Translate

Sunday, 19 September 2021

নেতারহাটের নির্জনতা The Ultimate Guide to Netarhat

 

                                    ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

                                               রাঁচি

                                          রুমকি রায় দত্ত

Thtনেতারহাটের নির্জনতা ঃ (দ্বিতীয় পর্ব)The Ultimate Guide to Netar


The Ultimate Guide to Netarhat


ঘুমের মাঝে বিশ্রামরত মস্তিষ্ক কিযেন একটা সংকেত পাচ্ছে! আস্তে আস্তে স্পষ্ট হলো সে সংকেত। উঠতে হবে।

 সূর্য ওঠার সময় হয়ে এসেছে। ভোর হওয়ার আগেই দোর খুলতে হবে,তা না হলে সূয্যিমামার হামাদেওয়া দেখব কি করে। ভোরের আলো ফোটার আগেই গিয়ে দাঁড়ালাম লাগোয়া ব্যালকনিতে। নিশি শেষে কুয়াশা মাখা শাল-পিপুলের জঙ্গল ফিসফিস করে কত কথা যেন বলে চলেছে। পূবের আকাশটায় কি রং লাগছে!—ক্যামেরা নিয়ে ছুটলাম ছাদে।---উন্মুক্ত তমসাচ্ছন্ন আকাশ পানে চাতকের পিপাসা নিয়ে, সূর্যমামার হামা দেওয়ার সেই দুর্ল দৃশ্যসন্ধিক্ষণ শুধু আমার মস্তিষ্কের দৃশ্যপটে নয়,উন্নত প্রযুক্তির সুমিষ্ট ফল ব্যাটারী চালিত ফটোবাক্স নামক বস্তুটিতেও তাকে বন্দি করার অভিপ্রায়ে। ধীরে ধীরে ঘন অন্ধকারে ফিকে গোলাপি রঙের আবির ছড়ালো। তারপর উজ্বল হলুদ,ফিকে বেগুনি,উজ্বল কমলা---রঙে রঙে দিগন্তরেখা রঙীন হয়ে উঠল। শুরু হল ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক—যেন কোনো লাস্যময়ী নারীর শরীরের সুন্দর ভঙ্গিমা হারিয়ে যাওয়ার আগে সংগ্রহ করার পাগলামি। রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেদ করে কানে এসে পৌঁছাতে লাগলো পাখির কূজন

The Ultimate Guide to Netarhat
সূর্যোদয়ের মুহূর্ত



নেতারহাটে আলাদা করে বিশেষ কিছু দেখার নেই। আপার ঘাগরি আর লোয়ার ঘাগরি বলে দুটো ছোটো জলের ধারা আছে,আর একটা বড় প্রাকৃতিক ঝিল। এখানকার প্রকৃতিই আসলে দর্শনীয়। কি আছে প্রকৃতিতে সেটা নেতারহাট না এলে সঠিকভাবে অনুভব করা সম্ভব নয়। সূর্যোদয় দেখে নেমে এলাম একেবারে নীচে। হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে কুয়াশা মেখে হাঁটতে বেশ লাগল। রেস্টুরেন্টে সকালের চায়ের সাথে শীতের অনুভব নেওয়া এক অনবদ্য পাওনা। ঘাগরি দুটিতে এই ফেব্রুয়ারিতে জল থাকে না,তাই সেটা দেখার কোনো আগ্রহ এল না। স্নান সেরে তিনজনে বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। পাশদিয়ে তখন হুসহুস বেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। যারা গতকাল এসেছিল তারা ফিরছে। এখানে সাধারণত শনিবার এক দিনের জন্যই লোকজন আসে। আমাদের মত দু’তিন দিন থাকার পাবলিক খুব কম, এমনটা জানিয়েছিলেন হোটেলের ম্যানেজার স্বয়ং। হাঁটতে এসে পড়লাম গাছগাছালি ঘেরা একট পিচ রাস্তায়। রাস্তার গায়ে আলোছায়ায় বিচিত্র এক নকশা পায়ের নিচে ফেলে হেঁটে চলেছে তিনটি বাচ্ছা মেয়ে। মাথায় তাদের কাঠের বোঝা। বললাম, ‘এই তোদের একটা ছবি তুলছি’। ওরা হাঁসল। দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠল। এটাই এখানকার প্রকৃত চিত্র। বনের কাঠ বেচে উপার্জন এখানকার অনেক মানুষের। কেউ শহরে গিয়েছে রাজমিস্ত্রির কাজে। অনেকে কাজ করে বক্সাইট খনিতে। কিছু আধুনিক যুবক আমাদের মত ট্যুরিস্টদের গাড়ি ভাড়া দিয়ে উপার্জন করে। তবে যেহেতু এখানে ট্যুরিস্টরা শনিবার বেশি ভিড় জমায়, তাই ঐ একদিন বা দু’দিনই যা ইনকাম হয়। বাকি দিনগুলো গাড়ি নিয়ে ওরা যায় শহরে। আর নতুন শহরে বাবুদের দেখলে, ছোটো ছোটো বাচ্চারা টাকা চায়। একটাও একটা উপার্জনের পথ।

