Translate

Wednesday, 24 November 2021

জলপ্রপাত ও মানব জীবন Simple Guaidence For You In Ranchi

ভ্রমণ ডায়েরির পাতা

রাঁচি

জলপ্রপাত ও মানব জীবন 

Simple Guaidence For You In Ranchi :

Simple Guaidence For You In Ranchi

     কুলের পসরা


রাতের নির্জন অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। একটা সাদা ঘোলাটে কুয়াশার চাদর ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে, যেন গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে থোকা থোকা মেঘ। উঠে পড়েছি সকাল সকাল। স্নান আর ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পড়তে হবে। ব্যালকনি খুলে বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছি কুয়াশা ভেজা প্রকৃতিকে। এখনও হরিণের দল মাঠে নামেনি। বাঁদরগুলো মুখ গুঁজে ঝিমাচ্ছে।একটা দুটো মাঝে মাঝে পাশের ঘরের ব্যালকনির রেলিং থেকে ঝুলে পাক খেয়ে ফিরে যাচ্ছে। কিছুটা দূরে তাকাতেই চোখ স্থির হয়ে গেল। বেশ অনেকটা দূরে হালকা অবয়ব। একটা হাতি যাচ্ছে। বিস্মিত হলাম! এত সকালে বনের ভিতরে হাতি মানে! তবে কি জংলি হাতির দর্শন পেলাম শেষে? চলে যাচ্ছে হাতিটা একা একা। পরে জানলাম না, ওটা জংলি হাতি নয়, আনারকলি। সকালে খাবার খেতে এসেছে।

 ঠিক ন’টা, গাড়ি হাজির। লটবহর গাড়িতে তুলে শুরু করলাম ছোটা রাঁচির পথে। ড্রাইভার রফিকদা বললেন,যাওয়ার পথে একটা স্পট দেখাবেন ‘কেচকি সঙ্গম’। কালো পিচের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলল গাড়ি। বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতেই সামনে দেখলাম একটা ছোট্ট ব্রিজ। গাড়ি ক্রমশ গতি কমাচ্ছে। ব্রিজ বলে কি! না, গাড়ি গতি কমিয়ে বাঁ-দিকে বেঁকে গেল। একটা সরু কালো রাস্তা,মাঝে মাঝে ভাঙা।অদ্ভুত এক নির্জনতায় ঘেরা এই পথ! যেন কোনো এক অচিনপুরের পথে ছুটে চলেছি আমরা। জনহীন নির্জন একটা রেলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি। গল্পে পড়া ভূতুরে স্টেশনের চাক্ষুষ দর্শন। কোনো প্রভেদ নেই! একটা অদ্ভুত আন্দোলন চলছে মনের মধ্যে। একটা মেলট্রেন ছুটে গেল সামনে দিয়ে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, এবার নিশ্চয় গেট খুলবে! রফিকদা নেমে দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। জিপের ভিতর থেকে আমরা তাকিয়ে আছি কোনো এক অজানা লোকের খোঁজে, ‘গেটম্যান’। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি কাউকে দেখিনি। গেলেন কোথায় তিনি? রফিকদা এগিয়ে গিয়ে হাঁকডাক করে ডেকে আনলেন তাকে। 

এগিয়ে চললাম। এসে দাঁড়ালাম একটা বিস্তীর্ণ বালুভূমির সামনে। এই সেই ‘কেচকি সঙ্গম’। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম নদীর অনেক কাছে। জল প্রায় নেই,শুকনো। ডানদিক থেকে ‘কোয়েল নদী’ আর বামদিকে ‘ঔরঙ্গা নদী’ এসে মিশেছে। দূরে আঙুল তুলে দেখালেন ড্রাইভার দা—ঐ যে সঙ্গমস্থল, আর নদীর ঠিক উলটো পাড়ে আছে এক ডাকবাংলো, যেখানে বসে বুদ্ধদেব গুহ লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কোয়েলের কাছে’। ভীষণ নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ছি যেন। মানস চোক্ষে দেখছি যেন সেই অরণ্যপুরুষকে। ভাবতে চেষ্টা করলাম ঠিক কিরকম ভঙ্গিতে বসে তিনি উপন্যাসটি লিখেছিলেন? এ অরণ্য, এ নদী-প্রকৃতি আমারও বড্ড প্রিয়। ওখান থেকে ফেরার পর লিখেছিলাম এক গল্প। একটা নয়, দু-দুটো গল্প। বালির ফাঁকদিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে চলেছে। দেখছি দু’চোখ ভরে। সময়ও বয়ে চলেছে, তাই ফিরতে হবে।

Simple Guaidence For You In Ranchi
নদী আর বালির আলপনা


 ফিরিতি পথে এসে দাঁড়ালাম সেই ব্রিজটার সামনে। দু’পাশে বালির মাঝে মাঝে জল দাঁড়িয়ে অপূর্ব কারুকার্য ফুটে উঠেছে। না দেখলে কল্পনা করা যায় না। কোয়েল নদী বালির গায়ে প্রাকৃতিক আল্পনা এঁকেছে। বিচিত্র এই প্রকৃতির কোথায় কেমন খেয়াল বোঝা মুশকিল। ছুটতে ছুটতে গাড়ি এসে দাঁড়াল ডাল্টনগঞ্জ বাজারে। এখান থেকেই রাঁচির বাসে তুলে দিয়ে রফিকদা ফিরে গেলেন।

রাঁচিতে আমাদের হোটেল ঠিক করা ছিল না। নেতারহাটে এক ট্যুরিস্ট যোগাযোগ করে দিয়েছিল নটরাজ হোটেলের সাথে। সেইমত রাঁচি নেমে রিকশা নিয়ে চলেছি। কিন্তু কোথায় সেই হোটেল? যে পথে চলেছি সেখানে শুধু বড়ো বড়ো বাড়ি। প্রায় আধঘন্টা পর একটা প্রাচীন জীর্ণ হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল রিকশাওয়ালা। বাইরে থেকে দেখে কেমন যেন লাগছে। ভিতরটা যদিও আধুনিক সজ্জিত তবে, কেমন যেন রহস্যময় মনে হল। না, ঠিক পছন্দ হল না। বেরিয়ে এসে রিকশাওয়ালাকেই বললাম, ‘ভাই একটা ভালো হোটেলে নিয়ে চলো’।

সে বলল, ‘ আমি শুনেই ভাবছিলাম, আপনারা এখানে কেন থাকতে চাইলেন। এই এলাকাটা ভালো না একদম। রাতে একা বেরতেই পারতেন না’।

জানি না, কতটা ভয়ঙ্কর সেই জায়গা। আদেও সত্যিই রাঁচিতে এমন জায়গা আছে কিনা! রিকশাওয়ালা নিয়ে এলো আমাদের ‘হোটেল সাঁই’। আমাদের ওভার বাজেটের হোটেল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আর অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছা করছিল না। হোটেলের ঘরে ঢুকে হাতে,পায়ে জল ছোঁয়াতেই বেশ এনার্জি ফিরে পেলাম। পেটে তখন ছুঁচো মারছে ডন। ভালো মতো পেটপুজো করে চারটের দিকে বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। এই অঞ্চলটা রাঁচির প্রধান অঞ্চল। বাজার-হাট, বড়ো ও মাঝারি মাপের হোটেলে ঠাঁসা। সামনে দূরন্ত রাস্তা। অবিরাম ছুটে চলেছে গাড়ি। খুব কাছেই স্টেশন। বেশ ভালোই হল। ফেরার পথে ট্রেন ধরতে সুবিধা হবে। রাঁচির পথ পায়ে হাঁটছি আমরা। এভাবে কত অজানা পথ হাঁটতে হাঁটতে চিনে ফেলেছি। হঠাৎ মাথায় এল, কটা হোটেল ঘুরে দেখলে কেমন হয়? একটু যদি বাজেটটা কমানো যায়? অনেক হোটেল আছে। এমনই একটা বাজেটের হোটেলে কথা বার্তা পাকা করে নিলাম পরের তিনদিন থাকব।

পরেরদিন বেশ সকাল সকাল নতুন হোটেলে এসে উঠলাম। এখানেই স্নান,ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে পড়ব রাঁচির জোনহা আর হুড্রু ফলস দেখতে। এই হোটেল থেকে একটু এগোতেই অটোস্ট্যান্ড। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো এখানে ঘুরে দেখার জন্য অটো অথবা ট্যাক্সি নিতে হয় দিনপ্রতি হিসাবে ভাড়া। দুটি পরিবার হলে ট্যাক্সি নেওয়া লাভজনক। আমরা অটো ঠিক করলাম। ঠিক সাড়ে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম জোনহা ফলসের পথে। রাঁচি থেকে প্রায় পনেরো কিমি রাস্তা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এই সময় রাঁচিতে যথেষ্ট ঠান্ডা। অটোতে ভালো করে নাক-মুখ ঢেকে বসে আছি। ছুটছে অটো। দু’পাশে সবুজের বাহার ছুটে চলেছে আমাদের সাথে। অপূর্ব পথশোভা! দশ-বারো কিমি যাওয়ার পর বাঁ-দিকে বেঁকে যাওয়া একটা কাঁচা রাস্তা দেখিয়ে অটো ড্রাইভার রাম কুমার সিংহ বললেন, ‘ইস রাস্তে সে হুড্রু যানা পরতা হ্যয়। হাম পহেলে জোনহা দেখেঙ্গে। ফিরতে ওয়াক্ত হুড্রু দেখেঙ্গে’।

বললাম, ঠিক আছেআপনি যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই করুন। কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে একটা কাঁচা রাস্তায় নেমে গেল অটো। গ্রামের ভিতরে আঁকাবাঁকা পথে ছুটে চলেছি। হঠাৎ একজায়গায় দেখলাম কয়েকটি বাচ্ছা ছেলে পলিপ্যাকে করে কুল বিক্রি করছে। এই সময় কুলের। এভাবে ঘুরতে আসা মানুষদের কাছে কুল বেচে দু’পয়সা উপার্জন হয় ওদের। চারিপাশে একটা অর্থনৈতিক অনটনের ছবি যেন। বিভিন্ন পথ ঘুরে এসে  পৌঁছালাম জোনহার সামনে। তখনও সে অদৃশ্য। অটো পার্কিং এর টাকা মিটিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছি হঠাৎ পিছন থেকে ডাক ‘ হেঁই দিদিমণি’। ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম একটি অল্প বয়সের হাট্টা গাট্টা চেহারার ছেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। গায়ের রং বেশ কালো। মাথায় ঝাঁকরা চুল। বলল, ‘ তুমরা দোপহরে খাবে না?’

