Translate

Monday, 13 May 2019

অন্তরে বিম্বিতঃ

সেদিন জানালায় বসে দেখছিলাম, কীভাবে একটা বাড়ি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ইটের উপর ইট।সব ইট সমান তাপে শুকনো নয়, কিন্তু বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ।হঠাৎ নজরে এল  মিস্ত্রির সহচরটি একটা বেশ বড় মাপের তারজালিতে বাল ভরে তারপর ক্রমাগত সেটাকে এপাশ-ওপাশ নেড়ে চলেছে।ঝুরঝুর করে দানাবালি নীচে জমা হচ্ছে। একটা ভীষণ আলোড়ন শেষে তারজালিটিতে জমে ওঠা ঢেলা, নোংরা ফেলে ফেলে দিচ্ছে ছেলেটি। হঠাৎ মনে হল, জীবনেও তো কত নোংরা, ঢেলা লুকিয়ে থাকে। সেগুলো কী করে পরিশুদ্ধ হবে?
জীবন কীভাবে? কখন নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নেই, আমরা বুঝতেই পারি না। কখনও কখনও এমন হয় না? হঠাৎ হঠাৎ আমরা বিভ্রান্ত হয়ে উঠি? মনে হয় জীবনটা এবার থমকে গেল! একটা কোনো ঘটনা জীবনে তুমুল আলোড়ন তুলল। হয় না এমন?
এই আলোড়নই আসলে জীবনের তারজালি। জীবনের সাথে মিশে থাকা যা,কিছু ভেজাল। যা কিছু নোংরা, ঢেলা সব আটকা পড়ে সামনে চলে আসে। আর আমরা ঝরঝরে পরিশুদ্ধ হয়ে একধাপ সামনে এগোই। আবার পথচলা শুরু হয়। সঞ্চয় হয় আরও শত শত নোংরা। আবার একদিন জীবনে ঝড় ওঠে, সৃষ্টি হয় আলোড়নের...তবু থামা নয়। জীবন বাড়ি গড়তে হলে ইটের  পর ইট এভাবেই গেঁথে যেতে হবে।
এটাই জীবন,এটাই পথচলা।

