Translate

Sunday, 15 August 2021

refreshing green view of mizoram (পাহাড়ি জাতির ভূমি, মিজোরাম তুমি)

 

পাহাড়ি জাতির ভূমি মিজোরাম তুমি-- {refreshing green view of mizoram }

কোলকাতা বিমানবন্দরে ঢুকে মিজোরাম [mizoram] ফ্লাইটের টিকিট কনফরমেশন লাইনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা ছ’জন। বেশ লম্বা লাইন সামনে। এক মহিলা কাউন্টারের পিছন থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন,আপনারা নিশ্চিত তো যে,  মিজোরামেই যাচ্ছেন’যেহেতু প্রশ্নটা ছিল ইংলিশে তাই উত্তর বললাম, ‘ইয়েস’। মহিলা ‘ওকে’ বলে চলে গেলেন। পোশাক দেখে অনুমান করলাম তিনি বিমানবন্দরের কর্মী। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু আমাদেরই করা হল কেন? বেশ কিছুক্ষণ পর নজরে এল ঐ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্যাসেঞ্জারের মধ্যে আমরা ছ’জন ছাড়া আর একজনও বাঙালি নয়। সবাই অল্প বয়সের মিজো তরুণ-তরুণী। সকলেই খ্রিস্টমাসের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে আর আমরা যাচ্ছি ভ্রমণে। ওরা মিজো ভাষায় একে অপরের সাথে কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে।
<title>refreshing green view of mizoram</title>
সবুজ মিজোরাম [green mizoram]


 সিট নাম্বার হাতে পেয়ে মাথায় হাত। ছ’জন ছয় জায়গায় বসতে হবে। সমস্যা আমার ছেলেকে নিয়ে, সদ্য সাতে পদার্পণ করেছেন তিনি। এহেন বিশাল ব্যক্তি তো একা বসতে হবে শুনেই কাঁদো কাঁদো প্রায়। যাক, আশার কথা হলো আমার বাঁপাশের মিজো তরুণীকে অসুবিধার কথা জানাতেই সে সিট পরিবর্তনে রাজি হয়ে গেল। আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। মন জুড়ে তাই বেশ একটা ভালো লাগার আবেশ! জানালার ধারে বসে এক সুদর্শনা মিজো তরুণীমিনিট দশেক উড়েছি আকাশে। একঘণ্টার পথ মিজোরামের রাজধানী আইজলের ‘লেংপুই’ এয়ারপোর্ট। দশ মিনিটেই সামনে রাখা নিয়মাবলী পড়া হয়ে গিয়েছে। বাকি পঞ্চাশ মিনিট কি এভাবেই চুপচাপ বসে কাটবে? পাশের জনের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু শুরু করি কীভাবে? ভাবতে ভাবতেই সিটবেল্টটা খোলার চেষ্টা করছি। হঠাৎ মেয়েটি জানতে চাল ‘এনি প্রবলেম? ক্যান আই হেল্প ইউ?’
আমি বললাম, নো নো। যাক ইংরাজিতেই কথা বলছে সে। আমার বিদ্যা দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পার, তবে হিন্দি হলে একটু ভালো হত। নাম জিজ্ঞাসা করলাম,
সে উত্তর দিল, মিনো... মানে বাংলায় আমরা বলি মিনু।
কথায় কথায় জানতে পারলাম সে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাড়ি ফিরছে। সেখানে চাকরি করে। তবে বেচারার মন ভীষণ খারাপ।  লাগেজের ওভার ওয়েটের জন্য তাকে অতিরিক্ত বারো হাজার টাকা দিতে হয়েছে কোলকাতা এয়ারপোর্টে। অল্প সময়ের মধ্যেই মিনোর সাথে বেশ ভাব হয়ে গেল। ওর কাছেই শুনলাম খ্রিস্টমাসের দু’দিন আগে বাজার বন্ধ হয়ে যায় পুরো মিজোরামেঐ শেষ দিন নাকি বাজারে এত ভিড় হয় যে একটা পা রাখার জায়গা হয় না। তারমানে আমরা গিয়ে বাজার খোলা পাব। তবে এমনিতেই সাড়ে দশটার ফ্লাইট দেরি করে দুটো তিরিশে ছেড়েছে। সময় মতো পৌঁছাতে পারব তো! তিনটে পনেরো হবে, তখন ফ্লাইট মিজোর আকাশে উড়ছে। মিনুর পাশের জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখতেই বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। 
উপর থেকে পাহাড় ঘেরা অপরূপ মিজোরামকে দেখা যাচ্ছে ছবির মতো। চারিদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা, মাঝে সরু সুতোর মতো বয়ে চলেছে নদীএটাই কি তালং নদী! প্লেন যত নিচে নামতে লাগলো সেই ছবি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। অবশেষে প্লেনের চাকা মিজোরামের মাটি স্পর্শ করল। প্লেনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার আগে সামনে তাকিয়ে দেখলাম সূর্যটা ক্রমশ পাহাড়ের পিছনে লুকাচ্ছে। পড়ন্ত দুপুরে পাহাড়ের কোলে সূর্যের ঢলে পড়া, এছবি তো কত এঁকেছি ড্রয়িং খাতার পাতায়,কত দেখেছি পাহাড়ে ভ্রমণের সময়, তবু কেন যেন মনে হল এ ছবি একেবারে আলাদা নতুন! আসলে মিজোরাম সত্যিই তো একেবারেই আলাদা। ছিমছাম ছোট্ট এয়ারপোর্টের বুকে দাঁড়িয়ে ভাবছি এই তবে মিজোরাম! কত মন্দ কথা-ই না শুনেছি এর নামে।
লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে এসে ফোন করতেই ‘পুঁইয়া’ ভাই এগিয়ে এসে ট্রলিটা হাতে নিল তারপর গাড়িতে। মিজোরামে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে “অরিনি” হোটেলে। সবই অনলাইন বুক করা সরাসরি, কোনো সংস্থার মাধ্যমে নয়। তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝলাম এই জায়গায় নিজে অনলাইন হোটেল বুককরা সত্যিই কঠিন ব্যাপার। সাইটে দেওয়া কোনো ফোন নাম্বারই কাজ করে না।
হোটেল থেকে আমাদের জন্য দুটি গাড়ি পাঠানো হয়েছিল। একটির ড্রাইভার পুঁইয়া জি আরেকজন অল্পবয়সের জোচং।  দুজনেই মিজোরামের স্থানীয় মানুষ। পুঁইয়া জির গাড়িতে বসেছি সবে, হঠাৎ একটা ফোন এল ‘ আপলোগ কাঁহা হ্যয়? গাড়ি লেকে খাড়ে হুঁ এয়ারপোর্টকে বাহার’।
 মানে? চমকে উঠলাম আমরা। আমাদের সহযাত্রী পরিবারটি তো উলটো দিকের পার্কিং এ দাঁড়ানো গাড়িটিতে চেপে গিয়েছে ইতিমধ্যে! তবে ইনি কে? তবে যা শুনেছিলাম মিজোরাম সম্পর্কে সেটাই কি ঠিক! ওরা কি কিডন্যাপড? ক্ষণিকের জন্য কেমন যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। আমাদের মুখের অবস্থা দেখে পুঁইয়া জি কিছু আন্দাজ করলেন হয়তো। দেখলাম তার মধ্যে নিজেদের প্রমাণ করার কি ভীষণ তাগিদ। বললেন, ‘ডোন্ট ওয়ারি’। তারপর আমাদের সোজা পার্কিং এর বাইরে দাঁড়ানো ওনার সঙ্গী গাড়িটির কাছে নিয়ে গেলেন। 
  দেখলাম ওরা নিশ্চন্তে বসে আছে গাড়ির ভিতর। আসলে একটা গন্ডগোল বোধহয় হোটেলেই ঘটেছে। ওরা দ্বিতীয় কোনো ড্রাইভারকেও আমাদের নাম্বার দিয়ে স্টেশনে পাঠিয়েছে।  যাই হোক গাড়ি ছুটে চলেছে লেংপুই এয়ারপোর্ট থেকে মিজোরামের রাজধানী আইজলের পথে। ঘন্টাখানেকের রাস্তা। আঁকাবাঁকা পথের কোথাও বাঁপাশে কোথাও ডানে ভেজা ভেজা সবুজ বুকে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় আর খাঁজে খাঁজে বাঁশ বা কাঠের খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে টিনের তৈরি মিজো হাউস। এদৃশ্য ঠিক কলমে প্রকাশের নয়। যদিও প্রচ্ছন্ন একটা দারিদ্রতার চিহ্ন রয়েছে তবু মনমোহিনী প্রকৃতি এখানে উদার হস্তে বিতরণ করেছে সবুজ।
<title>refreshing green view of mizoram</title>
সাধারণ মিজোবাড়ি


