ভ্রমণ ডায়েরির পাতা
রাঁচি
ষোলোভূজা দেবী ও দশম প্রপাতের গল্পঃ A Simple Guidance For You In Ranchi:
Click on video button 👆
দাদা বললেন--
“রাঁচির বিখ্যাত ‘দেউরি মন্দির’ এটা। আমি এখানেই দাঁড়াচ্ছি,আপনারা গিয়ে দেখে আসুন”।
অটোতেই জুতো খুলে শালপাতার ঠোঙায় ফুলের মালা আর প্রসাদ নিয়ে এগিয়ে গেলাম মন্দিরের দিকে। লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দিতে গেলে সারাদিন লেগে যাবে। সেদিন কোনো একটা বিশেষ তিথি ছিল। দূর দূর থেকে স্থানীয় দেহাতি মানুষের ভিড়ে ঢেকে আছে মন্দির। ভিতরের মন্দিরটি বহু প্রাচীন কালো বালিপাথরের। মন্দিরের ভাঙাচোরা ও কালো বর্ণ বুঝিয়ে দেয় এই মন্দির অনেক ইতিহাসের সাক্ষী।
সত্যিই তো এই মন্দিরের একটা প্রাচীন গল্প আছে,সে গল্পে এক আদবাসী রাজাও আছেন। রাজা 'কেরা'। প্রায় ১৩০০ সাল তখন, সিংভূমের তখন মুন্ডারাজা কেরা রাজত্ব করছেন। ছামরু পান্ডা নামের এক ব্রাহ্মণ পুরোহিত বছরে দু-বার এই রাজ্য পরিদর্শনে আসতেন। সেবার রাজা কেরা এক যুদ্ধ জিতে রাজ্যে ফিরেছেন সবে। সে সময় দেখা করতে এলেন ছামরু পান্ডা। রাজা তাঁকে নিজের রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুরোধ জানালে, রাজার সম্মানার্থে ছামরু পান্ডা সেখানেই থেকে গেলেন। পুজোপাঠ ও সাধনায় অতিবাহিত করতে লাগলেন দিন। জঙ্গলের এক পরিত্যক্ত অংশে ছমরু পুরোহিত প্রতিদিন দেবতার আরাধনা করতেন। একদিন তিনি তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। এমন সময় দেবী দুর্গা তাঁকে দর্শন দিলে, সে কথা তিনি মহারাজকে জানালেন। এই ঘটনার পরেরদিন থেকেই রাজা কেরা, সেই স্থান পরিষ্কার করার কাজে লোক নিযুক্ত করলেন।সেখানে কাজ করার সময় হঠাৎ তারা আবিষ্কার করল একটি কালো পাথর। তারা ভয় পেয়ে সকলেই ফিরে গেল, কিন্তু পরেরদিন আবার কাজে এসে তারা দেখল এক আশ্চর্য দৃশ্য। সেই স্থানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে এক কালো পাথরের মন্দির। ভিতরে রয়েছেন ষোলো ভূজা দেবী।
দেবী দুর্গার অবতার বলেই মানা হয় এই ষোলোভূজা দেবী কালিকাকে। স্থানীয় আদিবাসী মানুষরা এখানে নিত্য পুজো দেন। বাঁশের খুঁটিতে হলুদ ও লাল সুতো বেঁধে তাঁরা মানত করেন ঈশ্বরের কাছে। সপ্তাহে ৬দিন পুজো করেন আদিবাসী পুরোহিতরা ও একদিন পুজো করেন ব্রাহ্মণ পান্ডা। এইটা এই মন্দিরের পুজোর রীতি
মন্দিরের স্থাপত্যের বিশেষত্ব হল এই গঠন পদ্ধতি। কোনোরকম বালি সিমেন্ট বা সংযুক্তকারী উপাদান ছাড়াই শুধুমাত্র পাথরের সাথে পাথরের ইন্টারলক সিস্টেমের মাধমে এই মন্দিরটি গঠিত হয়েছিল পায় ৭০০ বছর আগে। অনেকে বিশ্বাস করেন, মন্দিরের আসল নির্মানকর্তা আসলে রাজা অশোক। যখন তিনি কলিঙ্গদেশে সামরিক অভিযানে যাচ্ছিলেন, তখন এই মন্দিরের নির্মাণ করেন। মন্দিরের ষোলোভূজা দেবী মুর্তিটি কালো বর্ণ ও উচ্চতেয় ৩ফুট। মন্দিরের আকৃতি ও গঠন ওড়িশার বিভিন্ন মন্দিরের আদলেই।
