হাঁড়িয়ার মিষ্টি নেশা
-রুমকি রায় দত্ত
ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে রঙ্গিনী।ব্যাগ থেকে চাবি বার করে ফ্ল্যাটের দরজা খোলে। ভিতরে
অন্ধকার। লাইট
জ্বালানোর আগেই নীলাঞ্জন ওকে পিছন থেকে জাপটে ধরল,ঠোঁট ছোঁয়াল ওর পিঠের উন্মুক্ত
অংশে। ওর আগেই ফিরে এসেছে নীলাঞ্জন।রঙ্গিনী বিরক্ত প্রকাশ করে বলল—‘আঃ! নীল,--ছাড়!
এখন একদম ভালো লাগছে না। পুরো হ্যাঙ্গ হয়ে আছি’। তারপর হঠাৎ বসে পরে নিচে পড়ে
যাওয়া গবেষণা পত্রের দু’একটি পাতা তুলতে তুলতে বলল
—‘ এই কংক্রিটের জঙ্গলে থেকে কি প্রকৃতির প্রভাব অনুভব করা
যায়?---জানিস,রিসার্চের কাজ একদম এগোচ্ছেনা। মাথার মধ্যে থেকে সাহিত্য উধাও হয়ে
গিয়েছে,পড়ে আছে হাড়-পাঁজর বের করা এই কংক্রিটের কাঠামো’।
গবেষণাপত্র গুলো
টেবিলে রেখে রঙ্গিনী এগিয়ে এসে দাঁড়ায় নীলাঞ্জনের সামনে। হাত দুটো দিয়ে নীলের গলা জড়িয়ে,ওর চোখের দিকে স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে বলল—
‘ ইস্! কত বছর হয়ে গেল উন্মুক্ত আকাশের নিচে, সবুজ
প্রকৃতির কোলে শুইনি। দেখিনি চঞ্চল ঝর্ণার উন্মত্ত নাচ!----যাবি নীল,আমাকে নিয়ে
এমনই এক উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে?’
রঙ্গিনীর মন প্রকৃতির কোল তো খুঁজবেই,ও যে প্রকৃতির মেয়ে। যে
দেশের মানুষ গায়ে, মুখে মেঘ মেখে বেড়ায়,ও তো সেই দেশেই জন্মেছে। কিন্তু সেখানে তো
আর ফিরবে না রঙ্গিনী,পরিজনদের সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে, শুধু নীলাঞ্জনের
সাথে থাকবে বলে। একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায় রঙ্গিনী। বিয়ে নয়, লিভট্যুগেডারে
বিশ্বাসী ও,আর এখান থেকেই তো শুরু পরিবারের সাথে মতান্তরের। কেউ কেন বোঝে না?
প্রত্যেকটা পরিণত মানুষের জীবনে একটা নিজস্ব মতামত থাকতে পারে। থাকতে পারে নিজস্ব
ভালোলাগা,মন্দলাগা। রঙ্গিনী কোনো দিনই বিবাহ বন্ধনে আস্থা রাখতে পারে নি। মেঘকে কি
একটি জায়গায় বেঁধে রাখা যায়? মেঘের মতই ভাসমান আর অস্থির ওর মন। আসলে ও নিজেই
নিজের মনের গতি বুঝতে পারে না, বিশ্বাস করতে পারে না নিজের মনকে।
কি রে? বলনা, নিয়ে যাবি আমাকে, প্রকৃতির কোলে? নীলের গলা
ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তুই না গেলে, আমি কিন্তু একাই চলে যাব। কোনো এক আদিবাসী
গ্রামে। ওখানে গিয়ে কোনো এক আদিবাসী ছেলের সাথে মহুয়া খেয়ে নেশা করব,তারপর ওর কোমর
ধরে নাচব। তারপর...বলেই থেমে গিয়ে ঘুরে তাকায় নীলের দিকে।
--তারপর কি? থামলি কেন বল।
--কি আবার। সেই ছেলেকে বিয়ে করে ওখানেই থেকে যাব।
--মানে? তুই এটা করতে পারবি? তুই আমাকে ছেড়ে অন্য
ছেলেকে বিয়ে করতে পারবি?
