আঁধার পেরিয়ে
রুমকি রায় দত্ত
আজকাল আর
ঝুমঝুমিকে লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে হয় না! এখন যে ক’দিন ও এখানে থাকবে
উন্মুক্ত পাখি হয়ে। আর পাঁচটা ওরই মত পরিত্যক্ত ডাস্টবিন মানুষের মাঝে। খাঁচার
ভিতরে থাকা প্রথম দিকের কথা ওর ঠিক মনে পড়ে না। তবে শেষের দিকে, যখন একটু একটু করে অতীতটা
স্পষ্ট হতে শুরু করেছে,তখন মাঝে মাঝে খাঁচাটাকে ভেঙে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছা করতো। ওই গরাদের
ভিতর থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া আকাশ দেখতে দেখতে নিঃশ্বাস গুলোও কেমন যেন টুকরো হয়ে যেত!
মনে হতো উন্মুক্ত পৃথিবীতে সবাই বুঝি ওর অপেক্ষায় আছে। কিন্তু যেদিন এই এত বড় উন্মুক্ত পৃথিবীতে হাসপাতালেরই নির্জন প্রান্তে এই ছোট্ট ঘরে ঠাঁই পেল
সেদিন বুঝলো কত একা ও। তাই এখন গরাদকে ভালো লাগে। ফাঁক ফোকর দিয়ে
দেখা ছোট্ট ছোট্ট আকাশকে ওর নিজের পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছে। সুস্থ মানুষকে যে আর
হাসপাতালের ভিতরে রাখার অনুমতি নেই। ঝুমঝুমি ভাবতে থাকে ওর জায়গায় নিশ্চয় আবার
অন্য কেউ ঠাঁই পেয়েছে, যেমন একদিন ও ঠাঁই পেয়েছিল অন্য কারোর জায়গায়। এই ছোট্ট
ঘরটায় ওর মতো আরও দু’জন থাকে। কোনো আসবাবপত্র নেই, ফাঁকা। পাগলের আবার জিনিস লাগে
নাকি? একটা মাদুর আর বালিশ। শীতকাল হলে হয়তো একটা কম্বল জুটতো। পাগলের অবশ্য শীতও
লাগে না,এমনটা সবাই ভাবে। মাথার কাছে ঠিক গরাদের মত লম্বা শিকের জানালা, দো-থাকি। ছেঁড়া ছেঁড়া আকাশ থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ এসে পড়েছে
ওর চোখে মুখে। ঝুমঝুমি ওই দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলো বুঝি। ওর পাশের মেয়েটি ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আছে। ঝুমঝুমি হাসছে ,মনে মনে ভাবছে কি অদ্ভুত নিয়ম প্রকৃতির,শূন্যতা রাখতে জানে
না! সারাটা ক্ষণ প্রকৃতিতে, মানুষের জীবনে যেন হাতাখুন্তি খেলা চলছে। একটা ঘর শূন্য
হতেই পাশের খেলোয়ার নিজের ঘর শূন্য করেও ছুটে চলেছে অন্যের খালি ঘরের দখল নিতে।
চলছে নিরন্তর ছোটাছুটি। কিন্তু সব শূন্যতা
কি পূরণ হয়? হৃদয়ের শূন্যতা? কি যেন এক শুকনো বেদনা বুক ঠেলে উঠে আসতে চায়। কিন্তু
আজকাল আর চোখ ফেটে জল আসেনা ওর।
হাসপাতালের যে নার্স দিদি ওদের দেখাশোনা করতো,ওকে খুব ভালোবাসতো। ওর কাছে শুনেছে, ওকে যখন এখানে রেখে যাওয়া হয়, তখন নাকি ও মাঝে মাঝেই চিৎকার করে, কোন এক বুকফাটা আর্তনাদে গারদ কাঁপিয়ে কাঁদতো। কিছুতেই নাকি ওকে সামলানো যেতনা। আর নাকি কোনো রকম পাগলামি ওর মধ্যে ছিলনা। অনেকে অনেক রকম ভাবেই জ্বালাতো কেউ সারাদিন থুঁতু ছেটাতো, কেউ বকে যেত, কেউ নিজের শরীরে সুতোটি পর্যন্ত রাখতে চায়তো না, কিন্তু ও ওই মাঝে মাঝে যা কান্না ছাড়া বাকি সময় নাকি চুপচাপ বসে বসে কি যেন ভাবতো। কি ভাবতো ঝুমঝুমির আজ আর কিছুতেই মনে পড়েনা। সেই বুঝি ভালোছিল,সব ভুলে সে এক অন্য জগতে অন্য জীবনে ছিল। সব ভালোলাগা মন্দলাগার ঊর্ধ্বে সব পাওয়া অথবা সব না পাওয়ার এক অনন্য অনুভুতির জগতে ছিল। খুব দেখতে ইচ্ছে করে মাকে একবার। খুব-উ-ব ইচ্ছে করে। মারও কি করে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে।ওই প্রশ্নের উত্তরটা বুঝি এজীবনের মতো অজানা থেকে যাবে। আর কোনো দিনই হয়তো দেখা হবে না ওর মায়ের মুখটা, কপালের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট সিঁদুরের টিপ, আর সিঁথির মাঝে একচিলতে সিঁদুর। তখনই তো সিঁদুরের পারা লেগে লেগে সিঁথির চুল অনেক ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। এখন হয়তো আরও বেশি। মনে মনে মায়ের ছবিটা কল্পনা করার চেষ্টা করে। হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা, বাবা কি এখনও বেঁচে আছে! না, নিশ্চয় নেই। থাকলে ওর সুস্থ হয়ে ওঠার তিন তিনটে চিঠি পাওয়ার পরেও কি ওর বাবা ওকে নিতে আসতো না? নিশ্চয় আসতো। বাবা তার বড়বুড়িকে এভাবে কিছুতেই একা থাকতে দিত না। এখনও আগের সব কথা ও ভালো করে মনে করতে পারে না। ডাক্তার বলেছে চেষ্টা করার দরকার নেই এখন ও সম্পূর্ণ সুস্থ। আসতে আসতে সব কথা এমনিই নাকি ওর মনে পড়ে যাবে।
হাসপাতালের যে নার্স দিদি ওদের দেখাশোনা করতো,ওকে খুব ভালোবাসতো। ওর কাছে শুনেছে, ওকে যখন এখানে রেখে যাওয়া হয়, তখন নাকি ও মাঝে মাঝেই চিৎকার করে, কোন এক বুকফাটা আর্তনাদে গারদ কাঁপিয়ে কাঁদতো। কিছুতেই নাকি ওকে সামলানো যেতনা। আর নাকি কোনো রকম পাগলামি ওর মধ্যে ছিলনা। অনেকে অনেক রকম ভাবেই জ্বালাতো কেউ সারাদিন থুঁতু ছেটাতো, কেউ বকে যেত, কেউ নিজের শরীরে সুতোটি পর্যন্ত রাখতে চায়তো না, কিন্তু ও ওই মাঝে মাঝে যা কান্না ছাড়া বাকি সময় নাকি চুপচাপ বসে বসে কি যেন ভাবতো। কি ভাবতো ঝুমঝুমির আজ আর কিছুতেই মনে পড়েনা। সেই বুঝি ভালোছিল,সব ভুলে সে এক অন্য জগতে অন্য জীবনে ছিল। সব ভালোলাগা মন্দলাগার ঊর্ধ্বে সব পাওয়া অথবা সব না পাওয়ার এক অনন্য অনুভুতির জগতে ছিল। খুব দেখতে ইচ্ছে করে মাকে একবার। খুব-উ-ব ইচ্ছে করে। মারও কি করে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে।ওই প্রশ্নের উত্তরটা বুঝি এজীবনের মতো অজানা থেকে যাবে। আর কোনো দিনই হয়তো দেখা হবে না ওর মায়ের মুখটা, কপালের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট সিঁদুরের টিপ, আর সিঁথির মাঝে একচিলতে সিঁদুর। তখনই তো সিঁদুরের পারা লেগে লেগে সিঁথির চুল অনেক ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। এখন হয়তো আরও বেশি। মনে মনে মায়ের ছবিটা কল্পনা করার চেষ্টা করে। হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা, বাবা কি এখনও বেঁচে আছে! না, নিশ্চয় নেই। থাকলে ওর সুস্থ হয়ে ওঠার তিন তিনটে চিঠি পাওয়ার পরেও কি ওর বাবা ওকে নিতে আসতো না? নিশ্চয় আসতো। বাবা তার বড়বুড়িকে এভাবে কিছুতেই একা থাকতে দিত না। এখনও আগের সব কথা ও ভালো করে মনে করতে পারে না। ডাক্তার বলেছে চেষ্টা করার দরকার নেই এখন ও সম্পূর্ণ সুস্থ। আসতে আসতে সব কথা এমনিই নাকি ওর মনে পড়ে যাবে।