পথের পাশে ছোট্ট একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি। একমুখ বলিরেখা নিয়ে বসে আছে এক মিজো মহিলা। পুঁইয়াজি টাকা এগিয়ে দিয়ে বলল,’তাম্বুল’। মহিলা টাকা নিয়ে এগিয়ে দিল ছোটো প্যাকেটে কাটা গুটিকয় সুপারি। এখানে সুপারিকে তাম্বুল বলে। আইজলে ঢোকার মিনিট দশেক আগেই হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ যেতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! পাহাড়ের কোলে একটি আকাশ কেমন লালচে রঙে সেজেছে। সন্ধে হয়ে আসছে। রাস্তার অবস্থা খুব ভালো নয়।

 ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মত মিজোরাম যে উপেক্ষিত সেটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। হঠাৎ আবার গাড়ি দাঁড়েতেই দেখলাম সামনে সুদীর্ঘ গাড়ির লাইন।  সেখানেই শুনলাম,সন্ধের মুখে এমন একটু হয় তবে তেইশে ডিসেম্বর বলে আরও বেশি। সব গাড়ি ফিরে আসছে আগামী কয়েকদিন আর কোনো গাড়ি বাইরে বেরোবে না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই দেখলাম এক মজার দৃশ্য। পেট্রলপাম্পের সমনেই ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল।  আমাদের হোটেল আইজলেরে আপার খাটুয়া বলে একটি জায়গায়,যেখানে হাঁটা দূরত্বেই আছে রাজভবন।
 আইজল পৌঁছে বুঝলাম সন্ধে হলেই এখানে বাজার-হাট বন্ধ হয়ে যায়। চারিদিকে বন্ধ দোকান রাস্তাও বেশ ফাঁকা। সাড়েছ’টা নাগাদ হোটেলে পৌঁছালাম। রাস্তার একেবারে উপরেই। ভিতরে যেতেই একটি ছেলে এসে আমাদের জিনিস নিয়ে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। হোটেলের সব ঘরই নিচে। সুন্দর বিশাল বড় রুমবসার আর ঘুমানোর জায়গা আলাদা। প্রতিবারের মত এবারও তাই হল। পথের ক্লান্তি মোটেও কাবু করতে পারেনি। জিনিস রুমে রেখেই সবাই চলে গেলাম উপরে রিসেপশনে। একটু রাস্তায় হাঁটব। হোটেলের ম্যানেজার জানালেন, ‘কুছ খরিদনা হ্যয় তো আজ হি খরিদ লি জিয়ে। কাল সে ফার্স্ট জানুয়ারি তক দুকান বাজার বন্ধ রহেগা’। 
মানে? আমরা তবে বাজার করব কি করে? বললাম চব্বিশ তারিখও খোলা থাকবে না? সে জানাল পুরো বড়দিনের ছুটির দশদিন এখানে সব বন্ধ থাকে। ঘুরতে যেতে পারব তো? না সে বিষয়ে সংশয় নেই, কারণ পুঁইয়া জি আমাদের হোটেলে ড্রপ করার সময় একটা গাছের পাকা পেঁপে দিয়েছেন আর বলেছেন কাল এসে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবেন।
পাহাড়ের গা কেটে কংক্রিটের শহরে কালো পিচের রাস্তায় নিঝুম শীতল সন্ধ্যা। সোয়াটারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছি আমরা। এ তো শুধু হাঁটা নয়, সন্ধের মিজোরামকে যেন গায়ে মাখছি। শুকনো খাবারের সাথে খুশির আবেশ পকেটে ভরে হোটেলে ফেরার পর কীভাবে যেন কেটে গেল একটা রাত!
<title>refreshing green view of mizoram</title>
হোটেল অরিনি


সুন্দর একটা নরম ঘুমের সমাপ্তি ঘটল ধোঁয়াওঠা চায়ের কাপের সাথে। স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই দেখলাম, গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জোচং আর আরেকজন। পুঁইয়াজি পাঠিয়েছেন। আমাদের গন্তব্য ‘রেইক হিল’ ঘন্টাখানেকের রাস্তা। গাড়ি ছুটছে নিঃস্তব্ধ সবুজের মাঝ দিয়ে। এত ঘুরেছি পাহাড়ে কিন্তু এত সুন্দর পথ সত্যিই কোথাও দেখিনি! 
এখানে পথ নিজেই দর্শনীয়দু’পাশে ঘন সবুজ গাছের সারি নিবিড় ছায়াঘেরা অরণ্য পথ, মাঝে মাঝে ঠিক ছবির মত জেগে থাকা জনপদ গুটিকয় টিনের বাড়ি সবুজ গাছে ঘেরা। একটা ছোট্ট লোহার পাতের ব্রিজ পেরিয়ে থেমে গেল গাড়ি। আমরা নেমে ব্রিজের উপর এসে দাঁড়ালাম। ঘন সবুজ স্বচ্ছ কাচের মত বয়ে চলেছে ‘তালং নদী’। অপরূপা শুধু নদী নয়, তার দুইপাড় কী যে ভীষণ সুন্দর বলে বোঝানো সম্ভব নয়। দূরে, আরও দূরে শুধু দৃষ্টি হারাতে চায়!
<title>refreshing green view of mizoram</title>
তালং নদী


 নদীর সাথে একাত্মতা আমার চিরকালের। কান পাতলেই মনে হয় যেন ডাকছে ‘আয়, ছুঁয়ে যা আমায়’। তালং ও আমায় ডাকল। ইচ্ছার এক প্রবল শক্তি আছে। যাকে স্পর্শ করা যায়না,তাকে মন দিয়ে অনায়াসেই স্পর্শকরা যায়। আর মাত্র কিছুটা পথ পেরিয়ে গাড়ি এসে দাঁড়াল সবুজে ঘেরা একটা সুন্দর কটেজ কম্পাউন্ডের মধ্যে। এটাই রেইক ট্যুরিস্ট লজ। সব কটেজে তালা লাগানো। খ্রিস্টমাসের ছুটিতে লজ বন্ধ থাকে। মনে পড়ে গেল ফোন করেছিলাম এখানে। জোচং বলল, ‘রেইক হিল’ সামনে। প্রায় দু’কিলোমিটার পায়ে হেঁটে যেতে হবে জঙ্গলের পথে। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। সরু মাটির চড়াই রাস্তা জঙ্গলের বুক চিঁড়ে এগিয়ে গিয়েছে সামনের পথে। আমরা হাঁটছি দু’পাশে ঘন জঙ্গল। এ জঙ্গলের প্রকৃতি আমাদের কিচ্ছু জানা নেই। শুধু নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না। মাঝে মাঝে একটা কি যেন পাখি দূর থেকে ডেকে চলেছেএকটা প্রতিধবনির মত গোটা জঙ্গল ঘুরে সে ডাক যেন এসে ধাক্কা মারছে আমাদের কর্ণকূহরে। পথ বেশ চড়াই।পায়ের পাশিতে টান ধরছে, বুকেও মাঝে মাঝে চাপ লাগছে। একটু দাঁড়িয়ে আবার হাঁটছি আমরা। সহযাত্রী পরিবারের দু’জন আর পারল না। আমরা দুজন, আমার ছেলে আর রূপাদির মেয়ে এগিয়ে চললাম। সবার থেকে নিজেকে ক্ষণিক আড়াল করে কান পাতলাম জঙ্গলের বুকে। একটা গাছের ঝুঁকে পড়া ডালে হাত বুলিয়ে রেখে দিলাম স্পর্শ। অজস্র ফিসফিস যেন বাতাসে উড়ছে। মনে হল দু’হাতে আঁকড়ে ধরি এ বৃহৎ জঙ্গল, মিশে যায় এই নিঃশব্দ প্রকৃতির মাঝে। এক কি.মি. হাঁটার পর দেখলাম জঙ্গলের মাঝে রয়েছে একটি কবরস্থান আর একটি খালি জিপ দাঁড়িয়ে। সামনে দুটো রাস্তা। তারই একটা ধরে আরও সামনে দুই কি.মি আন্দাজ এসেগিয়েছি প্রায়। সামনে পথ বন্ধ আর এগোনোর জায়গা নেই। একটা বিশাল অর্ধাকৃতি গুহা পাহাড়ি পথের শেষে পথ আটকে দাঁড়িয়ে। বুঝতে পারলাম না ঠিক কোন পথে এগোলে নিচের অনন্ত বিস্তৃত ভ্যালিটি দেখতে পাব। কেমন যেন গা টা ছমছম করে উঠল। না এবার ফিরতে হবে সেই দু’কিলোমিটার পথ।
রেইক লজ