রঙ্গিণী উত্তর না দিয়েই ঢুকে পড়ে বাথরুমে। আসলে
নীলের প্রশ্নের সত্যিই কোনো উত্তর নেই ওর কাছে। ও নিজেই তো নিজেকে বোঝে না! যেমন
একদিন হঠাৎ করে নীলের সাথে থাকবে বলে ঘর ছেড়েছিল, ঠিক তেমনই যদি হঠাৎ...না, এভাবে
এসব ভাববে না। দ্রুত সরিয়ে নেয় মনকে।
নীল ল্যাপি নিয়ে বসে পড়ে। শেষ মুহূর্তে দুটো
টিকিট রাঁচি। ঠিক আর দু-ঘন্টা বাকি। দ্রুত রঙ্গিনী ওর ল্যাপি আর রিসার্চ পেপার
গুলো সাবধানে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। নীল দ্রুত হাতে ব্যাগ গুছিয়ে গলায় বিদেশী
ক্যামেরাটা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে হাওড়া স্টেশনের পথে।ফটোগ্রাফি ওর নেশা। রাঁচির
প্রকৃতির ফটো তো তুলবেই সেই সঙ্গে ওর সঙ্গের আদিম সৌন্দর্যে ভরপুর এই জীবন্ত
প্রকৃতিকেও উন্মুক্ত করবে ওর ক্যামেরার লেন্সের সামনে।
ঠিক এগারোটা বাইশ, হাতিয়া এক্সপ্রেস
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই উঠে পড়ে ওরা। সাইডের আপার-লোয়ার। ট্রেনের এই জায়গাটা
রঙ্গিনীর ভীষণ প্রিয়। বেশ একটা স্বাধীনতা থাকে। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ছুটতে
থাকে ট্রেন। আলো গুলোও যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে গুঁড়ো গুঁড়ো ঘুম
ছেঁয়ে ফ্যালে রঙ্গিণীর চোখের পাতা।
ট্রেনের জানালা দিয়ে আসা সকালের রোদের উষ্ণ পরশে
চোখ খুলতেই লাফিয়ে ওঠে রঙ্গিণী। ট্রেনের গতি ক্রমশ শ্লথ হয়ে আসছে। রাঁচি স্টেশনের
প্ল্যাটফর্ম ছুঁতেই দুজনেই এসে দাঁড়ায় দরজার সামনে। ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া লাগছে
রঙ্গিনীর মুখে-চোখে, চুল গুলো উড়ছে। রঙ্গিনী জানে যা কিছু অবাধ্য,তাকে বাঁধার
চেষ্টা বৃথা,ঠিক ওর মনের মত।
ওরা নেমে
দাঁড়ায় চলমান জনসমুদ্রের মাঝে কোথাও একফোঁটা সবুজ নেই! এখানে থকলে তো রঙ্গিনী
প্রকৃতিকে ছুঁতে পারবে না!---ওর মুখটা বিষন্ন হয়ে ওঠে।
‘ নীল এখানে
প্রকৃতি কোথায়?—আমি তো প্রকৃতি চেয়ে ছিলাম!’