পাশের
মেয়েটি এখনও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নার্সদিদির কাছে শুনেছে, ও আসলে শরীরে মেয়ে, মনে
পুরুষ। এক অদ্ভূত টানাপোড়েনের জীবনে, মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়ে, স্মৃতি হারিয়ে
ফেলেছিল। এখন ও ঝুমঝুমির মতই সুস্থ। কিন্তু ওর ফিরে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। নিয়ম
অনুযায়ী ডাক্তারের নিজের হাতের লেখা চতুর্থ চিঠির উত্তরে আজ তৃতীয় মেয়েটিকে নিতে
ওর বাড়ির লোক আসছে। তাই আজ ওর ভীষণ আনন্দ। সকাল থেকে সেজেগুজে বসে আছে। কপালের
মাঝখানে লাল টিপটা কি সুন্দর লাগছে আজ শ্রাবণীকে। এতক্ষণ বাইরেই ছিল, হঠাৎ ঘরে
ঢুকে দৌড়ে এলো ঝুমঝুমির কাছে।
ঝুমি, ওরা
বেরিয়ে পড়েছে বাড়ি থেকে। নার্সদিদি বললো, ওরা আসছে। ঝুমি, ওরা আমাকে নিতে আসছেরে। আমি ফিরে যাবো সেই
আমার ছোট্ট ঘরটাতে। চিলেকোঠার ঘরটাতো আমার ছিল। একান্তই আমার-র-র। শ্রাবণী দু’হাত
প্রসারিত করে ঘুরতে লাগলো ঘরময়, ওর নিলপাড় সাদা শাড়িটা হাওয়ায় ঘেরের মতো উড়তে
লাগলো। শ্রাবণীর শাড়ির ওড়া দেখতে দেখতে ঝুমঝুমির চোখের সামনে কি যেন অস্পষ্ট একটা
ছবি ভেসে উঠলো। একটা ল্যাবে দাঁড়িয়ে আছে, ওর হাতে একটা পুরানো লেবেল ছাড়া ওষুধের
খালি শিশি। তারপরেই সব যেন লন্ডভন্ড। ঝুমঝুমি উঠে দাঁড়ালো, জানালার শিক ধরে বাইরে
দেখতে লাগলো। সব মনে পড়ছে ওর। ফার্মাসিস্ট পড়ার সময় এমন ভাবেই ঔষধের খালি শিশিতে
নিজেদের তৈরি করা ঔষধ ভরে লেবেলিং করতে হতো। একে একে ওর সব বন্ধুদের মুখ চোখের
সামনে ভেসে উঠছে। একটা পরম তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বুঝি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল,
আচমকা চিৎকার করে পিছিয়ে এলো। জানালার খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার মুখ ওকে টেনে
নিয়ে গেল অতীতের সেই অন্ধকারে। সেদিন কলেজের ল্যাবে এমনই একটা মুখ ছিঁড়ে খেয়েছিল
ওকে। কেউ জানে না কাউকে কখনো বলেনি।
শ্রবণী ঘরময়
ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছে মাটিতে। ঝুমঝুমি আড়চখে তাকিয়ে দেখলো ওর দিকে।
সত্যিই কি স্নিগ্ধ লাগছে শ্রাবণীকে! মনের আনন্দ বুঝি এভাবেই মুখে লাবণ্য আনে।
তৃতীয় মেয়েটি তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে কখনও শ্রাবণীকে দেখছে আবার কখনো ঝুমঝুমিকে
দেখছে। ওর চোখে মুখে কত যেন অব্যক্ত যন্ত্রণা। অব্যক্ত কত কথার যন্ত্রণা যে
ঝুমঝুমি বুকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তা কি ওর সাথে থাকা দুজনের কেউ অনুমানও করতে
