Translate

Sunday, 12 September 2021

নেতারহাটের নির্জনতা

 

ভ্রমণ ডায়ারির পাতা থেকে

রাঁচি

রুমকি রায় দত্ত

নেতারহাটঃ

নেতারহাতের সমাজচিত্র


হাতিয়া এক্সপ্রেস রাঁচি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁতেই নেমে পড়লাম আমরা। বেশ অনেকটা ব্যাগ টেনে পৌঁছালাম প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে। তারপর ওভারব্রিজ পেরিয়ে ওপারে। ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা প্রায়। একটা তরতাজা চনমনে স্টেশন। অসংখ্য ট্যাক্সি,অটো। আমাদের প্রথম দিনের গন্তব্য নেতারহাট। আগেই শুনেছিলাম, স্টেশন থেকেই ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় নেতারহাট। এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে জানতেই সে বলল, যাওয়া-আসা মিলিয়ে চার হাজার টাকা নেবে। কিন্তু সমস্যা হল আমরা আর এপথে ফিরব না। আমাদের ভ্রমণসূচি অনুসারে নেতারহাট থেকে বেতলা, সেখান থেকে রাঁচি। ট্যাক্সি ড্রাইভারই সমস্যার সমাধন করে দিলেন। জানালেন, স্টেশন থেকে অটোতে বাস স্ট্যান্ড চলে যেতে, সেখান থেকে ভালো বাস প্রতিদিন নেতারহাট যায়। তবে তাই হোক, বলে একটা অটো ঠিক করলামসকালের ব্যস্ত, চলমান রাঁচি শহরের মধ্যদিয়ে ছুটে চলল অটো। নেতারহাটের কথা শুনেই অটোওয়ালা আপ্লুত হয়ে প্রসংশা করতে লাগলেন। বললেন, ‘দুনিয়ামে যাঁহা ভি যাউ,ইতনা আচ্ছা সানরাইজ নেহি দিখনে মিলেগা কভি। উঁহা তো মানো বগল সে নিকলে গা সূরিয়’তার কথা শুনতে শুনতেই একটা কল্পনার ছবি যেন আঁকা হয়ে যাচ্ছিল মনে। প্রায় আটটার দিকে পৌঁছালাম বাস স্ট্যান্ড। বাস দাঁড়িয়ে আছে দেখে অটো ড্রাইভার নিজেই ব্যাগ গাড়িতে তুলে দিলেন।

 গতরাতে প্রায় আটটায় খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম, পেটে ছুঁচো দৌড়ানো শুরু করেছে। সামনেই একটা পুরীর দোকানে সবে খাব বলে ঢুকেছি,এমন সময় বাস হর্ণ দিতে শুরু করল। একদিকে খাবার থালা আরেক দিকে বাসের হর্ণ, দু’দিক থেকে দুজনের ডাকে পুরো কনফিউজড তখন। ভাবলাম পরের বাসে যাব তবে,কিন্তু কপালে খাবার না থাকলে যা হয়; সেদিন ঠিক তাই ঘটল। জানলাম, এই আটটার বাসের পর আবার দুপুর দুটোতে বাস আছে নেতারহাট যাওয়ার। কী আর করা অগত্যা খালি পেটেই চেপে বসলাম বাসে। মনে মনে ভাবলাম, পথে কোথাও বাস দাঁড়ালে খেয়ে নেব কিছু। যেহেতু দূরত্বের জার্নি,তাই বাসের সিটগুলো বেশ আরামদায়ক। এ যাত্রায় আমরা তিনজনই ( আমি, কত্তা আর ছোট্ট ছানা অনুরাগ। মাত্র তিন তখন তিনি)। বাস শুরু করল ছোটা। দু’তিনটি বিস্কুট খেয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যে অনুরাগও শুরু কর বমি করা। বাস শহর ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে নির্জন পথে। প্রতিটি স্টপে দু’একজন নামছে আবার উঠছে। বেশির ভাগই দেহাতি লোকজন। আর আমাদের চোখ ঘুরছে খাবারের দোকানের সন্ধানে। হতাশ হয়ে আবার শুরু করছি অপেক্ষা পরের স্টপের জন্য। 