Friday, 5 April 2019

হাঁড়িয়ায় মিষ্টি নেশা

হাঁড়িয়ার মিষ্টি নেশা
-রুমকি রায় দত্ত
ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে রঙ্গিনী।ব্যাগ থেকে চাবি বার করে ফ্ল্যাটের দরজা খোলেভিতরে অন্ধকার। লাইট জ্বালানোর আগেই নীলাঞ্জন ওকে পিছন থেকে জাপটে ধরল,ঠোঁট ছোঁয়াল ওর পিঠের উন্মুক্ত অংশে। ওর আগেই ফিরে এসেছে নীলাঞ্জন।রঙ্গিনী বিরক্ত প্রকাশ করে বলল—‘আঃ! নীল,--ছাড়! এখন একদম ভালো লাগছে না। পুরো হ্যাঙ্গ হয়ে আছি’। তারপর হঠাৎ বসে পরে নিচে পড়ে যাওয়া গবেষণা পত্রের দু’একটি পাতা তুলতে তুলতে বলল
—‘ এই কংক্রিটের জঙ্গলে থেকে কি প্রকৃতির প্রভাব অনুভব করা যায়?---জানিস,রিসার্চের কাজ একদম এগোচ্ছেনা। মাথার মধ্যে থেকে সাহিত্য উধাও হয়ে গিয়েছে,পড়ে আছে হাড়-পাঁজর বের করা এই কংক্রিটের কাঠামো’।
 গবেষণাপত্র গুলো টেবিলে রেখে রঙ্গিনী এগিয়ে এসে দাঁড়ায় নীলাঞ্জনের সামনে। হাত দুটো দিয়ে নীলের গলা জড়িয়ে,ওর চোখের দিকে স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে বলল
‘ ইস্‌! কত বছর হয়ে গেল উন্মুক্ত আকাশের নিচে, সবুজ প্রকৃতির কোলে শুইনি। দেখিনি চঞ্চল ঝর্ণার উন্মত্ত নাচ!----যাবি নীল,আমাকে নিয়ে এমনই এক উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে?’
রঙ্গিনীর মন প্রকৃতির কোল তো খুঁজবেই,ও যে প্রকৃতির মেয়ে। যে দেশের মানুষ গায়ে, মুখে মেঘ মেখে বেড়ায়,ও তো সেই দেশেই জন্মেছে। কিন্তু সেখানে তো আর ফিরবে না রঙ্গিনী,পরিজনদের সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে, শুধু নীলাঞ্জনের সাথে থাকবে বলে। একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায় রঙ্গিনী। বিয়ে নয়, লিভট্যুগেডারে বিশ্বাসী ও,আর এখান থেকেই তো শুরু পরিবারের সাথে মতান্তরের। কেউ কেন বোঝে না? প্রত্যেকটা পরিণত মানুষের জীবনে একটা নিজস্ব মতামত থাকতে পারে। থাকতে পারে নিজস্ব ভালোলাগা,মন্দলাগা। রঙ্গিনী কোনো দিনই বিবাহ বন্ধনে আস্থা রাখতে পারে নি। মেঘকে কি একটি জায়গায় বেঁধে রাখা যায়? মেঘের মতই ভাসমান আর অস্থির ওর মন। আসলে ও নিজেই নিজের মনের গতি বুঝতে পারে না, বিশ্বাস করতে পারে না নিজের মনকে।
কি রে? বলনা, নিয়ে যাবি আমাকে, প্রকৃতির কোলে? নীলের গলা ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তুই না গেলে, আমি কিন্তু একাই চলে যাব। কোনো এক আদিবাসী গ্রামে। ওখানে গিয়ে কোনো এক আদিবাসী ছেলের সাথে মহুয়া খেয়ে নেশা করব,তারপর ওর কোমর ধরে নাচব। তারপর...বলেই থেমে গিয়ে ঘুরে তাকায় নীলের দিকে।
--তারপর কি? থামলি কেন বল।
--কি আবার। সেই ছেলেকে বিয়ে করে ওখানেই থেকে যাব।
--মানে? তুই এটা করতে পারবি? তুই আমাকে ছেড়ে অন্য ছেলেকে বিয়ে করতে পারবি?
রঙ্গিণী উত্তর না দিয়েই ঢুকে পড়ে বাথরুমে। আসলে নীলের প্রশ্নের সত্যিই কোনো উত্তর নেই ওর কাছে। ও নিজেই তো নিজেকে বোঝে না! যেমন একদিন হঠাৎ করে নীলের সাথে থাকবে বলে ঘর ছেড়েছিল, ঠিক তেমনই যদি হঠাৎ...না, এভাবে এসব ভাববে না। দ্রুত সরিয়ে নেয় মনকে।
  নীল ল্যাপি নিয়ে বসে পড়ে। শেষ মুহূর্তে দুটো টিকিট রাঁচি। ঠিক আর দু-ঘন্টা বাকি। দ্রুত রঙ্গিনী ওর ল্যাপি আর রিসার্চ পেপার গুলো সাবধানে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় নীল দ্রুত হাতে ব্যাগ গুছিয়ে গলায় বিদেশী ক্যামেরাটা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে হাওড়া স্টেশনের পথে।ফটোগ্রাফি ওর নেশা। রাঁচির প্রকৃতির ফটো তো তুলবেই সেই সঙ্গে ওর সঙ্গের আদিম সৌন্দর্যে ভরপুর এই জীবন্ত প্রকৃতিকেও উন্মুক্ত করবে ওর ক্যামেরার লেন্সের সামনে।
 ঠিক এগারোটা বাইশ, হাতিয়া এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই উঠে পড়ে ওরা। সাইডের আপার-লোয়ার। ট্রেনের এই জায়গাটা রঙ্গিনীর ভীষণ প্রিয়। বেশ একটা স্বাধীনতা থাকে। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ছুটতে থাকে ট্রেন। আলো গুলোও যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে গুঁড়ো গুঁড়ো ঘুম ছেঁয়ে ফ্যালে রঙ্গিণীর চোখের পাতা।
 ট্রেনের জানালা দিয়ে আসা সকালের রোদের উষ্ণ পরশে চোখ খুলতেই লাফিয়ে ওঠে রঙ্গিণী। ট্রেনের গতি ক্রমশ শ্লথ হয়ে আসছে। রাঁচি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁতেই দুজনেই এসে দাঁড়ায় দরজার সামনে। ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া লাগছে রঙ্গিনীর মুখে-চোখে, চুল গুলো উড়ছে। রঙ্গিনী জানে যা কিছু অবাধ্য,তাকে বাঁধার চেষ্টা বৃথা,ঠিক ওর মনের মত।
ওরা নেমে দাঁড়ায় চলমান জনসমুদ্রের মাঝে কোথাও একফোঁটা সবুজ নেই! এখানে থকলে তো রঙ্গিনী প্রকৃতিকে ছুঁতে পারবে না!---ওর মুখটা বিষন্ন হয়ে ওঠে।
‘ নীল এখানে প্রকৃতি কোথায়?—আমি তো প্রকৃতি চেয়ে ছিলাম!’
কেন তুইতো নিজেই একটা আস্ত প্রকৃতি আর আমি আদিম সেই মানব।
ধুত্‌! তোর এই কাব্য আমার মোটেও ভালো লাগছে না! প্লিজ নীল আমায় প্রকৃতি দে।
ফাগুনের পরশ মাখা বাতাস ওর মনটাকে আরও উদাস করে দেয় রঙ্গিনী জানে না কেন হঠাৎ হঠাৎ মন উদাস হয় আর কেনই বা উচ্ছ্বসিত? শুধু বোঝে প্রকৃতির কাছে এমন কিছু আছে যা,মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তো মন কখনও প্রথম বৃষ্টির পরশ মাখা ঝলমলে প্রকৃতি আবার কখনও গ্রীষ্মের তাপদগ্ধ খাঁ-খাঁ দুপুর।
 ফাল্গুনের ব্যস্ত রাঁচি শহর। রঙ্গিণী কংক্রিটের হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে নিচ দিয়ে ভেসে যাওয়া জনসমুদ্র। রঙ্গিণী একটু গভীরে নিঃশ্বাস নেয়। বাতাসের হিমেল গন্ধের সাথে ভেসে আসে মোবিল পোড়া গন্ধ। একরাশ বিরক্তি যেন ক্রমশ মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। একটা পুরো দিন কেটে রাত আসে। প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়ার আশায় অস্থির আগ্রহে,রাতটা শহুরে হোটেলের চার দেওয়ালের মাঝে কোনোরকমে কাটিয়ে; সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে যায় রঙ্গিনী। নীল বাথরুম থেকে বেরোতেই ব্রেকফাস্ট সেরে ওরা বেড়িয়ে পরে জোন্‌হা প্রপাতের দিকে। কালো পিচের রাস্তার বুকের উপর দিয়ে ছুটে চলে অটো। সমান গতিতে রঙ্গিনী আর নীলাঞ্জন।  রঙ্গিনীর মনের গতি আরও দ্রুত। অটো এসে দাঁড়ায় জোন্‌হা প্রপাতের প্রবেশদ্বারে। প্রপাতের গর্জন কানে আসতেই রঙ্গিনীর মনটা নেচে উঠে, ও ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় সেই সিঁড়ির মুখে যেখান থেকে নিচে নামতে হয়। রঙ্গিনী নীলের হাত ধরে নিচে নামার প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই পিছন থেকে ডাক পড়ল—‘হেই দিদিমণি,--হেই মেমেসাহেব –একটু দাঁড়াও তো’।
রঙ্গিনী নীলের হাতে টান মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছন ফিরে দেখল এক দেহাতি তরুণ
 কাছে এসে বলল—‘সাতশ সিঁড়ি ভেইঙে যেতে হবে,পারবে তুমরা?---সইঙ্গে লোক দিব?—যা মন চায় ধরে দিবে’।
নীল বিরক্তির সুরে বলল-- ‘না ওসব লোক ফোক লাগবে না’।
ওদের পা বাড়াতে দেখেই লোকটি আবার বলল-- ‘আচ্ছা ও ঠিক আছে,তোমরা দোপরে খাবা না কিচ্ছু?---কি চায় মাছ, মাংস,ডিম সবই মিলবে’। খাবার কথা শুনে দুজনেই বেশ উৎসাহিত হল।
 নীল বলল—‘ঠিক হ্যয়,দো প্লেট ডিম ভাত’। রাঁচিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও বদলে গিয়েছে। কেমন যেন নিজের থেকেই হিন্দি গড়গড় করে বেরিয়ে আসছে নীলের।
 রঙ্গিনী সামনের দিকে পা বাড়াতেই মনে পড়ল, নাম তো জানা হয়নি ছেলেটার।
‘তুমাহারা নাম কিয়া হ্যয়’?
ছেলেটি বলল-‘শুকরা লোহারা’
‘তুম বাংলা জানতে হ?’
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল---‘জি মেমসাহেব,বাংলা বলতেও পারি,বুঝতেও পারি। বাঙ্গালী লোক এলে বাঙ্গালায় কথা বলি’।
শুকনো পাতায় পা মাড়িয়ে আঁকা বাঁকা সিঁড়ির ধাপ গুনে নিচে নামছে রঙ্গিনী আর নীলাঞ্জন। পাহাড়ের গা বেয়ে স্বচ্ছ-শুভ্র ঝর্ণার জল ঝরে পড়ছে নিচে পাথরের খাঁজে। বড় বড় পাথরের খাঁজে ছোটো ছোটো দ্বীপের মত জমে আছে ঝর্ণার জল। আছড়ে পড়া ছিটানো জলে ভরে উঠল রঙ্গিনীর মুখ। অপূর্ব লাগছে ওকে। নীলাঞ্জন ওর রূপের খনিকে সংগ্রহ করে চলেছে ওর ক্যামেরায়। রঙ্গিনী উদাস চোখে দেখছে এই প্রকৃতির অপূর্ব রূপমাধুরী। শুধু দেখছে না যেন তৃষ্ণার্তের মত পান করছে। বড় পাথরের উপর বসে পা দুটো ডুবিয়ে দিয়েছে ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে। নীল এগিয়ে এসে বসল ওর পাশে। কাঁধের উপর হাত রেখে বসে আছে দুজনে। নীলের মুখটা রঙ্গিনীর ঘাড়ের কাছে নেমে আসতেই রঙ্গিনী ওকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল----
‘নীল ও দেখছে আমাদের’। বলেই আঙুল তুলে দেখাল বড় পাথরের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ‘শুকরা’। যদিও ততক্ষণে ও পাথরের আড়ালে সরে গেছে,তবুও ওর গভীর দৃষ্টি দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। রঙ্গিনী ইশারায় ওকে ডাকল। ও আড়ষ্ঠ পায়ে কাছে এসে দাঁড়াল,তারপর আঙুল তুলে পিছনের দিকে দেখিয়ে বলল--
—‘খানা হয়ে গেইছে তাই’,--- বলেই মাথা নিচু করল। রঙ্গিনী নীলের হাত ধরে ওর পিছু পিছু উপরে উঠতে লাগল।
‘আচ্ছা শুকরা, বাড়িতে তোমার কে কে আছে?’
‘আমার বৌ ফুলি আর আমি বছর গেল শাদি করেছি’
‘ তুমি কি শুধু এই কাজ করো? তোমার গাঁয়ের সবাই কি কাজ করে?
‘আমি চাষও করি। তবে সারা বছরতো আর চাষের কাম থাকে না,তাই তুমাদের মত যারা ঘুরতে আসে তাদের দোপোরের খাবার জোগাড় দিই। হামি আর ফুলি নিজে হাতে রাঁধি গো মেমেসাহেব। বড় তিরপ্তি পাই। গাঁইয়ের কেউ দূরে রাজমিস্ত্রির কাম করে।কেউ ইঁট ভাঁটায় কাম করে,কেউ আবার বনের কাঠ এইনে শহরে বেচতে যায়। এই ভাবেই চইলছে’।
রঙ্গিণী মনে মনে ভাবে কত নেই এর মাঝেও এরা কত আনন্দে থাকে।ওরা এসে বসে কিছুদূরেই একটা ছোট্ট ছাঁউনির নিচে।নীল আর রঙ্গিনীর সামনে শাল পাতা জোড়া দিয়ে তৈরি থালায় ভাত,ডাল,পেঁয়াজ,দিয়ে আলুমাখা,আলুভাজা আর ডিম।
‘দিদিমণি আলুমাখা খাও তো তুমরা? ভালো কইরে হাত ধুইয়ে মেখেছি’।
অন্য সময় শালপাতার গন্ধটা রঙ্গিনীর ভালো লাগে না। কিন্তু আজ যেন ও প্রকৃতি কন্যা,এই গন্ধটা যেন আজ ওর বড় প্রিয় হয়ে উঠেছে। ওরা খেতে থেকে। রঙ্গিনী খাওয়ার মাঝেই তাকিয়ে দেখে শুকরা তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে ওর দিকে। কি সে চাহনি, কি সে চোখের ভাষা, জানেনা রঙ্গিনী,শুধু একটা অতি চেনা অনুভব যেন বারবার ওর মনটাকে আচ্ছন্ন করে নিতে চায়। হঠাৎ একটা প্রশ্ন আসে মাথায়।
--আচ্ছা শুকরা, তোমার শহরে যেতে ইচ্ছা করে না?
--শুকরা কিযেন ভাবতে থাকে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে ওঠে ‘উখানে আকাশ কোথায়? শুনা কথা... মাটি নাই, গাছ নাই’।
-- শুকরা তোমার ফুলি বেশি ভালো,না শহরের মেমসাহেব?
প্রশ্ন শুনে কেমন যেন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ শুকরা। কিছুটা যেন লজ্জা পেয়েই কথা ঘুরিয়ে বলে ওঠে,’ হেই দাদাবাবু, তুমি একটু ভাত নিবে?’
 অনেকদিন পর এমন সুস্বাদু ঘরোয়া রান্নায় পেটের তৃপ্তি মিটলেও মনের মেটে না।এর পরই ফিরতে হবে মনে হতেই কান্না পায় রঙ্গিনীর। এই সামান্য সময়েই শুকরা যেন ওর চেনা মানুষ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ ওর মনে হয়, যদি আর না ফেরে? মনে হতেই করে ফ্যালে প্রশ্ন--
—‘ শুকরা, তোমার এখানে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে’?
-- ‘না দিদিমণি, এখানে তো কোনো হোটেল নাই। তবে মেমসাব, তুমি চাইলে আমার ঘরে থাইকতে পার। আমার দুটা ঘর আছে। একটায় ফুলি আর আমি থাকি,তোমরা চাইলে আরেকটায় থাইকতে পারো। থাইকলে উৎসব দেইখতে পাবে।পুরুলিয়া থেইকে ছোঁ নাচের শিল্পী আইসছে,কত বাদ্য যন্ত্রর আইসছে,সারা রাত উৎসব হবে,মেয়ে-পুরুষ সবাই মিলে নাচ হবে—সবাই হাড়িয়ার নেশায় মইজে যাব।খুব আনন্দ হবে’
রঙ্গিনী বলল, ‘হাঁড়িয়া!—সেটা আবার কি’?
শুকরা বলল, ‘ভাত মজিয়ে আবার কখনও মহুয়ার রস মজিয়ে হাঁড়িয়া বানাই আমরা। তোমরা থাক,তোমাদেরও খাওয়াব’।
রঙ্গিনী নীলের দিকে তাকাতেই নীল ওর মনের কথা বুঝে যায়। বাঁশের বেড়ার ঘর,টিমটিমে একটা হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলছে। সন্ধে হতেই আলো চলে গেছে। ঘন অন্ধকারে জ্বলছে দুটো কুপির আলো জঙ্গল ঘেরা এই প্রকৃতির মাঝে মিটমিটে আলো এক রহস্য সৃষ্টি করেছে। কিন্তু রঙ্গিনীর মনে হয় শুকরার চোখের রহস্য আরও গভীর। একটা নক্সা আঁকা কাঁথা পাতা কাঠের চৌকিতে। নীলের গায়ে মাথা রেখে শুয়ে রঙ্গিনী চেষ্টা করতে থাকে শুকরার চোখের ঐ গভীর রহস্য ভেদের। বেড়ার দেওয়ালের ছোট্ট জানালা দিয়ে তাকায় পাশে শুকরা আর ফুলির ঘরের দিকে। ঘন অন্ধকার। অনুভব করে একজোড়া বন্য হরিণ-হরিণীর উপস্থিতি। বাইরে বেরিয়ে আসে রঙ্গিনী। স্পষ্ট শুনতে পায় দেহাতি সোহাগের শব্দ। রঙ্গিনীও ঐ দেহাতি সোহাগ পাওয়ার ইচ্ছায় ব্যকুল হয়ে ওঠে।
(2)
পাখির কূজন শুনে ভোর হয় এদের। অনেক বছর পর রঙ্গিনীর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। মিষ্টি সুরে কোকিল ডাকছে। শহরে এসব কোথায়?—ফুলি চলেছে ঝরনায় স্নান করতে। রঙ্গিনীও ওর সাথে চলেছে। ফুলি ওকে হাঁটু পর্যন্ত ডুরে শাড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। রঙ্গিনী এখন দ্বিতীয় ফুলি,এক উজ্বল বর্ণের দেহাতি মেয়ে। ফুলির সাথে কোমর দুলিয়ে পাথরের উপর পা ফেলে,হরিণীর মত লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। ফুলি জলের কাছে এসেই এক আঁজলা জল ছিটিয়ে নিল নিজের মুখে,ছড়িয়ে দিল রঙ্গিনীর গায়ে। দুজনেই খিলখিল করে হাসছে। নীল ছবি তুলছে একটা বনের হরিণীর আর একটা শহুরে হরিণীর জলকেলির। ফুলির কালো শরীর জলের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। রঙ্গিনী স্বচ্ছ পাহাড়ী ঝর্ণার জলে গা ডুবাল। হঠাৎ কেমন যেন আড়ষ্ঠ হয়ে ভিতু খরগোশের মত নিজের ভেজা শরীরটাকে যেন দু’হাত দিয়ে আড়াল করতে চায়লনীল  এই মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত কিন্তু রঙ্গিনী ভুল দেখেনি। দূরে পাথরের আড়ালে একজোড়া চোখ যে ওকেই দেখছে। বড় অন্তর্ভেদী এ দৃষ্টি।
সন্ধে হলেই শুরু হবে উৎসব। রঙ্গিনী এক অন্য সাজে সেজেছে। শহুরে বন্ধনহীন বক্ষ ঢাকা কমলা রঙের শাড়ির আঁচলে। শাড়িটা ফুলির বিয়ের শাড়ি। ওর লম্বা সিল্কি চুল চুড়ো করে খোঁপা বেঁধে দিয়েছে ফুলি। তাতে আগুন রঙা পলাশ ফুলের মালা জড়ানো। হাতে পলাশ মালার চুড়ি। ঘুরে ঘুরে নাচ শিখছে দেহাতি মেয়েদের কাছে। নীল রঙ্গিনীর মুখ থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। নামহীন সম্পর্কটাকে নাম দেওয়ার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে।
সন্ধে হতেই হাঁড়িয়া পান শুরু হয়ে গেছে। নীল,রঙ্গিনী,শুকরা,ফুলি সবাই হাঁড়িয়া পানে মগ্ন। রাত বেড়ে চলেছে,ছোঁ-নাচ,বাদ্য যন্ত্র সব শেষে শুরু হয়েছে দেহাতি মেয়েদের নাচ। ফুলির হাত ধরে রঙ্গিনীও নেচে চলেছে আগুনের চারপাশে। আগুনের তাপে আর নাচের পরিশ্রমে ওর মোমের শরীর গলে যাচ্ছে। নীল ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে মিশে যাচ্ছে বিন্দুতে। আগুনের শিখার ফাঁকে ফাঁকে জেগে উঠছে ঘামে ভেজা চকচকে শুকরার শরীরটা, নেশারু দৃষ্টির গভীর তীক্ষ্ণ ভাষা। জেগে উঠছে আদিম যৌবন। শুকরার গায়ের ঘামের আদিম গন্ধের নেশায় ঝিমঝিম করছে রঙ্গিনীর মাথা। জেগে উঠছে তীব্র,মিষ্টি নেশা। কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া রঙ্গিনী মিশে যাচ্ছে সেই মিষ্টি নেশার স্রোতে। নীলাঞ্জন ক্রমশ মিশে যাচ্ছে বিন্দুতে। রঙ্গিণীর চোখে নীলাঞ্জন এখন হাড়-পাঁজর বের করা একটা কিংক্রিটের কাঠামো মাত্র।