আমরা একটা গাছ ঘেরা মাঠের ভিতর দিয়ে হেঁটে পৌঁছালাম সেই বড় রাস্তায়,যেখানে গত দিন বাস থেকে নেমে ছিলাম। যানবাহনের আধিক্য নেই কোনো। মাঝে মাঝে একটা দুটো গাড়ি বা মটরসাইকেল যাচ্ছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম একটা আবাশিক আশ্রমের সামনে। পথের দু’ধারে গাছ আর মাঝে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি আমরা। একেকটা কুটিরের মত বাগান ঘেরা ছাত্রদের একেকটা থাকার জায়গা। একটি ছাত্রর কাছে জানতে পারলাম এখানে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়তে আসে ছাত্ররা। পথে নজরে এসেছিল একটি বালিকা বিদ্যালয়,একটি National Residential School  হাঁটতে হাঁটতে এই সুন্দর পথে কখন যে দুপুর হয়ে গিয়েছে মনেই ছিল না।

দুপুরের খাওয়া সেরে অপেক্ষায় তখন ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট দেখতে যাবার। গাড়ি তো বলা আছে। ঠিক সাড়ে তিনটে, অপেক্ষা গাড়ি এলেই ছুটবো সেখানে। ঘড়ির কাঁটা সরতে লাগল, কিন্তু গাড়ি আর এল না। এ এক ভেস্তে যাওয়া পরিকল্পনা আর মন খারাপের গল্প। সত্যি আর এলো না গাড়ি। অনেক ছোটাছুটি করলাম, বড় রাস্তায় গিয়ে দোকান গুলোতে বললাম। হলো না নতুন কোনো গাড়ির যোগাড়। গাড়ির ড্রাইভার কথা দিয়ে কথা রাখলো না। আসলে আসার পথে রাস্তায় পারহেড হিসাবে প্যাসেঞ্জার পেয়ে সে বেমালুম ভুলে গেল আমরা তাকে বুক করে রেখেছি। বড় রাস্তার ধারে প্রতি বুধবার হাট বসে। পড়ে থাকা হাটের কাঠামোর চারপাশ ঘুরে, ফিরে এলাম হোটেলে। সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে আকাশের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম। কালো থোকা মেঘের মাঝাখান থেকে একটা রক্তাভ আলোর চ্ছ্বটা হোটেলের লনে বসেই দেখা যাচ্ছে। ছবি তুললাম সেই মেঘের। ভিতরে তখন তীব্র না পাওয়ার যন্ত্রণা! ভীষণ মনখারাপ লাগছে, ভীষণ... ভীষণ! সূর্যটা ডুবে গিয়ে নেমে এলো রাত। নিস্তব্ধ নির্জন প্রকৃতির মাঝে ভেস্তে যাওয়া পরিকল্পনার যন্ত্রণাটা ক্রমশ মিশে যেতে লাগল। পরেরদিন রওনা হবো বেতলা। যতই মনখারাপ হোক, মনখারাপের রাতটা গুছিয়ে রাখলাম অন্তরে। যা পেয়েছি তাই বা কম কি! নেতারহাট সত্যিই ‘নেচারহাট’ কোনো সন্দেহ নেই।

আবার একটা নতুন সূর্যের উদয় দেখে শুরু হল আমাদের নতুন একটা দিন। ন’টার মধ্যেই স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে তৈরি আমরা। হোটেলের ম্যানেজারের ভাই বেতলায় থাকেন,সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে আসছেন। আমাদের বেতলা নিয়ে যাবেন। প্রায় পুরো দিনটাই আমাদের পথে পথে কাটবে। ঠিক ন’টা বাজে তখন, একটা জিপ এসে দাঁড়াল। হোটেলের ছেলে গুলোই আমাদের জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে দিল। যাত্রাপথে কয়েকটি স্পট দেখে নেব এমনই কথা আছে ড্রাইভারের সাথে। বললাম, ‘দাদা এখানে একটা প্রাকৃতিক ঝিল আছে শুনেছিলাম, একবার ওটা দেখাতে নিয়ে যাবেন?’ ড্রাইভার দা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ ঠিক হ্যয়, চলিয়ে,মগর ইয়াদা টাইম নেহি হ্যয় ম্যাডামজি’।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, বেশি সময় নেব না। একটু ফটো তুলেই চলে আসব’।