পারছে? কি অসম্ভব অবসাদের মধ্যে দিয়ে ওর দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটেছে।
প্রতিটি দিন কলেজের ল্যাবে কাজ করার সময় ওই হিংস্র মানুষটির লোলুপ দৃষ্টি চেঁটে
চেঁটে খেয়েছে ওর শরীরটাকে। মোবাইলে রেকর্ড করে রাখা ওর শরীরের প্রত্যঙ্গের ছবি দেখিয়ে নিজের বিকৃতকামনা চরিতার্থ করেছে। উফ্! আর মনে করতে পারছে না
ঝুমঝুমি। মাথাটা যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।
(2)
রাত ফুরিয়েছে। মাদুরে গুটলি পাকিয়ে শুয়ে আছে
ঝুমঝুমি, হাতদুটো জড়ো করে গালের নিচে রাখা। আগে এভাবে শুয়ে থাকলে বাবা ভীষণ রেগে
যেত। বলতো, ‘ বড়বুড়ি, দিনদিন এ কেমন ভাবে শোয়া অভ্যাস হচ্ছে তোমার? এভাবে শুতে নেই
মা, এতে হজমের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ঝুমঝুমি যেন শুনতে পাচ্ছে বাবার কথা। খুব
শুনতে ইচ্ছা করছে। খুব ইচ্ছা করছে কেউ বকুক ওকে। বকার মধ্যে যে আন্তরিকতা, যে
নিবিড়তা আছে তা যে ভালোবাসার মধ্যেও থাকে না। কাল বিকেলে শ্রবণীর ফিরে যাওয়ার পথে
ওরা দু’জন, মানে ও আর মিঠু তাকিয়ে ছিল যেন কোন অপূর্ণ বাসনা বুকে নিয়ে। বাবা বলতো
মানুষ চায়লেই ভালো থাকতে পারে, চায়লেই নিজের লক্ষ্যে পৌঁছেতে পারে, নিজের ইচ্ছা
পূরণ করতে পারে। কিন্তু সে চাওয়ায় এতো জোর থাকতে হবে যেন স্বয়ং ঈশ্বরও মাটিতে নেমে
আসতে বাধ্য হন।
খোলা জানালা দিয়ে সকালের স্নিগ্ধ রোদ এসে ঘরে ঢুকছে। বাড়িতে সকাল হলেই মা সারা বাড়ির সব জানালা গুলো খুলে দিত। ছুটির দিনে ঘুমের ব্যাঘাত হতো বলে ও আর ওর বোন চিৎকার করলে মা বলতো—‘ সকালের রোদ ঘরে ঢোকাতে হয়,একমাত্র রোদই পারে ঘরের মধ্যে তৈরি হওয়া জীবাণুদের মারতে’। উঠে বসে ঝুমঝুমি, এখন ছুটিই ছুটি তাই এখন আর বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর আয়েসটা বেঁচে নেই। ঝুমঝুমি ওর একমাত্র সম্পত্তি বালিশটা হাত দিয়ে থাবড়া থুবড়ি দিয়ে রোদের মধ্যে ফেলে রাখে। পুজোর ঠিক আগে আশ্বিনে রোদে মা বালিশ-বিছানা, আলমারির জামা-কাপড়, বই খাতা সব রোদে দিত। আর ওরা দুইবোন, যেন পুরানো জিনিসের মাঝে নতুন কিছু আবষ্কারের চেষ্টায় লেগে থাকতো। উফ্! সেবার তো পোঁটলা খুলতেই বেরিয়ে এসেছিল একটা বড় সাপ। ভাই তখন খুব ছোটো। ভাই, ভাইয়ের কথা মনে হতেই দু’চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে এলো জল।এই ক’বছরে ও অনেক বড় হয়ে গেছে। বিয়ের বয়স কি হয়ে গেল? হিসাব করতে লাগলো ঝুমঝুমি। না, মাঝপথেই থেমে গেল। কি হবে? ভাবতে ভাবতে দৃষ্টি উদাসী...ঘারের কাছে উষ্ণ স্পর্শ। মিঠু, ওর হাতে ধরা স্টিলের থালা আর গ্লাস। ঝুমঝুমি ওর দিকে মুখ ফিরাতেই বললো—‘ চলো বন্ধু, বেশি দেরি হলে চা আর টিফিনটা আর পাবো না। রাতে ভালো করে পেট ভরে নি। খুব খিদে পেয়েছে গো। কত্ত করে বললাম, আর একটা রুটি দাও কিছুতেই দিলনা!