Wednesday, 2 January 2019

অবসর

অবসর
রুমকি রায় দত্ত
টেবিলের উপরে সযত্নে রাখা এক দিস্তা সাদা পাতা। আলগা পাতাগুলো হাওয়ায় ফরফর করে উড়ছে। উপরের পাতার উপর রাখা খোলা কলমটাও তালে তালে নাচছে। অনেক পুরানো নিব লাগানো কালিকলমটা। খোলা মুখের সাথে পাতার ঘর্ষণে একটা অদ্ভুত আঁকিবুকির সৃষ্টি হয়েছে সাদা পাতাটার গায়ে, যেন শুভ্রর জীবন থেকে কালো অক্ষরের ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়ার ইতিহাস লিখেছেন বিধাতা-পুরুষ।
 টেবিলের বাঁ-পাশে দক্ষিণ খোলা জানালাটা, মেঝে থেকে প্রায় ছাদ পর্যন্ত লম্বা। আগেকার দিনের জানালার মতো দেখতেযদিও শুভ্রর এই বাড়িটির গঠন একেবারে আধুনিক কিন্তু তিনতলার ছাদে ওঠার আগেই ডানদিকের এই ঘরটি, শুভ্র একেবারে নিজের মত সাজিয়েছে। একটা প্রাচীনতার ছোঁয়া, ঠিক ওর ছোটোবেলার ফেলে আসা বাড়িটার মত। দক্ষিণে লম্বা খোলা জানালা,উত্তরে টানা লম্বা ব্যালকনি,পশ্চিমের জানালার পাশে একটা মেহগনি কাঠের খাট। জানলাগুলোর মাথার উপরে লাল সাটিনের ঝালর, দু’পাশ থেকে নেমে এসেছে সাদা নেটের পর্দা। মাঝখানটা বাঁধা। খাটটা অবশ্য সেই পুরোনো বাড়ি থেকে আনা কিন্তু বাড়িটা আজ আর নেই! বাবার রমরমা ব্যবসায় হঠাৎ কীভাবে যেন ভাঁটা নেমে এসেছিল।

পুরনো বাড়ি থেকে ওরা যখন ভাড়া বাড়িতে উঠে আসে, তখন সঙ্গে ফার্নিচার বলতে শুধু এই খাটটা ছিল। মা’র কাছে শোন মায়ের দাদু নাকি এই খাটেই শুতেন। প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনোতো হবেই। বর্তমান বাজারে নিলামে উঠলে কোটিরনীচে দাম হবে না। 

মিলির আধুনিক মহলে যে এখাটের জায়গা হবে না সেটা শুভ্র ভালো করেই জানত,তাই শহর ছাড়িয়ে একটু একান্তে থাকার ইচ্ছায় এই অঞ্চলে যখন বাড়িটা তৈরি করে, তখনই নিজের একান্ত জগৎটাকে সাজিয়ে নেবে বলেই এই ঘরটা তৈরি। কত জল্পনা কল্পনা,অবসরে নিরালায় কলম আর অক্ষরের সাথে একান্ত যাপন করবে এখানে। লিখতে লিখতে লেখা থামিয়ে ব্যালকনি বেয়ে উঠে আসা মানিপ্ল্যান্টটার দিকে চেয়ে থাকবে। মাথার ভিতরে এলোমেলো হয়ে থাকা গল্পগুলো ফুলের মালার মতো সাজানো হলেই গালে লেগে থাকা কলম আবার সচল হয়ে উঠবে। 

উফ্‌! কোন অশুভক্ষণে যে এই লেখক হওয়ার স্বপ্নটা শিলালিপির মতো খোদিত হয়ে গিয়েছে ওর মনে! অখন্ড অবসরের আশায় কবে যেন ব্যালকনির বাম দিকে লাগানো মানিপ্ল্যান্টটা আর ডানদিকে লাগানো মাধবীলতা বড় হয়ে দোতলায় পৌঁছে গিয়েছে সে সময়ের হিসাব মেলাতে পারে না শুভ্র। প্রতিদিন ভোরে একটুকরো অবসর কোথাদিয়ে যেন কেটে যায় খোলা ছাদে গাছেদের সাথে। ভোরের ঐ একটুকরো টাটকা বাতাসই সারাদিন ওকে সময়ের সাথে যুদ্ধ করতে শক্তি দেয় 

এখন অবসরটা শুভ্রর কাছে মরুভূমিতে মরীচিকার সমান অথবা ঘন কালো মেঘের মাঝে এক ঝলক বিদ্যুৎ; যার আলো, অন্ধকারে পথ হারানো পথিককে পথ চলার আশা তো দেখায় কিন্তু পথ দেখায় না। হাতের ফাঁকে ধরে রাখা একমুঠো বালুকণার মত একটু একটু করে ফসকে যায় সময়। আজ গাছেদের কাছ থেকে সময় চুরি করেছে শুভ্র। সকালে ছাদে না গিয়ে এসে ঢুকেছে ওর এই একান্ত নিজের ঘরটিতে।
 
গত রাতে ঘুমের মধ্যেই টের পাচ্ছিল মস্তিষ্কের উর্বরতার। অনেকেরই এমন নাকি হয় মাঝে মাঝে। অবচেতন মনে সঞ্চিত তথ্য স্বপ্নে গল্প হয়ে ওঠে। ঘুম ভাঙার পর আসন্নপ্রসবার মতো ভিতরটা অস্থির হয়ে ওঠে। শুভ্রর ভিতরের সেই অস্থির প্রবণতা জমতে জমতে পাহাড় হয়ে উঠেছে। সকালে ছাদে যাওয়ার আগে কিছুটা নিজের অজান্তেই যেন কোনো এক অমোঘ আকর্ষণে ঢুকে পড়েছে এই ঘরে। দক্ষিণের খোলা হাওয়ায় ওর সাদা পাঞ্জাবিটা পতপত করে উড়ছে। শুভ্র এতক্ষণ ঐ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল উন্মুক্ত প্রকৃতির দিকে। হাওয়ায় উড়তে থাকা সাদা পাতাগুলোর শব্দে ঘুরে তাকালো টেবিলের দিকে। যেন সাদা পাতা গুলো ওর দিকে তাকিয়ে উপহাস করছে। নিজের অর্জিত বিদ্যাকে যান্ত্রিক ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে ফেলে পিষে মুঠো মুঠো টাকা উৎপাদন করে চলেছে।