বললাম, খেতে তো হবে, কিন্তু এখানে কোথায় খাবার পাব। ফেরার পথে খেয়ে নেব কিছু।

ছেলেটি বলল, ‘ এখানেই পাবে। আমি খাবার রেঁন্ধে দেব। কি খাবে বলো। মুরগা নাকি আন্ডা কারি?’

তুমি রেঁধে দেবে?

হ্যাঁ, দিদি। সবাই এখানে এসে এভাবেই খায়।

বলে দিমাল ঠিক আছে আন্ডা কারি বানাও। এক-দেড় ঘন্টার মধ্যে চাই কিন্তু।

সে মাথা নেড়ে চলে গেল। সামনে সুন্দর বাঁধানো সিঁড়ি ধাপে ধাপে উপরে উঠে গিয়েছে। বেশ কিছুটা উপরে ওঠার পর খাড়া ভাবে নীচে নেমে গিয়েছে। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে জোনহাকে। ঝিরঝির করে জলের ধারা নেমে আসছে, তবে ধারার বেগ অনেক কম। আসলে এইসময় নদীতে জল কমে যায়। নীচে জমে আছে পাথরের খাঁজে খাঁজে ঘনসবুজ জল। পরপর বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটায় ওখানে নেমে স্নান করা নিষেধ। 

কিছুটা পর থেকেই কাঁটা তারের ঘেরা। কিন্তু সেসব উপেক্ষা করেই বেশ কয়েকটি ছেলে জলে নেমে হুল্লোড় করে চলেছে। ওদের চিৎকার পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। ভেঙে যাচ্ছে নীরবতার জাল। এমন পরিবেশে কথা ভালো লাগে না। নীরবতা আর ঝরণার গর্জন ছাড়া কিচ্ছু ভালো লাগে না। বিরক্ত হয়ে উঠছি ওই দলটির দিকে তাকিয়ে। উপায় নেই, সহ্য করতেই হবে। প্রকৃতি তো আমার একার নয়। নামতে লাগলাম সিঁড়ি বেয়ে নীচে। একেবারে শেষ সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে পড়লাম একটা বড়ো পাথরের গায়ে। একটু নীচেই জল। ক্যামেরায় বন্দি করতে লাগলাম প্রকৃতিকে।

 ওই পাথর থেকে নেমে সামনের দিকে কিছুটা গেলেই ঝরণার জল নদীর মতো বয়ে চলেছে। খুব ইচ্ছা হচ্ছে পা ডুবিয়ে বসি কোনো এক পাথরের গায়ে। কিন্তু কিছুটা এগোতেই দেখলাম আর পথ নেই। একটু উপরে পাহাড়ের গায়ে খোদায় করা সিঁড়ির রেখা বেয়ে নেমে এলো একটি ছেলে আর মেয়ে। ওই পথেই যেতে হবে ওপারে ওই পাহাড়ি নদীর কাছে। ধীরে ধীরে পৌঁছেলাম নদীর কাছে। বড়ো বড়ো পাথরের ফাঁকে নদী বয়ে চলেছে। স্বচ্ছ জল। নীচের শ্যাওলাধরা পাথর গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হালকা ডোবালাম পা। পায়ের নখে লাগানো সবুজ নেলপালিশ স্পষ্ট দেখাচ্ছেঠান্ডা চিনচিনে জলটা। পা থেকে ঠান্ডা অনুভূতিটা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। অসম্ভব এক তৃপ্তি। দূর থেকে হেঁটে আসছে একটা আদিবাসী মেয়ে কাপড়ের বোঝা নিয়ে। দূরত্ব ক্রমশ কমছে। খুব কাছে এসে পড়েছে সে। কেমন যেন নিজেকে শহুরের উপন্যাসের নায়িকা মনে হচ্ছে। মেয়েটি তার কাপড়ের বোঝা জলে ভিজিয়ে সাবান ঘষছে। একে একে আছাড় মারছে পথরের গায়ে। ফেনা মেশানো কালো জল বয়ে যাচ্ছে। স্বছ পাহাড়ি নদীটি তার বুকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে সাবানের ফেনা। বেশ দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সাবানের ফেনা। তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন...

হালকা একটা ফিনফিনে হাওয়া বইছে। পাথরের উপর বসে শুনছি, জল আর পাথরের ভালোবাসার গল্প। জলের ছুঁয়ে যাওয়াতে সুখ আর পাথরের ছোঁয়া পাওয়াতে। অনন্তকাল ধরে এভাবেই তো ভালোবেসে আসছে একে অপরকে। সিঁড়ির উপর থেকে একটা ডাক শুনলাম। ফিরে তাকাতেই দেখলাম,হাত নেড়ে ডাকছে সেই ছেলেটি। কি যেন নাম বলেছিল, শুকরা লহরা। ডাকছে আমাদের খাবার প্রস্তুত করে। আসতে আসতে উঠে এলাম উপরে। একটা ছোট্ট ঘর, তার ভিতরে রাখা ছিল চেয়ার-টেবিল। সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। আমরা বসতেই সামনে সাজিয়ে দিল শালপাতার থালা তিনটি। দুটো আমাদের আর একটা নিরামিষ আমাদের অটোর ড্রাইভারের জন্য। হাতে তৈরি শালপাতার থালায় সাজানো, ঝরঝরে সাদা ভাত, পেঁয়াজ দিয়ে আলুমাখা, একটা শালপাতার ঠোঙায় ডাল আর আরেকটা ঠোঙায় ডিমের ঝোল।

আমাদের ছোটোবেলায় বিয়ে বাড়িতে দেখতাম শালপাতার চল ছিল। তখন এমন থার্মোকলের থালা বা চীনেমাটির প্লেটের তেমন চল ছিল না। শালপাতার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। খাবারের সাথে সেই গন্ধটা মিশে গেলে একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরি হয়। ছোটো থেকেই ঐ গন্ধটায় আমার ভীষণ ভয় ছিল। ঐ গন্ধে বিয়েবাড়ি ঢোকার আগেই দুপুরের খাবার বাইরে বেরিয়ে আসত। বেশ বড়ো পর্যন্ত এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ বছর পর সামনে অমন শালপাতার থালায় সাজানো খাবার দেখে প্রথমে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু একবার খাবার মুখে দিতেই আমার সব ভয় উড়নছুঁ। একটা অসাধারণ তৃপ্তি যেন ছড়িয়ে পড়ল মন জুড়ে। অসাধারণ স্বাদ সেই রান্নার! আজও ভুলতে পারিনি। খাওয়া শেষে পাতা তুলতে যেতেই চেপে ধরল হাত। কিছুতেই ফেলতে দিল না।

Simple Guaidence For You In Ranchi
স্থানীয় খাবার


 বললাম, কে রান্না করেছে শুকরা?

সে বলল, আমি আর আমার বউ, দুজনে মিলে।

বললাম, বউকে বলো, দারুণ রান্না হয়েছে।

কথাটা শুনেই সে বলে উঠল, ‘আজই চইলে যাবেন? থেইকে গেলে ছোঁ-নাচ দেখতে পেতেন। কাল এখানে সারা রাত ধরে ছোঁ-নাচ চইলবে। পুরুলিয়া থেইকে ছোঁ-নাচের শিল্পীরা আসবে। প্রতিবছর এই সময় এখানে ছোঁ-নাচ হয়’।

বললাম, না ভাই, থাকার উপায় নেই। কালই আমাদের ফেরার টিকিট কাটা।

দেখলাম একটা গাছতলায় বসে এক শিল্পী আপন মনে বসে বসে কাঠ কেটে জিনিস বানাচ্ছে। একটা বয়স্ক মহিলা পাকা কুলের পসরা সাজিয়ে বসেছে। ক’টা কুল কিনে মুখে দিয়েই মনটা ভালো হয়ে গেল। শুনেছিলাম, রাঁচির কুল নাকি দারুণ স্বাদের। সত্যিই প্রমাণিত হল সেকথা। এমন স্বাদের কুল সত্যিই আগে খাইনি। বেশি সময় এখানে ব্যয় করা যাবে না। এখনও বাকি হুড্রু জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া। জোনহা থেকে ফিরতি পথ ধরলাম। পথে সেই বাচ্ছাগুলো তখনও প্যাকেট ভর্তি কুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। কিনে নিলাম ওদের থেকে প্রায় তিন কেজি কুল। বাড়ি ফিরে আচার বানাব।

শুকরাকেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম ওদের কীভাবে দিন চলে। এখানে ঘুরতে আসা মানুষদের সবাই যে খাবার খায় এমনতো নয়! সব সারা বছর ধরে যারা এখানে ঘুরতে আসে সবাই তো আর দূর থেকে ঘুরতে আসে না। রাঁচির আসে পাশের মানুষজন ছুটির দিনে এসে হয়তো কিছুটা সময় কাটায়, তাদের তো আর ভাত খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। আর জায়গাটা বেশ রোমান্টিকও তাই কলেজ পালানো প্রেমিক যুগলদের ভিড় নেহাত মন্দ নয়। ফিরতি পথেই তো চোখে পড়েছে বেশ কয়েকজোড়া।

হেসে ছিল শুকরা। কত সাবলীল ভাবে বলেছিল, ‘ চলে যায় এভাবেই আমাদের। যখন ট্যুরিস্টদের সিজন চলে তখন আমি এদিকেই থাকি। এক ফসলের জমিতে মাঝে মাঝে কাজ হয়। ফাঁকে ফাঁকে কাঠ কেটে নিয়ে আসি বিক্রি করি। আমাদের মধ্যে অনেকে চলে গিয়েছে বড়ো শহরে, কোলকেতায়। মিস্ত্রির কাজ করে সেখানে। আবার অনেকে বক্সাইট খনিতেও শ্রমিকের কাজ করে। শুধু শুকরা নয়, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই এভাবেই বেঁচে থাকে টুকরো টুকরো পাওয়ার মাঝে একমুখ হাসি নিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই কথা বলে আসা শুকরার কথা ভাবতে ভাবতে এখানকার মানুষের জীবনের যাপনের কাল্পনিক এক রূপরেখা আঁকতে আঁকতে কখন যে হুড়্রুর কাছে চলে এসেছি খেয়ালই করিনি। তবে যাত্রাপথে মাঝে মাঝেই বাইরে চোখ পড়তেই একটা জিনিস ভীষণ ভাবে নজরে আসছিল, কয়েক কিলোমিটার অন্তর অন্তরই স্কুল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পড়ুয়া। কোনো এক অজানা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্ন কী ওদের বুকে ঘর বেঁধেছে! কি জানি! জানি না তো!