মন্দিরের বাইরে তৈরি হয়েছে রঙিন আধুনিক মন্দির,যার দেওয়ালে ছাদে আঁকা রঙিন দেবদেবীর ছবি। একসময় এই প্রাচীন মন্দিরটির কথা অনেকেই জানতেন না। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের তৎকালীন ক্যাপ্টেন ধোনি ও তাঁর পরিবার প্রতিদিন আসতেন এই মন্দিরে পুজো দিতে এমনিটাই জানাগেল স্থানীয় মানুষদের মুখথেকে।
মন্দির দর্শন ছেড়ে আমরা আবার এগিয়ে চললাম। এই রাস্তাটা রাঁচি জামশেদপুর জাতীয় সড়ক। আমাদের গন্তব্য দশম প্রপাত। পথে দেখে নিলাম রাঁচির বিখ্যাত সূর্যমন্দির। ১৮টা চাকার রথ টেনে নিয়ে যাচ্ছে সাতটা ঘোড়া। রথের আকারে গড়ে তোলা মন্দিরটা পুরোটাই শ্বেত পাথরের তৈরি। ভিতরের আরাধ্য দেবতা সূর্যদেব। অপূর্ব স্থাপত্যের নিদর্শন এই মন্দির!
এরপর আরও কিছুটা পথ এগিয়ে যাওয়া। সামনে অপেক্ষারত দশম প্রপাত। অপেক্ষারত বলাটা ঠিক হল কিনা জানি না, কে কার অপেক্ষা করছে! আমরা অপেক্ষায় আছি দু’চোখে ভরে নেব এই প্রকৃতির খেয়ালকে। একটা গ্রাম্য পথ বেয়ে টোটো যেখানে এসে দাঁড়াল,জায়গাটায় চারপাশে বেশ কয়েকটি দোকানপাট। না, দোকান মানে মোটেই শহুরে দোকান বা পরিবেশ নয়। একেবারে খাঁটি গ্রাম্য পরিবেশ। ছোটো ছোটো দোকানপাট খাবারের। মাঝ-দুপুর প্রায়। প্রচণ্ড খিদে পেটে। চারপাশের দোকানগুলোতে টুকটাক খাবার ছাড়া তেমন কিছু নজরেই এল না প্রথমে।
একটু এগোতেই দেখলাম, কয়েকজন একটা কাপড় দিয়ে ঘেরা স্থানে চেয়ারে বসে কিছু খাচ্ছে। এগিয়ে গেলাম। নয়া, কোনো হোটেল নয়। একজন দেহাতি মহিলা নিজেদের সামান্য খাবার বেশি পরিমানে বানিয়ে রেখেছে। কেউ খেতে চাইলে সেটাই অর্থের বিনিময়ে খাওয়াচ্ছে। দর্শনধারী না সে খাবার, তবে গুণবিচার ? খিদের মুখে দু’গ্রাস মুখে ঢুকাতেই মনে হল যেন অমৃত। না, এ খিদের মুখে খাওয়ার জন্য মনে হওয়া নয়। বাঁধাকপির ট্যালট্যালে ঝোল, বেশ শক্ত মোটা চালের ভাত আর আলুমাখা। বাঁধাপকপির ঝোল যে এত সুস্বাদু হতে পারে, না-খেলে সত্যিই জানতে পারতাম না।
এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে দশম জলপ্রপাতকে। উপর থেকে নীচের দিকে লাফিয়ে পড়ছে। প্রবল গর্জন আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। খুব ইচ্ছা করছে ঐ জলের কাছে যেতে। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, খাদের মধ্যে সবুজ জল জমে আছে, কিন্তু কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। এখানে আসার আগেই শুনেছিলাম, এখন আর নীচে জল্প্রপাতের সৃষ্ট ঐ জলাশয়ে স্নান করতে দেওয়া হয় না। অতটা উচ্চতা থেকে লাফিয়ে পড়া জলের ধারায় সৃষ্ট গভীর খাদের সবুজ জলাশয়ের যতই আকর্ষণ থাকুক, বিপদ তার থেকেও অনেক বেশি।