হ্যাঁ, এই যান্ত্রিক জীবন ও স্বেচ্ছায় বেঁছে নিয়েছে ঠিকই,কিন্তু সে সময় পরিস্থিতি তো এমনই ছিল, অর্থের কাছে হার মেনে ছিল অক্ষর। সেদিন যদি সে অক্ষরকে বিসর্জন না দিত, তবে আজকের এই এত সামাজিক সম্মান, এত অর্থ,গাড়ি-বাড়ি সব যে অধরা থেকে যেত। পারত কি মিলির মুখে ফোটাতে সফল স্বামীর গর্বে গর্বিণীর  হাসি,মেয়েকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করতে? আজকাল কে আর ঘরে বসে গল্প-উপন্যাস লিখিয়েদের সম্মান দেয়। নিদেন পক্ষে একটা বই ছাপাতেও তো টাকা লাগে। তাই, বাধ্য হয়েই তো ও নির্বাচন করেছে  অর্থকে হেসে ওঠে শুভ্র। ওর মতো সফল মানুষ এ সমাজে কটা আছে? লোকে ওর সফলতাকে দেখে ঈর্ষা করে, কিন্তু সবটাই যে ওর বাইরের আবরণ। ওর অন্তরটা যে ফেলে আসা এক সুপ্ত ইচ্ছা নিয়ে নিশিদিন হাহাকার করে,সেই অন্তরটা তো সকলের অজানা। এমনকি মিলিও জানে না, কোনদিন জানতেও চেষ্টা করেনি।
একপা একপা করে এগিয়ে আসে টেবিলের কাছে। পাতা গুলো উড়তে উড়তে থেমে যায়, শুভ্রর গায়ে আড়াল হয়েছে হাওয়া। চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ে। আড়াল সরতেই দমকা হাওয়ায় আবার নড়তে থাকে কাগজগুলো। পেনটা হাতে তুলে নেয়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় আজ কাজের কাছ থেকে চুরি করবে অবসর। আজ লিখবে ও অনেক লিখবে। ঠিক কতগুলো দিন,নাকি মাস বা বছর কাগজ কলমের থেকে দূরে আছে মনে নেই। মনে করতেও চায় না। ভিতরটা আকুলিব্যাকুলি করছে,গুলিয়ে যাচ্ছে সব কথা। অক্ষরগুলো যেন এলোমেলো ছোটাছুটি করছে কে আগে জন্মাবে। শুভ্র গালে পেন ঠেকিয়ে ব্যালকনি থেকে উঠে আসা মানিপ্ল্যান্টের দিকে তাকিয়ে প্লট সাজাতে লাগলো। টেবিলে রাখা ঘড়িটাকে উলটে দিল। আহা! একটা অদ্ভুত তৃপ্তির আকুলতাএ আকুলতা অক্ষরের সাথে সহবাসের।
বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে টুকটুক শব্দ ভেসে আসতেই বিরক্তিতে সামান্য ভ্রূ কুঁচকে গেল শুভ্রর। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো মিলি।
উফ্‌! এখানে এসে বসে আছো, আর আমি ছাদে গিয়ে খুঁজছি তোমায়।
কেন? এই সময় তুমি হঠাৎ আমাকে খুঁজছো যে!
হুমম, খুঁজছি। রমা ছাদে চা দিতে গিয়ে খুঁজে পায়নি তোমায়, তাই বাধ্য হয়ে আমাকেই আসতে হলএই নাও তোমার চা। হাতে ধরা কাপপ্লেটটা আর মোবাইলটা নামিয়ে রাখলো টেবিলে। শুভ্রর ফোনটাও টেবিলে রেখে এগিয়ে গেল উত্তরের ব্যালকনির দিকে। থোকা থোকা মাধবীলতা ঝুলে আছে। গন্ধে ম ম করছে চারপাশটা। শুভ্রর কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ভিতরে ভিতরে। মিলির উপস্থতিটা অনাহূতের মত অসহ্য লাগছে এই মুহূর্তে কিন্তু গিলে নিতে হচ্ছে বিরক্তিমিলিতো ওর কোনো অধস্তন কর্মচারী নয়, সে এই মহলের সর্বময় কর্ত্রী
ব্যালকনি থেকে উচ্চস্বর শোনা গেল মিলির, ‘শুনছো, তোমার ফোনটা একবার সময় করে দেখে নিওদু-বার ফুল রিং হয়ে কেটে গেছে’
শুভ্র রাগের চোটে মোবাইলটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেললো বিছানায়। আজ সকাল থেকেই একটা বিদ্রোহ যেন চেপে বসেছে ওর মাথায়। দেখবে না মোবাইল। যার ফোনই হোক ধরবেনা, শুধু এখন মিলি ঘর থেকে বেরোলে হয়। মিলি বেরোলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সাদা পাতাগুলোর উপর কামার্ত প্রেমিকের মতো।
মিলি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গুনগুন করে গান করছে। এক থোকা মাধবীলতা ফুল হাতে ধরে প্রাণ ভরে গন্ধ নিল। এগিয়ে গেল মানিপ্ল্যান্টটা’র দিকে। হলদে কচি পাতাগুলো বড্ড আকর্ষণীয়। আবার উচ্চস্বরে ব্যালকনি থেকে বললো, ‘তুমি কিন্তু এই ঘরটা দারুণ সাজিয়াছ শুভ্র! আমি ভাবতেও পারিনি প্রাচীনত্বের এত আভিজাত্য থাকে। বিশেষ করে এই ব্যালকনিটা ফ্যান্টাস্টিক!’
শুভ্র ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠছে। বেশ আট-দশ লাইন লিখে ফেলেছে এর মধ্যেই তবুও মাথাটা কিছুতেই স্থির হচ্ছে না। ব্যালকনির দিকে তাকাতেই দেখতে পেল মিলির লাল রঙের শাড়ির আঁচলটা উড়ছে। বাহ্‌, এই শাড়ির আঁচল নিয়েই তো কত কিছু লিখে ফেলা যায়! আরো খানিকটা উর্বর হয়ে উঠলো মাথাটা। মিলি আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। শুভ্র গুছিয়ে লিখতে বসলআজ তিতলির স্কুল ছুটি, স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস না কি যেন একটা আছে! বাজার-হাট করা আছে সবই। একটু পরে উঠে ফোনটা সুইচ অফ করে দেবে। মনে মনে ছোট্ট একটা প্ল্যান সাজিয়ে গুছিয়ে লিখতে বসে শুভ্র। দু’লাইন লিখতে না লিখতেই মোবাইলটা আবার বেজে ওঠে। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ওঠে শুভ্রর। ফোনটা পুরো বেজে বন্ধ হয়ে আবার বেজে উঠতেই শুভ্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে যায় খাটের কাছে। সুইচ অফ করতে গিয়েও পারে না,রিসিভ করে ফোনটা। নিমেষে বদলে যায় মুখের আদল। প্রায় উদ্ভ্রান্তের মতই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পোশাক বদলে বেরিয়ে পড়ে গাড়ি নিয়ে।
নির্মীয়মান বারোতলা বিল্ডিং নক্ষত্র হাইটসশুভ্রর স্বপ্নের প্রজেক্ট। গাড়ি থেকে নেমেই চোখে পড়ল নক্ষত্র হাইটস এর নিচে অসংখ্য মানুষের ভিড়। একটা চাপা উত্তেজনা,কোলাহল। প্রায় ছুটেই গেল সেই দিকে। দু’হাতে ভিড় ঠেলে পৌঁছালো ভিতরে। একচোখ দেখেই আঁতকে উঠলরক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে একটা শ্রমিকযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। কোমরের কাছে শরীরটা দু’পাশে সরে গিয়েছে। উফ্‌, বিভৎস! কিন্তু কি করে এমন দুর্ঘটনা হতে পারে! সুরক্ষার সবরকম ব্যবস্থা নিয়েই তো কাজ চলছে। ও নিজে সব দেখে নিয়েছে। কি করে পড়ে যেতে পারে লোকটা এগারো তলা থেকে! চারিদিকের গুঞ্জন বলে দিচ্ছে বিক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। শুভ্র হসপিটালে ফোন করে।
 লোকটাকে সকলে মিলে ধরে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছে। দৃশ্যটা কেমন যেন মস্তিষ্কের ফ্রেমে বন্দি হয়ে যায় শুভ্রর। হ্যাঁ, প্লট...এটা দিয়েই একটা গল্প লিখে ফেলতে পারে শুভ্রঅ্যাম্বুলেন্সের পিছনে পিছনে ছুটছে শুভ্রর গাড়ি। হসপিটালের করিডর পেরোতেই ডাক্তার শ্রমিকটিকে মৃত বলে ঘোষণা করে। শুভ্র বুঝতে পারে সামনে অনেক কঠিন সময় ওকে পেরোতে হবে। শ্রমিকটির মৃত্যু ওকে কাঠগড়া পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওর পুরো কনফিডেন্স আছে নিজের প্রতি। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সময় লাগবে না। সেফটি সিস্টেমে কোনো গণ্ডগোল ছিলনা এটা নিশ্চিত শুভ্র,তবে কিভাবে ঘটলো এমন ঘটনা? বিদ্যুতের ঝলকের মত ক্ষণিক সময়ের জন্য মাথায় খেলে গেল মৃত্যু রহস্য নিয়েই লিখে ফেলা যেতে পারে আরেকটা গল্প। উফ্‌! এত প্লট অথচ একটু সময়! সামান্য একটু সময় মানে একটা দিন যদি পেত,তবে গুছিয়ে লিখে ফেলতে পারত
সারা রাত কেটে গেল অফিসের কেবিনে বসেশুভ্র দোতলার জানালা দিয়ে দেখল, বাইরে অফিসের সামনে ইউনিয়নের লোকজন দলবেঁধে পাহারা দিচ্ছে। নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য ঘেরাও করেছে অফিস কর্তাদের। দশটার পর বোর্ড মিটিং বসবে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়ে। তার আগে তদন্ত কমিশন গঠন করে ঘুরে দেখা হবে ঘটনাস্থল। প্রজেক্ট হেড হিসাবে তদন্ত কমিশনের সদস্য হয়ে ওর ও থাকার কথা,কিন্তু এক্ষেত্রে তদন্তটা হবে ওর বিরুদ্ধে। এইখানেই একটা কেমন যেন মানসিক একটা চাপ অনুভব করছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও সবার চোখেই কেমন যেন একটা প্রশ্নচিহ্ন দেখতে পাচ্ছে। একটু সামনের খোলা ব্যালকনিতে দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে। বেরোতে গিয়েও থমকে গেল শুভ্র। এখন সব রাগ যে ওর উপর সেটা ভালোই টের পাচ্ছে ওদের স্লোগান শুনে। খোলা জায়গায় ওকে পেলে যেকোনো রকম দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বদ্ধ ঘরে দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে ওর। কাজহীন এভাবে বসে থাকাও যেন এক শাস্তি। শুধু ফোনের পর ফোন আর একই বিষয়ে বকবক। অদ্ভুত এক গিলে খাওয়া অবসর, আনপ্রোডাক্টিভ। কথাটা মনে হতেই নিজের মনেই হেসে উঠল শুভ্র। অবসর আর আনপ্রোডাক্টিভ কেমন যেন শোনাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা দৌড়াচ্ছে। অফিসের অন্দরের কাজ কর্ম শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। সূর্য মাঝ গগন থেকে পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। শুভ্র জানালার কাচ দিয়ে বাইরেটা দেখলএক গাড়ি পুলিশ এসে সরিয়ে দিচ্ছে বিক্ষোভকারীদের। এবার মুক্তির সময় আগতপ্রায়।
দীর্ঘ মাসখানেকের অস্থিরতা,থানাপুলিশের টানাটানি, কেমন যেন ঝলসে গিয়েছিল জীবনটা। শুভ্রর সামনে এখন দশদিনের অখন্ড অবসর। উত্তরাখণ্ডের এক নির্জন পাহাড়ে,প্রকৃতির কোলে এই দশটাদিন অবসর যাপনের জন্য এসেছে শুভ্র। হোটেলের সবুজ লনে আরামকেদারায় বসে দেখছে সূর্যোদয়। খাদের কোলজুড়ে বয়ে চলেছে মেঘসমুদ্র। শুভ্র বসে আছে একদিস্তা সাদা খাতা হাতে,গালে ঠেকানো পেন। গত দু’দিন ধরে এই একই ভাবেই সাধনা করে চলেছে অক্ষরের কিন্তু সব কিছু যেন কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে মাথার ভিতরে। অক্ষরও বুঝি নিরুদ্দেশের পথে হারিয়ে গিয়েছে অবসর যাপনে।