ক্রমশ...।।

Thursday, 28 October 2021

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান Simple Guaidence For You In Betla Forest

 ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

 রাঁচি

রুমকি রায় দত্ত

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান

  Simple Guaidence For You In Betla Forest

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান  Simple Guaidence For You In Betla Forest
elephant safari


হঠাৎ দেখলাম, সব অন্ধকার! কারেন্ট চলে গিয়েছে। মোমবাতির প্রয়োজনীয়তা এবার বুঝতে পারলাম। অন্ধকারে কিছুক্ষণ ভূতের মতো বসে থেকে মোমবাতি জ্বালালাম। ঘড়িতে সাতটা বাজে। দরজায় খটখট আওয়াজ। খুলতেই ভিতরে ঢুকল একটি ছেলে, হাতে ধরা রাতের খাবার। চক্ষু তখন চড়কগাছ। এই সন্ধেবেলা ডিনার! বলতেই ছেলেটি হেসে বলল, ‘ রাতমে অউর কুছ নেহি মিলে গা’। আমি বললাম কফি? সে মাথা নাড়ল। ‘হাম সব ঘর চল যায়েঙ্গে। হামলোগ সাত বাজেই খানা দে দেতে হ্য’।

আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কারেন্ট কখন আসবে?’

সে বলল, ‘দশ বাজে। ইঁহা ছে বাজে কারেন্ট যাতে হ্যয় অউর দশ বাজে আতে হ্যয় রোজ’।

একটা বড়ো করে ঢোঁক গিলে বললাম, ‘আর টিভি? সেটা চলল না কেন?’

ছেলেটি হা হা করে হেসে বলল, ‘সব বান্দরকা কামাল হ্যয় ম্যাডামজি’।

বান্দরকা কামাল!!

বান্দরকা কামাল! কিছুই বুঝলাম না, তখনও রহস্য অনেক বাকি। কিন্তু সমস্যা হল এই নির্জনে মোমের আলোয় সেই রাত দশটা পর্যন্ত সময় কাটবে কী করে? একটু আগেই দিয়ে যাওয়া খাবারের পাত্রের ঢাকা খুলে দেখলাম, দলা পাকানো ফ্রাইড রাইস। এ খাবার যে ঠান্ডা হলে আর খাওয়া যাবে না,তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঘড়িতে সন্ধে সাতটা তখন। আইপ্যাডে একটা সিনামা লোড করা ছিল। অন্ধকারে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, সাথে সিনামা আর বাইরে জঙ্গল। আহা! এমন মেলবন্ধন কি সহজে হয়?

 সাড়ে আটটা বাজতে না বাজতেই মনে হল কিছু খেলে হত, একটু চা বা কফি! কোনো চান্স নেই। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। লম্বা করিডোর পুরো ফাঁকা। সুন্দর সাজানো ঝকঝকে পরিবেশে বাঁধানো রাস্তায় সোলারে আলো জ্বলছে। বাইরে বেশ ঠান্ডা। চাদর গায়ে একটু বেরিয়ে এলাম। একটু এগোতেই বাঁ-দিকে একটা দরজাহীন ঘরে দেখলাম জনা তিনেক লোক গভীর ঘুমে আচ্ছান্ন। আকাশে মায়াবী চাঁদ, দূরে কালো জঙ্গলের অবয়ব গায়ে কুয়াশা মেখে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হিমভেজা গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসের গায়ে। এই নিঃশব্দতার মধ্যে হঠাৎ মনে হল,জঙ্গল থেকে যদি কোনো বাঘ ঢুকে পড়ে এখনই! বাঘ আছে কি এই জঙ্গলে? নিজের হাঁটার শব্দ বারবার ফিরে আসতে লাগল নিজের কানে। এসবের মাঝে কখন যে দশটা বেজে গিয়েছে মাথায় ছিল না। হঠাৎ ঘরের লাইটটা জ্বলে উঠতেই বদলে গেল পরিবেশটা। না, বেশ ক্লান্ত তখন আমরা। সারাদিনের ক্লান্তি চোখের পাতা জুড়ে,তাছাড়া খুব ভোরে উঠতেও হবে। সকালে এলিফ্যান্ট সাফারি আছে। এখানে দুটি হাতি আছে। একটার নাম আনারকলি, আরেরকটার নাম জুঁহি। দুটো হাতিই সকালে দু’বার সাফারি করায়, তাই আগের দিন বিকেলেই বুকিং করে রাখতে হয় হাতি। একটা হাতিতে চারজন বসার জায়গা। আমাদের সাফারি টাইম সকাল সাড়ে ছ’টা।

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান  Simple Guaidence For You In Betla Forest
জংগলে জলাশয় betla forest



ঘুম ভেঙে বাইরে এসে দেখলাম, চারিদিকে ঘন কুয়াশা। কুয়াশা হালকা না হলে সাফারি শুরু হবে না, তবু সময়েই পৌঁছে গেলাম স্পটে। জঙ্গলের এলাকার মধ্যেই একটা উঁচু কাঠের বাড়ির মতো করা। সেখানে টিকিট দেওয়া হল আমাদের। হাতি এসে দাঁড়াল ঠিক সাতটা। হাতির পিঠের সমান উচ্চতায় তখন দাঁড়িয়ে আছি আমরা।একটা ছোট্ট গেট খুলে কাঠের বাড়ির বারান্দা থেকে উঠে বসলাম হাতির পিঠে আমরা তিনজন, তিনজন বলাও ভুল। আমরা আড়াই জন। অনুরাগ তখন তিন। হাতির কানের পিছনে বসে আছে মাহুত। সামনের গেট খুলে যেতেই নড়ে উঠলাম আমরা। হাতি চলছে আর তার চলনের সাথে তালে তালে দুলতে দুলতে চলেছি আমরা। ঘন কুয়াশা ক্রমশ গায়ে লেগে দূরে সরে সরে যাচ্ছে। বড়ো বড়ো গাছের মাঝ দিয়ে আঁকা আছে পথে রেখা, সেই পথে চলেছি আমরা।

 গতদিন শেষ দুপুরে যেখানে হরিণ ছিল, সেখানে শুরু হয়েছে একটা দুটো হরিণের আনাগোনা। একটা ছোট্ট জলার পাশে দাঁড়ানো গাছের গায়ে প্রভাত কিরণে ফুটে উঠছে আলোর নকসাঁ। জলে চকচকে রোদ্দুর একফালি। ধীরে ধীরে যেন ঘুম ভাঙছে প্রকৃতির। পথের পাশে বাঁশঝাড় দেখে হাতি আনারকলি বেঁকে গেল সেই দিকে। মাহুতের শাসনে আবার সোজা চলতে শুরু করল। কিছুটা এগোতেই ডানদিকে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল হাতি। গভীর জঙ্গল! এলোমেলো দাঁড়িয়ে থাকা বড়ো বড়ো গাছের ডালপালা দু’হাতে ঠেলে খুব সাবধানে আমরা বসে রইলাম হাতির পিঠে। 

একেই হাতির দুলকি চালে পিঠে সুষ্ঠভাবে বসে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, তাতে আবার জঙ্গলের এবড়োখেবড়ো পথ,পুরো বোতলে রাখা জলের মতো নাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের। ছোট্ট বাচ্ছা নিয়ে নিজেকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। গভীর জঙ্গলে কোথাও মস্ত বেলগাছে তার ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরও গভীরের দিকে চলেছি আমরা। একটা অদ্ভুত এ্যডভেঞ্চার বোধ কাজ করছে মনের ভিতরে। হঠাৎ দেখলাম মাহুত ঝুপ করে নেমে পড়ল হাতির পিঠ থেকে। চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে আরে... করছেন কী? তিনি মুখে অদ্ভুত একটা শব্দ করে নীচ থেকেই হাতিকে পরিচালনা করতে লাগলেন, আর আমাদের বললেন, ‘আগর জংলি হাতি দিখায়ি দিয়া তো মুঝে বাতানা’। শুনেই বুক কেঁপে উঠল। মানে এখানে জংলি হাতিও আছে নাকি? 

মাহুত জানাল সেখানে মাঝে মাঝেই জংলি হাতি চলে আসে, আর ওরা পোষা হাতি দেখলে বিপদ হতে পারে। যাই হোক দুরুদুরু বুকে তখন সামনে এগোতেই ভয় লাগছে, অথচ পিছোনোর পথ নেই। মালভূমির পথ এমনিতেই উঁচুনিচু সেই পথে হাতির পিঠে যে কত ভয়ানক পরিস্থিতি হতে পারে তা তখনও আমাদের জানা ছিল না। গভীর জঙ্গলে অসংখ্য কাঁটা ঝোপের ভিতর দিয়ে চলেছি। হঠাৎ হাতি দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনের পথ প্রায় ফুট তিনেক নিচে। মাহুত বলল, ‘পিছে খিঁচকে ব্যইঠিয়ে, সিট কো আচ্ছেসে পকড়কে’। হাতি একটা পা নীচে দিতেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লাম আমরা। দু’হাতে সামনের ধরার জায়গাটাতে ভর দিয়ে দেহের ভার সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলাম, নিজের সাথে বাচ্চার ভার সামলানো যে কত কঠিন! ঠিক সেই মুহূর্তে একবার সত্যিই মনে হল বড্ড বেশি সাহস দেখিয়ে ফেলেছি আমরা। নিজেদের সামলানোর আগেই হাতি হুড়মুড় করে প্রচন্ড দুলুনি দিয়ে নেমে পড়ল নীচে। সামনে অজানা পথ, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যদি পড়ে যাই নিশ্চিত মৃত্যু। বেশ কিছুটা এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম এক নির্জন জলাশয়ের সামনে। সত্যি বলতে বাঁধা নেই, ঠিক সেই মুহূর্তে অপরূপ প্রকৃতির মাঝেও অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করে চলেছে। পাশের পাহাড়ের মতো উঁচু একটা জায়গা দেখিয়ে মাহুত বলল, ঐ গুহাতে আগে বাঘ বাস করত। জানতে চাইলাম, ‘এখন বাঘ থাকে না?’ উত্তর এল,

--আভি বো ইধার নেহি রহেতা

---আপনি কখনও বাঘ দেখেছন?