লজের রেস্টুরেন্টে ঘন দুধের চা পান করে ফেরার পথে ছুটে চললাম। এবারে ক্ষণিকের জন্য আমাদের ড্রাইভার চেঞ্জ হল। আসলে জোচং একজন খুব ভালো গায়ক। পাহাড়ি বনপথ,ঢালের রাস্তা, দু’ধারে গাছের সারি, ছুটে চলেছি আমরা জোচং গেয়ে চলেছে সুন্দর পাহাড়ি সুরে মিজো ভাষায়। সুরের কাছে সব ভাষা মিলামিশে এক। জোচং একেবারেই হিন্দি জানে না তবে অরিজিৎ সিং এর একটা হিন্দিগান শিখেছে, মানে বোঝে না গানের, তবে সুরটা ওর খুব প্রিয়

ক্রমশ.... পরের পর্বে থাকবে আদিম মিজো মানুষের সমাজজীবন। কোনও গ্রন্থ সংগৃহীত তথ্য নয়

@রুমকি রায় দত্ত

refreshing green view of mizoram 

Saturday, 7 August 2021

the hidden agenda of veg chanadal recipe নিরামিষ চানাছানা

 

শনিবারের স্বাদ

নিরামিষ মানেই গৃহিণীদের কপালে ভাঁজ। বিশেষ করে বাঙালি পরিবারে মাছ ছাড়া চলেই না যেন। হাঁড়িতে একমুঠো কম চাল নেওয়ার দিন। সেইসব গৃহিণীদের জন্য মজাদার “নিরামিষ চানাছানা” বাড়িতে থাকা সামান্য উপকরণেই বাজিমাত।

নিরামিষ চানাছানা(chanadal recipe):

উপকরণঃ


উপকরণ
 veg chanadal recipe

                                                       

এককাপ ছোলার ডাল/ পঞ্চাশগ্রাম ছানা/ ক্যাপসিকাম / টমেটো ১টা পেস্ট করা / ১ চামচ জিরে গুঁড়ো/ ১ চামচ ধনে গুঁড়ো/হলুদ/ শুকনো লংকা ২টো/ আদা/ গোটা গরম মশলা--- হাফ ইঞ্চি দারচিনি, ২টো এলাচ.২টো লবঙ্গ /  তেজপাতা ২টো/ গোটাজিরে ফোড়নের মতো/ ঘি / কিশমিশ / ডুমো করে কাটা আলু / গুঁড়ো গরমমশলা।

প্রণালীঃ

 পর্ব ১ঃ   তেল গরম হলে কেটেরাখা আলু ভেজে নিয়ে তুলে রাখতে হবে।

 পর্ব ২ঃ তেলে তেজপাতা,গোটাজিরে,গোটা গরম মশলা,শুকনো লংকা, ফোড়ন দিতে হবে। হালকা গন্ধ বেরোলে, সামান্য হাফ চামচ চিনি তেলে দিয়ে, ওতে টমেটো পিউরিটা দিয়ে কিছুক্ষণ কষাতে হবে।

পর্ব ৩ঃ মশলা হাফমজা হলে,ক্যাপসিকাম ও বাকি সমস্ত মশলা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কষাতে হবে মশলাটাকে। তেল ছেড়ে এলে ওর সাথে ভাজা আলু আর আগে থেকে ভিজানো ছোলার ডালটা দিয়ে আরও বেশ খানিকক্ষণ কষাতে হবে। তেল ভালোমতো বেরিয়ে এলে,ওর মধ্যে ছানাটা যোগ করে সামান্য নাড়াচাড়া করার পর প্রয়োজন মতো জল দিয়ে ঢাকা দিতে হবে। মিনিট কয়েক পর, প্রায় ঘন থকথকে হলে রান্না প্রস্তুত। নামানোর ঠিক আগে এক টেবিল চামচ ঘি ও গরম মশলা ছড়িয়ে একটু নেড়ে মিশিয়ে দিতে হবে।

<META NAME="Title" CONTENT="veg chanachana recipe">
নিরামিষ চানাছানা 
veg chanadal recipe

প্রস্তুত মজাদার চানাছানা। বাড়িতে থাকলে একচামচ পরিমান বাসিল পাতা ছড়িয়ে ঢাকা দিয়ে রাখতে হবে। তারপর গরম গরম পরিবেশন। খাবার টেবিলে ঢাকনা খুললেই গন্ধে জিভে জল।  

 

 

Wednesday, 28 July 2021

আমফান— আমের তৈরি মিষ্টান্নdelicious mango dessert mabe by milk meta

 

আমফান—আমের তৈরি মিষ্টান্ন    

রুমকি রায় দত্ত

মুর্শিদাবাদের নবাবের আমপ্রিয়তার কথা কে, না-জানে। তিনি নাকি সারাবছর আম খেতেন। বিস্তীর্ণ বাগানজুড়ে আমগাছে রাশি রাশি আমের ফলন। সুস্বাদু রসালো সেই আম সংরক্ষণ করা থাকত পিপে ভর্তি ঘিয়ের পাত্রে ডুবিয়ে। ঘি ভালো সংরক্ষক। মহাভারতে গান্ধারীর অপরিণত গর্ভের ১০১টি মাংস পিণ্ড দুইবছর ধরে সংরক্ষিত ছিল ঘিয়ের পাত্রে।

কিন্তু বর্তমান সময়ে সারাবছর আমের স্বাদ পাওয়ার জন্য আর ঘিয়ের প্রয়োজন নেই। এখন কোল্ড স্টোরে সংরক্ষিত আম সারাবছর-ই বাজারে মেলে। তাই আমফানের স্বাদ নিতে গ্রীষ্মের অপেক্ষারও প্রয়োজন নেই।

আজ রইল ফলের রাজা আমের তৈরি সুস্বাদু ডেজার্ট #আমফান


<title>mango dessert aamfun</title>
<meta name= " />
আমফান--আমের মজা


  • উপকরণঃ  ১০০গ্রাম গোবিন্দভোগ চাল, ১লিটার দুধ, একমুঠো রোস্টেড সিমুই, তিনটি পাকা ল্যাংড়া আমের পাল্প ( সুগন্ধী যে কোনও আম ব্যবহার করা যেতে পারে), মিহি কাটা আমন্ড ও কাজু বাদাম, বড়ো দু-চামচ ঘি, চিনি পাউডার ( দানাও চলবে), ৫০ গ্রাম খোয়া (ক্ষীর) অবর্তমানে ৫০০লি দুধ ঘন করেও বাড়িতে করা ক্ষীর চলবে। একচিমটে কেসর। 
  • প্রণালীঃ
  • পর্ব ১ ঃ চাল জলে ধুয়ে আধঘন্টা রেখে জল শুকিয়ে মিক্সিতে গুঁড়ো করে  নিতে হবে। দানাদার হতে হবে। মিহি হলে চলবে না।
  • পর্ব ২ ঃ কড়াই-তে ঘি দিয়ে,গুঁড়ো চাল আর সিমুই হালকা নেড়ে নিতে হবে। এবার আগে থেকে ফুটিয়ে রাখা এক লিটার দুধ ঐ মিশ্রণে একটু একটু করে মেশাতে হবে আর ক্রমাগত নাড়তে হবে, যাতে চাল দলাপেকে না যায়। মিশ্রণটি নাড়তে নাড়তেই ওর মধ্যে খোয়া গ্রেট করে মিশিয়ে দিতে হবে ও নাড়তে হবে। বেশ কিছুটা থকথকে ঘন ভাব হলে স্বাদমতো চিনি ওতে যুক্ত করতে হবে।
  • পর্ব ৩ ঃ নামানোর ২ মিনিট আগে মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে, আগে থেকে তৈরি রাখা পাকা আমের পাল্প ঐ মিশ্রণে দিয়ে হালকা হাতে দু-মিনিট নেড়ে নিতে হবে।
  • পর্ব ৪ ঃ নামানোর আগে ভেজা আঙুলের ডগায় লেগে থাকা পরিমাণ লবন ঐ মিশ্রণে মিশিয়ে, উপরে কেশর আর আমন্ড, কাজু কুচি ছড়িয়ে ঠান্ডা হতে দিন। ফ্রিজে ঘন্টাখানেক রেখে খেলে স্বাদ ভালো বোঝা যাবে।
সুস্বাদু ডেজার্ট আমফান

বাড়িতে অতিথি আসুক বা স্পেশাল দিন--- খাবার শেষে মিষ্টিমুখে আমের তুলনা নেই।

Friday, 23 July 2021

weekend tour ofbit destination e

 

সবুজ সুন্দরী বনলতা

রুমকি রায় দত্ত

 

জ্যৈষ্ঠের শেষ সপ্তাহ চলছে। গরম আর রৌদ্রতাপে নাজেহাল অবস্থা,এমনই এক সন্ধ্যা লগ্নে কত্তা অফিস থেকে ফিরেই প্রস্তাব রাখলেন, ‘ ১০ই জুন তো আসছে, বনলতা যাবে নাকি?’ বনলতা! নামটা শুনেই চমকে উঠলাম। বনলতা শুনলেই নাটরের বনলতা সেনের কথা মনে হয়। এই নামের কোনো ঘুরতে যাওয়ার জায়গা আছে বলে তো জানা নেই। বিস্মিত হয়ে বললাম, বনলতা! সেটা আবার কি?