Thursday, 6 December 2018

আঁধার পেরিয়ে







আঁধার পেরিয়ে
রুমকি রায় দত্ত
আজকাল আর ঝুমঝুমিকে লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে হয় না! এখন যে ক’দিন ও এখানে থাকবে উন্মুক্ত পাখি হয়ে। আর পাঁচটা ওরই মত পরিত্যক্ত ডাস্টবিন মানুষের মাঝে। খাঁচার ভিতরে থাকা প্রথম দিকের কথা ওর ঠিক মনে পড়ে না তবে শেষের দিকে, যখন একটু একটু করে অতীতটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে,তখন মাঝে মাঝে খাঁচাটাকে ভেঙে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছা করতো। ওই গরাদের ভিতর থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া আকাশ দেখতে দেখতে নিঃশ্বাস গুলোও কেমন যেন টুকরো হয়ে যেত! মনে হতো উন্মুক্ত পৃথিবীতে সবাই বুঝি ওর অপেক্ষায় আছেকিন্তু যেদিন এই এত বড় উন্মুক্ত পৃথিবীতে হাসপাতালেরই নির্জন প্রান্তে এই ছোট্ট ঘরে ঠাঁই পেল সেদিন বুঝলো কত একা ও। তাই এখন গরাদকে ভালো লাগে ফাঁক ফোকর দিয়ে দেখা ছোট্ট ছোট্ট আকাশকে ওর নিজের পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছে। সুস্থ মানুষকে যে আর হাসপাতালের ভিতরে রাখার অনুমতি নেই। ঝুমঝুমি ভাবতে থাকে ওর জায়গায় নিশ্চয় আবার অন্য কেউ ঠাঁই পেয়েছে, যেমন একদিন ও ঠাঁই পেয়েছিল অন্য কারোর জায়গায়। এই ছোট্ট ঘরটায় ওর মতো আরও দু’জন থাকে। কোনো আসবাবপত্র নেই, ফাঁকা। পাগলের আবার জিনিস লাগে নাকি? একটা মাদুর আর বালিশ। শীতকাল হলে হয়তো একটা কম্বল জুটতো। পাগলের অবশ্য শীতও লাগে না,এমনটা সবাই ভাবে। মাথার কাছে ঠিক গরাদের মত লম্বা শিকের জানালা, দো-থাকিছেঁড়া ছেঁড়া আকাশ থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ এসে পড়েছে ওর চোখে মুখে। ঝুমঝুমি ওই দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলো বুঝি ওর পাশের মেয়েটি ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঝুমঝুমি হাসছে ,মনে মনে ভাবছে কি অদ্ভুত নিয়ম প্রকৃতির,শূন্যতা রাখতে জানে না! সারাটা ক্ষণ প্রকৃতিতে, মানুষের জীবনে যেন হাতাখুন্তি খেলা চলছে। একটা ঘর শূন্য হতেই পাশের খেলোয়ার নিজের ঘর শূন্য করেও ছুটে চলেছে অন্যের খালি ঘরের দখল নিতে। চলছে নিরন্তর ছোটাছুটি কিন্তু সব শূন্যতা কি পূরণ হয়? হৃদয়ের শূন্যতা? কি যেন এক শুকনো বেদনা বুক ঠেলে উঠে আসতে চায়। কিন্তু আজকাল আর চোখ ফেটে জল আসেনা ওর।

 হাসপাতালের যে নার্স দিদি ওদের দেখাশোনা করতো,ওকে খুব ভালোবাসতো। ওর কাছে শুনেছে, ওকে যখন এখানে রেখে যাওয়া হয়, তখন নাকি ও মাঝে মাঝেই চিৎকার করে, কোন এক বুকফাটা আর্তনাদে গারদ কাঁপিয়ে কাঁদতো। কিছুতেই নাকি ওকে সামলানো যেতনা। আর নাকি কোনো রকম পাগলামি ওর মধ্যে ছিলনা। অনেকে অনেক রকম ভাবেই জ্বালাতো কেউ সারাদিন থুঁতু ছেটাতো, কেউ বকে যেত, কেউ নিজের শরীরে সুতোটি পর্যন্ত রাখতে চায়তো না, কিন্তু ও ওই মাঝে মাঝে যা কান্না ছাড়া বাকি সময় নাকি চুপচাপ বসে বসে কি যেন ভাবতো। কি ভাবতো ঝুমঝুমির আজ আর কিছুতেই মনে পড়েনা। সেই বুঝি ভালোছিল,সব ভুলে সে এক অন্য জগতে অন্য জীবনে ছিল। সব ভালোলাগা মন্দলাগার ঊর্ধ্বে সব পাওয়া অথবা সব না পাওয়ার এক অনন্য অনুভুতির জগতে ছিল। খুব দেখতে ইচ্ছে করে মাকে একবার। খুব-উ-ব ইচ্ছে করে। মারও কি করে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে।ওই প্রশ্নের উত্তরটা বুঝি এজীবনের মতো অজানা থেকে যাবে। আর কোনো দিনই হয়তো দেখা হবে না ওর মায়ের মুখটা, কপালের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট সিঁদুরের টিপ, আর সিঁথির মাঝে একচিলতে সিঁদুর। তখনই তো সিঁদুরের পারা লেগে লেগে সিঁথির চুল অনেক ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। এখন হয়তো আরও বেশি। মনে মনে মায়ের ছবিটা কল্পনা করার চেষ্টা করে। হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা, বাবা কি এখনও বেঁচে আছে! না, নিশ্চয় নেই। থাকলে ওর সুস্থ হয়ে ওঠার তিন তিনটে চিঠি পাওয়ার পরেও কি ওর বাবা ওকে নিতে আসতো না? নিশ্চয় আসতো। বাবা তার বড়বুড়িকে এভাবে কিছুতেই একা থাকতে দিত না। এখনও আগের সব কথা ও ভালো করে মনে করতে পারে না। ডাক্তার বলেছে চেষ্টা করার দরকার নেই এখন ও সম্পূর্ণ সুস্থ। আসতে আসতে সব কথা এমনিই নাকি ওর মনে পড়ে যাবে।

পাশের মেয়েটি এখনও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নার্সদিদির কাছে শুনেছে, ও আসলে শরীরে মেয়ে, মনে পুরুষ। এক অদ্ভূত টানাপোড়েনের জীবনে, মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়ে, স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিল। এখন ও ঝুমঝুমির মতই সুস্থ। কিন্তু ওর ফিরে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। নিয়ম অনুযায়ী ডাক্তারের নিজের হাতের লেখা চতুর্থ চিঠির উত্তরে আজ তৃতীয় মেয়েটিকে নিতে ওর বাড়ির লোক আসছে। তাই আজ ওর ভীষণ আনন্দ। সকাল থেকে সেজেগুজে বসে আছে। কপালের মাঝখানে লাল টিপটা কি সুন্দর লাগছে আজ শ্রাবণীকে। এতক্ষণ বাইরেই ছিল, হঠাৎ ঘরে ঢুকে দৌড়ে এলো ঝুমঝুমির কাছে।

ঝুমি, ওরা বেরিয়ে পড়েছে বাড়ি থেকে। নার্সদিদি বললো, ওরা আসছে ঝুমি, ওরা আমাকে নিতে আসছেরে। আমি ফিরে যাবো সেই আমার ছোট্ট ঘরটাতে। চিলেকোঠার ঘরটাতো আমার ছিল। একান্তই আমার-র-র। শ্রাবণী দু’হাত প্রসারিত করে ঘুরতে লাগলো ঘরময়, ওর নিলপাড় সাদা শাড়িটা হাওয়ায় ঘেরের মতো উড়তে লাগলো। শ্রাবণীর শাড়ির ওড়া দেখতে দেখতে ঝুমঝুমির চোখের সামনে কি যেন অস্পষ্ট একটা ছবি ভেসে উঠলো। একটা ল্যাবে দাঁড়িয়ে আছে, ওর হাতে একটা পুরানো লেবেল ছাড়া ওষুধের খালি শিশি। তারপরেই সব যেন লন্ডভন্ড। ঝুমঝুমি উঠে দাঁড়ালো, জানালার শিক ধরে বাইরে দেখতে লাগলো। সব মনে পড়ছে ওর। ফার্মাসিস্ট পড়ার সময় এমন ভাবেই ঔষধের খালি শিশিতে নিজেদের তৈরি করা ঔষধ ভরে লেবেলিং করতে হতো। একে একে ওর সব বন্ধুদের মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একটা পরম তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বুঝি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, আচমকা চিৎকার করে পিছিয়ে এলো। জানালার খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার মুখ ওকে টেনে নিয়ে গেল অতীতের সেই অন্ধকারে। সেদিন কলেজের ল্যাবে এমনই একটা মুখ ছিঁড়ে খেয়েছিল ওকে। কেউ জানে না কাউকে কখনো বলেনি।