নেতারহাটের পথে পথে


এদিকে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকায় ক্রমশ মাথার দু’পাশে ধরে থাকা চিনচিনে ব্যথাটা বেড়েই চলেছে। প্রায় ঘন্টা চারেক চলার পর বাস এসে দাঁড়াল একটা নির্জন গ্রামের পথে। বামপাশে একটা চায়ের দোকান। পান, সিগারেট আর একটা ঝোলানো প্যাকেটে বাবুজী কেক। এত খিদেতে খাবার ইচ্ছাটা প্রায় শেষ তখনহঠাৎ চোখে পড়ল একটা ঠেলায় বিক্রি হচ্ছে ছোলামাখা। জিভে জল এল। তাই কিনে খেতে খেতে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালাম। এখনও প্রায় ঘন্টা দুয়েকের পথ। বাস আস্তে আস্তে আঁকাবাঁকা গ্রাম্য পথ ছেড়ে পৌঁছাল পাহাড়ি পাকদন্ডী পথে। ক্রমশ সমতল ছেড়ে যত উপরে উঠতে লাগলাম,রাস্তা তত খারাপ। পথের দু’পাশে শাল,মহুয়া ও অন্যান্য গাছের জঙ্গল পথের সাথে এঁকেবেঁকে চলেছে। না, সত্যি বলছি এত অপরূপ পথশোভা উপভোগ করার মতো অবস্থ তখন আর আমার ছিল না। মাথার যন্ত্রণা তীব্র আকার ধারণ করেছে তখনহঠাৎ লক্ষ করলাম, আমাদের বাস সমতল রাস্তায় চলছে। অর্থাৎ নেতার হাটে চলে এসেছি আমরা। কিন্তু ঠিক কোথায় নামব বুঝে উঠতে পারছি না। দেখলাম, একটি দেহাতী পরিবার বড়ো রাস্তার উপরে নেমে পড়ল। তারাই বলল, এখানেই নামতে হবে আমাদের।

 রাস্তার পাশেই রয়েছে দু’একটি দোকান। সেখানে একটি বাঁশের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। আমাদের হোটেল ঠিককরা ছিল না। সঙ্গের ভদ্রলোকটিকে হোটেলের কথা বলাতে উনিই ফোন করলেন হোটেল প্রভাত বিহারের ম্যানেজারকে। ম্যানেজার তাঁর বন্ধুস্থানীয়। ম্যানেজারকে আসতে বলে চলে গেলেন ভদ্রলোক। এদিকে মাথার যন্ত্রণা এতটাই তীব্রতা ধারণ করেছে তখন,প্রায় চোখে অন্ধকার দেখছি, প্রচন্ড গা গোলাতে শুরু করেছে। ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই তখন। ঠিক আধঘণ্টা হবে! ম্যানেজার এলেন গাড়ি নিয়ে। ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটে। গাড়ি একটা ঘেরা কম্পাউন্ডের মধ্যে প্রবেশ করল। সুন্দর সাজানো গোছানো। ডানদিকে কাচ ঘেরা একটা বড়ো রেস্টুরেন্ট। এখানেই হোটেলের খাওয়ার ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে একটা সরু রাস্তা নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। দু’পাশে মরশুমি ফুল। রাস্তার শেষেই রয়েছে হোটেল ‘প্রভাত বিহার’ পর্যটন দপ্তরের থাকার জায়গা। হোটেলের একতলার অংশ মাটির নীচে। দূর থেকে দেখলে দোতলাকে একতলা বলেই ভ্রম হবে। আমাদের যে ঘরটি দেওয়া হল সেটি দোতলায়। ১০২ নং। দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠেই একটা খোলা ছাদ পেরিয়ে পৌঁছালাম আমাদের রুমে। সমনে গ্রিলঘেরা বারান্দা। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে সামনের সাজানো বাগান। পথশ্রমের ক্লান্তি মিটাতে হালকা গরম জলে স্নান সারার পর কিছুটা সুস্থ বোধ করতেই, খাওয়ার জন্য গেলাম রেস্টুরেন্টে,কিন্তু খেতে পারলাম না। দু’গ্রাস খেতেই শরীর তীব্র ভাবে প্রতিবাদ জানাল। বাইরে এসে দেখলাম, অন্য সবাই কোথাও বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ম্যানেজার এসে হিন্দি মিশানো বাংলায় বললেন, গাড়ি বলে দিই? আপনারা নিশ্চয় ‘ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট’ দেখতে যাবেন?