কেন তুইতো
নিজেই একটা আস্ত প্রকৃতি আর আমি আদিম সেই মানব।
ধুত্! তোর
এই কাব্য আমার মোটেও ভালো লাগছে না! প্লিজ নীল আমায় প্রকৃতি দে।
ফাগুনের পরশ
মাখা বাতাস ওর মনটাকে আরও উদাস করে দেয়। রঙ্গিনী জানে না কেন হঠাৎ হঠাৎ
মন উদাস হয় আর কেনই বা উচ্ছ্বসিত? শুধু বোঝে প্রকৃতির কাছে এমন কিছু আছে
যা,মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তো মন কখনও প্রথম বৃষ্টির পরশ মাখা ঝলমলে
প্রকৃতি আবার কখনও গ্রীষ্মের তাপদগ্ধ খাঁ-খাঁ দুপুর।
ফাল্গুনের ব্যস্ত রাঁচি শহর। রঙ্গিণী কংক্রিটের
হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে নিচ দিয়ে ভেসে যাওয়া জনসমুদ্র। রঙ্গিণী একটু
গভীরে নিঃশ্বাস নেয়। বাতাসের হিমেল গন্ধের সাথে ভেসে আসে মোবিল পোড়া গন্ধ। একরাশ
বিরক্তি যেন ক্রমশ মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। একটা পুরো দিন কেটে রাত
আসে। প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়ার আশায় অস্থির আগ্রহে,রাতটা শহুরে হোটেলের চার দেওয়ালের
মাঝে কোনোরকমে কাটিয়ে; সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে যায় রঙ্গিনী। নীল বাথরুম
থেকে বেরোতেই ব্রেকফাস্ট সেরে ওরা বেড়িয়ে পরে জোন্হা প্রপাতের দিকে। কালো পিচের রাস্তার বুকের উপর
দিয়ে ছুটে চলে অটো। সমান গতিতে রঙ্গিনী আর নীলাঞ্জন। রঙ্গিনীর মনের গতি আরও দ্রুত। অটো এসে দাঁড়ায়
জোন্হা প্রপাতের প্রবেশদ্বারে। প্রপাতের গর্জন কানে আসতেই রঙ্গিনীর মনটা নেচে উঠে,
ও ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় সেই সিঁড়ির মুখে যেখান থেকে নিচে নামতে হয়। রঙ্গিনী নীলের হাত
ধরে নিচে নামার প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই পিছন থেকে ডাক পড়ল—‘হেই দিদিমণি,--হেই
মেমেসাহেব –একটু দাঁড়াও তো’।
রঙ্গিনী নীলের হাতে টান মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছন ফিরে দেখল
এক দেহাতি তরুণ।
কাছে এসে বলল—‘সাতশ
সিঁড়ি ভেইঙে যেতে হবে,পারবে তুমরা?---সইঙ্গে লোক দিব?—যা মন চায় ধরে দিবে’।
নীল
বিরক্তির সুরে বলল-- ‘না ওসব লোক ফোক লাগবে না’।
ওদের পা
বাড়াতে দেখেই লোকটি আবার বলল-- ‘আচ্ছা ও ঠিক আছে,তোমরা দোপরে খাবা না কিচ্ছু?---কি
চায় মাছ, মাংস,ডিম সবই মিলবে’। খাবার কথা শুনে দুজনেই বেশ উৎসাহিত হল।
নীল বলল—‘ঠিক হ্যয়,দো প্লেট ডিম ভাত’। রাঁচিতে
প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও বদলে গিয়েছে। কেমন যেন নিজের থেকেই হিন্দি গড়গড় করে
বেরিয়ে আসছে নীলের।
রঙ্গিনী সামনের দিকে পা বাড়াতেই মনে পড়ল, নাম তো
জানা হয়নি ছেলেটার।
‘তুমাহারা
নাম কিয়া হ্যয়’?
ছেলেটি
বলল-‘শুকরা লোহারা’।
‘তুম বাংলা
জানতে হ?’
