আমি, কত্তা আর ছোট্ট ছানা অনুরাগ। মাত্র তিন তখন তিনি)। বাস শুরু করল ছোটা। দু’তিনটি বিস্কুট খেয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যে অনুরাগও শুরু কর বমি করা। বাস শহর ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে নির্জন পথে। প্রতিটি স্টপে দু’একজন নামছে আবার উঠছে। বেশির ভাগই দেহাতি লোকজন। আর আমাদের চোখ ঘুরছে খাবারের দোকানের সন্ধানে। হতাশ হয়ে আবার শুরু করছি অপেক্ষা পরের স্টপের জন্য। 

নেতারহাটের পথে পথে


এদিকে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকায় ক্রমশ মাথার দু’পাশে ধরে থাকা চিনচিনে ব্যথাটা বেড়েই চলেছে। প্রায় ঘন্টা চারেক চলার পর বাস এসে দাঁড়াল একটা নির্জন গ্রামের পথে। বামপাশে একটা চায়ের দোকান। পান, সিগারেট আর একটা ঝোলানো প্যাকেটে বাবুজী কেক। এত খিদেতে খাবার ইচ্ছাটা প্রায় শেষ তখনহঠাৎ চোখে পড়ল একটা ঠেলায় বিক্রি হচ্ছে ছোলামাখা। জিভে জল এল। তাই কিনে খেতে খেতে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালাম। এখনও প্রায় ঘন্টা দুয়েকের পথ। বাস আস্তে আস্তে আঁকাবাঁকা গ্রাম্য পথ ছেড়ে পৌঁছাল পাহাড়ি পাকদন্ডী পথে। ক্রমশ সমতল ছেড়ে যত উপরে উঠতে লাগলাম,রাস্তা তত খারাপ। পথের দু’পাশে শাল,মহুয়া ও অন্যান্য গাছের জঙ্গল পথের সাথে এঁকেবেঁকে চলেছে। না, সত্যি বলছি এত অপরূপ পথশোভা উপভোগ করার মতো অবস্থ তখন আর আমার ছিল না। মাথার যন্ত্রণা তীব্র আকার ধারণ করেছে তখনহঠাৎ লক্ষ করলাম, আমাদের বাস সমতল রাস্তায় চলছে। অর্থাৎ নেতার হাটে চলে এসেছি আমরা। কিন্তু ঠিক কোথায় নামব বুঝে উঠতে পারছি না। দেখলাম, একটি দেহাতী পরিবার বড়ো রাস্তার উপরে নেমে পড়ল। তারাই বলল, এখানেই নামতে হবে আমাদের।

 রাস্তার পাশেই রয়েছে দু’একটি দোকান। সেখানে একটি বাঁশের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। আমাদের হোটেল ঠিককরা ছিল না। সঙ্গের ভদ্রলোকটিকে হোটেলের কথা বলাতে উনিই ফোন করলেন হোটেল প্রভাত বিহারের ম্যানেজারকে। ম্যানেজার তাঁর বন্ধুস্থানীয়। ম্যানেজারকে আসতে বলে চলে গেলেন ভদ্রলোক। এদিকে মাথার যন্ত্রণা এতটাই তীব্রতা ধারণ করেছে তখন,প্রায় চোখে অন্ধকার দেখছি, প্রচন্ড গা গোলাতে শুরু করেছে। ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই তখন। ঠিক আধঘণ্টা হবে! ম্যানেজার এলেন গাড়ি নিয়ে। ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটে। গাড়ি একটা ঘেরা কম্পাউন্ডের মধ্যে প্রবেশ করল। সুন্দর সাজানো গোছানো। ডানদিকে কাচ ঘেরা একটা বড়ো রেস্টুরেন্ট। এখানেই হোটেলের খাওয়ার ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে একটা সরু রাস্তা নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। দু’পাশে মরশুমি ফুল। রাস্তার শেষেই রয়েছে হোটেল ‘প্রভাত বিহার’ পর্যটন দপ্তরের থাকার জায়গা। হোটেলের একতলার অংশ মাটির নীচে। দূর থেকে দেখলে দোতলাকে একতলা বলেই ভ্রম হবে। আমাদের যে ঘরটি দেওয়া হল সেটি দোতলায়। ১০২ নং। দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠেই একটা খোলা ছাদ পেরিয়ে পৌঁছালাম আমাদের রুমে। সমনে গ্রিলঘেরা বারান্দা। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে সামনের সাজানো বাগান। পথশ্রমের ক্লান্তি মিটাতে হালকা গরম জলে স্নান সারার পর কিছুটা সুস্থ বোধ করতেই, খাওয়ার জন্য গেলাম রেস্টুরেন্টে,কিন্তু খেতে পারলাম না। দু’গ্রাস খেতেই শরীর তীব্র ভাবে প্রতিবাদ জানাল। বাইরে এসে দেখলাম, অন্য সবাই কোথাও বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ম্যানেজার এসে হিন্দি মিশানো বাংলায় বললেন, গাড়ি বলে দিই? আপনারা নিশ্চয় ‘ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট’ দেখতে যাবেন?

‘ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট’ নেতার হাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পট ‘সানসেট পয়েন্ট’। ম্যাগনোলিয়া নামে এক ইংরেজ মহিলা এক মেষপ্রতিপালককে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছিল এইখানে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ঘোড়াসহ এই  পাহাড় থেকে গভীরে!