‘ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট’ নেতার হাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পট ‘সানসেট পয়েন্ট’। ম্যাগনোলিয়া নামে এক ইংরেজ মহিলা এক মেষপ্রতিপালককে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছিল এইখানে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ঘোড়াসহ এই  পাহাড় থেকে গভীরে!

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছিল না। মন তখন নীরবতার মাঝে একন্ত যাপনে মগ্ন হতে চাইছিল। আর হাতে তো পরের দিনটা আছেই, এই ভেবে বললাম, ‘আজ আর যাব না, কাল দেখব’। দেখলাম উপস্থিত অন্যান্য টুরিস্ট সকলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সূর্যাস্ত দেখতে। বেলা পড়ে এল প্রায়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি,শীত লাগছে বেশ। জড়িয়ে নিলাম হালকা একটা চাদর। আকাশটা ক্রমশ কফি রঙে ডুবে যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টের আলো গুলো জ্বলে উঠছে একে একে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেই খোলা ছাদে। দুটো চেয়ার পাতা রয়েছে। পড়ন্ত দিনের রংটা তখনও মুছে যায়নি। বসলাম চেয়ারে একা নির্জনে। ক্রমশ গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার উপর থেকে নেমে আসছে, অনুভব করছি এই অন্ধকারকে ভীষণ ভাবে।একটা অদ্ভুত কথা বলা শুরু হয়েছে অন্ধকারের সাথে নির্জন প্রকৃতির। ছাদের সীমানা পেরিয়েই চোখ আটকে যায় বিস্তীর্ণ জঙ্গলের গায়ে। পাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। ওদের মাঝে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে অন্ধকার! জেগে উঠছে বৃক্ষপ্রকৃতি মিটমিটে জোনাকির আলোয়,আর নিরবচ্ছিন্ন ঝিঁঝিঁর চিৎকারে। একটা ঘোর, একটা নেশা জাগানো ঘোর যেন ঘিরে ধরছে আমায় তখন। চোখ বন্ধ করে গভির অনুভূতিতে সেই প্রথম আমার নীরবতার সাথে অন্ধকারকে মাখা। কি সে অনুভূতি? কি সে নেশা... কোনো ভাবেই ব্যাখ্যা করতে অপারগ আমি। শুধু এটুকু বলতে পারি, সেই প্রথম আমি অন্ধকারের প্রেমে পড়েছিলাম। আজও সেই প্রেম সংরক্ষিত মনে। মাঝে মাঝেই ভেসে আসছিল অদ্ভুত কিছু পশু অথবা নাম-না-জানা পাখির ডাক। ঘোর ঘনঘোর এক আবেশের মধ্যে বিলিন হয়ে যাচ্ছি যেন।

প্রভাত বিহারের রেস্টুরেন্ট


‘মাথায় হিম পড়ছে’ গম্ভীর পুরুষকন্ঠ সতর্ক করতে যেন ফিরে এলাম ঘোরলাগা জগৎ থেকে বাস্তবে ফেরার পথটা। চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। একঝাঁক জোনাকির সমাবেশ গাছের ফাঁকে ফাঁকে পায়ে পায়ে উঠে এলাম ঘরের দিকে। চেয়ার

এমন একটা নির্জন জায়গায়, কাচ ঘেরা রেস্টুরেন্টে বসে রাতের খাবারখাওয়া, বেশ ভালোই লাগছিল। ভালো লাগছিল অন্যান্য টেবিলে খেতে বসা অন্য সব ট্যুরিস্টদের নিজস্ব আচরণ গুলো আড়চোখে দেখতে। বিভিন্ন বিচিত্র স্বভাবের অনেক মানুষ একসাথে বসে অথচ সবার জীবনে একটা ভিন্ন গল্প আছে।

শীত বেশ ভালোই। রাতের বিছানার হাতছানিটাও বেশ উপভোগ্য। সকালে সূর্য মামার হামা দেওয়া দেখতে হবে, মোবাইলে ঘন্টি ঠিক করে রাখলাম।

বাকি পরের পর্বে...।

No comments:

Post a Comment