ছেলেটি মাথা
নেড়ে বলল---‘জি মেমসাহেব,বাংলা বলতেও পারি,বুঝতেও পারি। বাঙ্গালী লোক এলে
বাঙ্গালায় কথা বলি’।
শুকনো পাতায়
পা মাড়িয়ে আঁকা বাঁকা সিঁড়ির ধাপ গুনে নিচে নামছে রঙ্গিনী আর নীলাঞ্জন। পাহাড়ের গা
বেয়ে স্বচ্ছ-শুভ্র ঝর্ণার জল ঝরে পড়ছে নিচে পাথরের খাঁজে। বড় বড় পাথরের খাঁজে ছোটো
ছোটো দ্বীপের মত জমে আছে ঝর্ণার জল। আছড়ে পড়া ছিটানো জলে ভরে উঠল রঙ্গিনীর মুখ। অপূর্ব
লাগছে ওকে। নীলাঞ্জন ওর রূপের খনিকে সংগ্রহ করে চলেছে ওর ক্যামেরায়। রঙ্গিনী উদাস
চোখে দেখছে এই প্রকৃতির অপূর্ব রূপমাধুরী। শুধু দেখছে না যেন তৃষ্ণার্তের মত পান
করছে। বড় পাথরের উপর বসে পা দুটো ডুবিয়ে দিয়েছে ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে। নীল এগিয়ে এসে
বসল ওর পাশে। কাঁধের উপর হাত রেখে বসে আছে দুজনে। নীলের মুখটা রঙ্গিনীর ঘাড়ের কাছে
নেমে আসতেই রঙ্গিনী ওকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল----
‘নীল ও
দেখছে আমাদের’। বলেই আঙুল তুলে দেখাল বড় পাথরের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ‘শুকরা’। যদিও
ততক্ষণে ও পাথরের আড়ালে সরে গেছে,তবুও ওর গভীর দৃষ্টি দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
রঙ্গিনী ইশারায় ওকে ডাকল। ও আড়ষ্ঠ পায়ে কাছে এসে দাঁড়াল,তারপর আঙুল তুলে পিছনের
দিকে দেখিয়ে বলল--
—‘খানা হয়ে
গেইছে তাই’,--- বলেই মাথা নিচু করল। রঙ্গিনী নীলের হাত ধরে ওর পিছু পিছু উপরে উঠতে
লাগল।
‘আচ্ছা শুকরা, বাড়িতে তোমার কে কে
আছে?’
‘আমার বৌ ফুলি আর আমি। বছর গেল শাদি করেছি’
‘ তুমি কি শুধু এই কাজ করো? তোমার
গাঁয়ের সবাই কি কাজ করে?
‘আমি চাষও করি। তবে সারা বছরতো আর
চাষের কাম থাকে না,তাই তুমাদের মত যারা ঘুরতে আসে তাদের দোপোরের খাবার জোগাড় দিই।
হামি আর ফুলি নিজে হাতে রাঁধি গো মেমেসাহেব। বড় তিরপ্তি পাই। গাঁইয়ের কেউ দূরে
রাজমিস্ত্রির কাম করে।কেউ ইঁট ভাঁটায় কাম করে,কেউ আবার বনের কাঠ এইনে শহরে বেচতে
যায়। এই ভাবেই চইলছে’।
রঙ্গিণী মনে মনে ভাবে কত নেই এর
মাঝেও এরা কত আনন্দে থাকে।ওরা এসে বসে কিছুদূরেই একটা ছোট্ট ছাঁউনির নিচে।নীল আর
রঙ্গিনীর সামনে শাল পাতা জোড়া দিয়ে তৈরি থালায় ভাত,ডাল,পেঁয়াজ,দিয়ে
আলুমাখা,আলুভাজা আর ডিম।
‘দিদিমণি আলুমাখা খাও তো তুমরা? ভালো
কইরে হাত ধুইয়ে মেখেছি’।
অন্য সময় শালপাতার
গন্ধটা রঙ্গিনীর ভালো লাগে না। কিন্তু আজ যেন ও প্রকৃতি কন্যা,এই গন্ধটা যেন আজ ওর
বড় প্রিয় হয়ে উঠেছে। ওরা খেতে থেকে। রঙ্গিনী খাওয়ার মাঝেই তাকিয়ে দেখে শুকরা
তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে ওর দিকে। কি সে চাহনি, কি সে চোখের ভাষা, জানেনা রঙ্গিনী,শুধু
একটা অতি চেনা অনুভব যেন বারবার ওর মনটাকে আচ্ছন্ন করে নিতে চায়। হঠাৎ একটা প্রশ্ন
আসে মাথায়।
--আচ্ছা
শুকরা, তোমার শহরে যেতে ইচ্ছা করে না?