কত্তা বললেন, বাঁকুড়াতে একটা জায়গা আছে। নেটে বনলতা লিখে সার্চ করো দেখতে পাবে’।

সুন্দরী বনলতা

একে তো এই গরম, তাতে বাঁকুড়া। কিন্তু সুযোগ বারবার আসে না, যেখানেই হোক, ঘুরতে যাওয়া নিয়ে কথা। নেটে সার্চ করতেই ভেসে উঠল বনলতা নামে একটা সুদৃশ্য গ্রাম্য পরিবেশের ছবি। পুরোটাই নাকি একটা হোটেল। মনে মনে ভাবলাম, শীতকাল হলে এমন পরিবেশে গায়ে রোদ লাগিয়ে বেশ ঘুরে বেড়ানো যেত, কিন্তু এই গরমে সেটা তো সম্ভব নয়,শুধু ঐ হোটেলে থাকার জন্য যাব? আসে পাশে কি কিছুই নেই আর দেখার? আরে, আছে তো, ম্যাপ খুলতেই দেখতে পেলাম জায়গাটা আসলে বাঁকুড়া জয়পুর ফরেস্টের গায়ে লাগাজঙ্গল যখন আছে তখন আর না বলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। 

তল্পি উঠিয়ে চললাম জয়পুর,বনলতা আমরা দুটি পরিবার। বর্ধমান থেকে গাড়িতে যেতে সময় লাগল আড়াই ঘন্টা মতো।পৌঁছালাম যখন, তখন ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজে। বনলতার বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরণের থাকার জায়গা আছে। আমাদের যে ঘর দেওয়া হল, সেগুলি জোড়া কটেজের মতো। নয়,দশ নাম্বার আমাদের। এরকম পাঁচখানা জোড়া কটেজ। সামনে সাজানো বাগান,তার ঠিক গা ঘেঁষে সুন্দর একটা পুকুর। কটেজের ঠিক পিছনেই শুরু হয়েছে ঘন শালের জঙ্গল। যখন পোঁছালাম, বাইরে তখন চকচকে রোদ।

 ওখানে পৌঁছাতেই একটি মাঝ বয়সি স্থানীয় মহিলা এসে বলল, ‘আমার নাম অষ্টমী, আপনাদের যা দরকার লাগবে, চা,জল,দারু.... আমাকে বলবেন, আমি এনে দেব’। মেয়েটি চলে যেতে আমরা ব্যাগ রেখে সামনের চাতালে রাখা কাঠের ডাইনিং টেবলে এসে বসলাম। চায়ের সাথে আড্ডাটা তখন বেশ জমে উঠেছে হঠাৎ দেখলাম, একটা কালো মেঘের দলা ধীরে ধীরে যেন ছেঁয়ে যাচ্ছেআস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যাচ্ছে চকচকে রোদ। ময়ূরের মত পেখম তুলে নাচতে ইচ্ছা হল মেঘ দেখে। সত্যি বলতে ভীষণ মনে মনে বৃষ্টি চাইছিলাম, চাইছিলাম এমন সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশে একটু বৃষ্টিতে ভিজতে। সেটা যে এভাবে এত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে ভাবতেই পারিনি। শুরু হল টিপটিপ বৃষ্টি। আমরা দলবেঁধে চারজন সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁটতে লাগলাম বনলতার বিস্তীর্ণ এলাকা। সত্যিই অপূর্ব জায়গা। সবুজ ভেজা ঘাসের লনে পা রেখে বৃষ্টি ভেজার স্বাদই আলাদা। বেশ অনেকটা সময় কেটে গেল এভাবে। প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে নিজেদের কটেজের দিকে ফিরতে ফিরতে হঠাৎ চোখ গেল একটা লালমাটির সরু রাস্তার দিকে। রাস্তাটা বনলতার মাঝ দিয়ে গেলেও আসলে রাস্তাটা সরকারি। এমন অজানা পথ চিরকালই মনকে টেনে নেয় তার দিকে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না। সুমন্ত কটেজে ফিরে যেতেই আমরা চারজন বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা লাগালাম সেই পথে। মাথার উপর তখন ক্রমশ কালো মেঘ জমে চলেছে। রাস্তাটার দু’পাশে জঙ্গল। ডানদিকে আমবাগান। কোথায় গিয়ে শেষ এই রাস্তার কোনো ঠিক নেই। লাল মাটির কাদায় বারবার আটকে যাচ্ছে জুতো। দূরে একটা চকচকে সবুজ বাঁশ গাছের ঝাড় দেখা যাচ্ছে। আর ঠিক যেন তার পিছন থেকেই উঠে আসছে কালো মেঘ আর মাঝে মাঝে শব্দহীন আলোর ঝলকানি। এগিয়ে চলেছি আমরা ঐ বাঁশ ঝাড়কে লক্ষ্য করে, হঠাৎ বিকট বাজ পড়ার আওয়াজে চমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। না, আকাশের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়ে আসছে।আর এগোতে একটু ভয় পেলাম। লালমাটিতে চটি চটাস চটাস করতে করতে ফিরে এলাম কটেজে। সারাদিন ধরে চলল অঝোর ধারার বৃষ্টি। সামনে পুকুরের বুকে বৃষ্টির ফোঁটার টুপটাপ নাচ।

নির্জন লালমাটির রাস্তা

বনলতায় ঢোকার মুখেই দেখেছিলাম সামনে বেশ কয়েকটি খাবার দোকান আছে। ঠিক বিকালে ছাতা মাথায় বেরিয়ে এলাম বাইরে। গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে বৃষ্টির ফোঁটা ফেলে চা-আড্ডার মজাই আলাদা। দেখলাম রাস্তার ওপাশে একটু এগোলেই ফরেস্ট অফিস। সবাইকে হোটেলে পাঠিয়ে আমি আর মণিদীপা পায়ে পায়ে সেই পথে হাঁটতে লাগলাম। একটা বিশাল বড় লোহার গেট। ভিতর থেকে তালা ঝুলছে। একজনের কাছে জানতে পারলাম রেঞ্জারের সাথে দেখা করতে হলে আরেকটু এগিয়ে যেতে হবে। কিছুটা এগিয়ে বাঁয়ে একটা ছোট্ট গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। কেউ কোথাও নেই! একটা আবছা অন্ধকারের আস্তরণ ছড়িয়ে আছে চারপাশের পরিবেশে। একটু দূরে একটা বৃদ্ধ একটা গাছতলায় বসে আছে। তিনিই আমাদের নিয়ে গেলেন রেঞ্জারের সাথে দেখা করার জন্য। জানতে চাইলাম,

জঙ্গলে চোরা শিকারি আসে? কাঠ চুরি হয়?

তিনি মাথা নেড়ে জানালেন, না।

তবে যে দেখলাম জঙ্গলের মাঝে মাঝে বেশ মোটা মোটা সাল গাছের কাটা গুঁড়ি!

তিনি বললেন, ওগুলো আমরাই কেটেছি। ঐ কাটা অংশ থেকে আবার ট্যাগ বেরবে। ওর মধ্যে সবথেকে ভালো টা রেখে বাকি গুলো আবার কেটে দেবেন তারা। বছর দশেকের মধ্যেই আবার বড় শালগাছ হয়ে যাবে।

আর সত্যিই কি হরিণ আছে?