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছিল না। মন তখন নীরবতার মাঝে একন্ত যাপনে মগ্ন হতে চাইছিল। আর হাতে তো পরের দিনটা আছেই, এই ভেবে বললাম, ‘আজ আর যাব না, কাল দেখব’। দেখলাম উপস্থিত অন্যান্য টুরিস্ট সকলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সূর্যাস্ত দেখতে। বেলা পড়ে এল প্রায়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি,শীত লাগছে বেশ। জড়িয়ে নিলাম হালকা একটা চাদর। আকাশটা ক্রমশ কফি রঙে ডুবে যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টের আলো গুলো জ্বলে উঠছে একে একে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেই খোলা ছাদে। দুটো চেয়ার পাতা রয়েছে। পড়ন্ত দিনের রংটা তখনও মুছে যায়নি। বসলাম চেয়ারে একা নির্জনে। ক্রমশ গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার উপর থেকে নেমে আসছে, অনুভব করছি এই অন্ধকারকে ভীষণ ভাবে।একটা অদ্ভুত কথা বলা শুরু হয়েছে অন্ধকারের সাথে নির্জন প্রকৃতির। ছাদের সীমানা পেরিয়েই চোখ আটকে যায় বিস্তীর্ণ জঙ্গলের গায়ে। পাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। ওদের মাঝে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে অন্ধকার! জেগে উঠছে বৃক্ষপ্রকৃতি মিটমিটে জোনাকির আলোয়,আর নিরবচ্ছিন্ন ঝিঁঝিঁর চিৎকারে। একটা ঘোর, একটা নেশা জাগানো ঘোর যেন ঘিরে ধরছে আমায় তখন। চোখ বন্ধ করে গভির অনুভূতিতে সেই প্রথম আমার নীরবতার সাথে অন্ধকারকে মাখা। কি সে অনুভূতি? কি সে নেশা... কোনো ভাবেই ব্যাখ্যা করতে অপারগ আমি। শুধু এটুকু বলতে পারি, সেই প্রথম আমি অন্ধকারের প্রেমে পড়েছিলাম। আজও সেই প্রেম সংরক্ষিত মনে। মাঝে মাঝেই ভেসে আসছিল অদ্ভুত কিছু পশু অথবা নাম-না-জানা পাখির ডাক। ঘোর ঘনঘোর এক আবেশের মধ্যে বিলিন হয়ে যাচ্ছি যেন।

প্রভাত বিহারের রেস্টুরেন্ট


‘মাথায় হিম পড়ছে’ গম্ভীর পুরুষকন্ঠ সতর্ক করতে যেন ফিরে এলাম ঘোরলাগা জগৎ থেকে বাস্তবে ফেরার পথটা। চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। একঝাঁক জোনাকির সমাবেশ গাছের ফাঁকে ফাঁকে পায়ে পায়ে উঠে এলাম ঘরের দিকে। চেয়ার

এমন একটা নির্জন জায়গায়, কাচ ঘেরা রেস্টুরেন্টে বসে রাতের খাবারখাওয়া, বেশ ভালোই লাগছিল। ভালো লাগছিল অন্যান্য টেবিলে খেতে বসা অন্য সব ট্যুরিস্টদের নিজস্ব আচরণ গুলো আড়চোখে দেখতে। বিভিন্ন বিচিত্র স্বভাবের অনেক মানুষ একসাথে বসে অথচ সবার জীবনে একটা ভিন্ন গল্প আছে।

শীত বেশ ভালোই। রাতের বিছানার হাতছানিটাও বেশ উপভোগ্য। সকালে সূর্য মামার হামা দেওয়া দেখতে হবে, মোবাইলে ঘন্টি ঠিক করে রাখলাম।

বাকি পরের পর্বে...।

Sunday, 5 September 2021

পঞ্চরত্ন গোলারুটি(golarooti)

 পঞ্চরত্ন গোলারুটি


খাদ্য তালিকার একটা উপাদেয় খাদ্য 'গোলারুটি'।

এটাকে মুখোরোচক সবজি মিশ্রিত করলে তার পুষ্টিগুণ দ্বিগুণ মাত্রায় বেড়ে যায়.... বাচ্চারা নানা রকমের খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যদি তা মুখোরোচক হয়। রবিবারের রান্নায় আজ থাকল তেমনই একটি পদ্ধতি—

আপনাদের জন্য

পঞ্চ উপকরণ 


উপকরণ:

ক) আটা/ময়দা বা দুটোর মিশ্রণ ১ কাপ, খ) ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ, টমেটো, ধনেপাতা, ও সিদ্ধ আলু ২টি, গ) এক চিমটে খাওয়ার সোডা,/১টা ডিম, ঘ) লবণ, ঙ) গোলমরিচ গুঁড়ো, চ) সাদা তেল



প্রণালী:

পর্ব ১: সমস্ত সবজি কুচো আকারে কেটে নিতে হবে।

           সিদ্ধ গোটা আলি গ্রেট করে নিতে হবে।

           

পর্ব ২ :একটা পাত্রে ময়দা নিয়ে তাতে বেকিং সোডা                            দিয়ে মিশিয়ে নিয়ে অল্প অল্প জল মিশিয়ে মধ্যম মানের তরল করতে হবে।

মিশ্রণ


পর্ব ৩ : ঐ মিশ্রণে সবজির সমস্ত ও লবণ, গোলমরিচ মিশিয়ে ঘনত্ব দেখতে হবে, বেশি মনে হলে আরেকটি জল মিশিয়ে নিতে হবে। 


পর্ব ৪ : এবার তাওয়া গরম করে সামান্য তেল দিতে হবে। পাত্রের মিশ্রণ হাতায় করে দিয়ে গোল রুটির আকারে ছড়িয়ে একটা ঢাকা ৩ মিনিট চাপা দিয়ে ভেজে নিতে হবে। এভাবে দুপিঠই হবে। 


তৈরি গরম গরম ব্রেকফাস্ট বা ডিনার। 

খেতে পারেন, পুদিনা চাটনি, সস, বা ডিমের কারি সহযোগেও


পুদিনা চাটনি: পুদিনাপাতা রসুন কাঁচা লংকা সহযোগে বেটে নিয়ে, লেবুর রস মিশিয়ে নিতে হবে। তেঁতুলের গোলাও চলবে। 


প্রস্তুত..... মুখোরোচক পুষ্টিকর গোলারুটি। 


পঞ্চরত্ন গোলারুটি

Sunday, 29 August 2021

ঝিঙে বাটায় রসনার তৃপ্তি

ঝিঙে বাটায় রসনার তৃপ্তিঃ

ঝিঙে বাটার উপকরণ


অসাধারণ খনিজ উপাদান,কার্বোহাইড্রেট,অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও বিবিধ উপাদান সমৃদ্ধ এই সবুজ সবজির পুষ্টিগুণ আর উপকারিতার কোনও ঘাটতি নেই, তবু খাদ্য তালিকায় ঝিঙে দেখলেই অনেকেরই বিরক্তি লাগে। এই ফাইবার সমৃদ্ধ সবজিটির একটা নিজস্ব বুনো গন্ধ আছে,তাই অনেকেরই না-পসন্দ ঝিঙে। অথচ এটি লিভার,ত্বক,রক্ত সবকিছুকেই সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। আমরা সাধারণত ঝোল বা রোগীর পথ্য হিসাবেই ঝিঙেকে চিনি,কারণ ঝিঙে মাছের বা বড়ার ঝোলেই বেশি প্রয়োগ হয়। 