--হাঁ, ইসি জাগাপে। বহুতবার দেখা। শের ইঁহা পানি পিনে আতা থা।

-- জলাশয়ের উলটো দিকে একটা ছোট্ট পাঁচ বাই পাঁচ ফুটের ঘরের মতো জায়গা দেখিয়ে বলল, শিকারি লোগ পহলে উঁহা পর ছুপা রহেতে থে। শের ইঁহা পর পানি পিনে আতে থে।

হাতিটা ততক্ষণে জলাশয়ে শুঁড় ডুবিয়ে জল খেতে শুর করেছে। খেলছে জল নিয়ে। আমার মনে কেমন যেন একটা অজানা ভয় কাজ করছে তখন। আগে বাঘ থাকত, কিন্তু যদি হঠাৎ করে এই মুহূর্তে সত্যিই বাঘ চলে আসে! যেমন মাঝে মাঝেই শোনা যায় লোকালয়ে কোথা থেকে বাঘ এসে হাজির। এটা তো তার নিজের আস্তানা। ভয়ে ভয়ে মাহুত কে জিজ্ঞাসা করলাম, যদি হঠাৎ বাঘ চলে আসে?

সে বলল, হাতি সে বাঘ ডরতে হ্যয়। হাতি কে পিঠ মে বাঘ কুছ নেহি কর পায়ে গা।

তবু কি ভয় যায়! সঙ্গে বাচ্চা আছে যে, মাথায় আবোলতাবোল ভাবনা আসতে লাগল। হাতি জল খেয়ে ছোট্ট জলাটা পেরিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। আবার সেই উঁচুনিচু পথ! এক ঘন্টারও অধিক সময় আমরা এভাবে চলছি। এক অন্য সবুজ পথে এবার ফিরতে লাগলাম। ঘড়িতে তখন প্রায় ন’টা বাজতে চলেছে। দ্বিতীয় হাতিটিও ততক্ষণে একদল সাওয়ারী নিয়ে ফিরছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার দুজনে নতুন যাত্রী নিয়ে জঙ্গলে যাবে। এক প্যাকেট বিস্কুট হাতির নরম মুখে ঢুকিয়ে দিতেই সে শুঁড় মাথায় তুলল। আসলে পশুরা মানুষ নামক পশুর থেকে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হয়, সেটা আবার প্রমাণ হল।

বেতলার জংগলে রোমাঞ্চকর অভিযান  Simple Guaidence For You In Betla Forest
অলস যাপন


সারাটা দিন আজ শুধু নির্জনবাস। এখানে দেখার মূল আকর্ষণ এই জঙ্গলই। এছাড়া আছে একটা জীর্ণ দুর্গের অবশিষ্ঠ অংশ। না আজ আর কোথাও যাব না, পায়ে হেঁটে ঘুরব এই জায়গাটা। সাফারি সেরে সামনেই লজের ক্যান্টিনে চা পান করলাম। আজ যেন প্রকৃতই একটা অবসর যাপন। স্নানের তাড়া নেই, কাজের তাড়া নেই, নেই কোথাও যাওয়ার তাড়া। ক্যান্টিনের সামনে বসেই রইলাম, দেখলাম ক্রমশ ট্যুরিস্টরা আসছে। ভিড় বারছে।

 আসে পাশে বাঁদরের দল যেন মিছিল করছে। ভিড় ভালো লাগছিল না, ফিরে গেলাম ঘরে, খোলা ব্যলকনিতে চেয়ার নিয়ে বসার উপায় নেই, বাঁদর ঝুলছে রেলিং ধরে, জানালা খুলতেই একটা এসে টুকি দিয়ে গেল ঘরের ভিতরে। দাঁত খিঁচিয়ে মুখ ভেঙাল না, ভালোবাসল বুঝতেই পারলাম না। স্নান সেরে বারোটার দিকে শীতের মিঠে রোদ পিঠে মেখে বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের ক্যাম্পাস ছেড়ে রাস্তায়। একটু এগোতেই একটা ছোট্ট ঘুনটি। পান, সিগারেটের দোকান। 

পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ধরে কিছুটা এগোতেই বিকট গন্ধ নাকে এল। দেখলাম, একটা বাড়িতে রোদে শুকাচ্ছে পাঁপড়ের মতো কিছুজানতে চাইলাম কি ওটা, নামটা বলল, কিন্তু আমার মগজ থেকে নিমেষে উড়ে পালাল সেটা। আমার মগজটা এমনই একটু, যেটা মনে ধরে না, সেটাকে কিছুতেই স্থান দেয় না। এখন স্মার্ট ফোনের দৌলতে এমন অনেক মনে রাখতে না পারা কথা রেকর্ড করে রাখি তাই। বেরোনোর সময় শুনেছিলাম মিনিট পাঁচেকের পথ মেইন রাস্তা ধরে এগোলেই আছে একটা জঙ্গলের প্রাণীদের সংগ্রহশালা। চললাম, সেই পথে। একটা ছোট্ট সংগ্রহশালা। ফিরতে ফিরতে দুপুর একটা।

 ক্যান্টিনেই খাওয়া সেরে রোদে নির্জীবের মতো ঝিমানো, বেশ আরামের কিন্তু। ধীরে ধীরে কমছে ট্যুরিস্টদের ভিড় শীতের নরম রোদের বিকেলে এক ভাঁড় গরম চা খেয়ে উঠে পড়লাম আমরা, বিকেলে আবার যাব জঙ্গলে জিপ সাফারি। যে দাদা আমাদের নেটারহাট থেকে বেতলা এনেছিলেন তিনিই নিয়ে যাবেন। পৌনে চারটের দিকে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের পথে। জঙ্গলের ভিতরে আঁকা পথরেখা দেখে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি। সন্ধের এই সময়ে সাধারণত অনেক জীব-জন্তু দেখা যায়। ড্রাইভার দা জানালেন, কপালে থাকলে তবেই দেখা মেলে তাদের। জঙ্গলের মাঝে কোথাও ফাঁকা মাঠ, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ জলাশয়। 

ঝোপঝাড়ের দিকে চোখ পড়লেই মনে হচ্ছিল এই বুঝি দুটো জ্বলজ্বলে চোখ দেখতে পাব ঝোপের আড়াল থেকেনা, কোনো চোখ দেখা আমাদের ভাগ্যে ছিল না,তবে দেখলাম ময়ূর। চলতে চলতে দেখতে পেলাম গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে কেমন ঝুপ ঝুপ করে নেমে আসছে সন্ধে রং। ঠিক সন্ধের মুখে ফিরে এলাম বনবাংলোয়। সোলার গুলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে, আবার গিয়ে বসলাম ক্যান্টিনের সামনে। হাতগুলো বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠছে। আকাশে গাছের ফাঁক দিয়ে উজ্জ্বল চাঁদের আলো উঁকি মারছে কি মায়াবী সেই চাঁদের আলো। গরম চায়ে চুমুক দিয়েছি সবে আবার চলে গেল ক্যারেন্টবিকল্প উপায়ে ক্যারেন্টের ব্যবস্থা যদিও ছিল,কিন্তু সব সোলার প্যানেল গুলো খারাপ হয়ে পড়ে আছে। আগের থেকেই আরও কিছু মোমবাতির জোগাড় করেই রেখেছিলাম। দশটা পর্যন্ত চলে যাবে। একটা মন খারাপের অন্ধকার রাত। সকাল হলেই চলে যাব এই নির্জনতার কোল থেকে...রাঁচির পথে। আবার নতুন একটা পথ। 

ক্রমশ......


Wednesday, 13 October 2021

 

পটল গোবিন্দঃ

উপকরণ
উপকরণঃ

পটল ৭টা (প্রয়োজন মতো) / আলু দুটো / আদা / টমেটো/ ১-কাপ গোবিন্দভোগ চাল/ ঘি দু-চামচ / চিনি এক চামচ (বড়ো) / গোটা গরম মশলা/ এক কাপ দুধ / লবণ / হলুদ/ গোটা শুকনো লংকা (ফোড়নের জন্য)/ কাঁচা লংকা (ঝাল প্রিয়তা অনুসারে)/ ধনে গুঁড়ো/জিরে গুঁড়ো। ( আমিষ রান্না করলে ২টি পেঁয়াজ ও ৬ কোয়া রসুন))

প্রণালীঃ

পটল গোবিন্দ
পর্ব ১ঃ কড়াতে এক চামচ ঘি ও সামান্য তেলের মিশ্রণে গোটা গরম মশলা, তেজপাতা,শুকনো লংকা ফোড়ন দিয়ে ঐ তেলে জলে ভালো করে ধুয়ে রাখা জল ঝরানো, গোবিন্দভোগ চাল ভেজে নিতে হবে।

পর্ব ২ঃ পটল চাকা চাকা করে চোটো আকারে কাটা, আলু ডুমো করে ছোটো আকারে কেটে দুটো উপকরণকেই আলাদা ভাবে লালচে করে ভেজে নিতে হবে।

পর্ব ৩ঃ এবার অবশিষ্ট তেলে ( কুড়ানো পেঁয়াজ ও রসুন কষাতে হবে আমিষ রান্নার ক্ষেত্রে।) টমেটো কুচি দিয়ে কিছুটা কষানো হলে সমস্ত মশলা উপকরণ দিয়ে ভালো করে মশলা কষিয়ে তেল ছেড়ে এলে, ঐ মশলায় ভেজে রাখা চাল ও আলু,পটল দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করতে হবে।

পর্ব ৪ঃ মিশ্রণে জল মাপ মতো দিতে হবে ( চাল ঃ জঃ/ ১ঃ ২) হিসাবে দিতে হবে, তবে এক্ষেত্রে এককাপ জল ও এককাপ দুধ দিতে হবে,তাই আরও হাফ কাপ জল মিশিয়ে, মিশ্রণে স্বাদমতো লবণ ও চিনি মিশিয়ে, ঢাকা দিয়ে অল্প আঁচে রান্না করতে হবে। নামানোর ঠিক আগে সামান্য গরম মশলা ও ঘি ছড়িয়ে দিলেই তৈরি মজাদার পটল গোবিন্দ।

Monday, 27 September 2021

নেতারহাট থেকে বেতলার পথে Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.


ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

রাঁচি

রুমকি রায় দত্ত

নেতারহাট থেকে বেতলার পথেঃ

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.


গ্রামটির নাম মহুয়া। একটা রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে, আরেকটা রাস্তা বাঁ-দিকে গ্রামের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। যদিও বেতলা যেতে হলে আমাদের ঐ সোজা রাস্তা ধরেই এগোতে হবে, কিন্তু লোধ দেখতে হলে আমাদের ঐ গ্রামের মধ্যের রাস্তাটা ধরতে হবে। গ্রামে ঢোকার আগেই রাস্তার মুখে একটা ছোট্ট হোটেলে ড্রাইভারদা দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে এগিয়ে চললেন গ্রামের রাস্তা ধরে। 

মহুয়া গ্রাম থেকে বাইশ কিমি পথ যেতে হবে আমাদের। গ্রামের জনবহুল রাস্তা ছেড়ে আমরা নির্জন পথে নেমে এলাম। সরু পিছের রাস্তা দু’পাশে ধু ধু মাঠ, রোদে পোড়া হলদে ঘাস। রাস্তা ঢেউয়ের মতো আঁকা বাঁকাগাড়ি চলতে চলতে কখনও ঊর্ধমুখী আবার কখনও নিম্নমুখী। যেন ঢেউ এর ছন্দে পথচলা। 

নির্জন একটা গ্রামের মধ্যদিয়ে গাড়ি এসে পৌঁছাল একটা খোলা মাঠের সামনে। এরপর আর কোনো রাস্তা নেই। ওই মাঠ পেরোলে আবার একটা নতুন রাস্তা শুরু হবে। মাঠ পেরিয়ে যে রাস্তায় এসে পড়লাম,তার রূপ একেবারে অন্যরকম। সরু কালো রাস্তার দু’ধারে মানুষ সমান ঘন ঘাসের জঙ্গল। সে জঙ্গলের রং কোথাও সবুজ আবার কোথাও রোদে পুড়ে হলুদ। মাঝে মাঝে একটা দুটো বড় গাছ ন্যাড়া, পাতা নেই। আসলে মরশুমটাই তো পাতা ঝরার। কোথাও কোথাও দু-একটি দেহাতি মানুষ কাঠ সংগ্রহে ব্যস্ত। কিছুদূর যেতেই দূরে একটি পাহাড়ের দিকে হাত তুলে ড্রাইভারদা দেখালেন, ‘ঐ যে পাহাড়টা দেখছেন, আমরা ওখানেই যাব। ঐ পাহাড়েই রয়েছে লোধপ্রপাত।বর্ষার সময় হলে এই এখান থেকেই শুনতে পেতেন গর্জন’।

 গাছগাছালি ঘেরা হালকা জঙ্গলের পথ দিয়ে চলতে চলতে নজরে এল কোথাও জলের ধারা নালা থেকে নেমে পথের এপাশ থেকে ওপাশে বয়ে যাচ্ছে কুলু কুলু ছন্দে। এই জলধারা ঐ প্রপাত থেকে জঙ্গলের বিভিন্ন পথ ঘুরে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা জঙ্গলঘেরা পোড়ো জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল আমাদের গাড়ি। অসম্ভব রকমের নির্জন এই জায়গাটা। ঝরনার জলের গমগমে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। ড্রাইভারদা’র সাথে আরেকটি ছেলেও আমাদের এই পথের সঙ্গী ছিল। সে বলল, ‘সামনে সরু ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে হবে, আসুন আপনারা’। 

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.
লোধ প্রপাত ( lodth)


দেখলাম একটা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক-দেড় ফুট চওড়া ভাঙা হাতে তৈরি সিঁড়ি নীচে নেমে গিয়েছে। চারপাশের ঝোঁপ এমনভাবে রয়েছে যে, সে সিঁড়ি প্রায় দেখাই যায় না। অনেক কষ্টে দেওয়াল ঘেঁষে ঝোঁপ সরিয়ে কিছুটা নীচে নেমে দেখলাম, এরপর বেশ কয়েকধাপ সিঁড়ি উপরে উঠে গিয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আবার নীচে নামতে নামতে প্রায় দুশোটা সিঁড়ি পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম সেই অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের সামনে, যার সামনে এক কথায় মাথা নত করা যায়। প্রায় ৪৪৫ ফুট উচ্চতা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বুঢ়ানদী। ঝারখন্ড আর ছত্তিশগড়ের সীমানায় এ নদীর উৎস। কি অপূর্ব এই রূপ! এ কেবল চোখেই ধারণ করা যায়।  চারপাশের পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঝরণার জল পাহাড়ের পাদদেশে সৃষ্টি করেছে ঘন সবুজ জলাশয়ের। মাঝে মাঝে মাথা তুলে আছে পাথর। টলটলে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে মন চাই। বসলাম একটা উঁচু পাথরে। নিমেষের মধ্যে চোখমুখ ভরে উঠল বিন্দু বিন্দু জলকণায়। এক অদ্ভুত তৃপ্তি সারা মন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ফিরতে মন চায় না তবু ফিরতে তো হবেই। এখনও কত বিস্ময় যে বাকি আছে।

 আবার একই পথে ফিরে এলাম ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আবার এসে দাঁড়ালাম সেই মহুয়া গ্রামের হোটেলটির সামনে। খাবার কথা আগেই বলা ছিল। সামান্য নিরামিষ ভাত খেয়ে আবার শুরু হল পথচলা। এপথের শেষ হবে বেতলায়। বেশ ঘন্টাখানেকের পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম একটা ছোট্ট গ্রাম বরেসাঁড়। এখানে ভালো ক্ষীরের পেঁড়া পাওয়া যায়। জঙ্গলে মিষ্টিমুখ ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ভালো। সঙ্গে নিলাম পেঁড়া। গ্রাম ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা পথে এগিয়ে এসেছি বেতলার পথে,হঠাৎ দূর থেকে দেখতে পেলাম, একটা জঙ্গলের সীমানা। গাড়ি আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ল ‘মারোমার’ জঙ্গলের পথে।

 নির্জন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে শুয়ে আছে কালো পিচের রাস্তা, ঝকঝকে পরিষ্কার। একটা অদ্ভুত জীবন্ত অনুভূতি! চারিদিকে অজস্র প্রাণের স্পন্দন জেগে আছে,কিন্তু শুধু অনুভবে। সব প্রাণ জেগে আছে অন্তরালে, সবুজ গাছের পাতায় পাতায়,ডালে ডালে। অজানা আচেনা শব্দের গায়ে, লুকিয়ে থাকা বন্য জন্তুর উপস্থিতির অনুভবে। রাস্তায় পড়ে আছে টাটকা হাতির বিষ্ঠা। পথের দু’পাশে বাঁশের ঝারে যেন ঘূর্ণিমাতন বয়ে গিয়েছেহয়তো মিনিট কয়েক আগেই এপথে জংলি হাতির দল গিয়েছে, আর যাবার আগে রেখে গিয়েছে তাদের দামালপনার চিহ্ন। বাঁশ হাতির প্রিয় খাদ্য। চোখ,কান, মস্তিষ্ক যেন সজাগ হয়ে আছে,যদি কারোর দেখা মেলে! একটা অদ্ভুত শিহরণ বুকে নিয়ে ছুটে চলেছি আমরা মারোমার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। রাস্তার বাঁ-দিকে পড়ে আছে একটা পোড়া জিপের কাঠামো। 

সালটা ঠিক মনে পড়ছে না, তবে সম্ভবত ১৯৯৯ হবে, মাওবাদীদের আক্রমণে পুড়ে গিয়েছিল এই জিপগাড়িটি ও মারোমার বনবাংলো। বেশ দীর্ঘপথ পেরিয়ে তখন ঘড়িতে সাড়ে তিনটে প্রায়, এসে পৌঁছালাম বেতলায়। নেতারহাট থেকেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাছবাড়িটি আমাদের বুকিং করা হয়েছিল। গাড়ি একটা বড় গেটে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। সামনে তাকিয়ে দেখলাম একটা উঁচু টিলার উপর রয়েছে বনদপ্তরের লজ। বাইরে থেকে দেখতে বেশ সাজানো গোছানো। ছোট্ট কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলাম। লজের এরিয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। উপরে উঠেই বাঁদিকে একটা পায়ে হাঁটা রাস্তা চলে গিয়েছে। একটি ছেলে এসে আমাদের জিনিস নিয়ে ঐ পথে হাঁটছে দেখে আমরাও পিছন পিছন গেলাম। একটা বড় গাছ, তার মাঝ থেকে পিলারের উপর রয়েছে একটা বাড়ি। একটা কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপরে। ছেলেটি ঐ সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে ঘরের তালা খুলল। সিঁড়িটি ভাঙা, ঘরটির বারান্দায় অসম্ভব নোংরা ছড়ানো। বাঁদরের পায়খানা। সিঁড়িতে, ছাদে, বারান্দার রেলিং এ এদিক ওদিকে দিয়ে ঝুলে আছে বাঁদর। কোনো রকমে ভয়ে ভয়ে প্রবেশ করলাম ঘরে ভিতর। ভীষণ অন্ধকার। ভিতরে দুটি রুম। পুরো কাঠের তৈরি, কিন্তু বারান্দায়, দরজায় সূক্ষ্ণ তারের নেট লাগানো। কেমন যেন একটা গা ছমছমে পরিবেশ। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই মনে হল, হাঁপিয়ে যাচ্ছি। ছেলেটি জানাল এটাই আমাদের বুকিং ছিল। বাথরুমে গরমজল পাওয়া যাবে না। জানালা লাগিয়ে না রাখলে মশা ঢুকবে। ঘরটার শূন্যতা দেখে বুকের ভিতরে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা বোধ হতে লাগল। দুটোদিন এই ঘরে কাটাব কেমন করে! ঠিক করলাম,এই ঘরে থাকব না আমরা। ছেলেটিকে জানাতেই সে বলল, ‘তবে চলুন অফিসে, কেয়ারটেকারকে বললে তিনি অন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দেবেন। দরজায় তালা দিয়ে ছেলেটি নেমে চলে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে গিয়ে হঠাৎ বাঁ-দিকের জঙ্গলের দিকে চোখ আটকে গেল। বিস্ময়ের বিস্ময়! পঞ্চাশ-ষাট ফুট দুরেই একপাল চিতলহরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে আপন মনে। ঘাস খাচ্ছে। এভাবে গরুর পাল, ছাগলের পালকে দেখেছি অনেক কিন্তু চিতলহরিণের এমন সমাবেশ এত প্রাকৃতিক ভাবে এই প্রথম। বিস্ময়ে চোখ ফেরাতে পারলাম না। তাকিয়ে রইলাম ওদের দিকে। মুগ্ধটা এতটাই ছিল যে, ফটো তুলতেই ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে পড়তেই দ্রুত ক্যামেরায় তাক করলাম।