খোলা জানালা দিয়ে সকালের স্নিগ্ধ রোদ এসে ঘরে ঢুকছে। বাড়িতে সকাল হলেই মা সারা বাড়ির সব জানালা গুলো খুলে দিত। ছুটির দিনে ঘুমের ব্যাঘাত হতো বলে ও আর ওর বোন চিৎকার করলে মা বলতো—‘ সকালের রোদ ঘরে ঢোকাতে হয়,একমাত্র রোদই পারে ঘরের মধ্যে তৈরি হওয়া জীবাণুদের মারতে’। উঠে বসে ঝুমঝুমি, এখন ছুটিই ছুটি তাই এখন আর বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর আয়েসটা বেঁচে নেই। ঝুমঝুমি ওর একমাত্র সম্পত্তি বালিশটা হাত দিয়ে থাবড়া থুবড়ি দিয়ে রোদের মধ্যে ফেলে রাখে। পুজোর ঠিক আগে আশ্বিনে রোদে মা বালিশ-বিছানা, আলমারির জামা-কাপড়, বই খাতা সব রোদে দিত। আর ওরা দুইবোন, যেন পুরানো জিনিসের মাঝে নতুন কিছু আবষ্কারের চেষ্টায় লেগে থাকতো। উফ্! সেবার তো পোঁটলা খুলতেই বেরিয়ে এসেছিল একটা বড় সাপ। ভাই তখন খুব ছোটো। ভাই, ভাইয়ের কথা মনে হতেই দু’চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে এলো জল।এই ক’বছরে ও অনেক বড় হয়ে গেছে। বিয়ের বয়স কি হয়ে গেল? হিসাব করতে লাগলো ঝুমঝুমি। না, মাঝপথেই থেমে গেল। কি হবে? ভাবতে ভাবতে দৃষ্টি উদাসী...ঘারের কাছে উষ্ণ স্পর্শ। মিঠু, ওর হাতে ধরা স্টিলের থালা আর গ্লাস। ঝুমঝুমি ওর দিকে মুখ ফিরাতেই বললো—‘ চলো বন্ধু, বেশি দেরি হলে চা আর টিফিনটা আর পাবো না। রাতে ভালো করে পেট ভরে নি। খুব খিদে পেয়েছে গো। কত্ত করে বললাম, আর একটা রুটি দাও কিছুতেই দিলনা!
কেমন যেন
করুণায় ছেঁয়ে গেল ঝুমঝুমির মনটা। মানুষটার মুখের মধ্যে এক অদ্ভূত মায়া মাখানো। ঝুমঝুমি
থালা আর গ্লাস হাতে ওর দিকে তাকাতেই মুখ জুড়ে একটা মায়াবী হাসি ছড়ালো, তারপর ওর
হাতের ফাঁক দিয়ে নিজের হাত গলিয়ে বললো, ‘চলো এবার’। সামান্য দু’পা হেঁটে দু’জনে
গিয়ে দাঁড়ালো খাবার দেওয়ার জানালার সামনে। একখানা গ্লাস রুটি আর হাফ গ্লাসের একটু
বেশি লিকার চা। ওরা খাবার নিয়ে গিয়ে বসলো ছাতিম গাছের নিচে। মিঠু নিমেষে রুটিটা
শেষ করতেই ঝুমঝুমি ওর নিজের পাঁউরুটি থেকে কিছুটা নিয়ে মিঠুর হাতে দিয়ে বললো, ‘
এবার থেকে পেট না ভরলে আমাকে বলবে বেশ’। মিঠু পাঁউরুটি চিবাতে চিবাতে মাথা নাড়লো।
ঝুমঝুমি চিরটা কাল তো এভাবে ভাগ করেই খেতে শিখেছে। বাড়ির বড়দের যা যা ভাগ করতে হয়,
সব ও পারে। কতদিন এমন হয়েছে ভাই নিজের ভাগের ডিমটা খেয়ে নিয়ে ওর ভাগেরটাও তুলে
নিয়েছে। রুমঝুম কে, কি না দিয়েছে ও...সব ...সব দিয়েছে। পুজোতে কেনা ওর সব থেকে
প্রিয় জামাটা, লিপস্টিক, জুতো,শেষ পর্যন্ত নিজের স্বপ্নগুলোও। ভাগ দিতে দিতে নিজেই