তিনি বললেন নিশ্চয় আছে। দু’দিন আগেই একটা পূর্ণবয়স্ক হরিণ রাস্তার ট্রাকের ধাক্কা খেয়েছিল। ডাক্তার এসে দু’দিন ধরে সেবা করে সুস্থ করেছিল তাকে। সকালেই নাকি যে লোকটা ওকে খেতে দিত, তাকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে গিয়েছে। আর হাতি? হ্যাঁ, হাতিও এখানে আসে দলবেঁধে। পাশের জঙ্গলে প্রায় একমাস ধরে একটা দল আস্তানা গেড়েছে। যে কোনো দিন চলে আসবে। জঙ্গলের পাশে রাস্তার অপর দিকে সকালেই দেখেছি বিশালবড় একটা আমবাগান। রেঞ্জার জানালেন এখন ওরা এলেই ঐ আমবাগানে হানা দেবে। হাতি, হরিণ,শালবন এদের নিয়ে গল্পের মাঝে কখন যেন সন্ধেটা নেমে গিয়েছে বুঝতেই পারিনি। বেরিয়ে এলাম ফরেস্ট অফিস থেকে। বড় রাস্তা বেশ নির্জন। পাশ দিয়ে হুশহাশ ছুটে যাচ্ছে ট্রাক। বছর দশেক আগেও এইখানে ডাকাতি হয়েছে, সে কথা মনে আসতেই বেশ ছমছম করে উঠল গা টা। দ্রুত পা চালিয়ে ফিরে এলাম।

সামনের চাতালে বসেই দেখতে লাগলাম বৃষ্টি মাথায় নিয়েও বনলতার কর্মীদের কর্মব্যস্ততা। সন্ধের দিকে টিপটিপ বৃষ্টিতে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গল্প জুড়লাম অষ্টমীদি’র সাথে। জানলাম বনলতা কিভাবে একটা অঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রেখেছে। প্রায় চারশো কর্মচারীর সবাই এই অঞ্চলের দরিদ্র গ্রামবাসী। যার কোথাও কাজ জোটে না, বনলতার মালিক ঠিক খুঁজে একটা না একটা কাজে ঢুকিয়ে দেয় তাদের। ‘পরনের কাপড়, দু’বেলা মাছভাত... আর কি চাওয়া বলো আমাদের?’ .... বলে ওঠে অষ্টমীদি। বনলতার সবজি, মাছ সব খাঁটি। এরা নিজেরাই চাষ করে। কিছু মানুষ শালপাতার থালা তৈরি করে দিয়ে যায় হোটেলে। অতিথিদের সেই পাতাতেই খেতে দেওয়া হয়।

 পুকুরের ধারে ধারে জ্বালানো আলোকস্তম্ভের গা বেয়ে নেমে যাওয়া বৃষ্টধারা দেখতে দেখতে কিভবে যেন রাত গড়াতে থাকে।

একটা পুরোদিন কেটে যায় বনলতায়। সকাল থেকে আলিস্য গায়ে মাখা ছাড়া আর তো কোনো কাজ নেই আমাদের। একটু বেলায় একটা টোটো ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের পথে। আগের দিন ঠিক সন্ধের আগে একবার গাড়িতে গিয়েছিলাম এই পথে। মাঝে শুয়ে কালো মসৃণ রাস্তা আর দু’ধারে ঘন সবুজ প্রাকৃতিক শালবন। এখানে নাকি প্রায় হরিণ দেখা যায়। টোটো সড়ক পথে ছেড়ে ডানদিকে জঙ্গলের মধ্যে যাওয়ার সরু লালমাটির রাস্তা ধরল। কি অপূর্ব সে পথের শোভা। না, বারবার মনে হবে এ কোনো বাস্তর নয়, পটে আঁকা ছবি মাত্র, কিন্তু এই প্রকৃতি সত্যিই বাস্তব। মাঝে লালমাটির রাস্তা শুয়ে, দু’ধারে সবুজ শালের সারি। আমরা ক্রমশ এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছি জঙ্গলের মাঝে। এই মাঝ দুপুরে হরিণ যে চোখে পড়বে না, সে তো জানা কথা,তবু চোখ কিছু অজানা খুঁজে চলেছে। পথের দু’ধারে পড়ে আছে মহুয়াফল। তাই নিয়ে ব্যাগে ভরলাম। টোটোর ছেলেটি বলল, এই ফলগুলো ভেজে খেতে নাকি খুব ভালো লাগে। কি জানি কেমন লাগে,শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয়নি।

সালবনে মেঠোপথ

দুটো দিন কোথা দিয়ে যেন ছুটে চলে গেল। রাত পোহালেই ফেরার সূর্য দেখা দেবে। সন্ধে থেকেই সবাই বাইরের চেয়ার-টেবিলে বসে আড্ডায় মেতে উঠলাম। তারিখটা ১০ই জুন, আমার জন্মদিন। একটা একেবারে অন্যরকমের জন্মদিন।প্রথমবার মোমবাতিতে ফুঁ দিয়ে কেক কাটা। জীবনের একটা দিন স্মরণীয় করে তুলল সুমন্ত আর মণিদীপা। ওরাই তো চুপিসারে সব আয়োজন করেছিল।

পরদিন খুব ভোরে উঠে পড়লাম। ফেরার ঘন্টা বেজে গিয়েছে,কিন্তু তখনও একটা পথের শেষের রহস্য উন্মোচন বাকি। সেই পথ, যে পথে বৃষ্টিতে হেঁটেছিলাম। বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। লাল মাটিতে পায়ের চিহ্ন আঁকতে আঁকতে হেঁটে চললাম পথের শেষ খুঁজতে। একটা রাঙামাটির আঁকাবাঁকা পথের শেষে দেখা পেলাম বিশালবড় একটা জলাশয়ের। ঘাটে বাঁধা একটা নৌকা। শীতের সময় অনেক লোকজন আসে,তখন এই জলাশয়ের বুকে বোটিং করা যায়। ঝোঁপের পিছন থেকে ধীরে ধীরে  লাল সূর্যটা উপরে উঠে আসছে। আঁকাবাঁকা প্রতিবিম্ব খেলা করছে জলে। আমরা চেয়ে আছি অবাক চোখে।একই ছবি কতবার দেখেছি, কিন্তু প্রতিবার নতুন লাগে। চেনা প্রকৃতি প্রতিদিন নতুন রূপে এসে দাঁড়ায় আমাদের সামনে। নাহ্‌, আর সময় নেই। ঘড়ি বলচে বাড়ি ফিরতে হবে। যে আসে তাকে যেতেই হয়। এটাই তো জীবনের অমোঘ সত্য। যেতে হয় কখনও দেশ থেকে দেশান্তরে বা শহর থেকে অন্য শহরে।



weekend tour ofbit destination e

Friday, 4 June 2021

কিকিরুরু

 কিকিরুরু

কিকিরুরু... কিকিরুরু। কিছুক্ষণ থেমে আবার। সোনাঝুরি আর শিরীষের. বন ঘুরে তরঙ্গের মতো শব্দটা ছড়িয়ে পড়ছে। চোখদুটো চঞ্চল হয়ে উঠছে আমার।
খুঁজছি, কে ডাকে অমন করে? আমি যেন দিনে দিনে কেমন পক্ষীবিশারদ হয়ে উঠছি। কোন পাখি কখন কী সুরে ডাকে সব জানি, কিন্তু এ ডাকটা অদ্ভুত তো! অচেনা! কে ও? আমি মনে মনে উচ্চারণ করলে ভারি মিষ্টি লাগছে, কিন্তু পাখির স্বর তীক্ষ্মধার।

পাতার ফাঁকে শক্ত, দীর্ঘ কমলা রঙের ঠোঁট। ডানায় ময়ূরের কন্ঠ রং, বুকের কাছে সাদা।
আমি  বললাম, "ও... তোর নাম তো মাছরাঙা।"
 সে তখন উঁচু ডালে বসে ঘাড় কাত করে তাকিয়ে নীচের জমা জলে।
অস্বচ্ছ কাদাঘোলা জলে পা ডুবিয়ে নীচু হয়ে মাছ অথবা গুগলি খুঁজছে মেয়েটি। পরনে একটা ছোটো ইজের।
মাছরাঙাটা ওর দিকে তাকিয়ে কিকিরুরু ডাকছে।
আচ্ছা, কিকিরুরু মানে কি প্রতিদ্বন্দ্বী?