গাড়ি মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই এসে দাঁড়াল একটা বিশাল আকৃতির ঝিলের সামনে। স্বচ্ছ সাদা জলে সূর্যের আলো চকচক করছে। বেশ কিছুটা দূরে বড় বড় গাছগুলোর শান্ত ছায়া ছবির মতো আঁকা রয়েছে ঝিলের বুকে। কি প্রশান্তি! দীর্ঘক্ষণ সেই দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে মন চাই। বেশ কিছু ফটো তুলে গিয়ে বসলাম গাড়িতে। না, আর সময় নষ্ট করা যাবে না। কিন্তু কপালে যদি সময় নষ্ট লেখা থাকে তবে? ঠিক সেটাই ঘটল। গাড়ি বেশ ছুটে চলছিল সরু কালো পিচের রাস্তার উপর দিয়ে। কোথাও দু’পাশে ধু ধু মাঠ, কোথাও বা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাছ। মাঝে মাঝে বক্সাইট খনি থেকে মাল বোঝাই ট্রাককে সাইড দিয়ে আমাদের গাড়ি বেশ ভালোই ছুটছিল, হঠাৎ ব্রেক লাগিয়ে থেমে গেল গাড়ি। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, আগে দুটো ট্রাক দাঁড়িয়ে। যা ঘটেছে তার ঠিক আগে। কি ঘটেছে জানার আগেই আমাদের পিছনে অনন্ত চারখানা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ড্রাইভার এসে জানালেন, সামনে একটা ট্রাকের চাকা এমন ভাবে ফেটেছে যে, সে গাড়ি রাস্তায় আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পাশ দিয়ে খুব বেশি হলে একটা মানুষ যাওয়ার রাস্তা আছে। জানতে চাইলাম, ‘কি হবে এবার?’

The Ultimate Guide to Netarhat
প্রভাত বিহারের পিছনের ব্যালকনি দৃশ্য



ড্রাইভার জানালেন, ষাট কিমি দূরে একটা গ্রাম আছে, সেখান থেকে মেকানিক আসবে তবে রাস্তা পরিষ্কার হবে। বললাম, ‘বিকল্প কোনো রাস্তা নেই?’ উনি জানালেন না। দু’পাশে ঝোঁপে ভরা মাঠ, তাও রাস্তা থেকে অনন্ত দু’হাত নিচু, সুতরাং পাশ দিয়ে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই। যা বুঝলাম, দুপুর দুটোর আগে এপথে এগোনো সম্ভব নয়, আর এমনটা হলে আমাদের আর ‘লোধ’ জলপ্রপাতটা দেখতে যাওয়া হবে না। উফ্‌! এবার সত্যিই বিরক্ত হলাম,আর ভীষণ কান্না পেল আমার। এই ভ্রমণে কি শুধুই ভেস্তে যাবে সব! প্রায় ঘন্টাখানেক পর দেখলাম, পিছন থেকে দু-একটা গাড়ি ব্যাকগিয়ারে পিছনের দিকে যাচ্ছে। কিছু তো কারণ আছে। ড্রাইভারদা জানালেন, ‘একটা রাস্তা পাওয়া গিয়েছে,কিন্তু সব ধরণের গাড়ি যেতে পারবে না। দেখি একবার চেষ্টা করে’। পিছাতে লাগল আমাদের গাড়িও। বেশ কিছুটা ব্যাকে এসে দাঁড়াতেই দেখলাম, রাস্তার ডানদিকে এবড়োখেবড়ো উঁচু নিচু ঢিবি ও ঝোঁপের মাঝখান দিয়ে একটা গাড়ি যাচ্ছে। পাশের জমিটা রাস্তা থেকে হাতখানেক নিচু। জিপের মতো শক্তপোক্ত গাড়ি ছাড়া সত্যিই ওই পথে কোনো গাড়ির যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের গাড়িও ঢকাম ঢকাম করে লাফাতে লাফাতে কিছুটা এগোতেই একটা ঢিবিতে গেল আটকে ড্রাইভার স্টেয়ারিং এ বসে থাকল, দুজন লোক পিছন থেকে ধাক্কা দিতেই সেই গাড়ি আবার লাফাতে লাফাতে চলতে শুরু করল। অবশেষে আবার এসে উঠলাম পিচের রাস্তায়। জানি না সামনের পথে আর কি কি বাকি আছে,তবে মনটা আবার আনন্দে ভরে উঠল কারণ, লোধ দেখা হবে। ভেস্তে যেতে যেতেও ভেস্তে না যাওয়া ভ্রমণের গল্প এটা। গাড়ি আপন গতিতে ছুটে চলল। প্রায় ষাট কিমি পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম এই পথের একমাত্র বর্ধিষ্ণু গ্রামে। গ্রামটির নাম ‘মহুয়া’। নেতারহাটের মানুষ সপ্তাহে একদিন এই গ্রামে এসেই সারা সপ্তাহের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিয়ে যায়। এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি।

এরপরেই আছে অ্যাডভেঞ্চারের এক যাত্রা লোধের পথে... পরের পর্বে আগামী রবিবার

 

No comments:

Post a Comment