একদিন খন্ড খন্ড হয়ে এসে পৌঁছেছে একটুকরো বন্দি আকাশের নিচে। উফ্! যন্ত্রণা, কি
ভীষণ যন্ত্রণায় তোলপাড় করছে ওর শরীরটা। হারিয়ে যাচ্ছে কি ঝুমঝুমি? অন্ধকার ঘরে
নেগেটিভ থেকে যে ভাবে ছবি তৈরি হয়,ঠিক তেমনি কিছু যেন। কানটা কেমন যেন বোঁ বোঁ করছে---
৩
‘মিস্
বিশ্বাস,’ বোঁ বোঁ শব্দে কানের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে গলাটা। একটা সাদা ছোটো ঝুল
জামা, হাঁটু পর্যন্ত সাদা মোজা, পায়ে সাদা পামসু। চেয়ারটা দুলছে খুব জোড়ে জোড়ে
দুলছে। ঝুমঝুমিও দুলছে।
‘মিস্
বিশ্বাস, স্যার আপনাকে ডাকছে’।
উঠে দাঁড়ালো
ঝুমঝুমি। ডঃ ঘোষের কেবিনের হাতলটা চাপ দিতেই মুখের উপর এসে পড়লো
একগুচ্ছ কাগজ।
‘হোয়াট ইজ্
দিস? এসব আপনি কি লিখেছেন? এটা কি আপনার নাট্যশালা বলে মনে হচ্ছে? প্লিজ্ গিভমি
দ্যা আনসার’।
নিরুত্তর
ঝুমঝুমির কোনো উত্তর মাথায় আসছে না। নিজের মনের অজান্তেই স্টকের খাতায় এসব কি
লিখেছে, কখন লিখেছে কিছুই ওর মনে পড়ছে না,
শুধু ওর চোখ আর মন জুড়ে ভেসে উঠছে গতকালের সেই ভয়ঙ্কর অনুভূতির কথা।
অন্ধকার ঘর দেখে সোজা ঢুকে পড়েছিল জুবিনের ঘরে। ছোট্ট নিল আলোর নিচে দেখেছিল সে
দৃশ্য। দেখেছিল ওর বোন রুমঝুমের পাকা গমের মত উজ্বল সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরের উপর
জুবিনের নগ্ন শরীরটাকে। দেখেছিল দুটি নগ্ন শরীরের আশ্লেষে আলিঙ্গনরত উদ্দাম যৌনতার
আনন্দে ভাসা। জীবনের সবথেকে বড় স্বপ্নটাও সেদিন ও ভাগকরে ছিল, শুধু বইতে পারেনি
নিজেকে। অন্ধকার... অন্ধকার আর কিচ্ছু মনে পড়ছে না ঝুমঝুমির শুধু তীব্র যন্ত্রণার
অনুভবটা ছাড়া। আবার ডাকটা...
‘মিস্ বিশ্বাস,
স্যার আপনাকে ডাকছেন’। দু’ঘারে তীব্র ঝাঁকুনি খেল ঝুমঝুমি। ফিরে এলো অতীত থেকে।
সাদা ছোটোঝুলের স্কার্ট,সাদামোজা আর সাদা পামসু পড়া নার্সটি তখনও ঝুমঝুমির মুখের
দিকে তাকিয়ে। ঝুমঝুমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। নার্সটি মিঠুকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘
তোমাকে আজ হোমে পাঠানো হবে। তুমি গিয়ে দাঁড়াও ওই বারান্দায়’।
৪
ঝুমঝুমি
লম্বা করিডর ধরে হেঁটে চলেছে, পিছনে সেই নার্সটি ও একটি ওয়ার্ডবয়। হয়তো এখনও ওকে
ঠিক সুস্থ বলে বিশ্বাস করতে পারছে না ওরা। ঝুমঝুমি মনে মনে ভাবে কেমন হয় ঠিক এখনি
একবার পাগল হওয়ার ভান করলে। যদি হঠাৎ এখনই হা –হা –হা করে হেসে ওঠে একবার? এসে
দাঁড়ায় ডাক্তারের চেম্বারের সামনে। জানে, মানে অনুমান করতে পারে ঠিক কি কারণে ওকে
এখানে ডাকা হয়েছে।
স্যার, আমায়
ডেকে ছিলেন?