Simple Guidance For You In Netarhat, Ranchi ,betla Tour.
betla forest (বেতলা জঙ্গল)


ঢোকার মুখে লজের যে দিকটা দেখেছিলাম, সেখানেই লজের কেয়ারটেকার একটা ভালো রুমের ব্যবস্থা করে দিলেন। ডাল্টনগঞ্জের অফিসে ফোন করে রুমটা তিনিই বুক করে দিলেন। ঘরে ঢুকেই মন ভরে গেল। বেশ বড় ঘরটা। মাঝ বরাবর একটা স্ট্যান্ড দেওয়া খাট। পাশের দুটো সোফা,মাঝে কাচ লাগানো বেতের টেবিল। খাটের উলটো দিকের দেওয়ালে টাঙানো একটা ৩২ ইঞ্চির টিভি। একটা কাঠের আলমারি। ভিতরের দিকে দরজা দেখে সেটা খুললাম। দরজার ওপাশে জঙ্গলের দিকে একটা খোলা বারান্দা। দারুণ ব্যপার। মন আনন্দের নেচে উঠল। জিনিসপত্র ভিতরে রেখে দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। তখনও সন্ধ্যা নামেনি। লজের সামনের দিকেই আছে খাবার,রান্নার জায়গা। সামনে বাঁধানো চাতালে চেয়ার পাতা। আমরা হাঁটতে হাঁটতে লজের পিছনের দিক দিয়ে জঙ্গলের এড়িয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছি নিজের অজান্তেই। অনতিদূরে বড় শিংওয়ালা একপাল হরিণ দেখে সেই দিকেই হাঁটছি, হঠাৎ পিছন থেকে ডাক এল, ‘উধার যানা মানা হ্যয়’। ভয়ে আর এগোলাম না

টিলার নিচ দিয়ে ঘুরে এসে বসলাম লজের রান্নাঘরের সামনের চেয়ারে। এবার একটু একটু করে যেন নেমে আসছে সন্ধে। ঠান্ডাটাও বেশ জোরাল হচ্ছে। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিয়ে কিছুক্ষণ গল্প চলল আমাদের। ঠিক সন্ধের মুখে রুমে ফেরার ঠিক আগেই কেয়ারটেকার এসে হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা ছয় ইঞ্চির মোমবাতি। কারণ জানতে চাইলাম। বললে, ‘রাখ লিজিয়ে, কাম আয়েগা’। রুমে ফিরে ব্যলকনির দরজা খুলতেই চমকে উঠলাম! আর কত বিস্ময় লুকানো আছে এই বেতলার জঙ্গলে? ব্যলকনির খোলা রেলিং থেকে হাত দশেক দূরেই ঘুরে বেরাচ্ছা চিতলহরিণের দল। এতকাছে! জীবনে কখনও আর এমন কি দেখাতে পাবো? বন্য হরিণ প্রাকৃতিক ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের এত কাছে! সামান্য নিঃশ্বাসটাও যেন জোরে নিতে পারছি না তখন। একটু আওয়াজেই সরে যাচ্ছে ওরা দূরে। ছোটো ছোটো ঘাসে মুখ ডুবিয়ে খেয়ে চলেছে একমনে। ক্রমশ অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। মিশে যাচ্ছে হরিণের দল অন্ধকারের সাথে। ব্যলকনি বন্ধ করে ভিতরে এলাম। গোটা ঘর জুড়ে ঝকঝকে আলো। রাতের খাবারে ফ্রাইডরাইস আর চিলিচিকেন বলা আছে। ঐ একটাই মেনু আজ সবার জন্য। বলেছে সন্ধের দিকেই খাবার দিয়ে যাবে। ঘড়িতে ছটা বাজে। টিভিটা খুলতে গেলাম, কিন্তু কিছুতেই চলল না। হঠাৎ দেখলাম, সব অন্ধকার! 

তারপর কী হল...? থাকবে পরের পর্বে

Sunday, 19 September 2021

নেতারহাটের নির্জনতা The Ultimate Guide to Netarhat

 

                                    ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

                                               রাঁচি

                                          রুমকি রায় দত্ত

Thtনেতারহাটের নির্জনতা ঃ (দ্বিতীয় পর্ব)The Ultimate Guide to Netar


The Ultimate Guide to Netarhat


ঘুমের মাঝে বিশ্রামরত মস্তিষ্ক কিযেন একটা সংকেত পাচ্ছে! আস্তে আস্তে স্পষ্ট হলো সে সংকেত। উঠতে হবে।

 সূর্য ওঠার সময় হয়ে এসেছে। ভোর হওয়ার আগেই দোর খুলতে হবে,তা না হলে সূয্যিমামার হামাদেওয়া দেখব কি করে। ভোরের আলো ফোটার আগেই গিয়ে দাঁড়ালাম লাগোয়া ব্যালকনিতে। নিশি শেষে কুয়াশা মাখা শাল-পিপুলের জঙ্গল ফিসফিস করে কত কথা যেন বলে চলেছে। পূবের আকাশটায় কি রং লাগছে!—ক্যামেরা নিয়ে ছুটলাম ছাদে।---উন্মুক্ত তমসাচ্ছন্ন আকাশ পানে চাতকের পিপাসা নিয়ে, সূর্যমামার হামা দেওয়ার সেই দুর্ল দৃশ্যসন্ধিক্ষণ শুধু আমার মস্তিষ্কের দৃশ্যপটে নয়,উন্নত প্রযুক্তির সুমিষ্ট ফল ব্যাটারী চালিত ফটোবাক্স নামক বস্তুটিতেও তাকে বন্দি করার অভিপ্রায়ে। ধীরে ধীরে ঘন অন্ধকারে ফিকে গোলাপি রঙের আবির ছড়ালো। তারপর উজ্বল হলুদ,ফিকে বেগুনি,উজ্বল কমলা---রঙে রঙে দিগন্তরেখা রঙীন হয়ে উঠল। শুরু হল ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক—যেন কোনো লাস্যময়ী নারীর শরীরের সুন্দর ভঙ্গিমা হারিয়ে যাওয়ার আগে সংগ্রহ করার পাগলামি। রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেদ করে কানে এসে পৌঁছাতে লাগলো পাখির কূজন

The Ultimate Guide to Netarhat
সূর্যোদয়ের মুহূর্ত



নেতারহাটে আলাদা করে বিশেষ কিছু দেখার নেই। আপার ঘাগরি আর লোয়ার ঘাগরি বলে দুটো ছোটো জলের ধারা আছে,আর একটা বড় প্রাকৃতিক ঝিল। এখানকার প্রকৃতিই আসলে দর্শনীয়। কি আছে প্রকৃতিতে সেটা নেতারহাট না এলে সঠিকভাবে অনুভব করা সম্ভব নয়। সূর্যোদয় দেখে নেমে এলাম একেবারে নীচে। হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে কুয়াশা মেখে হাঁটতে বেশ লাগল। রেস্টুরেন্টে সকালের চায়ের সাথে শীতের অনুভব নেওয়া এক অনবদ্য পাওনা। ঘাগরি দুটিতে এই ফেব্রুয়ারিতে জল থাকে না,তাই সেটা দেখার কোনো আগ্রহ এল না। স্নান সেরে তিনজনে বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। পাশদিয়ে তখন হুসহুস বেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। যারা গতকাল এসেছিল তারা ফিরছে। এখানে সাধারণত শনিবার এক দিনের জন্যই লোকজন আসে। আমাদের মত দু’তিন দিন থাকার পাবলিক খুব কম, এমনটা জানিয়েছিলেন হোটেলের ম্যানেজার স্বয়ং। হাঁটতে এসে পড়লাম গাছগাছালি ঘেরা একট পিচ রাস্তায়। রাস্তার গায়ে আলোছায়ায় বিচিত্র এক নকশা পায়ের নিচে ফেলে হেঁটে চলেছে তিনটি বাচ্ছা মেয়ে। মাথায় তাদের কাঠের বোঝা। বললাম, ‘এই তোদের একটা ছবি তুলছি’। ওরা হাঁসল। দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠল। এটাই এখানকার প্রকৃত চিত্র। বনের কাঠ বেচে উপার্জন এখানকার অনেক মানুষের। কেউ শহরে গিয়েছে রাজমিস্ত্রির কাজে। অনেকে কাজ করে বক্সাইট খনিতে। কিছু আধুনিক যুবক আমাদের মত ট্যুরিস্টদের গাড়ি ভাড়া দিয়ে উপার্জন করে। তবে যেহেতু এখানে ট্যুরিস্টরা শনিবার বেশি ভিড় জমায়, তাই ঐ একদিন বা দু’দিনই যা ইনকাম হয়। বাকি দিনগুলো গাড়ি নিয়ে ওরা যায় শহরে। আর নতুন শহরে বাবুদের দেখলে, ছোটো ছোটো বাচ্চারা টাকা চায়। একটাও একটা উপার্জনের পথ।

আমরা একটা গাছ ঘেরা মাঠের ভিতর দিয়ে হেঁটে পৌঁছালাম সেই বড় রাস্তায়,যেখানে গত দিন বাস থেকে নেমে ছিলাম। যানবাহনের আধিক্য নেই কোনো। মাঝে মাঝে একটা দুটো গাড়ি বা মটরসাইকেল যাচ্ছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম একটা আবাশিক আশ্রমের সামনে। পথের দু’ধারে গাছ আর মাঝে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি আমরা। একেকটা কুটিরের মত বাগান ঘেরা ছাত্রদের একেকটা থাকার জায়গা। একটি ছাত্রর কাছে জানতে পারলাম এখানে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়তে আসে ছাত্ররা। পথে নজরে এসেছিল একটি বালিকা বিদ্যালয়,একটি National Residential School  হাঁটতে হাঁটতে এই সুন্দর পথে কখন যে দুপুর হয়ে গিয়েছে মনেই ছিল না।