 আজ আপনাদের জন্য একটি অভিনব ও রসনা তৃপ্তিদায়ক রেসিপি রইল----
স্বাদের ঝিঙে বাটা


উপাদানঃ   ১ ) ঝিঙে ৩টি,  ২) রসুন ৬-৮টি কোয়া,  ৩) কাঁচা লংকা ৩টি,  ৪) একটা মিহি কাটা পেঁয়াজ,  ৫) কালোজিরে ফোড়নের মতো, ৬) লবণ,  ৭) চিনি স্বাদমতো, ৮) হলুদ,৯) সরিষার তেল চারপলা। ( প্রয়োজনে বেশি দেওয়া যেতে পারে)।

প্রাণালী ঃ
  
পর্ব ১ঃ  ঝিঙের খোসা ছাড়িয়ে পিস পিস করে কেটে নিতে হবে। এবার মিক্সির বাটিতে কাঁচা লংকা,রসুন কোয়া, আর কাটা ঝিঙে টুকরো নিয়ে একসাথে পেস্ট করে নিতে হবে।

পর্ব ২ঃ  কড়াইতে তেল গরম হলে তাতে কালোজিরে আর মিহিকাটা পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ বাদামি হওয়া পর্যন্ত নাড়তে হবে। পেঁয়াজ নরম হলে তাতে ঐ বাটা উপকরণ যোগ করে আন্দাজ মতো লবণ দিয়ে দিতে হবে। এই অবস্থায় ঝিঙে বাটা-টা ক্রমাগত নাড়তে নাড়তে শুকিয়ে আনতে হবে। প্রায় শুকনো হলে লবণ চেক করে, নিজের স্বাদমতো চিনি ১চামচ বা ১/২ চামচ দিতে হবে। 
{ যারা মিষ্টি বেশি খান তারা একটু চেখে দেখে দেবেন। তবে ঝিঙের পরিমানের সাথে বুঝে লবণ বা চিনি দেবেন।}
পুরো শুকিয়ে গা-মাখা হয়ে তেল ছেড়ে এলে নামিয়ে ফেলুন ও গরম ভাতে পরিবেশন করুন। 

ঝিঙের গুণের পরিপূর্ণ উপস্থিতির পরও মুখোরোচক ঝিঙে

ঝিঙেবাটার কাঁচা মিশ্রণ


Sunday, 22 August 2021

The Advanced Guide to Heritage Spots Of Mizoram


পাহাড়ি জাতির ভূমি----মিজোরাম তুমি

প্রথম পর্বের পর---


 

 

The Advanced Guide to Heritage Spots Of Mizoram
mizoram, reiek village, heritage hutanthuriam festival
heritage spot solman temple
সলমন টেম্পল


 মিজোরামের ৯৮% অধিবাসীই খ্রিস্টান। ২৪শে ডিসেম্বর রাত মানেই এখানে ধামাকাদার পার্টি। ঠিক সন্ধে সাতটা। আমরা হোটেল থাকে বেরিয়ে পড়লাম প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আর্মি ক্যাম্পের দিকে। আগের দিনের মত রাস্তা অতটা ফাঁকা নয়। তবে সব থেকে লক্ষণীয় বিষয় হল। রাস্তায় স্টেট ট্রান্সপোর্ট তো নয়, পাবলিক ট্রান্সপোর্টও চোখে পড়ল না। রাতের অন্ধকারে অচেনা পথে হাঁটতে শুরু করলাম আমরা দু’জন আর রূপেনদা। রূপাদি ও ছেলে,মেয়ে হোটেলেই রয়েছে। যাওয়ার পথে ফুটপাথ আমাদের বামদিকে। এখানে রাস্তায় একদিকেই ফুটপাথ। কিছুটা এগিয়েছি সবে, হঠাৎ একটি অল্প বয়সের মিজো ছেলে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আমার কত্তাকে জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে টেনে নিতেই চমকে উঠলাম আমরা। ঠিক কী করতে চাইছে ছে! ফিসফিস করে কি যেন বলল। তারপর আমার দিকে এগিয়ে এসে হ্যান্ডসেক করার মতো হাতটা চেপে ধরে নেশা জড়ানো গলায় বলল, ‘মেরি খ্রিস্টমাস’। আঃ! বড়ো একটা নিঃশ্বাস নিলাম। এখানে আসার আগে যে যে ভয়ের কারণ গুলো জানতে পেরেছিলাম,তারমধ্যে একটি হল ছিনতাই। শুনেছিলাম পথা চলতি লোকের মানিব্যাগ তুলে নেয়। আর ছিনতাইয়ের টাকায় ইঞ্জেকশন নেয় শিরায়। এক অনাবিল নেশার আনন্দে মেতে ওঠে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। এখানে কোনও ইন্ডাস্ট্রি নেই। ট্যুরিস্টও তেমন আসে না। ফলে আর্থিক কাঠামো বেশ দুর্বল। রক্তে নেশার আগুন জ্বললে ছিনিয়ে নিতেও সংকোচ জাগে না। অজানাকে চিরকালই মানুষ ভয় পেয়ে এসেছে আবার সেই অজানাকে জানার চেষ্টায় ছুটে গিয়েছে সেই দিকে। আমরাও তো তার ব্যাতিক্রম নই, তাই মনের অতলে একটা অজানা আশঙ্কা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পৌঁছালাম আর্মি ক্যাম্পের কাছে চারমাথার মোড়ে।

আলোয় ঝলসে যাচ্ছে চারিদিক। চার্চের সামনে বিশাল একটা স্টেজ। বিশাল এক কফি নাইটের আয়োজনরাস্তার কিছুটা অংশ ঘিরে ভি আই পি বসার আয়োজন। একটা করে সেন্টার টেবিল আর চারটে চেয়ার। একটি সুন্দরী মিজো মেয়ে প্রত্যেক টেবিলে একটা করে ভাঁজ করা কাগজ রেখে চলে গেল। জানা হলো না কেন। সুযোগ পেলাম না কাউকে জিজ্ঞাসা করার। চারপাশে সাধারণ মিজো বাসিন্দার ভিড়। যেদিকে তাকাই অল্প বয়সের, মাঝ বয়সের যুবক-যুবতীরা মদ্দপ অবস্থায় হুল্লোড় করছে, ঢলে পড়ছে একে অপরের গায়ে। স্টেজে অর্কেস্টার সাথে একটি বাচ্চা মেয়ে মিজো ভাষায় উদ্‌বোধনী সঙ্গীত গাইছে। না, কোনো ট্র্যাডিশনের ছোঁয়া পেলাম না। আমরাও মিজোদের ভিড়ে মিশে দাঁড়িয়ে পড়লাম। নাচ, গান সবেতাই সেই পাশ্চাত্যের উপস্থিতি।