ডঃ ঘোষ পিছন ঘুরে ফাইলের তাকে কি যেন
খুঁজছিলেন। ফিরে তাকালেন ঝুমঝুমির দিকে। বছর তিরিশের ঝকঝকে যুবক।
হ্যাঁ, মিস্ বিশ্বাস। বসুন ওই চেয়ারটায়।
না, ঠিক আছে। আপনি বলুন।
আপনাকে তো বেশ ফ্রেশ মানে ঝকঝকে
দেখাচ্ছে। তার মানে আপনি একদম ঠিক আছেন। কি ঠিক বললাম তো?
হ্যাঁ, আপনি যখন বলছেন তখন ঠিকই বলছেন নিশ্চয়,
আপনি ডাক্তার আপনি তো আমার থেকে বেশি ভালো জানবেন তাই না?
হুমম্ , আপনার তো দেখছি ডাক্তারের উপর ভীষণ
আস্থা। ইয়েস, আমি বলছি আপনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
আপনি কি শুধু এটা বলার জন্যই আমাকে ডেকে ছিলেন?
না , একটা অন্য কারণ আছে।
আমি জানি।
আপনি জানেন? কি বলুন তো?
হাসপাতাল থেকে পাঠানো তৃতীয় চিঠির
কোনো উত্তর আমার বাড়ির লোক পাঠায়নি তাই তো?
উত্তর আসে নি বললে ভুল হবে। এসেছে
একটা উত্তর। তবুও আমি একবার শেষ চেষ্টা করতে চাই, আমার ব্যক্তিগত জবানিতে নিজের
হাতে লেখা একটা চতুর্থ চিঠি পাঠাতে চাই আর সেখানে আপনি নিজের হাতে কিছু লিখুন, এই
জন্যই আপনাকে ডাকা মিস্ বিশ্বাস।
ঝুমঝুমি টেবিলের পাশ থেকে সরে এসে
দাঁড়ায় খোলা জানালার ধারে। কিছুক্ষণ নিরবতা! যেন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে মনে মনে।
আচ্ছা
স্যার, আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন আমি পুরোপুরি সুস্থ?
হ্যাঁ,
অবশ্যই, আপনি এখন একশ শতাংশ সুস্থ। আর শুধু সুস্থই নয়, আপনার মত শিক্ষিত মেয়ে
বাইরে গেলেই যে কোনো চাকরিতে ঢুকে নিশ্চিন্তে উপার্জন করতে পারেন। বিয়ে করে নিজের
সংসার করতে পারেন। এতটাই সুস্থ আপনি। কিন্তু কিছুতেই আমি বুঝতে পারি না পেসেন্টের
বাড়ির লোক কেন সে কথা শোনে না, বোঝে না। কেন তাদের পরিবারের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় না। আপনাদেরও সমাজের মূল
স্রোতে ফেরার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। বড় অসহায় লাগে মাঝে মাঝে জানেন।
আপনি সত্যি
বলছেন ডাক্তার, আমিও বিয়ে করে সংসার করতে পারি?
নিশ্চয়, যে
কোনো সুস্থ শিক্ষিত ছেলেই আপনাকে বিয়ে করতে চায়বে। আপনার মত এত মিষ্টি মেয়েকে কি
কেউ সহজে ফেরাতে পারে? আপনার তো আর কোনো অসুখ নেই। শুধু একটা দশ টাকার ওষুধ আপনাকে
সারা জীবন খেয়ে যেতে হবে। এটাতো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, যার হার্টের অসুখ আছে,
যার থায়রয়েড আছে, ক্লোলেস্টোরেল আছে তাদেরও তো সারা জীবন এর থেকে অনেক দামি ওষুধ
খেয়ে যেতে হয়।
ঝুমঝুমি ধীর
পায়ে এগিয়ে আসে ডাঃ ঘোষের টেবিলের কাছে। তারপর ডাক্তারের দিকে তাকায়।
আচ্ছা
ডাক্তার, আপনার কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে? ভালো বাসেন কাউকে?