শ্রবণী ঘরময় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছে মাটিতে। ঝুমঝুমি আড়চখে তাকিয়ে দেখলো ওর দিকে। সত্যিই কি স্নিগ্ধ লাগছে শ্রাবণীকে! মনের আনন্দ বুঝি এভাবেই মুখে লাবণ্য আনে। তৃতীয় মেয়েটি তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে কখনও শ্রাবণীকে দেখছে আবার কখনো ঝুমঝুমিকে দেখছে। ওর চোখে মুখে কত যেন অব্যক্ত যন্ত্রণা। অব্যক্ত কত কথার যন্ত্রণা যে ঝুমঝুমি বুকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তা কি ওর সাথে থাকা দুজনের কেউ অনুমানও করতে পারছে? কি অসম্ভব অবসাদের মধ্যে দিয়ে ওর দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটেছে। প্রতিটি দিন কলেজের ল্যাবে কাজ করার সময় ওই হিংস্র মানুষটির লোলুপ দৃষ্টি চেঁটে চেঁটে খেয়েছে ওর শরীরটাকেমোবাইলে রেকর্ড করে রাখা ওর শরীরের প্রত্যঙ্গের ছবি দেখিয়ে নিজের বিকৃতকামনা চরিতার্থ করেছে। উফ্‌! আর মনে করতে পারছে না ঝুমঝুমি। মাথাটা যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।

(2)


 রাত ফুরিয়েছে। মাদুরে গুটলি পাকিয়ে শুয়ে আছে ঝুমঝুমি, হাতদুটো জড়ো করে গালের নিচে রাখা। আগে এভাবে শুয়ে থাকলে বাবা ভীষণ রেগে যেত। বলতো, ‘ বড়বুড়ি, দিনদিন এ কেমন ভাবে শোয়া অভ্যাস হচ্ছে তোমার? এভাবে শুতে নেই মা, এতে হজমের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ঝুমঝুমি যেন শুনতে পাচ্ছে বাবার কথা। খুব শুনতে ইচ্ছা করছে। খুব ইচ্ছা করছে কেউ বকুক ওকে। বকার মধ্যে যে আন্তরিকতা, যে নিবিড়তা আছে তা যে ভালোবাসার মধ্যেও থাকে না। কাল বিকেলে শ্রবণীর ফিরে যাওয়ার পথে ওরা দু’জন, মানে ও আর মিঠু তাকিয়ে ছিল যেন কোন অপূর্ণ বাসনা বুকে নিয়ে। বাবা বলতো মানুষ চায়লেই ভালো থাকতে পারে, চায়লেই নিজের লক্ষ্যে পৌঁছেতে পারে, নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে পারে। কিন্তু সে চাওয়ায় এতো জোর থাকতে হবে যেন স্বয়ং ঈশ্বরও মাটিতে নেমে আসতে বাধ্য হন।

 খোলা জানালা দিয়ে সকালের স্নিগ্ধ রোদ এসে ঘরে ঢুকছে। বাড়িতে সকাল হলেই মা সারা বাড়ির সব জানালা গুলো খুলে দিত। ছুটির দিনে ঘুমের ব্যাঘাত হতো বলে ও আর ওর বোন চিৎকার করলে মা বলতো—‘ সকালের রোদ ঘরে ঢোকাতে হয়,একমাত্র রোদই পারে ঘরের মধ্যে তৈরি হওয়া জীবাণুদের মারতে’। উঠে বসে ঝুমঝুমি, এখন ছুটিই ছুটি তাই এখন আর বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর আয়েসটা বেঁচে নেই। ঝুমঝুমি ওর একমাত্র সম্পত্তি বালিশটা হাত দিয়ে থাবড়া থুবড়ি দিয়ে রোদের মধ্যে ফেলে রাখে। পুজোর ঠিক আগে আশ্বিনে রোদে মা বালিশ-বিছানা, আলমারির জামা-কাপড়, বই খাতা সব রোদে দিত। আর ওরা দুইবোন, যেন পুরানো জিনিসের মাঝে নতুন কিছু আবষ্কারের চেষ্টায় লেগে থাকতো। উফ্‌! সেবার তো পোঁটলা খুলতেই বেরিয়ে এসেছিল একটা বড় সাপ। ভাই তখন খুব ছোটো। ভাই, ভাইয়ের কথা মনে হতেই দু’চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে এলো জল।এই ক’বছরে ও অনেক বড় হয়ে গেছে। বিয়ের বয়স কি হয়ে গেল? হিসাব করতে লাগলো ঝুমঝুমি। না, মাঝপথেই থেমে গেল। কি হবে? ভাবতে ভাবতে দৃষ্টি উদাসী...ঘারের কাছে উষ্ণ স্পর্শ। মিঠু, ওর হাতে ধরা স্টিলের থালা আর গ্লাস। ঝুমঝুমি ওর দিকে মুখ ফিরাতেই বললো—‘ চলো বন্ধু, বেশি দেরি হলে চা আর টিফিনটা আর পাবো না। রাতে ভালো করে পেট ভরে নি। খুব খিদে পেয়েছে গো। কত্ত করে বললাম, আর একটা রুটি দাও কিছুতেই দিলনা!

কেমন যেন করুণায় ছেঁয়ে গেল ঝুমঝুমির মনটা। মানুষটার মুখের মধ্যে এক অদ্ভূত মায়া মাখানো। ঝুমঝুমি থালা আর গ্লাস হাতে ওর দিকে তাকাতেই মুখ জুড়ে একটা মায়াবী হাসি ছড়ালো, তারপর ওর হাতের ফাঁক দিয়ে নিজের হাত গলিয়ে বললো, ‘চলো এবার’। সামান্য দু’পা হেঁটে দু’জনে গিয়ে দাঁড়ালো খাবার দেওয়ার জানালার সামনে। একখানা গ্লাস রুটি আর হাফ গ্লাসের একটু বেশি লিকার চা। ওরা খাবার নিয়ে গিয়ে বসলো ছাতিম গাছের নিচে। মিঠু নিমেষে রুটিটা শেষ করতেই ঝুমঝুমি ওর নিজের পাঁউরুটি থেকে কিছুটা নিয়ে মিঠুর হাতে দিয়ে বললো, ‘ এবার থেকে পেট না ভরলে আমাকে বলবে বেশ’। মিঠু পাঁউরুটি চিবাতে চিবাতে মাথা নাড়লো। ঝুমঝুমি চিরটা কাল তো এভাবে ভাগ করেই খেতে শিখেছে। বাড়ির বড়দের যা যা ভাগ করতে হয়, সব ও পারে। কতদিন এমন হয়েছে ভাই নিজের ভাগের ডিমটা খেয়ে নিয়ে ওর ভাগেরটাও তুলে নিয়েছে। রুমঝুম কে, কি না দিয়েছে ও...সব ...সব দিয়েছে। পুজোতে কেনা ওর সব থেকে প্রিয় জামাটা, লিপস্টিক, জুতো,শেষ পর্যন্ত নিজের স্বপ্নগুলোও। ভাগ দিতে দিতে নিজেই একদিন খন্ড খন্ড হয়ে এসে পৌঁছেছে একটুকরো বন্দি আকাশের নিচে। উফ্‌! যন্ত্রণা, কি ভীষণ যন্ত্রণায় তোলপাড় করছে ওর শরীরটা। হারিয়ে যাচ্ছে কি ঝুমঝুমি? অন্ধকার ঘরে নেগেটিভ থেকে যে ভাবে ছবি তৈরি হয়,ঠিক তেমনি কিছু যেন।  কানটা কেমন যেন বোঁ বোঁ করছে---


‘মিস্‌ বিশ্বাস,’ বোঁ বোঁ শব্দে কানের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে গলাটা। একটা সাদা ছোটো ঝুল জামা, হাঁটু পর্যন্ত সাদা মোজা, পায়ে সাদা পামসু। চেয়ারটা দুলছে খুব জোড়ে জোড়ে দুলছে। ঝুমঝুমিও দুলছে।
‘মিস্‌ বিশ্বাস, স্যার আপনাকে ডাকছে’।
উঠে দাঁড়ালো ঝুমঝুমি। ডঃ ঘোষের কেবিনের হাতলটা চাপ দিতেই মুখের উপর এসে পড়লো
 একগুচ্ছ কাগজ।
‘হোয়াট ইজ্‌ দিস? এসব আপনি কি লিখেছেন? এটা কি আপনার নাট্যশালা বলে মনে হচ্ছে? প্লিজ্‌ গিভমি দ্যা আনসার’।

নিরুত্তর ঝুমঝুমির কোনো উত্তর মাথায় আসছে না। নিজের মনের অজান্তেই স্টকের খাতায় এসব কি লিখেছে, কখন লিখেছে কিছুই ওর মনে পড়ছে না,  শুধু ওর চোখ আর মন জুড়ে ভেসে উঠছে গতকালের সেই ভয়ঙ্কর অনুভূতির কথা। অন্ধকার ঘর দেখে সোজা ঢুকে পড়েছিল জুবিনের ঘরে। ছোট্ট নিল আলোর নিচে দেখেছিল সে দৃশ্য। দেখেছিল ওর বোন রুমঝুমের পাকা গমের মত উজ্বল সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরের উপর জুবিনের নগ্ন শরীরটাকে। দেখেছিল দুটি নগ্ন শরীরের আশ্লেষে আলিঙ্গনরত উদ্দাম যৌনতার আনন্দে ভাসা। জীবনের সবথেকে বড় স্বপ্নটাও সেদিন ও ভাগকরে ছিল, শুধু বইতে পারেনি নিজেকে। অন্ধকার... অন্ধকার আর কিচ্ছু মনে পড়ছে না ঝুমঝুমির শুধু তীব্র যন্ত্রণার অনুভবটা ছাড়া। আবার ডাকটা...