রুমকি রায় দত্ত 









Wednesday, 23 September 2020

ভাদো আইল রে

  

ঐ যে। ঐ পোটলাটা, ওটার মধ্যে কী আছে? ভাদো আছে গো...ভাদো! পুরো একটা বছর ধরে ওটার মধ্যে ভাদো রাখা আছে। ভাদোর একটা নিজস্ব মানে আছে। ভাদো মানেই রহস্য! ভাদো মানে পুরোনো স্মৃতি আবিষ্কারের আনন্দ! ভাদো মানে প্রকৃতির জাগরণ। বর্ষা গেলেই পোটলা খুলে বাইরে আনতে হয় ভাদোকে। শ্রাবণ যায়,ভাদো আসে। মেঘের ভেলায় চেপে ভাদো আসে। সঙ্গে আনে মুঠো মুঠো সোনালি রোদ্দুর, ঘন নীল আকাশ! পোটলা খুলে ভাদোকে আদর করে কোলে তুলে নিতে হয়। ভাদোর গায়ে তখন ভারি শ্যাওলাধরা গন্ধ! ছাতারে গন্ধ! ভাদোকে তখন রোদে সেঁকে শিউলিগন্ধ বাতাস দিয়ে স্নান করাতে হয়। সাদা কাশের চামর দিয়ে বাতাস দিতে হয়। দু’গাছি কচি ধানের শিষ দাঁতে কেটে ভাদো পিঁড়িতে বসে শুরু করে গল্প।

মাঝে মাঝে সুখের স্মৃতিগুলো ভুলে যেতে হয়। ছেলে বেলার স্মৃতি গুলো ভাদোর মতো পোটলায় ভরে,একটু ন্যাপথালিন দিয়ে গুটিয়ে রেখে দিয়ে, তারপর ভুলে যেতে হয়। দীর্ঘদিন সুখ-যাপনে,সুখের উপর নোনা ধরে,জিভের উপর জমা সাদা আস্তরণের মতো। ভুলে যেতে হয়, কারণ- পুরোনো জামা-কাপড়ের মতো,পুরোনো স্মৃতি গুলো নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ দিতে হয় নিজেকে। আবিষ্কারের যেমন নানা দিক, তেমনি আনন্দটাও তো ভিন্ন। পুরোনো আবিষ্কারের আনন্দটায় একটা অদ্ভুত মাতাল করা নেশা আছে। ন্যাপথালিনের তুলতুলে গন্ধ পুরোনোর ভাঁজে ভাঁজে রহস্যের নেশা জাগায়!কখনও কখনও পুরোনো আবিষ্কার নতুনের থেকেও মোহময়ী! কোনও ভাঙা দুর্গের প্রাচীরের আড়ালে থাকা পুরোনো অথবা মাটির স্তরের নীচে প্রাচীন সভত্যার স্মৃতিমাখা পুরোনো অথবা আলমারির কোণে স্মৃতির স্তর বুকে নিয়ে জমে থাকা পুরোনো,সে যাইহোক...সব পুরোনই আসলে আবিষ্কারের নেশা জাগায়।   

ভাদো এলেই ঘর আর প্রকৃতির সমস্ত রহস্যময় স্থানেই যেন আলো ঢুকে রহস্য উন্মোচন করে। বন্দরের দাঁড়ানো রহস্যময় জাহাজের মতো আলমারিটা পাল্লা দুটো হাট করে খোলা। একে একে বেরিয়ে আসে জামা-কাপড়! তারই মাঝে নতুন করে পুরোনো আবিষ্কারের নেশা। বিশ বা তিরিশ বছর আগের পুরনো, নরম হয়ে যাওয়া বেনারসি আর নকশা ধুতির দাম্পত্য দেখে,  ন্যাপথালিন মাখা মিষ্টি-মেদুর স্মৃতির ছাতার নীচে দু’দন্ড জিরিয়ে নেওয়া। সযত্নে একমুঠো ভাদুরে রোদের ছোঁয়াতে স্মৃতির আয়ু বেড়ে যায় আরোও। আবার একটা বছর পর বেরিয়ে আসবে সবাই।ছড়াবে স্মৃতির সেই পুরোনো উষ্ণতা! নতুন ভাদো কথা কবে বিগত ভাদোর সাথে।দাঁতে তার একগুচ্ছ কচি ধানের শিষ।



Monday, 13 May 2019

অন্তরে বিম্বিতঃ

সেদিন জানালায় বসে দেখছিলাম, কীভাবে একটা বাড়ি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ইটের উপর ইট।সব ইট সমান তাপে শুকনো নয়, কিন্তু বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ।হঠাৎ নজরে এল  মিস্ত্রির সহচরটি একটা বেশ বড় মাপের তারজালিতে বাল ভরে তারপর ক্রমাগত সেটাকে এপাশ-ওপাশ নেড়ে চলেছে।ঝুরঝুর করে দানাবালি নীচে জমা হচ্ছে। একটা ভীষণ আলোড়ন শেষে তারজালিটিতে জমে ওঠা ঢেলা, নোংরা ফেলে ফেলে দিচ্ছে ছেলেটি। হঠাৎ মনে হল, জীবনেও তো কত নোংরা, ঢেলা লুকিয়ে থাকে। সেগুলো কী করে পরিশুদ্ধ হবে?
জীবন কীভাবে? কখন নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নেই, আমরা বুঝতেই পারি না। কখনও কখনও এমন হয় না? হঠাৎ হঠাৎ আমরা বিভ্রান্ত হয়ে উঠি? মনে হয় জীবনটা এবার থমকে গেল! একটা কোনো ঘটনা জীবনে তুমুল আলোড়ন তুলল। হয় না এমন?
এই আলোড়নই আসলে জীবনের তারজালি। জীবনের সাথে মিশে থাকা যা,কিছু ভেজাল। যা কিছু নোংরা, ঢেলা সব আটকা পড়ে সামনে চলে আসে। আর আমরা ঝরঝরে পরিশুদ্ধ হয়ে একধাপ সামনে এগোই। আবার পথচলা শুরু হয়। সঞ্চয় হয় আরও শত শত নোংরা। আবার একদিন জীবনে ঝড় ওঠে, সৃষ্টি হয় আলোড়নের...তবু থামা নয়। জীবন বাড়ি গড়তে হলে ইটের  পর ইট এভাবেই গেঁথে যেতে হবে।
এটাই জীবন,এটাই পথচলা।