প্রচুর মানুষ তলিয়ে গিয়েছেন ঐ জলে। আমরা আসার একমাস আগেই সেখানে এক যুবক তলিয়ে যায়, তারপর থেকেই ঐ কাঁটাতারের ব্যবস্থা। একটা স্থানীয় লোক আমাদের পথ দেখাল। আমরা নীচে না নেমে, একটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রপাতের উপরের অংশে পৌঁছালাম। ভয়ঙ্কর সেই রাস্তা। এতক্ষণ আমরা যেখান থেকে জলের ধারাকে লাফিয়ে নীচে নামতে দেখছিলাম, দেখলাম আমরা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের পায়ের তলা দিয়েই বয়ে যাওয়া জলধারাই লাফিয়ে নামছে নীচে। একহাত দূরেই রয়েছে খাদের কিনারা। ভয়ঙ্কর সেই পথ! কীভাবে গেলাম সেখানে এখন ভাবলেই বুকের ভিতরে দ্রুত হৃদ্গতির শব্দ শুনতে পাই। স্বচ্ছ কাচের গুলির মতো চকচকে জল, জমে আছে পাথরের খাঁজে খাঁজে। বাইরে রোদের তীব্রতা তখন যথেষ্ট। জুতোর ভিতরে পা ঘেমে উঠছে। জুতো খুলে সেই স্বচ্ছজলে পা ডুবিয়ে বসতেই শরীর জুড়ে নেমে এল শীতলতা।
বড় বড় পাথর পাহাড়ের
মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের অলিতে গলিতে এঁকে বেঁকে বয়ে চলেছে জলধারা। এক পাথর থেকে
আরেক পাথরে যেতে হলে ডিঙাতে হবে বহমান জলধারা। কীভাবে যেন হাঁটতে হাঁটতে এমন
জায়গায় এসে পৌঁছালাম চারিদিকে বড় বড় পাথর শুধু। যেদিকেই যাচ্ছি সামনে বিশালাকার
পাথর। কাছাকাছি কাউকে দেখতেই পেলাম না। ক্ষণিকের জন্য মনে হল,পথ হারিয়ে ফেলেছি।
একটা অজানা ভয়ের সাথে রোমাঞ্চ জুড়ে তখন মনের এক অদ্ভুত অবস্থা। দেখলাম একটা পাথরের
পিছন দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। ঐধারা ডিঙিয়ে ওপারে যেতে পারলেই রাস্তা পাব। পেরতে গিয়ে
পা পিছলে গেল। ঠান্ডা কনকনে জলে ভিজে গেল জুতো। তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। একটা
ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে। ভেজা জুতোয় বেশ কাঁপুনি ধরে গেল। উপর থেকেই দেখতে পেলাম
সূর্যটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছে যেন,আর ভীষণ রকম লাল দেখাচ্ছে। আসলে দিগন্ত
ছোঁয়ার প্রস্তুতি। আস্তে আস্তে নেমে এলাম সেই গ্রামের পথে। অটো আমাদের নিয়ে ফেরার
পথ ধরল। রাস্তায় ধারে অজানা গাছে লাল লাল কচি পাতা ধরেছে। ছুটে চলতে চলতে দেখতে
পেলাম,লাল কচি পাতার আড়ালে ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ছে সূর্য। একটা দিন বিদায় নিচ্ছে,
নতুন দিনের জন্ম দেবে বলে। কোথা দিয়ে যেন কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। হাতে আর মাত্র একটা
দিন। আগামীকালই রাঁচিতে আমাদের শেষ দিন। অনেক জায়গা দেখা বাকি। মনটা কেমন যেন
বিষন্ন হয়ে উঠছে...সারা দিন প্রকৃতির কোলে কাটিয়ে ফিরে এলাম আবার রাঁচির শহুরে ব্যস্ত
জনস্রোতের মাঝে।
ক্রমশ...।।