--শুকরা
কিযেন ভাবতে থাকে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে ওঠে ‘উখানে আকাশ কোথায়? শুনা কথা...
মাটি নাই, গাছ নাই’।
-- শুকরা তোমার
ফুলি বেশি ভালো,না শহরের মেমসাহেব?
প্রশ্ন শুনে
কেমন যেন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ শুকরা। কিছুটা যেন লজ্জা পেয়েই কথা
ঘুরিয়ে বলে ওঠে,’ হেই দাদাবাবু, তুমি একটু ভাত নিবে?’
অনেকদিন পর এমন সুস্বাদু ঘরোয়া রান্নায় পেটের
তৃপ্তি মিটলেও মনের মেটে না।এর পরই ফিরতে হবে মনে হতেই কান্না পায় রঙ্গিনীর। এই
সামান্য সময়েই শুকরা যেন ওর চেনা মানুষ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ ওর মনে হয়, যদি আর না
ফেরে? মনে হতেই করে ফ্যালে প্রশ্ন--
—‘ শুকরা,
তোমার এখানে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে’?
-- ‘না
দিদিমণি, এখানে তো কোনো হোটেল নাই। তবে মেমসাব, তুমি চাইলে আমার ঘরে থাইকতে পার।
আমার দুটা ঘর আছে। একটায় ফুলি আর আমি থাকি,তোমরা চাইলে আরেকটায় থাইকতে পারো।
থাইকলে উৎসব দেইখতে পাবে।পুরুলিয়া থেইকে ছোঁ নাচের শিল্পী আইসছে,কত বাদ্য যন্ত্রর
আইসছে,সারা রাত উৎসব হবে,মেয়ে-পুরুষ সবাই মিলে নাচ হবে—সবাই হাড়িয়ার নেশায় মইজে
যাব।খুব আনন্দ হবে’।
রঙ্গিনী বলল, ‘হাঁড়িয়া!—সেটা আবার
কি’?
শুকরা বলল,
‘ভাত মজিয়ে আবার কখনও মহুয়ার রস মজিয়ে হাঁড়িয়া বানাই আমরা। তোমরা থাক,তোমাদেরও
খাওয়াব’।
রঙ্গিনী
নীলের দিকে তাকাতেই নীল ওর মনের কথা বুঝে যায়। বাঁশের বেড়ার ঘর,টিমটিমে একটা হলুদ
আলোর বাল্ব জ্বলছে। সন্ধে হতেই আলো চলে গেছে। ঘন অন্ধকারে জ্বলছে দুটো কুপির আলো
জঙ্গল ঘেরা এই প্রকৃতির মাঝে মিটমিটে আলো এক রহস্য সৃষ্টি করেছে। কিন্তু রঙ্গিনীর
মনে হয় শুকরার চোখের রহস্য আরও গভীর। একটা নক্সা আঁকা কাঁথা পাতা কাঠের চৌকিতে। নীলের
গায়ে মাথা রেখে শুয়ে রঙ্গিনী চেষ্টা করতে থাকে শুকরার চোখের ঐ গভীর রহস্য ভেদের।
বেড়ার দেওয়ালের ছোট্ট জানালা দিয়ে তাকায় পাশে শুকরা আর ফুলির ঘরের দিকে। ঘন
অন্ধকার। অনুভব করে একজোড়া বন্য হরিণ-হরিণীর উপস্থিতি। বাইরে বেরিয়ে আসে রঙ্গিনী। স্পষ্ট
শুনতে পায় দেহাতি সোহাগের শব্দ। রঙ্গিনীও ঐ দেহাতি সোহাগ পাওয়ার ইচ্ছায় ব্যকুল হয়ে
ওঠে।
(2)
পাখির কূজন
শুনে ভোর হয় এদের। অনেক বছর পর রঙ্গিনীর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। মিষ্টি সুরে কোকিল
ডাকছে। শহরে এসব কোথায়?—ফুলি চলেছে ঝরনায় স্নান করতে। রঙ্গিনীও ওর সাথে চলেছে।