দুপুরের খাওয়া সেরে অপেক্ষায় তখন ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট দেখতে যাবার। গাড়ি তো বলা আছে। ঠিক সাড়ে তিনটে, অপেক্ষা গাড়ি এলেই ছুটবো সেখানে। ঘড়ির কাঁটা সরতে লাগল, কিন্তু গাড়ি আর এল না। এ এক ভেস্তে যাওয়া পরিকল্পনা আর মন খারাপের গল্প। সত্যি আর এলো না গাড়ি। অনেক ছোটাছুটি করলাম, বড় রাস্তায় গিয়ে দোকান গুলোতে বললাম। হলো না নতুন কোনো গাড়ির যোগাড়। গাড়ির ড্রাইভার কথা দিয়ে কথা রাখলো না। আসলে আসার পথে রাস্তায় পারহেড হিসাবে প্যাসেঞ্জার পেয়ে সে বেমালুম ভুলে গেল আমরা তাকে বুক করে রেখেছি। বড় রাস্তার ধারে প্রতি বুধবার হাট বসে। পড়ে থাকা হাটের কাঠামোর চারপাশ ঘুরে, ফিরে এলাম হোটেলে। সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে আকাশের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম। কালো থোকা মেঘের মাঝাখান থেকে একটা রক্তাভ আলোর চ্ছ্বটা হোটেলের লনে বসেই দেখা যাচ্ছে। ছবি তুললাম সেই মেঘের। ভিতরে তখন তীব্র না পাওয়ার যন্ত্রণা! ভীষণ মনখারাপ লাগছে, ভীষণ... ভীষণ! সূর্যটা ডুবে গিয়ে নেমে এলো রাত। নিস্তব্ধ নির্জন প্রকৃতির মাঝে ভেস্তে যাওয়া পরিকল্পনার যন্ত্রণাটা ক্রমশ মিশে যেতে লাগল। পরেরদিন রওনা হবো বেতলা। যতই মনখারাপ হোক, মনখারাপের রাতটা গুছিয়ে রাখলাম অন্তরে। যা পেয়েছি তাই বা কম কি! নেতারহাট সত্যিই ‘নেচারহাট’ কোনো সন্দেহ নেই।

আবার একটা নতুন সূর্যের উদয় দেখে শুরু হল আমাদের নতুন একটা দিন। ন’টার মধ্যেই স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে তৈরি আমরা। হোটেলের ম্যানেজারের ভাই বেতলায় থাকেন,সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে আসছেন। আমাদের বেতলা নিয়ে যাবেন। প্রায় পুরো দিনটাই আমাদের পথে পথে কাটবে। ঠিক ন’টা বাজে তখন, একটা জিপ এসে দাঁড়াল। হোটেলের ছেলে গুলোই আমাদের জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে দিল। যাত্রাপথে কয়েকটি স্পট দেখে নেব এমনই কথা আছে ড্রাইভারের সাথে। বললাম, ‘দাদা এখানে একটা প্রাকৃতিক ঝিল আছে শুনেছিলাম, একবার ওটা দেখাতে নিয়ে যাবেন?’ ড্রাইভার দা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ ঠিক হ্যয়, চলিয়ে,মগর ইয়াদা টাইম নেহি হ্যয় ম্যাডামজি’।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, বেশি সময় নেব না। একটু ফটো তুলেই চলে আসব’।

গাড়ি মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই এসে দাঁড়াল একটা বিশাল আকৃতির ঝিলের সামনে। স্বচ্ছ সাদা জলে সূর্যের আলো চকচক করছে। বেশ কিছুটা দূরে বড় বড় গাছগুলোর শান্ত ছায়া ছবির মতো আঁকা রয়েছে ঝিলের বুকে। কি প্রশান্তি! দীর্ঘক্ষণ সেই দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে মন চাই। বেশ কিছু ফটো তুলে গিয়ে বসলাম গাড়িতে। না, আর সময় নষ্ট করা যাবে না। কিন্তু কপালে যদি সময় নষ্ট লেখা থাকে তবে? ঠিক সেটাই ঘটল। গাড়ি বেশ ছুটে চলছিল সরু কালো পিচের রাস্তার উপর দিয়ে। কোথাও দু’পাশে ধু ধু মাঠ, কোথাও বা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাছ। মাঝে মাঝে বক্সাইট খনি থেকে মাল বোঝাই ট্রাককে সাইড দিয়ে আমাদের গাড়ি বেশ ভালোই ছুটছিল, হঠাৎ ব্রেক লাগিয়ে থেমে গেল গাড়ি। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, আগে দুটো ট্রাক দাঁড়িয়ে। যা ঘটেছে তার ঠিক আগে। কি ঘটেছে জানার আগেই আমাদের পিছনে অনন্ত চারখানা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ড্রাইভার এসে জানালেন, সামনে একটা ট্রাকের চাকা এমন ভাবে ফেটেছে যে, সে গাড়ি রাস্তায় আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পাশ দিয়ে খুব বেশি হলে একটা মানুষ যাওয়ার রাস্তা আছে। জানতে চাইলাম, ‘কি হবে এবার?’

The Ultimate Guide to Netarhat
প্রভাত বিহারের পিছনের ব্যালকনি দৃশ্য



ড্রাইভার জানালেন, ষাট কিমি দূরে একটা গ্রাম আছে, সেখান থেকে মেকানিক আসবে তবে রাস্তা পরিষ্কার হবে। বললাম, ‘বিকল্প কোনো রাস্তা নেই?’ উনি জানালেন না। দু’পাশে ঝোঁপে ভরা মাঠ, তাও রাস্তা থেকে অনন্ত দু’হাত নিচু, সুতরাং পাশ দিয়ে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই। যা বুঝলাম, দুপুর দুটোর আগে এপথে এগোনো সম্ভব নয়, আর এমনটা হলে আমাদের আর ‘লোধ’ জলপ্রপাতটা দেখতে যাওয়া হবে না। উফ্‌! এবার সত্যিই বিরক্ত হলাম,আর ভীষণ কান্না পেল আমার। এই ভ্রমণে কি শুধুই ভেস্তে যাবে সব! প্রায় ঘন্টাখানেক পর দেখলাম, পিছন থেকে দু-একটা গাড়ি ব্যাকগিয়ারে পিছনের দিকে যাচ্ছে। কিছু তো কারণ আছে। ড্রাইভারদা জানালেন, ‘একটা রাস্তা পাওয়া গিয়েছে,কিন্তু সব ধরণের গাড়ি যেতে পারবে না। দেখি একবার চেষ্টা করে’। পিছাতে লাগল আমাদের গাড়িও। বেশ কিছুটা ব্যাকে এসে দাঁড়াতেই দেখলাম, রাস্তার ডানদিকে এবড়োখেবড়ো উঁচু নিচু ঢিবি ও ঝোঁপের মাঝখান দিয়ে একটা গাড়ি যাচ্ছে। পাশের জমিটা রাস্তা থেকে হাতখানেক নিচু। জিপের মতো শক্তপোক্ত গাড়ি ছাড়া সত্যিই ওই পথে কোনো গাড়ির যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের গাড়িও ঢকাম ঢকাম করে লাফাতে লাফাতে কিছুটা এগোতেই একটা ঢিবিতে গেল আটকে ড্রাইভার স্টেয়ারিং এ বসে থাকল, দুজন লোক পিছন থেকে ধাক্কা দিতেই সেই গাড়ি আবার লাফাতে লাফাতে চলতে শুরু করল। অবশেষে আবার এসে উঠলাম পিচের রাস্তায়। জানি না সামনের পথে আর কি কি বাকি আছে,তবে মনটা আবার আনন্দে ভরে উঠল কারণ, লোধ দেখা হবে। ভেস্তে যেতে যেতেও ভেস্তে না যাওয়া ভ্রমণের গল্প এটা। গাড়ি আপন গতিতে ছুটে চলল। প্রায় ষাট কিমি পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম এই পথের একমাত্র বর্ধিষ্ণু গ্রামে। গ্রামটির নাম ‘মহুয়া’। নেতারহাটের মানুষ সপ্তাহে একদিন এই গ্রামে এসেই সারা সপ্তাহের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিয়ে যায়। এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি।

এরপরেই আছে অ্যাডভেঞ্চারের এক যাত্রা লোধের পথে... পরের পর্বে আগামী রবিবার

 

Sunday, 12 September 2021

নেতারহাটের নির্জনতা

 

ভ্রমণ ডায়ারির পাতা থেকে

রাঁচি

রুমকি রায় দত্ত

নেতারহাটঃ

নেতারহাতের সমাজচিত্র


হাতিয়া এক্সপ্রেস রাঁচি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁতেই নেমে পড়লাম আমরা। বেশ অনেকটা ব্যাগ টেনে পৌঁছালাম প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে। তারপর ওভারব্রিজ পেরিয়ে ওপারে। ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা প্রায়। একটা তরতাজা চনমনে স্টেশন। অসংখ্য ট্যাক্সি,অটো। আমাদের প্রথম দিনের গন্তব্য নেতারহাট। আগেই শুনেছিলাম, স্টেশন থেকেই ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় নেতারহাট। এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে জানতেই সে বলল, যাওয়া-আসা মিলিয়ে চার হাজার টাকা নেবে। কিন্তু সমস্যা হল আমরা আর এপথে ফিরব না। আমাদের ভ্রমণসূচি অনুসারে নেতারহাট থেকে বেতলা, সেখান থেকে রাঁচি। ট্যাক্সি ড্রাইভারই সমস্যার সমাধন করে দিলেন। জানালেন, স্টেশন থেকে অটোতে বাস স্ট্যান্ড চলে যেতে, সেখান থেকে ভালো বাস প্রতিদিন নেতারহাট যায়। তবে তাই হোক, বলে একটা অটো ঠিক করলামসকালের ব্যস্ত, চলমান রাঁচি শহরের মধ্যদিয়ে ছুটে চলল অটো। নেতারহাটের কথা শুনেই অটোওয়ালা আপ্লুত হয়ে প্রসংশা করতে লাগলেন। বললেন, ‘দুনিয়ামে যাঁহা ভি যাউ,ইতনা আচ্ছা সানরাইজ নেহি দিখনে মিলেগা কভি। উঁহা তো মানো বগল সে নিকলে গা সূরিয়’তার কথা শুনতে শুনতেই একটা কল্পনার ছবি যেন আঁকা হয়ে যাচ্ছিল মনে। প্রায় আটটার দিকে পৌঁছালাম বাস স্ট্যান্ড। বাস দাঁড়িয়ে আছে দেখে অটো ড্রাইভার নিজেই ব্যাগ গাড়িতে তুলে দিলেন।