‘মিস্‌ বিশ্বাস, স্যার আপনাকে ডাকছেন’। দু’ঘারে তীব্র ঝাঁকুনি খেল ঝুমঝুমি। ফিরে এলো অতীত থেকে। সাদা ছোটোঝুলের স্কার্ট,সাদামোজা আর সাদা পামসু পড়া নার্সটি তখনও ঝুমঝুমির মুখের দিকে তাকিয়ে। ঝুমঝুমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। নার্সটি মিঠুকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘ তোমাকে আজ হোমে পাঠানো হবে। তুমি গিয়ে দাঁড়াও ওই বারান্দায়’।


ঝুমঝুমি লম্বা করিডর ধরে হেঁটে চলেছে, পিছনে সেই নার্সটি ও একটি ওয়ার্ডবয়। হয়তো এখনও ওকে ঠিক সুস্থ বলে বিশ্বাস করতে পারছে না ওরা। ঝুমঝুমি মনে মনে ভাবে কেমন হয় ঠিক এখনি একবার পাগল হওয়ার ভান করলে। যদি হঠাৎ এখনই হা –হা –হা করে হেসে ওঠে একবার? এসে দাঁড়ায় ডাক্তারের চেম্বারের সামনে। জানে, মানে অনুমান করতে পারে ঠিক কি কারণে ওকে এখানে ডাকা হয়েছে।
স্যার, আমায় ডেকে ছিলেন?
ডঃ ঘোষ পিছন ঘুরে ফাইলের তাকে কি যেন খুঁজছিলেন। ফিরে তাকালেন ঝুমঝুমির দিকে। বছর তিরিশের ঝকঝকে যুবক।
 হ্যাঁ, মিস্‌ বিশ্বাস। বসুন ওই চেয়ারটায়।
 না, ঠিক আছে। আপনি বলুন।
আপনাকে তো বেশ ফ্রেশ মানে ঝকঝকে দেখাচ্ছে। তার মানে আপনি একদম ঠিক আছেন। কি ঠিক বললাম তো?
 হ্যাঁ, আপনি যখন বলছেন তখন ঠিকই বলছেন নিশ্চয়, আপনি ডাক্তার আপনি তো আমার থেকে বেশি ভালো জানবেন তাই না?
 হুমম্‌ , আপনার তো দেখছি ডাক্তারের উপর ভীষণ আস্থা। ইয়েস, আমি বলছি আপনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
 আপনি কি শুধু এটা বলার জন্যই আমাকে ডেকে ছিলেন?
না , একটা অন্য কারণ আছে।
আমি জানি।
আপনি জানেন? কি বলুন তো?
হাসপাতাল থেকে পাঠানো তৃতীয় চিঠির কোনো উত্তর আমার বাড়ির লোক পাঠায়নি তাই তো?
উত্তর আসে নি বললে ভুল হবে। এসেছে একটা উত্তর। তবুও আমি একবার শেষ চেষ্টা করতে চাই, আমার ব্যক্তিগত জবানিতে নিজের হাতে লেখা একটা চতুর্থ চিঠি পাঠাতে চাই আর সেখানে আপনি নিজের হাতে কিছু লিখুন, এই জন্যই আপনাকে ডাকা মিস্‌ বিশ্বাস
ঝুমঝুমি টেবিলের পাশ থেকে সরে এসে দাঁড়ায় খোলা জানালার ধারে। কিছুক্ষণ নিরবতা! যেন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে মনে মনে।

আচ্ছা স্যার, আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন আমি পুরোপুরি সুস্থ? 
                      
হ্যাঁ, অবশ্যই, আপনি এখন একশ শতাংশ সুস্থ। আর শুধু সুস্থই নয়, আপনার মত শিক্ষিত মেয়ে বাইরে গেলেই যে কোনো চাকরিতে ঢুকে নিশ্চিন্তে উপার্জন করতে পারেন। বিয়ে করে নিজের সংসার করতে পারেন। এতটাই সুস্থ আপনি। কিন্তু কিছুতেই আমি বুঝতে পারি না পেসেন্টের বাড়ির লোক কেন সে কথা শোনে না, বোঝে নাকেন তাদের পরিবারের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় না। আপনাদেরও সমাজের মূল স্রোতে ফেরার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। বড় অসহায় লাগে মাঝে মাঝে জানেন।

আপনি সত্যি বলছেন ডাক্তার, আমিও বিয়ে করে সংসার করতে পারি?

নিশ্চয়, যে কোনো সুস্থ শিক্ষিত ছেলেই আপনাকে বিয়ে করতে চায়বে। আপনার মত এত মিষ্টি মেয়েকে কি কেউ সহজে ফেরাতে পারে? আপনার তো আর কোনো অসুখ নেই। শুধু একটা দশ টাকার ওষুধ আপনাকে সারা জীবন খেয়ে যেতে হবে। এটাতো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, যার হার্টের অসুখ আছে, যার থায়রয়েড আছে, ক্লোলেস্টোরেল আছে তাদেরও তো সারা জীবন এর থেকে অনেক দামি ওষুধ খেয়ে যেতে হয়।

ঝুমঝুমি ধীর পায়ে এগিয়ে আসে ডাঃ ঘোষের টেবিলের কাছে। তারপর ডাক্তারের দিকে তাকায়।
আচ্ছা ডাক্তার, আপনার কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে? ভালো বাসেন কাউকে?

না, মিস্‌ বিশ্বাস, পেসেন্টদের ভালো বাসতে বাসতে ব্যক্তি জীবনের ভালোবাসার কথা ভাবার আর অবকাশ পেলাম কোথায়?

জানেন এখন আমি একজনকে খুব ভালোবাসি, মানে বলতে পারেন তার আচরণ, কথাবলা এসব দেখে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

তাই মিস্‌ বিশ্বাস? এটাতো আরো ভালো লক্ষণ, মানে আপনি তো জীবনে ফিরতে চায়ছেনবলুন সে কে ? দরকার হলে আমি নিজে তার সাথে কথা বলবো। অন্তত একজনকেও যদি সমাজের মূলস্রোতে ফিরতে সাহায্য করতে পারি নিজেকে বড় হালকা মনে হবে।

ঝুমঝুমি একটা অদ্ভূত হাসি ছড়িয়ে বলে, ‘যে সবথেকে বেশি বিশ্বাস করে, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, আমারও সমাজের মূলস্রোতে ফেরার অধিকার আছে। আমি তাকে ভালোবাসি ডঃ ঘোষ’। মুখটা একটু নামিয়ে ডাক্তারের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘ যদি বলি আমি আপনাকে ভালোবাসি। পারবেন ডাক্তার বাবু? পারবেন আমাকে বিয়ে করে বাকি জীবনটা আমার সাথে সংসার করতে?’

ঝুমঝুমি আবার ফিরে আসে খোলা জানালাটার কাছে। করিডরের শেষপ্রান্তটা এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মিঠু দাঁড়িয়ে আছে,পাশে আরো কয়েকটা মেয়ে। এদের প্রত্যেকেরই আর বাড়ি ফেরা হবে না তাই, হোমে পাঠানো হচ্ছে।
ক্ষণিক নিরবতার পাহাড় ঠেলে ভেসে এলো ঝুমঝুমির গলা। এত কি ভাবছেন ডাক্তার? আপনি তো বিবাহিত নন, তবে আর বাঁধা কোথায়? আমি শিক্ষিত, সুন্দরী আর আপনি তো ভালো করেই জানেন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ্‌শুধু জানেন না, এটাই বিশ্বাস করেন। কি তাইতো? বিশ্বাস করেন তো?

ঝুমঝুমি, আমাদের ডাক্তারি পরিভাষায় এটাই সত্য যে, আপনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু এতবড় একটা সিদ্ধান্ত কি এভাবে নেওয়া যায়?

কিভাবে নেওয়া যায়? ঘরে বসে চায়ের কাপ হাতে নাকি প্লেটে সাজানো মিষ্টি খেতে খেতে?

থাক ডাক্তারবাবু, হেসে ওঠে ঝুমঝুমি। আপনার কপাল থেকে ঘামটা মুছে নিন। একটা কাগজ আর পেন দিন তো,আপনেকে দায় মুক্ত করি যাওয়ার আগে। আমার জন্য কারোর কাছে আপনাকে জবাব দিতে হবেনা,এই রইল আমার হলফনামা।

ঝুমঝুমি করিডর ধরে ছায়ামূর্তির মত এগিয়ে চলে মিঠুর কাছে। কারোর জন্য, কারোর আশ্রয় হয়ে বাঁচবে ও এখন থেকে, একটা নিজের পৃথিবী একটা অন্য মানুষের পৃথিবীতে। ডাক্তারের কানে বাজতে থাকে ঝুমঝুমির শেষ প্রশ্নটা ---- ‘ ডাক্তারবাব,সত্যি করে বলুনতো অসুস্থ আসলে আমরা না এ সমাজ?’ মিঠুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ঝুমঝুমি। হাঁটতে থাকে উন্মুক্ত পৃথিবীর পথে। ক্রমশ দূরে আরও দূরে সরে যেতে থাকে দুটি ছায়া, ওরা আঁধার পেরিয়ে ছুটে চলা এক আলোর পথযাত্রী।