ফুলি ওকে হাঁটু পর্যন্ত ডুরে শাড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। রঙ্গিনী এখন
দ্বিতীয় ফুলি,এক উজ্বল বর্ণের দেহাতি মেয়ে। ফুলির সাথে কোমর দুলিয়ে পাথরের উপর পা
ফেলে,হরিণীর মত লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। ফুলি জলের কাছে এসেই এক আঁজলা জল ছিটিয়ে নিল
নিজের মুখে,ছড়িয়ে দিল রঙ্গিনীর গায়ে। দুজনেই খিলখিল করে হাসছে। নীল ছবি তুলছে একটা
বনের হরিণীর আর একটা শহুরে হরিণীর জলকেলির। ফুলির কালো শরীর জলের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ
চঞ্চল হয়ে উঠেছে। রঙ্গিনী স্বচ্ছ পাহাড়ী ঝর্ণার জলে গা ডুবাল। হঠাৎ কেমন যেন আড়ষ্ঠ
হয়ে ভিতু খরগোশের মত নিজের ভেজা শরীরটাকে যেন দু’হাত দিয়ে আড়াল করতে চায়ল। নীল এই
মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত কিন্তু
রঙ্গিনী ভুল দেখেনি। দূরে পাথরের আড়ালে একজোড়া চোখ যে ওকেই দেখছে। বড় অন্তর্ভেদী এ
দৃষ্টি।
সন্ধে হলেই
শুরু হবে উৎসব। রঙ্গিনী এক অন্য সাজে সেজেছে। শহুরে বন্ধনহীন বক্ষ ঢাকা কমলা রঙের
শাড়ির আঁচলে। শাড়িটা ফুলির বিয়ের শাড়ি। ওর লম্বা সিল্কি চুল চুড়ো করে খোঁপা বেঁধে
দিয়েছে ফুলি। তাতে আগুন রঙা পলাশ ফুলের মালা জড়ানো। হাতে পলাশ মালার চুড়ি। ঘুরে
ঘুরে নাচ শিখছে দেহাতি মেয়েদের কাছে। নীল রঙ্গিনীর মুখ থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। নামহীন
সম্পর্কটাকে নাম দেওয়ার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে।
সন্ধে হতেই
হাঁড়িয়া পান শুরু হয়ে গেছে। নীল,রঙ্গিনী,শুকরা,ফুলি সবাই হাঁড়িয়া পানে মগ্ন। রাত
বেড়ে চলেছে,ছোঁ-নাচ,বাদ্য যন্ত্র সব শেষে শুরু হয়েছে দেহাতি মেয়েদের নাচ। ফুলির
হাত ধরে রঙ্গিনীও নেচে চলেছে আগুনের চারপাশে। আগুনের তাপে আর নাচের পরিশ্রমে ওর
মোমের শরীর গলে যাচ্ছে। নীল ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে মিশে যাচ্ছে বিন্দুতে। আগুনের
শিখার ফাঁকে ফাঁকে জেগে উঠছে ঘামে ভেজা চকচকে শুকরার শরীরটা, নেশারু দৃষ্টির গভীর
তীক্ষ্ণ ভাষা। জেগে উঠছে আদিম যৌবন। শুকরার গায়ের ঘামের আদিম গন্ধের নেশায় ঝিমঝিম
করছে রঙ্গিনীর মাথা। জেগে উঠছে তীব্র,মিষ্টি নেশা। কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া
রঙ্গিনী মিশে যাচ্ছে সেই মিষ্টি নেশার স্রোতে। নীলাঞ্জন ক্রমশ মিশে যাচ্ছে
বিন্দুতে। রঙ্গিণীর চোখে নীলাঞ্জন এখন হাড়-পাঁজর বের করা একটা কিংক্রিটের কাঠামো
মাত্র।
No comments:
Post a Comment