 গতরাতে প্রায় আটটায় খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম, পেটে ছুঁচো দৌড়ানো শুরু করেছে। সামনেই একটা পুরীর দোকানে সবে খাব বলে ঢুকেছি,এমন সময় বাস হর্ণ দিতে শুরু করল। একদিকে খাবার থালা আরেক দিকে বাসের হর্ণ, দু’দিক থেকে দুজনের ডাকে পুরো কনফিউজড তখন। ভাবলাম পরের বাসে যাব তবে,কিন্তু কপালে খাবার না থাকলে যা হয়; সেদিন ঠিক তাই ঘটল। জানলাম, এই আটটার বাসের পর আবার দুপুর দুটোতে বাস আছে নেতারহাট যাওয়ার। কী আর করা অগত্যা খালি পেটেই চেপে বসলাম বাসে। মনে মনে ভাবলাম, পথে কোথাও বাস দাঁড়ালে খেয়ে নেব কিছু। যেহেতু দূরত্বের জার্নি,তাই বাসের সিটগুলো বেশ আরামদায়ক। এ যাত্রায় আমরা তিনজনই ( আমি, কত্তা আর ছোট্ট ছানা অনুরাগ। মাত্র তিন তখন তিনি)। বাস শুরু করল ছোটা। দু’তিনটি বিস্কুট খেয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যে অনুরাগও শুরু কর বমি করা। বাস শহর ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে নির্জন পথে। প্রতিটি স্টপে দু’একজন নামছে আবার উঠছে। বেশির ভাগই দেহাতি লোকজন। আর আমাদের চোখ ঘুরছে খাবারের দোকানের সন্ধানে। হতাশ হয়ে আবার শুরু করছি অপেক্ষা পরের স্টপের জন্য। 

নেতারহাটের পথে পথে


এদিকে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকায় ক্রমশ মাথার দু’পাশে ধরে থাকা চিনচিনে ব্যথাটা বেড়েই চলেছে। প্রায় ঘন্টা চারেক চলার পর বাস এসে দাঁড়াল একটা নির্জন গ্রামের পথে। বামপাশে একটা চায়ের দোকান। পান, সিগারেট আর একটা ঝোলানো প্যাকেটে বাবুজী কেক। এত খিদেতে খাবার ইচ্ছাটা প্রায় শেষ তখনহঠাৎ চোখে পড়ল একটা ঠেলায় বিক্রি হচ্ছে ছোলামাখা। জিভে জল এল। তাই কিনে খেতে খেতে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালাম। এখনও প্রায় ঘন্টা দুয়েকের পথ। বাস আস্তে আস্তে আঁকাবাঁকা গ্রাম্য পথ ছেড়ে পৌঁছাল পাহাড়ি পাকদন্ডী পথে। ক্রমশ সমতল ছেড়ে যত উপরে উঠতে লাগলাম,রাস্তা তত খারাপ। পথের দু’পাশে শাল,মহুয়া ও অন্যান্য গাছের জঙ্গল পথের সাথে এঁকেবেঁকে চলেছে। না, সত্যি বলছি এত অপরূপ পথশোভা উপভোগ করার মতো অবস্থ তখন আর আমার ছিল না। মাথার যন্ত্রণা তীব্র আকার ধারণ করেছে তখনহঠাৎ লক্ষ করলাম, আমাদের বাস সমতল রাস্তায় চলছে। অর্থাৎ নেতার হাটে চলে এসেছি আমরা। কিন্তু ঠিক কোথায় নামব বুঝে উঠতে পারছি না। দেখলাম, একটি দেহাতী পরিবার বড়ো রাস্তার উপরে নেমে পড়ল। তারাই বলল, এখানেই নামতে হবে আমাদের।

 রাস্তার পাশেই রয়েছে দু’একটি দোকান। সেখানে একটি বাঁশের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। আমাদের হোটেল ঠিককরা ছিল না। সঙ্গের ভদ্রলোকটিকে হোটেলের কথা বলাতে উনিই ফোন করলেন হোটেল প্রভাত বিহারের ম্যানেজারকে। ম্যানেজার তাঁর বন্ধুস্থানীয়। ম্যানেজারকে আসতে বলে চলে গেলেন ভদ্রলোক। এদিকে মাথার যন্ত্রণা এতটাই তীব্রতা ধারণ করেছে তখন,প্রায় চোখে অন্ধকার দেখছি, প্রচন্ড গা গোলাতে শুরু করেছে। ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই তখন। ঠিক আধঘণ্টা হবে! ম্যানেজার এলেন গাড়ি নিয়ে। ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটে। গাড়ি একটা ঘেরা কম্পাউন্ডের মধ্যে প্রবেশ করল। সুন্দর সাজানো গোছানো। ডানদিকে কাচ ঘেরা একটা বড়ো রেস্টুরেন্ট। এখানেই হোটেলের খাওয়ার ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে একটা সরু রাস্তা নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। দু’পাশে মরশুমি ফুল। রাস্তার শেষেই রয়েছে হোটেল ‘প্রভাত বিহার’ পর্যটন দপ্তরের থাকার জায়গা। হোটেলের একতলার অংশ মাটির নীচে। দূর থেকে দেখলে দোতলাকে একতলা বলেই ভ্রম হবে। আমাদের যে ঘরটি দেওয়া হল সেটি দোতলায়। ১০২ নং। দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠেই একটা খোলা ছাদ পেরিয়ে পৌঁছালাম আমাদের রুমে। সমনে গ্রিলঘেরা বারান্দা। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে সামনের সাজানো বাগান। পথশ্রমের ক্লান্তি মিটাতে হালকা গরম জলে স্নান সারার পর কিছুটা সুস্থ বোধ করতেই, খাওয়ার জন্য গেলাম রেস্টুরেন্টে,কিন্তু খেতে পারলাম না। দু’গ্রাস খেতেই শরীর তীব্র ভাবে প্রতিবাদ জানাল। বাইরে এসে দেখলাম, অন্য সবাই কোথাও বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ম্যানেজার এসে হিন্দি মিশানো বাংলায় বললেন, গাড়ি বলে দিই? আপনারা নিশ্চয় ‘ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট’ দেখতে যাবেন?

‘ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট’ নেতার হাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পট ‘সানসেট পয়েন্ট’। ম্যাগনোলিয়া নামে এক ইংরেজ মহিলা এক মেষপ্রতিপালককে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছিল এইখানে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ঘোড়াসহ এই  পাহাড় থেকে গভীরে!

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছিল না। মন তখন নীরবতার মাঝে একন্ত যাপনে মগ্ন হতে চাইছিল। আর হাতে তো পরের দিনটা আছেই, এই ভেবে বললাম, ‘আজ আর যাব না, কাল দেখব’। দেখলাম উপস্থিত অন্যান্য টুরিস্ট সকলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সূর্যাস্ত দেখতে। বেলা পড়ে এল প্রায়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি,শীত লাগছে বেশ। জড়িয়ে নিলাম হালকা একটা চাদর। আকাশটা ক্রমশ কফি রঙে ডুবে যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টের আলো গুলো জ্বলে উঠছে একে একে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেই খোলা ছাদে। দুটো চেয়ার পাতা রয়েছে। পড়ন্ত দিনের রংটা তখনও মুছে যায়নি। বসলাম চেয়ারে একা নির্জনে। ক্রমশ গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার উপর থেকে নেমে আসছে, অনুভব করছি এই অন্ধকারকে ভীষণ ভাবে।একটা অদ্ভুত কথা বলা শুরু হয়েছে অন্ধকারের সাথে নির্জন প্রকৃতির। ছাদের সীমানা পেরিয়েই চোখ আটকে যায় বিস্তীর্ণ জঙ্গলের গায়ে। পাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। ওদের মাঝে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে অন্ধকার! জেগে উঠছে বৃক্ষপ্রকৃতি মিটমিটে জোনাকির আলোয়,আর নিরবচ্ছিন্ন ঝিঁঝিঁর চিৎকারে। একটা ঘোর, একটা নেশা জাগানো ঘোর যেন ঘিরে ধরছে আমায় তখন। চোখ বন্ধ করে গভির অনুভূতিতে সেই প্রথম আমার নীরবতার সাথে অন্ধকারকে মাখা। কি সে অনুভূতি? কি সে নেশা... কোনো ভাবেই ব্যাখ্যা করতে অপারগ আমি। শুধু এটুকু বলতে পারি, সেই প্রথম আমি অন্ধকারের প্রেমে পড়েছিলাম। আজও সেই প্রেম সংরক্ষিত মনে। মাঝে মাঝেই ভেসে আসছিল অদ্ভুত কিছু পশু অথবা নাম-না-জানা পাখির ডাক। ঘোর ঘনঘোর এক আবেশের মধ্যে বিলিন হয়ে যাচ্ছি যেন।

প্রভাত বিহারের রেস্টুরেন্ট


‘মাথায় হিম পড়ছে’ গম্ভীর পুরুষকন্ঠ সতর্ক করতে যেন ফিরে এলাম ঘোরলাগা জগৎ থেকে বাস্তবে ফেরার পথটা। চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। একঝাঁক জোনাকির সমাবেশ গাছের ফাঁকে ফাঁকে পায়ে পায়ে উঠে এলাম ঘরের দিকে। চেয়ার

এমন একটা নির্জন জায়গায়, কাচ ঘেরা রেস্টুরেন্টে বসে রাতের খাবারখাওয়া, বেশ ভালোই লাগছিল। ভালো লাগছিল অন্যান্য টেবিলে খেতে বসা অন্য সব ট্যুরিস্টদের নিজস্ব আচরণ গুলো আড়চোখে দেখতে। বিভিন্ন বিচিত্র স্বভাবের অনেক মানুষ একসাথে বসে অথচ সবার জীবনে একটা ভিন্ন গল্প আছে।

শীত বেশ ভালোই। রাতের বিছানার হাতছানিটাও বেশ উপভোগ্য। সকালে সূর্য মামার হামা দেওয়া দেখতে হবে, মোবাইলে ঘন্টি ঠিক করে রাখলাম।

বাকি পরের পর্বে...।