Friday, 30 November 2018

সেই রাত



অনেক দিন আগের লেখা একটি অজানা রহস্য গল্প। জোনাকি বন্ধুদের জন্য,জোনাকির জানালায়।


             
সেই রাত
                রুমকি রায় দত্ত                

দিনটা ছিল ১৮ই ফাল্গুন।পরের দিন আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস।পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশাল এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল,সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া।এত বড় আয়োজন তাই প্রস্তুতি চলছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই।সমস্ত অনুষ্ঠান পরিচালনার গুরু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমাদের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রদের উপরদ্বাদশ শ্রেণীর দাদাদের সামনেই ছিল উচ্চমাধ্যমিক তাই ওরা ছিল অতিথির ভূমিকায়।স্কুলের যারা, আমারা হস্টেলে থাকতাম তাদের মধ্যে আমি,শুভম,সাহবাজ,উজি,বিবেক ও রমেন এই ছ’জনের উপরেই পড়েছিল সব থেকে বেশি দায়িত্ব। অবশ্য আমাদের হস্টেল সুপার প্রতাপ স্যার আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।তাঁরই তত্ত্বাবধানে আমরা বেশ গর্বের সঙ্গে সব দায়িত্ব সুষ্ঠ ভাবেই পালন করছিলাম।প্রাক্তন ছাত্রদের আমন্ত্রণ,বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ও পাশের দুটি স্কুলের সকল সদস্যদের আমন্ত্রণ পত্রে নাম লেখা,তা বিতর করা, এসব কাজ তো ছিলই সঙ্গে আরো অনেক কাজ।
স্টেজ সাজানোর প্রধান দায়িত্ব ছিল আমার আর বিবেকের উপর।বিবেক আমাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হলেও ওর স্বভাবটা ছিল ভাবুক প্রকৃতির। কাজের মাঝে হঠাৎ উদাস হয়ে যেত। কি যেন ভাবতযেন কোথায় হারিয়ে যেত। গায়ে জোরে জোরে ঠেলা মারলে কেমন যেন চমকে ওঠার মত নড়ে উঠত, তারপর বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে বলত... ‘অমন জোরে জোরে ঝাঁকাছিলিস কেন?—আমি কি কালা?—ডাকলেই তো হয়’।ওর এমন আচরণে প্রথম প্রথম আমরা অবাক হতাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেখার ফলে ওর এই স্বভাবে আমরা ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম।বিবেকের একটা বিশেষ গুন ছিল।ওর উদ্ভাবনী চিন্তাধারা ছিল একদম আলাদা।প্রায় নতুন নতুন জিনিস বানাতসুন্দর ছবই আঁকত।ওর এই সব গুনের কারণেই স্টেজ সাজানোর দায়িত্ব ওর উপর দেওয়া হয়েছিল।
অনুষ্ঠানের মাস খানেক আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছিলাম, সেই কারণে সময়মত আমরা সবাই মিলে অনুষ্ঠানের সব কাজ প্রায় গুটিয়ে এনেছিলাম।যেটুকু কাজ বাকি ছিল সবটায় স্টেজ সংক্রান্ত। অনেক বড় অনুষ্ঠান।শুধু যে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করবে তা নয়,আমন্ত্রিত অতিথিরাও আছে।দর্শকদের বসার জায়গা,স্টেজ আর প্রাধান গেট সাজানো,শুধু সাজানোতো নয়, বেশ আকর্ষণীয় করে তোলা রীতিমতো একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার অনুষ্ঠানের ঠিক তিনদিন আগে মানে ১৭ই ফাল্গুন থেকে শুরু হল আমাদের রাত দিনের পরিশ্রম রাত জেগে প্যান্ডেল গড়ার কাজ চলতে লাগল। আমরা সারা রাত ওদের সাথে জেগে পাহারা দিতাম।
১৭ই ফাল্গুন রাত ঠিক দু’টো হবে। নিঃস্তব্ধ রাতের পরিবেশে,হালকা কুয়াশার চাদরে খোলা মাঠের চারপাশটা ঘেরা। কিছুদূর পর্যন্ত আলোর পরে বেশ একটা ঘোলাটে অন্ধকারে মাঠ ছেয়ে আছে। প্যান্ডেলের কাজ চলছে।টুকটাক---ঠুকঠাক প্যান্ডেলের বাঁশে পেরেক পোঁতার আওয়াজ চলছে। খোলা মাঠের চার ধারে ঘুরে সে আওয়াজ যেন ঝনঝন করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আমরা পাঁচজন চেয়ার পেতে মাঠের মধ্যে গোল হয়ে বসে গল্প করছি। আমাদের কাজের জায়গায় দুটো হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলছে মাত্র। যতদূর চোখ যাচ্ছে কালো অন্ধকার। বিবেকের উপর যেহেতু প্রধান দায়িত্ব তাই ও তদারকির কাজে ব্যস্ত।মাথায় হিম পড়বে বলে সবার মাথায় মাফলার বাঁধা ছিল। আমরা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল তখন। হঠাৎ দেখলাম, বিবেক ছুটে এসে টান মেরে মাথা থেকে মাফলার খুলে দলা পাকিয়ে বলের মত ছুঁড়ে ফেলল।ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দরদর ঘামছে। কানের দু’পাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম।দুই কানে হাত দিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। যেন কোনো বিকট আওয়াজ থেকে নিজেকের কান কে বাঁচাতে চায়ছে। তারপর ছুটে চলে গেল হস্টেলের দিকে। ফাল্গুন চলছে। তখনও রাতের পরিবেশ বেশ ঠান্ডা। ওকে এভাবে ঘামতে ঘামতে ছুটতে দেখে আমরাও ওর পিছনে ছুটলাম। দেখলাম ও সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। কল থেকে জল পড়ার শব্দ আসতে লাগলো আমরা ভাবলাম ওর বুঝি প্রবল চাপ ছিল তাই, ছোটো ঘরে গেছে আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি হঠাৎ দেখি ও বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো, ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভেজা। গা দিয়ে টপ টপ করে জল ঝরছে। এসে ধপ করে বসে পড়ল বিছানার উপর।তারপর বেশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। গায়ে হাত দিয়ে ডাকতেই বিরক্ত হয়ে বলল-‘তোদের বললেও শুনিস না কেন বলত’।
[২]
আমাদের কাজ প্রায় শেষের দিকেই ছিল। কাজের সুবিধার জন্য এই ক’দিন স্কুলের দোতলা বিল্ডিং এর চাবি আমাদের কাছে রাখা ছিল। ১৮ তারিখ সন্ধের মধ্যে আমাদের কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায়। রাত দশটার মধ্যে বাইরে কাজ সেরে আমরা হস্টেলে ঢুকে গেলাম। আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যে আমাদের হস্টেলের খাওয়া-দাওয়া সব সারা হয়ে যায়। স্বভাবতই আমরা যখন ঘরে ঢুকলাম,হস্টেল প্রায় নিশুতি। আমাদের ঘরে আমি বিবেক আর উজি থাকতাম।ঠিক পাশের ঘরেই থাকত সাহবাজ,শুভম আর রমেন।আমাদের শুতে শুতে প্রায় রাত এগারোটা হয়ে গেল।কদিনের খাটুনিতে বেশ ক্লান্তই ছিলাম। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।
তখন, রাত কত হবে জানিনা। হঠাৎ পাশ ফিরে শুতে গিয়ে দেখলাম,বিবেক নেই। ভালো করে তাকাতেই দেখলাম, ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে ও সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে। ওর হাঁটাটা স্বাভাবিক নয়, যেন কোনো এক রহস্য লুকিয়ে আছে। আমিও ওকে অনুসরণ করলাম। বিবেক যাতে চোখ ছাড়া না হয়ে যায় তাই কাউকে না জানিয়েই ওর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম। বিবেক সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সোজা চলল আমাদের স্কুলের দোতলা বিল্ডিং এর দিকে। কিছুটা গিয়ে ডান দিকে বেঁকে চলতে লাগলো স্কুলের পিছনের দিকে,যে দিকে পুকুরটা আছে। ঠিক ফিজিক্স ল্যাবের নিচে। ফিজিক্স ল্যাবের জানালার পাশ দিয়ে একটা রেইন ওয়াটার পাইপ ছাদ থেকে সোজা নিচে নেমে এসেছে। দেখলাম বিবেক ঐ পাইপ ধরে সোজা উপরে উঠতে লাগল কিছুটা উঠে ফসকে গেল। আবার লাফিয়ে ঝুলে পড়ল পাইপটা ধরে। চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখে আমি ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। তারপর ওর দেখাদেখি আমিও পাইপ ধরে কিছুটা উঠলাম।কিন্তু ভারি শরীরের কারণে আর উঠতে না পেরে নিচে নেমে ছুটে গেলাম গেটের  কাছে। সব থেকে আর্শ্চয হলাম আমি যে ওকে অনুসরণ করছি এটা যেন ও টেরই পেল না।কেমন রোবটের মত নিজের কাজই করতে লাগল। গেটের কাছে পৌঁছাতেই মনে হল চাবি আমার বালিশের নিচে।ছুটে ঘরে গেলাম। চাবি নিয়ে ফিরে এসে গেট খুলতে যেতেই দেখি গেট খোলা,তালাটা এমনি ঝোলানো।কোনো কিছু ভাবার সময় তখন ছিল না।উন্মাদের মত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। যখন ছাদে পৌঁছালাম দেখলাম,বিবেক সেই দিনের মত  দু’কানে হাত দিয়ে চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে। দেখে মনে হল যেন তীব্র কোনো শব্দকে আটকানোর চেষ্টা করছে আর ঘামছে। অথচ দশ-বারো হাত দূরে দাঁড়িয়ে আমি কোনো শব্দ শুনিতে পেলাম না। আমি একপা একপা করে ওর দিকে এগোতে লাগলাম।প্রায় ওর থেকে হাত দেঢ়েক দূরে এসেছি, হঠাৎ মনে হল আমি কোন শব্দাবর্তের মধ্যে চলে এলাম।একটা ক্ষীণ,তীক্ষ্ণ শব্দ যেন আমার মাথার কোষ গুলো কে ক্রমশ অবশ করতে শুরু করলো।সব কিছুর মাঝে দেখলাম বিবেক ছাদ থেকে ঝাঁপ দিল।আমি দু’হাতে কান চেপে মরিয়া হয়ে নিচে নামতে লাগলাম।ঠিক ছাদ থেকে দোতলায় নেমেছি,তখন ঝনঝন তীব্র আওয়াজে মাথার শিরা গুলো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম প্রায়।যেন অদৃশ্য এক আকর্ষণে আমি নিচে নামার সিঁড়ির দিকে না গিয়ে বেঁকে গেলাম আমাদের ফিজিক্স ল্যাবের দিকে।দরজার কাছে এসে দেখলাম ল্যাবের দরজা খোলা। আমি ভিতরে ঢুকতে যাব এমন সময় মনে হল কে যেন আমাকে ধাক্কা মারলো।কিন্তু অদ্ভূত ভাবে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে চললাম,যেন মনে হল কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টানে চলমান রোবোটের মত আমি এগিয়ে চলেছি। আমার শরীর যেন নিয়ন্ত্রহীন। আমি ল্যাবের স্টোরের দরজায় হাত দিতেই সেটা খুলে গেল।ভিতরে অন্ধকার।টেবিলের উপর রাখা একটা গোল স্টপ ওয়াচের মত যন্ত্র থেকে সবুজ এক আলো বেরোচ্ছে।সেই আলোতে স্পষ্ট দেখলাম,টেবিলের এক কোনে রাখা আছে অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি,যেগুলির কোনোটিই কখনও আমাদের ল্যাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ল না। আমি এগিয়ে গিয়ে গোল যন্ত্রটাকে হাতে নিতেই বুঝলাম এই যন্ত্রটায় শব্দের উৎসযন্ত্রটাকে চোখের সামনে আনতেই মাথার ভিতরে সব কিছু যেন ওলটপালট হতে লাগল। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম।
এর পরের ইতিহাস আমি ছাড়া স্কুলের সবারই জানা।পরের দিন সকালে নাকি হস্টেলের ছাত্ররা আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় ফিজিক্স ল্যাব থেকে উদ্ধার করেসে রাতের পর বিবেকের সাথে আমার আর দেখা হয়নি। তিনদিন পর আমার জ্ঞান ফেরে।পরে সবার কাছে শুনেছিলাম,পরের দিন স্কুলের পিছনে পুকুর পাড় থেকে বিবেক কে প্রায় অর্দ্ধ উন্মাদ অবস্থায় পাওয়া যায়।ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে জলে পড়ায় সে যাত্রায় বিবেক প্রাণে বেঁচে গেলেও তীব্র শব্দ ওর মাথার সবকিছু ওলটপালট করে দেয়।
কিন্তু সব থেকে আর্শ্চযের বিষয় হল ঐ রাতের ঘটনা আমি কারোর সামনে প্রমাণ করতে পারিনি।পড়ে ঘটনা স্থল থেকে আমার বর্ণনা মত কোনো যন্ত্রই পাওয়া যায় নি।এমন কি সেই শব্দ উৎপাদক গোল যন্ত্রটা ও নয়।