‘ আন্তোরিয়াম’ মিজোরামের প্রিয় ফুলের নামে এই উৎসবই এখানকার ট্র্যাডিশন্যাল উৎসব। এপ্রিল-মে মাসে সাতদিন ধরে এখানকার ট্র্যাডিশন্যাল নাচ,গান চলে। থাকে হাতে তৈরি জিনিসের পসরা। কিন্তু এখানকার মানুষ পাশ্চাত্য কালচারকে এত ভীষণ ভাবে গ্রহণ করেছে যে, খ্রিস্টমাসের এই উৎসব প্রায় ওদের জাতীয় উৎসবের আকার ধারণ করেছে। ভাবা যায়, টানা দশদিন কেউ দোকানপাট খুলবে না, রাস্তায় কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট  রাজধানীর বাইরে যাবে না বা বাইরের গাড়িও প্রায় আসে না বললেই চলে। আগেরদিনই পুঁইয়াজি বলেছিলেন, ‘ আপ লোগোকা দুর্গাপূজা য্যাইসা হামারা খ্রিস্টমাস সেলিব্রেশন’। আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ‘মিম কূট’ নামে একটি বিশেষ উৎসব হয়। ভুট্টা চাষকে কেন্দ্র করেনতুন ফসল ঘরে তোলার আগে মাচায় রেখে পূর্বপুরুষকে উৎসর্গ করা হয়। এই উৎসবটার সাথে বেশ একটা মিল পেলাম আমাদের নবান্নের। আসলে ভারতের নানা ভাষা, নানা পথ, নানা জাতির মধ্যেই কোথাও যেন একটা মিলন সূত্রে গাঁথা আছি আমরা!

The Advanced Guide to Heritage Spots Of Mizoram mizoram, reiek village, heritage hutanthuriam festival


 

২৫শে ডিসেম্বর সকাল আগের দিন রাতেই হোটেলের ম্যানেজার কপালে একটা অশনি সংকেত ঝুলিয়ে দিয়েছেনআসাম থেকে কোনো গাড়ি আসছেনা। আর মিজোরাম থেকে কোনো গাড়ি এই মরশুমে (আসাম) শিলচর যেতে নারাজ।এমন হলে ২৬ তারিখ শিলচর যাওয়া হবে না। বদলে যাবে ভ্রমণসূচি। একটা চিন্তার ভাঁজ কপালে নিয়েই ঘুম থেকে ওঠা। ২৫ তারিখ প্রথমে আমাদের গন্তব্য ছিল তামডিল লেক। কিন্তু এখানে এসে শুনলাম তেমন কিছু দেখার মত নয়, তাই সে পথে না গিয়ে আমরা চললাম শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত ‘সলমন টেম্পল’ এ। এটি এখানকার একটি বিখ্যাত চার্চ। বড়োদিনের সকালে আইজলের রাস্তা পোশাকের রঙে আর মানুষের ভিড়ে সেজে উঠেছে। রাস্তায় নজরে আসা প্রতিটি মিজো রমণীর পরনে ‘পঞ্চেই’, উপরে ব্লাউজ। এটাই এখানকার ট্র্যাডিশনাল পোশাক। এই বিশেষ দিনে চার্চ সব সম্প্রদায় এর জন্য অবাধ প্রবেশ। প্রাধন দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই মনে হল তারায় মোড়া কোনো এক ঘুমের রাজ্যে পৌঁছে গিয়েছি আমরা। সামনেই দুধসাদা বিশাল আকারের সলমন টেম্পল দাঁড়িয়ে। বিস্তৃত বাগান যেন এক আজব দুনিয়া! প্রার্থনা সংগীত ভেসে আসছে। সে সুরের আবেশ গোটা চার্চের চারিপাশে যেন এক ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় খ্রিস্টানধর্মাবলম্বী মিজোদের দুপুরে এখানেই আহারের ব্যবস্থা। পুরো চার্চ ঘুরে দেখতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় কোথা দিয়ে যেন কেটে গেল! কিন্তু চার্চের অভূতপূর্ব পরিবেশের আবেশ স্রোতস্বিনী নদীর মতো অন্তরে প্রবাহিত হতে লাগল। সে আবেশ বুকে নিয়ে  আমরা চললাম আমাদের আলটিমেট গন্তব্য ‘ রেইক হেরিটেজ ভিলেজ’ 'reiek heritage village'। সেখানে আছে মিজোরামের আদিম অধিবাসীদের ব্যবহারের গৃহসামগ্রী, বাড়ি ঘর এইসব। এখানে আসার আগে থেকেই এই স্থানটির প্রতি একটা অমোঘ আকর্ষণ ছিল। মনে এক অনন্ত পরিতৃপ্তি নিয়ে যখন ছুটে চলেছি হেরিটেজ ভিলেজের পথে, কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি সব ভুলে হারিয়ে গেলাম এক অনন্য দুনিয়ায়। এখানকার পথ মায়াবিনী! এ পথে,পথ হারাতেও ভালো লাগে, ভালো লাগে অনন্তকাল ধরে চলতে। চোখ কিছুতেই ক্লান্ত হয় না, মনের তৃষ্ণা মেটে না! প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ পেরিয়ে পৌঁছালাম “যোকহাম, ফালকান”। যদিও এটা মিজোরাম ‘আর্ট এন্ড ক্যালচার ডেভলপমেন্ট’ ডিপার্টমেন্টের অংশ তবুও ২৫শে ডিসেম্বর খোলা ছিল। প্রবেশদ্বারের বাঁ দিকে টিকিট কেটে এগিয়ে চললাম আমরা। একটা ছায়াঘেরা কাঁচা সরু রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে গিয়েছে সামনে। একটু এগিয়ে বাঁদিকে একটা চাতালে আমরা ব্রেকফাস্ট সারছি যখন, হঠাৎ নজর থমকে গেল গোটা চার যুবকের দিকে। চাতাল থেকে কয়েকহাত দূরেই বসে আছে। একজনের হাতে একটা লোহার দন্ড বাকিদের হাতে বিশাল আকারের চকচকে ধারাল অস্ত্রতাতে শান দেওয়া চলছে। ওরা নিজেদের মধ্যে মিজোভাষায় কিযেন বলে চলেছে। চারিদিকে নির্জন, ছুটিরদিন অফ সিজন। ট্যুরিস্ট বলতে শুধু আমরা ক’জন। কেমন যেন গা টা ছমছম করে উঠল। দূরে কোনো চার্চ থেকে অজানা এক বাদ্যযন্ত্রের পাহাড় কাঁপানো দম দম আওয়াজ ভেসে আসছে। হঠাৎ-ই লোকগুলো উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের চাতালের দিকে এগোতে লাগল। না, কিছুটা এগিয়ে ওরা চাতালের পাশ দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে চলে গেল। বুঝলাম, শিকারের আয়োজন চলছিল এতক্ষণ। আমরাও ব্রেকফাস্ট সেরে সামনে এগোতে লাগলাম। একটা বড়ো মাঠের মতো অংশে মডেল ঘর গুলো সাজানো রয়েছে।