না, মিস্
বিশ্বাস, পেসেন্টদের ভালো বাসতে বাসতে ব্যক্তি জীবনের ভালোবাসার কথা ভাবার আর
অবকাশ পেলাম কোথায়?
জানেন এখন
আমি একজনকে খুব ভালোবাসি, মানে বলতে পারেন তার আচরণ, কথাবলা এসব দেখে আমি তাকে
ভালোবেসে ফেলেছি।
তাই মিস্
বিশ্বাস? এটাতো আরো ভালো লক্ষণ, মানে আপনি তো জীবনে ফিরতে চায়ছেন। বলুন সে কে ? দরকার হলে আমি নিজে তার সাথে কথা বলবো। অন্তত একজনকেও যদি সমাজের মূলস্রোতে
ফিরতে সাহায্য করতে পারি নিজেকে বড় হালকা মনে হবে।
ঝুমঝুমি
একটা অদ্ভূত হাসি ছড়িয়ে বলে, ‘যে সবথেকে বেশি বিশ্বাস করে, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ,
আমারও সমাজের মূলস্রোতে ফেরার অধিকার আছে। আমি তাকে ভালোবাসি ডঃ ঘোষ’। মুখটা একটু
নামিয়ে ডাক্তারের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘ যদি বলি আমি আপনাকে ভালোবাসি। পারবেন
ডাক্তার বাবু? পারবেন আমাকে বিয়ে করে বাকি জীবনটা আমার সাথে সংসার করতে?’
ঝুমঝুমি আবার
ফিরে আসে খোলা জানালাটার কাছে। করিডরের শেষপ্রান্তটা এখান থেকে স্পষ্ট দেখা
যাচ্ছে। মিঠু দাঁড়িয়ে আছে,পাশে আরো কয়েকটা মেয়ে। এদের প্রত্যেকেরই আর বাড়ি ফেরা
হবে না তাই, হোমে পাঠানো হচ্ছে।
ক্ষণিক
নিরবতার পাহাড় ঠেলে ভেসে এলো ঝুমঝুমির গলা। এত কি ভাবছেন ডাক্তার? আপনি তো বিবাহিত
নন, তবে আর বাঁধা কোথায়? আমি শিক্ষিত, সুন্দরী আর আপনি তো ভালো করেই জানেন আমি
সম্পূর্ণ সুস্থ্। শুধু জানেন না, এটাই বিশ্বাস করেন। কি তাইতো? বিশ্বাস করেন তো?
ঝুমঝুমি,
আমাদের ডাক্তারি পরিভাষায় এটাই সত্য যে, আপনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু এতবড় একটা
সিদ্ধান্ত কি এভাবে নেওয়া যায়?
কিভাবে
নেওয়া যায়? ঘরে বসে চায়ের কাপ হাতে নাকি প্লেটে সাজানো মিষ্টি খেতে খেতে?
থাক
ডাক্তারবাবু, হেসে ওঠে ঝুমঝুমি। আপনার কপাল থেকে ঘামটা মুছে নিন। একটা কাগজ আর পেন
দিন তো,আপনেকে দায় মুক্ত করি যাওয়ার আগে। আমার জন্য কারোর কাছে আপনাকে জবাব দিতে
হবেনা,এই রইল আমার হলফনামা।
ঝুমঝুমি করিডর
ধরে ছায়ামূর্তির মত এগিয়ে চলে মিঠুর কাছে। কারোর জন্য, কারোর আশ্রয় হয়ে বাঁচবে ও
এখন থেকে, একটা নিজের পৃথিবী একটা অন্য মানুষের পৃথিবীতে। ডাক্তারের কানে বাজতে
থাকে ঝুমঝুমির শেষ প্রশ্নটা ---- ‘ ডাক্তারবাব,সত্যি করে বলুনতো অসুস্থ আসলে আমরা
না এ সমাজ?’ মিঠুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ঝুমঝুমি। হাঁটতে থাকে উন্মুক্ত পৃথিবীর
পথে। ক্রমশ দূরে আরও দূরে সরে যেতে থাকে দুটি ছায়া, ওরা আঁধার পেরিয়ে ছুটে চলা এক
আলোর পথযাত্রী।
No comments:
Post a Comment