Friday, 5 April 2019

হাঁড়িয়ায় মিষ্টি নেশা

হাঁড়িয়ার মিষ্টি নেশা
-রুমকি রায় দত্ত
ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে রঙ্গিনী।ব্যাগ থেকে চাবি বার করে ফ্ল্যাটের দরজা খোলেভিতরে অন্ধকার। লাইট জ্বালানোর আগেই নীলাঞ্জন ওকে পিছন থেকে জাপটে ধরল,ঠোঁট ছোঁয়াল ওর পিঠের উন্মুক্ত অংশে। ওর আগেই ফিরে এসেছে নীলাঞ্জন।রঙ্গিনী বিরক্ত প্রকাশ করে বলল—‘আঃ! নীল,--ছাড়! এখন একদম ভালো লাগছে না। পুরো হ্যাঙ্গ হয়ে আছি’। তারপর হঠাৎ বসে পরে নিচে পড়ে যাওয়া গবেষণা পত্রের দু’একটি পাতা তুলতে তুলতে বলল
—‘ এই কংক্রিটের জঙ্গলে থেকে কি প্রকৃতির প্রভাব অনুভব করা যায়?---জানিস,রিসার্চের কাজ একদম এগোচ্ছেনা। মাথার মধ্যে থেকে সাহিত্য উধাও হয়ে গিয়েছে,পড়ে আছে হাড়-পাঁজর বের করা এই কংক্রিটের কাঠামো’।
 গবেষণাপত্র গুলো টেবিলে রেখে রঙ্গিনী এগিয়ে এসে দাঁড়ায় নীলাঞ্জনের সামনে। হাত দুটো দিয়ে নীলের গলা জড়িয়ে,ওর চোখের দিকে স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে বলল
‘ ইস্‌! কত বছর হয়ে গেল উন্মুক্ত আকাশের নিচে, সবুজ প্রকৃতির কোলে শুইনি। দেখিনি চঞ্চল ঝর্ণার উন্মত্ত নাচ!----যাবি নীল,আমাকে নিয়ে এমনই এক উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে?’
রঙ্গিনীর মন প্রকৃতির কোল তো খুঁজবেই,ও যে প্রকৃতির মেয়ে। যে দেশের মানুষ গায়ে, মুখে মেঘ মেখে বেড়ায়,ও তো সেই দেশেই জন্মেছে। কিন্তু সেখানে তো আর ফিরবে না রঙ্গিনী,পরিজনদের সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে, শুধু নীলাঞ্জনের সাথে থাকবে বলে। একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায় রঙ্গিনী। বিয়ে নয়, লিভট্যুগেডারে বিশ্বাসী ও,আর এখান থেকেই তো শুরু পরিবারের সাথে মতান্তরের। কেউ কেন বোঝে না? প্রত্যেকটা পরিণত মানুষের জীবনে একটা নিজস্ব মতামত থাকতে পারে। থাকতে পারে নিজস্ব ভালোলাগা,মন্দলাগা। রঙ্গিনী কোনো দিনই বিবাহ বন্ধনে আস্থা রাখতে পারে নি। মেঘকে কি একটি জায়গায় বেঁধে রাখা যায়? মেঘের মতই ভাসমান আর অস্থির ওর মন। আসলে ও নিজেই নিজের মনের গতি বুঝতে পারে না, বিশ্বাস করতে পারে না নিজের মনকে।
কি রে? বলনা, নিয়ে যাবি আমাকে, প্রকৃতির কোলে? নীলের গলা ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তুই না গেলে, আমি কিন্তু একাই চলে যাব। কোনো এক আদিবাসী গ্রামে। ওখানে গিয়ে কোনো এক আদিবাসী ছেলের সাথে মহুয়া খেয়ে নেশা করব,তারপর ওর কোমর ধরে নাচব। তারপর...বলেই থেমে গিয়ে ঘুরে তাকায় নীলের দিকে।
--তারপর কি? থামলি কেন বল।
--কি আবার। সেই ছেলেকে বিয়ে করে ওখানেই থেকে যাব।
--মানে? তুই এটা করতে পারবি? তুই আমাকে ছেড়ে অন্য ছেলেকে বিয়ে করতে পারবি?
রঙ্গিণী উত্তর না দিয়েই ঢুকে পড়ে বাথরুমে। আসলে নীলের প্রশ্নের সত্যিই কোনো উত্তর নেই ওর কাছে। ও নিজেই তো নিজেকে বোঝে না! যেমন একদিন হঠাৎ করে নীলের সাথে থাকবে বলে ঘর ছেড়েছিল, ঠিক তেমনই যদি হঠাৎ...না, এভাবে এসব ভাববে না। দ্রুত সরিয়ে নেয় মনকে।
  নীল ল্যাপি নিয়ে বসে পড়ে। শেষ মুহূর্তে দুটো টিকিট রাঁচি। ঠিক আর দু-ঘন্টা বাকি। দ্রুত রঙ্গিনী ওর ল্যাপি আর রিসার্চ পেপার গুলো সাবধানে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় নীল দ্রুত হাতে ব্যাগ গুছিয়ে গলায় বিদেশী ক্যামেরাটা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে হাওড়া স্টেশনের পথে।ফটোগ্রাফি ওর নেশা। রাঁচির প্রকৃতির ফটো তো তুলবেই সেই সঙ্গে ওর সঙ্গের আদিম সৌন্দর্যে ভরপুর এই জীবন্ত প্রকৃতিকেও উন্মুক্ত করবে ওর ক্যামেরার লেন্সের সামনে।
 ঠিক এগারোটা বাইশ, হাতিয়া এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই উঠে পড়ে ওরা। সাইডের আপার-লোয়ার। ট্রেনের এই জায়গাটা রঙ্গিনীর ভীষণ প্রিয়। বেশ একটা স্বাধীনতা থাকে। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ছুটতে থাকে ট্রেন। আলো গুলোও যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে গুঁড়ো গুঁড়ো ঘুম ছেঁয়ে ফ্যালে রঙ্গিণীর চোখের পাতা।
 ট্রেনের জানালা দিয়ে আসা সকালের রোদের উষ্ণ পরশে চোখ খুলতেই লাফিয়ে ওঠে রঙ্গিণী। ট্রেনের গতি ক্রমশ শ্লথ হয়ে আসছে। রাঁচি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁতেই দুজনেই এসে দাঁড়ায় দরজার সামনে। ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া লাগছে রঙ্গিনীর মুখে-চোখে, চুল গুলো উড়ছে। রঙ্গিনী জানে যা কিছু অবাধ্য,তাকে বাঁধার চেষ্টা বৃথা,ঠিক ওর মনের মত।
ওরা নেমে দাঁড়ায় চলমান জনসমুদ্রের মাঝে কোথাও একফোঁটা সবুজ নেই! এখানে থকলে তো রঙ্গিনী প্রকৃতিকে ছুঁতে পারবে না!---ওর মুখটা বিষন্ন হয়ে ওঠে।
‘ নীল এখানে প্রকৃতি কোথায়?—আমি তো প্রকৃতি চেয়ে ছিলাম!’
কেন তুইতো নিজেই একটা আস্ত প্রকৃতি আর আমি আদিম সেই মানব।
ধুত্‌! তোর এই কাব্য আমার মোটেও ভালো লাগছে না! প্লিজ নীল আমায় প্রকৃতি দে।
ফাগুনের পরশ মাখা বাতাস ওর মনটাকে আরও উদাস করে দেয় রঙ্গিনী জানে না কেন হঠাৎ হঠাৎ মন উদাস হয় আর কেনই বা উচ্ছ্বসিত? শুধু বোঝে প্রকৃতির কাছে এমন কিছু আছে যা,মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তো মন কখনও প্রথম বৃষ্টির পরশ মাখা ঝলমলে প্রকৃতি আবার কখনও গ্রীষ্মের তাপদগ্ধ খাঁ-খাঁ দুপুর।
 ফাল্গুনের ব্যস্ত রাঁচি শহর। রঙ্গিণী কংক্রিটের হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে নিচ দিয়ে ভেসে যাওয়া জনসমুদ্র। রঙ্গিণী একটু গভীরে নিঃশ্বাস নেয়। বাতাসের হিমেল গন্ধের সাথে ভেসে আসে মোবিল পোড়া গন্ধ। একরাশ বিরক্তি যেন ক্রমশ মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। একটা পুরো দিন কেটে রাত আসে। প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়ার আশায় অস্থির আগ্রহে,রাতটা শহুরে হোটেলের চার দেওয়ালের মাঝে কোনোরকমে কাটিয়ে; সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে যায় রঙ্গিনী। নীল বাথরুম থেকে বেরোতেই ব্রেকফাস্ট সেরে ওরা বেড়িয়ে পরে জোন্‌হা প্রপাতের দিকে। কালো পিচের রাস্তার বুকের উপর দিয়ে ছুটে চলে অটো। সমান গতিতে রঙ্গিনী আর নীলাঞ্জন।  রঙ্গিনীর মনের গতি আরও দ্রুত। অটো এসে দাঁড়ায় জোন্‌হা প্রপাতের প্রবেশদ্বারে। প্রপাতের গর্জন কানে আসতেই রঙ্গিনীর মনটা নেচে উঠে, ও ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় সেই সিঁড়ির মুখে যেখান থেকে নিচে নামতে হয়। রঙ্গিনী নীলের হাত ধরে নিচে নামার প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই পিছন থেকে ডাক পড়ল—‘হেই দিদিমণি,--হেই মেমেসাহেব –একটু দাঁড়াও তো’।
রঙ্গিনী নীলের হাতে টান মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছন ফিরে দেখল এক দেহাতি তরুণ
 কাছে এসে বলল—‘সাতশ সিঁড়ি ভেইঙে যেতে হবে,পারবে তুমরা?---সইঙ্গে লোক দিব?—যা মন চায় ধরে দিবে’।
নীল বিরক্তির সুরে বলল-- ‘না ওসব লোক ফোক লাগবে না’।