The Advanced Guide to Heritage Spots Of Mizoram mizoram, reiek village, heritage hutanthuriam festival
রেইক ভিলেজ
reiek village

 

এখানে ঘর বানানোর মূল উপাদান বাঁশ। সাধারণত ৫ বছরের পুরানো বাঁশকে মূল ফাউন্ডেশনের কাজে লাগানো হয়। ছাদ ও দেওয়াল গঠন করতে ৩ বছরের পুরানো বাঁশ ব্যবহার করা হয়। পিলার হিসাবে কাঠের যে দন্ড ব্যবহার করা হয় তাকে মিজো ভাষায় বলে ‘ SUT’. যদিও বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল বলে এখানে ঘরের ছাদে ঢাল থাকে, তবুও আমাদের কড়িবরগার মত এদের ছাদের কাঠামোর অংশ দুটিকে বলে ‘KHANTHHUK’ , ‘ SECHHUAR’. ঘরের মেঝে ও দেওয়াল তৈরি করা split bamboo, flat bamboo. দিয়ে।

একটা বিশাল আকারের বাঁশেরঘর দেখে আমরা ভিতরে গেলাম। ছোট্ট বারান্দা মত অংশের পরই দেখলাম আর এগোনোর উপায় নেই। হলঘরের মত বড় ঘরটির এপ্রান্ত থেকে প্রান্ত কোমর সমান উচ্চতায় কাঠের পিলার দিয়ে আটকানো। ওপারে যেতে হলে ডিঙিয়ে যেতে হবে। মাঝ বরাবর একটা কমন আগুন পোহানোর জায়গা। বুঝতেই পারছিলাম এটা গ্রামের পঞ্চায়েত জাতীয় বিশেষ কোনো স্থান। এই নিয়ে আমাদের আলচনার মাঝেই এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন আমাদের কাছে। অস্পষ্ট হিন্দি মেশানো বাংলায় বললেন ‘ এটা আসলে মিজো আদিবাসীদের যৌবনের সূচক নির্ণয়ক ঘর। মিজো আদিবাসী যুবকদের মধ্যে যারা এটা টপকে ওপ্রান্ত প্রবেশ করতে পারবে, তারা যুবক হয়েছে বলে মেনে নেবে সমাজ। এহেন বিদেশে বাংলা বোঝা মানুষ পেয়ে আমরা যে অবাক,সেটা বুঝি বলার অপেক্ষা রাখে না। আসলে ভদ্রলোকটি চাকরি সুত্রে ২ বছর পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছেন। তাঁর কাছে জেনে নিলাম এখানে রাখা আদিবাসীদের ব্যবহারের জিনিস গুলির নাম,কাজ। একটা সিঙা মত জিনিস হাতে তুলে বললেন, ‘ এটা আদিবাসী যুবকদের কাছে খুব সম্মানের জিনিস। কোনো বীর যুবক সাহসের কাজ করলে রাজা তাকে মদ্যপানের পাত্র হিসাবে এই জিনিসটি উপহার দিত’। আরও অনেক ছোটো গল্প শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে যেন কোথায় হারিয়ে গেলাম। কল্পনারা ডানা মেলে উড়ছিল। অদেখা এক আদিম জনজাতির নিজস্ব সমাজ জীবনের অলিতে গলিতে। ওই তো, এক যুবক লাফ দিয়ে পৌঁছে গেল ওপারে। তার হাতে রাজা তুলে দিলেন মদ্যপানের পাত্র।

The Advanced Guide to Heritage Spots Of Mizoram mizoram, reiek village, heritage hutanthuriam festival
মিজো আদিবাসীদের ব্যবহারের পাত্র

 

রেইক ভিলেজ থেকে বেরিয়ে পাশেই দেখলাম একটা আদিবাসী গ্রাম। একটি মানুষেরও দেখা মিলল না ছায়া ছায়া  রাস্তায় নিঃশব্দে হেঁটে যেতে যেতে দেখলাম, ডানদিকে পাহাড়ের ঢালে বাঁশের খুঁটির উপর বাঁশের ঘর, শৌচাগার, শূকর রাখার বাঁশের খাঁচা, প্রতিটা বাড়ি একই। আধুনিকতা বলতে বাঁশের দরজায় ঝুলানো মিটার আর বৃষ্টির জল সঞ্চয়ের জন্য জলের ট্যাংকএইতো আধুনিক আদিবাসী সমাজ। কিন্তু কেমন ছিল প্রাচীন সে সমাজ? ঐ বিজয়ী যুবককে দেখে কি কোনো যুবতীর বুক কাঁপছিল? অথবা সমবয়সি অন্য যুবকের ঈর্ষার আগুনে বিদ্ধ হচ্ছিল তার হৃদয়! কেমন ছিল  অপরাধ, শাস্তি, শান্তি, প্রেম, ভালোবাসা মিলিয়ে মি(জাতি) জো (পাহাড়) রাম (ভূমি)?

 রেইক ভিলেজ থেকে ফেরার পথে বড়োদিনের মিজোরামকে একটু অন্য ভাবেও দেখলাম।আসলে এখানে প্রকৃতি প্রেমময়, সবুজ যৌবনের হাতছানি অসীম। বড়োদিনের দুপুর হতেই নির্জনে নিভৃতে যুবক-যুবতির একান্ত যাপন হঠাৎ করে বাঙালির ভ্যালেন্টাইন ডে সরস্বতী পুজোর কথা মনে করিয়ে দেয়। পথের বাঁকে বাঁকে সরকারী সচেতনতার বোর্ডে একেবারে অন্য বার্তা নজরে আসে--‘’use comdom”. আমি যেটুকু দেখলাম আজকের মিজো মানুষগুলো বেশ ভালো, অতিথিপরায়ণ,মিশুকে।

 The Advanced Guide to Heritage Spots Of Mizoram
mizoram, reiek village, heritage hut anthuriam festival

বিঃদ্রঃ
উড়ো পথে কোলকাতা থেকে লেংপুই এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে সময় লাগে কমবেশি একঘন্টা পনেরো মিনিট। লেংপুই থেকে গাড়ি যায় আইজল। সময় লাগে একঘন্টা।
এছাড়া ট্রেনে গোহাটি পৌঁছে ওখান থেকে বাসে পৌঁছানো যায় আইজল। তবে সেই রাস্তা খুব কষ্টকর ও সময় সাপেক্ষ।
এখানে উন্নতমানের ভালো হোটেল আছে। আছে chaltlang tourist lodge, berawtlang cottage, government guest house.

গাড়িভাড়া ও হোটেল এখানে বেশ ব্যয়বহুল

প্রথম পর্ব...... 👇

https://www.blogger.com/blog/post/edit/4154231247512337095/8644491017997076530

Sunday, 15 August 2021

refreshing green view of mizoram (পাহাড়ি জাতির ভূমি, মিজোরাম তুমি)

 

পাহাড়ি জাতির ভূমি মিজোরাম তুমি-- {refreshing green view of mizoram }

কোলকাতা বিমানবন্দরে ঢুকে মিজোরাম [mizoram] ফ্লাইটের টিকিট কনফরমেশন লাইনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা ছ’জন। বেশ লম্বা লাইন সামনে। এক মহিলা কাউন্টারের পিছন থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন,আপনারা নিশ্চিত তো যে,  মিজোরামেই যাচ্ছেন’যেহেতু প্রশ্নটা ছিল ইংলিশে তাই উত্তর বললাম, ‘ইয়েস’। মহিলা ‘ওকে’ বলে চলে গেলেন। পোশাক দেখে অনুমান করলাম তিনি বিমানবন্দরের কর্মী। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু আমাদেরই করা হল কেন? বেশ কিছুক্ষণ পর নজরে এল ঐ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্যাসেঞ্জারের মধ্যে আমরা ছ’জন ছাড়া আর একজনও বাঙালি নয়। সবাই অল্প বয়সের মিজো তরুণ-তরুণী। সকলেই খ্রিস্টমাসের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে আর আমরা যাচ্ছি ভ্রমণে। ওরা মিজো ভাষায় একে অপরের সাথে কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে।
<title>refreshing green view of mizoram</title>
সবুজ মিজোরাম [green mizoram]


 সিট নাম্বার হাতে পেয়ে মাথায় হাত। ছ’জন ছয় জায়গায় বসতে হবে। সমস্যা আমার ছেলেকে নিয়ে, সদ্য সাতে পদার্পণ করেছেন তিনি। এহেন বিশাল ব্যক্তি তো একা বসতে হবে শুনেই কাঁদো কাঁদো প্রায়। যাক, আশার কথা হলো আমার বাঁপাশের মিজো তরুণীকে অসুবিধার কথা জানাতেই সে সিট পরিবর্তনে রাজি হয়ে গেল। আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। মন জুড়ে তাই বেশ একটা ভালো লাগার আবেশ! জানালার ধারে বসে এক সুদর্শনা মিজো তরুণীমিনিট দশেক উড়েছি আকাশে। একঘণ্টার পথ মিজোরামের রাজধানী আইজলের ‘লেংপুই’ এয়ারপোর্ট। দশ মিনিটেই সামনে রাখা নিয়মাবলী পড়া হয়ে গিয়েছে। বাকি পঞ্চাশ মিনিট কি এভাবেই চুপচাপ বসে কাটবে? পাশের জনের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু শুরু করি কীভাবে? ভাবতে ভাবতেই সিটবেল্টটা খোলার চেষ্টা করছি। হঠাৎ মেয়েটি জানতে চাল ‘এনি প্রবলেম? ক্যান আই হেল্প ইউ?’
আমি বললাম, নো নো। যাক ইংরাজিতেই কথা বলছে সে। আমার বিদ্যা দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পার, তবে হিন্দি হলে একটু ভালো হত। নাম জিজ্ঞাসা করলাম,
সে উত্তর দিল, মিনো... মানে বাংলায় আমরা বলি মিনু।
কথায় কথায় জানতে পারলাম সে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাড়ি ফিরছে। সেখানে চাকরি করে। তবে বেচারার মন ভীষণ খারাপ।  লাগেজের ওভার ওয়েটের জন্য তাকে অতিরিক্ত বারো হাজার টাকা দিতে হয়েছে কোলকাতা এয়ারপোর্টে। অল্প সময়ের মধ্যেই মিনোর সাথে বেশ ভাব হয়ে গেল। ওর কাছেই শুনলাম খ্রিস্টমাসের দু’দিন আগে বাজার বন্ধ হয়ে যায় পুরো মিজোরামেঐ শেষ দিন নাকি বাজারে এত ভিড় হয় যে একটা পা রাখার জায়গা হয় না। তারমানে আমরা গিয়ে বাজার খোলা পাব। তবে এমনিতেই সাড়ে দশটার ফ্লাইট দেরি করে দুটো তিরিশে ছেড়েছে। সময় মতো পৌঁছাতে পারব তো! তিনটে পনেরো হবে, তখন ফ্লাইট মিজোর আকাশে উড়ছে। মিনুর পাশের জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখতেই বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। 
উপর থেকে পাহাড় ঘেরা অপরূপ মিজোরামকে দেখা যাচ্ছে ছবির মতো। চারিদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা, মাঝে সরু সুতোর মতো বয়ে চলেছে নদীএটাই কি তালং নদী! প্লেন যত নিচে নামতে লাগলো সেই ছবি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। অবশেষে প্লেনের চাকা মিজোরামের মাটি স্পর্শ করল। প্লেনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার আগে সামনে তাকিয়ে দেখলাম সূর্যটা ক্রমশ পাহাড়ের পিছনে লুকাচ্ছে। পড়ন্ত দুপুরে পাহাড়ের কোলে সূর্যের ঢলে পড়া, এছবি তো কত এঁকেছি ড্রয়িং খাতার পাতায়,কত দেখেছি পাহাড়ে ভ্রমণের সময়, তবু কেন যেন মনে হল এ ছবি একেবারে আলাদা নতুন! আসলে মিজোরাম সত্যিই তো একেবারেই আলাদা। ছিমছাম ছোট্ট এয়ারপোর্টের বুকে দাঁড়িয়ে ভাবছি এই তবে মিজোরাম! কত মন্দ কথা-ই না শুনেছি এর নামে।
লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে এসে ফোন করতেই ‘পুঁইয়া’ ভাই এগিয়ে এসে ট্রলিটা হাতে নিল তারপর গাড়িতে। মিজোরামে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে “অরিনি” হোটেলে। সবই অনলাইন বুক করা সরাসরি, কোনো সংস্থার মাধ্যমে নয়। তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝলাম এই জায়গায় নিজে অনলাইন হোটেল বুককরা সত্যিই কঠিন ব্যাপার। সাইটে দেওয়া কোনো ফোন নাম্বারই কাজ করে না।
হোটেল থেকে আমাদের জন্য দুটি গাড়ি পাঠানো হয়েছিল। একটির ড্রাইভার পুঁইয়া জি আরেকজন অল্পবয়সের জোচং।  দুজনেই মিজোরামের স্থানীয় মানুষ। পুঁইয়া জির গাড়িতে বসেছি সবে, হঠাৎ একটা ফোন এল ‘ আপলোগ কাঁহা হ্যয়? গাড়ি লেকে খাড়ে হুঁ এয়ারপোর্টকে বাহার’।
 মানে? চমকে উঠলাম আমরা। আমাদের সহযাত্রী পরিবারটি তো উলটো দিকের পার্কিং এ দাঁড়ানো গাড়িটিতে চেপে গিয়েছে ইতিমধ্যে! তবে ইনি কে? তবে যা শুনেছিলাম মিজোরাম সম্পর্কে সেটাই কি ঠিক! ওরা কি কিডন্যাপড? ক্ষণিকের জন্য কেমন যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। আমাদের মুখের অবস্থা দেখে পুঁইয়া জি কিছু আন্দাজ করলেন হয়তো। দেখলাম তার মধ্যে নিজেদের প্রমাণ করার কি ভীষণ তাগিদ। বললেন, ‘ডোন্ট ওয়ারি’। তারপর আমাদের সোজা পার্কিং এর বাইরে দাঁড়ানো ওনার সঙ্গী গাড়িটির কাছে নিয়ে গেলেন। 
  দেখলাম ওরা নিশ্চন্তে বসে আছে গাড়ির ভিতর। আসলে একটা গন্ডগোল বোধহয় হোটেলেই ঘটেছে। ওরা দ্বিতীয় কোনো ড্রাইভারকেও আমাদের নাম্বার দিয়ে স্টেশনে পাঠিয়েছে।  যাই হোক গাড়ি ছুটে চলেছে লেংপুই এয়ারপোর্ট থেকে মিজোরামের রাজধানী আইজলের পথে। ঘন্টাখানেকের রাস্তা। আঁকাবাঁকা পথের কোথাও বাঁপাশে কোথাও ডানে ভেজা ভেজা সবুজ বুকে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় আর খাঁজে খাঁজে বাঁশ বা কাঠের খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে টিনের তৈরি মিজো হাউস। এদৃশ্য ঠিক কলমে প্রকাশের নয়। যদিও প্রচ্ছন্ন একটা দারিদ্রতার চিহ্ন রয়েছে তবু মনমোহিনী প্রকৃতি এখানে উদার হস্তে বিতরণ করেছে সবুজ।
<title>refreshing green view of mizoram</title>
সাধারণ মিজোবাড়ি


পথের পাশে ছোট্ট একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি। একমুখ বলিরেখা নিয়ে বসে আছে এক মিজো মহিলা। পুঁইয়াজি টাকা এগিয়ে দিয়ে বলল,’তাম্বুল’। মহিলা টাকা নিয়ে এগিয়ে দিল ছোটো প্যাকেটে কাটা গুটিকয় সুপারি। এখানে সুপারিকে তাম্বুল বলে। আইজলে ঢোকার মিনিট দশেক আগেই হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ যেতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! পাহাড়ের কোলে একটি আকাশ কেমন লালচে রঙে সেজেছে। সন্ধে হয়ে আসছে। রাস্তার অবস্থা খুব ভালো নয়।

 ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মত মিজোরাম যে উপেক্ষিত সেটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। হঠাৎ আবার গাড়ি দাঁড়েতেই দেখলাম সামনে সুদীর্ঘ গাড়ির লাইন।  সেখানেই শুনলাম,সন্ধের মুখে এমন একটু হয় তবে তেইশে ডিসেম্বর বলে আরও বেশি। সব গাড়ি ফিরে আসছে আগামী কয়েকদিন আর কোনো গাড়ি বাইরে বেরোবে না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই দেখলাম এক মজার দৃশ্য। পেট্রলপাম্পের সমনেই ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল।  আমাদের হোটেল আইজলেরে আপার খাটুয়া বলে একটি জায়গায়,যেখানে হাঁটা দূরত্বেই আছে রাজভবন।
 আইজল পৌঁছে বুঝলাম সন্ধে হলেই এখানে বাজার-হাট বন্ধ হয়ে যায়। চারিদিকে বন্ধ দোকান রাস্তাও বেশ ফাঁকা। সাড়েছ’টা নাগাদ হোটেলে পৌঁছালাম। রাস্তার একেবারে উপরেই। ভিতরে যেতেই একটি ছেলে এসে আমাদের জিনিস নিয়ে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। হোটেলের সব ঘরই নিচে। সুন্দর বিশাল বড় রুমবসার আর ঘুমানোর জায়গা আলাদা। প্রতিবারের মত এবারও তাই হল। পথের ক্লান্তি মোটেও কাবু করতে পারেনি। জিনিস রুমে রেখেই সবাই চলে গেলাম উপরে রিসেপশনে। একটু রাস্তায় হাঁটব। হোটেলের ম্যানেজার জানালেন, ‘কুছ খরিদনা হ্যয় তো আজ হি খরিদ লি জিয়ে। কাল সে ফার্স্ট জানুয়ারি তক দুকান বাজার বন্ধ রহেগা’। 
মানে? আমরা তবে বাজার করব কি করে? বললাম চব্বিশ তারিখও খোলা থাকবে না? সে জানাল পুরো বড়দিনের ছুটির দশদিন এখানে সব বন্ধ থাকে। ঘুরতে যেতে পারব তো? না সে বিষয়ে সংশয় নেই, কারণ পুঁইয়া জি আমাদের হোটেলে ড্রপ করার সময় একটা গাছের পাকা পেঁপে দিয়েছেন আর বলেছেন কাল এসে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবেন।
পাহাড়ের গা কেটে কংক্রিটের শহরে কালো পিচের রাস্তায় নিঝুম শীতল সন্ধ্যা। সোয়াটারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছি আমরা। এ তো শুধু হাঁটা নয়, সন্ধের মিজোরামকে যেন গায়ে মাখছি। শুকনো খাবারের সাথে খুশির আবেশ পকেটে ভরে হোটেলে ফেরার পর কীভাবে যেন কেটে গেল একটা রাত!
<title>refreshing green view of mizoram</title>
হোটেল অরিনি


সুন্দর একটা নরম ঘুমের সমাপ্তি ঘটল ধোঁয়াওঠা চায়ের কাপের সাথে। স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই দেখলাম, গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জোচং আর আরেকজন। পুঁইয়াজি পাঠিয়েছেন। আমাদের গন্তব্য ‘রেইক হিল’ ঘন্টাখানেকের রাস্তা। গাড়ি ছুটছে নিঃস্তব্ধ সবুজের মাঝ দিয়ে। এত ঘুরেছি পাহাড়ে কিন্তু এত সুন্দর পথ সত্যিই কোথাও দেখিনি! 
এখানে পথ নিজেই দর্শনীয়দু’পাশে ঘন সবুজ গাছের সারি নিবিড় ছায়াঘেরা অরণ্য পথ, মাঝে মাঝে ঠিক ছবির মত জেগে থাকা জনপদ গুটিকয় টিনের বাড়ি সবুজ গাছে ঘেরা। একটা ছোট্ট লোহার পাতের ব্রিজ পেরিয়ে থেমে গেল গাড়ি। আমরা নেমে ব্রিজের উপর এসে দাঁড়ালাম। ঘন সবুজ স্বচ্ছ কাচের মত বয়ে চলেছে ‘তালং নদী’। অপরূপা শুধু নদী নয়, তার দুইপাড় কী যে ভীষণ সুন্দর বলে বোঝানো সম্ভব নয়। দূরে, আরও দূরে শুধু দৃষ্টি হারাতে চায়!
<title>refreshing green view of mizoram</title>
তালং নদী


 নদীর সাথে একাত্মতা আমার চিরকালের। কান পাতলেই মনে হয় যেন ডাকছে ‘আয়, ছুঁয়ে যা আমায়’। তালং ও আমায় ডাকল। ইচ্ছার এক প্রবল শক্তি আছে। যাকে স্পর্শ করা যায়না,তাকে মন দিয়ে অনায়াসেই স্পর্শকরা যায়। আর মাত্র কিছুটা পথ পেরিয়ে গাড়ি এসে দাঁড়াল সবুজে ঘেরা একটা সুন্দর কটেজ কম্পাউন্ডের মধ্যে। এটাই রেইক ট্যুরিস্ট লজ। সব কটেজে তালা লাগানো। খ্রিস্টমাসের ছুটিতে লজ বন্ধ থাকে। মনে পড়ে গেল ফোন করেছিলাম এখানে। জোচং বলল, ‘রেইক হিল’ সামনে। প্রায় দু’কিলোমিটার পায়ে হেঁটে যেতে হবে জঙ্গলের পথে। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। সরু মাটির চড়াই রাস্তা জঙ্গলের বুক চিঁড়ে এগিয়ে গিয়েছে সামনের পথে। আমরা হাঁটছি দু’পাশে ঘন জঙ্গল। এ জঙ্গলের প্রকৃতি আমাদের কিচ্ছু জানা নেই। শুধু নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না। মাঝে মাঝে একটা কি যেন পাখি দূর থেকে ডেকে চলেছেএকটা প্রতিধবনির মত গোটা জঙ্গল ঘুরে সে ডাক যেন এসে ধাক্কা মারছে আমাদের কর্ণকূহরে। পথ বেশ চড়াই।পায়ের পাশিতে টান ধরছে, বুকেও মাঝে মাঝে চাপ লাগছে। একটু দাঁড়িয়ে আবার হাঁটছি আমরা। সহযাত্রী পরিবারের দু’জন আর পারল না। আমরা দুজন, আমার ছেলে আর রূপাদির মেয়ে এগিয়ে চললাম। সবার থেকে নিজেকে ক্ষণিক আড়াল করে কান পাতলাম জঙ্গলের বুকে। একটা গাছের ঝুঁকে পড়া ডালে হাত বুলিয়ে রেখে দিলাম স্পর্শ। অজস্র ফিসফিস যেন বাতাসে উড়ছে। মনে হল দু’হাতে আঁকড়ে ধরি এ বৃহৎ জঙ্গল, মিশে যায় এই নিঃশব্দ প্রকৃতির মাঝে। এক কি.মি. হাঁটার পর দেখলাম জঙ্গলের মাঝে রয়েছে একটি কবরস্থান আর একটি খালি জিপ দাঁড়িয়ে। সামনে দুটো রাস্তা। তারই একটা ধরে আরও সামনে দুই কি.মি আন্দাজ এসেগিয়েছি প্রায়। সামনে পথ বন্ধ আর এগোনোর জায়গা নেই। একটা বিশাল অর্ধাকৃতি গুহা পাহাড়ি পথের শেষে পথ আটকে দাঁড়িয়ে। বুঝতে পারলাম না ঠিক কোন পথে এগোলে নিচের অনন্ত বিস্তৃত ভ্যালিটি দেখতে পাব। কেমন যেন গা টা ছমছম করে উঠল। না এবার ফিরতে হবে সেই দু’কিলোমিটার পথ।
রেইক লজ


লজের রেস্টুরেন্টে ঘন দুধের চা পান করে ফেরার পথে ছুটে চললাম। এবারে ক্ষণিকের জন্য আমাদের ড্রাইভার চেঞ্জ হল। আসলে জোচং একজন খুব ভালো গায়ক। পাহাড়ি বনপথ,ঢালের রাস্তা, দু’ধারে গাছের সারি, ছুটে চলেছি আমরা জোচং গেয়ে চলেছে সুন্দর পাহাড়ি সুরে মিজো ভাষায়। সুরের কাছে সব ভাষা মিলামিশে এক। জোচং একেবারেই হিন্দি জানে না তবে অরিজিৎ সিং এর একটা হিন্দিগান শিখেছে, মানে বোঝে না গানের, তবে সুরটা ওর খুব প্রিয়

ক্রমশ.... পরের পর্বে থাকবে আদিম মিজো মানুষের সমাজজীবন। কোনও গ্রন্থ সংগৃহীত তথ্য নয়

@রুমকি রায় দত্ত

refreshing green view of mizoram