ওদের পা বাড়াতে দেখেই লোকটি আবার বলল-- ‘আচ্ছা ও ঠিক আছে,তোমরা দোপরে খাবা না কিচ্ছু?---কি চায় মাছ, মাংস,ডিম সবই মিলবে’। খাবার কথা শুনে দুজনেই বেশ উৎসাহিত হল।
 নীল বলল—‘ঠিক হ্যয়,দো প্লেট ডিম ভাত’। রাঁচিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও বদলে গিয়েছে। কেমন যেন নিজের থেকেই হিন্দি গড়গড় করে বেরিয়ে আসছে নীলের।
 রঙ্গিনী সামনের দিকে পা বাড়াতেই মনে পড়ল, নাম তো জানা হয়নি ছেলেটার।
‘তুমাহারা নাম কিয়া হ্যয়’?
ছেলেটি বলল-‘শুকরা লোহারা’
‘তুম বাংলা জানতে হ?’
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল---‘জি মেমসাহেব,বাংলা বলতেও পারি,বুঝতেও পারি। বাঙ্গালী লোক এলে বাঙ্গালায় কথা বলি’।
শুকনো পাতায় পা মাড়িয়ে আঁকা বাঁকা সিঁড়ির ধাপ গুনে নিচে নামছে রঙ্গিনী আর নীলাঞ্জন। পাহাড়ের গা বেয়ে স্বচ্ছ-শুভ্র ঝর্ণার জল ঝরে পড়ছে নিচে পাথরের খাঁজে। বড় বড় পাথরের খাঁজে ছোটো ছোটো দ্বীপের মত জমে আছে ঝর্ণার জল। আছড়ে পড়া ছিটানো জলে ভরে উঠল রঙ্গিনীর মুখ। অপূর্ব লাগছে ওকে। নীলাঞ্জন ওর রূপের খনিকে সংগ্রহ করে চলেছে ওর ক্যামেরায়। রঙ্গিনী উদাস চোখে দেখছে এই প্রকৃতির অপূর্ব রূপমাধুরী। শুধু দেখছে না যেন তৃষ্ণার্তের মত পান করছে। বড় পাথরের উপর বসে পা দুটো ডুবিয়ে দিয়েছে ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে। নীল এগিয়ে এসে বসল ওর পাশে। কাঁধের উপর হাত রেখে বসে আছে দুজনে। নীলের মুখটা রঙ্গিনীর ঘাড়ের কাছে নেমে আসতেই রঙ্গিনী ওকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল----
‘নীল ও দেখছে আমাদের’। বলেই আঙুল তুলে দেখাল বড় পাথরের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ‘শুকরা’। যদিও ততক্ষণে ও পাথরের আড়ালে সরে গেছে,তবুও ওর গভীর দৃষ্টি দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। রঙ্গিনী ইশারায় ওকে ডাকল। ও আড়ষ্ঠ পায়ে কাছে এসে দাঁড়াল,তারপর আঙুল তুলে পিছনের দিকে দেখিয়ে বলল--
—‘খানা হয়ে গেইছে তাই’,--- বলেই মাথা নিচু করল। রঙ্গিনী নীলের হাত ধরে ওর পিছু পিছু উপরে উঠতে লাগল।
‘আচ্ছা শুকরা, বাড়িতে তোমার কে কে আছে?’
‘আমার বৌ ফুলি আর আমি বছর গেল শাদি করেছি’
‘ তুমি কি শুধু এই কাজ করো? তোমার গাঁয়ের সবাই কি কাজ করে?
‘আমি চাষও করি। তবে সারা বছরতো আর চাষের কাম থাকে না,তাই তুমাদের মত যারা ঘুরতে আসে তাদের দোপোরের খাবার জোগাড় দিই। হামি আর ফুলি নিজে হাতে রাঁধি গো মেমেসাহেব। বড় তিরপ্তি পাই। গাঁইয়ের কেউ দূরে রাজমিস্ত্রির কাম করে।কেউ ইঁট ভাঁটায় কাম করে,কেউ আবার বনের কাঠ এইনে শহরে বেচতে যায়। এই ভাবেই চইলছে’।
রঙ্গিণী মনে মনে ভাবে কত নেই এর মাঝেও এরা কত আনন্দে থাকে।ওরা এসে বসে কিছুদূরেই একটা ছোট্ট ছাঁউনির নিচে।নীল আর রঙ্গিনীর সামনে শাল পাতা জোড়া দিয়ে তৈরি থালায় ভাত,ডাল,পেঁয়াজ,দিয়ে আলুমাখা,আলুভাজা আর ডিম।
‘দিদিমণি আলুমাখা খাও তো তুমরা? ভালো কইরে হাত ধুইয়ে মেখেছি’।
অন্য সময় শালপাতার গন্ধটা রঙ্গিনীর ভালো লাগে না। কিন্তু আজ যেন ও প্রকৃতি কন্যা,এই গন্ধটা যেন আজ ওর বড় প্রিয় হয়ে উঠেছে। ওরা খেতে থেকে। রঙ্গিনী খাওয়ার মাঝেই তাকিয়ে দেখে শুকরা তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে ওর দিকে। কি সে চাহনি, কি সে চোখের ভাষা, জানেনা রঙ্গিনী,শুধু একটা অতি চেনা অনুভব যেন বারবার ওর মনটাকে আচ্ছন্ন করে নিতে চায়। হঠাৎ একটা প্রশ্ন আসে মাথায়।
--আচ্ছা শুকরা, তোমার শহরে যেতে ইচ্ছা করে না?
--শুকরা কিযেন ভাবতে থাকে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে ওঠে ‘উখানে আকাশ কোথায়? শুনা কথা... মাটি নাই, গাছ নাই’।
-- শুকরা তোমার ফুলি বেশি ভালো,না শহরের মেমসাহেব?
প্রশ্ন শুনে কেমন যেন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ শুকরা। কিছুটা যেন লজ্জা পেয়েই কথা ঘুরিয়ে বলে ওঠে,’ হেই দাদাবাবু, তুমি একটু ভাত নিবে?’
 অনেকদিন পর এমন সুস্বাদু ঘরোয়া রান্নায় পেটের তৃপ্তি মিটলেও মনের মেটে না।এর পরই ফিরতে হবে মনে হতেই কান্না পায় রঙ্গিনীর। এই সামান্য সময়েই শুকরা যেন ওর চেনা মানুষ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ ওর মনে হয়, যদি আর না ফেরে? মনে হতেই করে ফ্যালে প্রশ্ন--
—‘ শুকরা, তোমার এখানে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে’?
-- ‘না দিদিমণি, এখানে তো কোনো হোটেল নাই। তবে মেমসাব, তুমি চাইলে আমার ঘরে থাইকতে পার। আমার দুটা ঘর আছে। একটায় ফুলি আর আমি থাকি,তোমরা চাইলে আরেকটায় থাইকতে পারো। থাইকলে উৎসব দেইখতে পাবে।পুরুলিয়া থেইকে ছোঁ নাচের শিল্পী আইসছে,কত বাদ্য যন্ত্রর আইসছে,সারা রাত উৎসব হবে,মেয়ে-পুরুষ সবাই মিলে নাচ হবে—সবাই হাড়িয়ার নেশায় মইজে যাব।খুব আনন্দ হবে’
রঙ্গিনী বলল, ‘হাঁড়িয়া!—সেটা আবার কি’?
শুকরা বলল, ‘ভাত মজিয়ে আবার কখনও মহুয়ার রস মজিয়ে হাঁড়িয়া বানাই আমরা। তোমরা থাক,তোমাদেরও খাওয়াব’।
রঙ্গিনী নীলের দিকে তাকাতেই নীল ওর মনের কথা বুঝে যায়। বাঁশের বেড়ার ঘর,টিমটিমে একটা হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলছে। সন্ধে হতেই আলো চলে গেছে। ঘন অন্ধকারে জ্বলছে দুটো কুপির আলো জঙ্গল ঘেরা এই প্রকৃতির মাঝে মিটমিটে আলো এক রহস্য সৃষ্টি করেছে। কিন্তু রঙ্গিনীর মনে হয় শুকরার চোখের রহস্য আরও গভীর। একটা নক্সা আঁকা কাঁথা পাতা কাঠের চৌকিতে। নীলের গায়ে মাথা রেখে শুয়ে রঙ্গিনী চেষ্টা করতে থাকে শুকরার চোখের ঐ গভীর রহস্য ভেদের। বেড়ার দেওয়ালের ছোট্ট জানালা দিয়ে তাকায় পাশে শুকরা আর ফুলির ঘরের দিকে। ঘন অন্ধকার। অনুভব করে একজোড়া বন্য হরিণ-হরিণীর উপস্থিতি। বাইরে বেরিয়ে আসে রঙ্গিনী। স্পষ্ট শুনতে পায় দেহাতি সোহাগের শব্দ। রঙ্গিনীও ঐ দেহাতি সোহাগ পাওয়ার ইচ্ছায় ব্যকুল হয়ে ওঠে।
(2)
পাখির কূজন শুনে ভোর হয় এদের। অনেক বছর পর রঙ্গিনীর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। মিষ্টি সুরে কোকিল ডাকছে। শহরে এসব কোথায়?—ফুলি চলেছে ঝরনায় স্নান করতে। রঙ্গিনীও ওর সাথে চলেছে। ফুলি ওকে হাঁটু পর্যন্ত ডুরে শাড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। রঙ্গিনী এখন দ্বিতীয় ফুলি,এক উজ্বল বর্ণের দেহাতি মেয়ে। ফুলির সাথে কোমর দুলিয়ে পাথরের উপর পা ফেলে,হরিণীর মত লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। ফুলি জলের কাছে এসেই এক আঁজলা জল ছিটিয়ে নিল নিজের মুখে,ছড়িয়ে দিল রঙ্গিনীর গায়ে। দুজনেই খিলখিল করে হাসছে। নীল ছবি তুলছে একটা বনের হরিণীর আর একটা শহুরে হরিণীর জলকেলির। ফুলির কালো শরীর জলের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। রঙ্গিনী স্বচ্ছ পাহাড়ী ঝর্ণার জলে গা ডুবাল। হঠাৎ কেমন যেন আড়ষ্ঠ হয়ে ভিতু খরগোশের মত নিজের ভেজা শরীরটাকে যেন দু’হাত দিয়ে আড়াল করতে চায়লনীল  এই মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত কিন্তু রঙ্গিনী ভুল দেখেনি। দূরে পাথরের আড়ালে একজোড়া চোখ যে ওকেই দেখছে। বড় অন্তর্ভেদী এ দৃষ্টি।
সন্ধে হলেই শুরু হবে উৎসব। রঙ্গিনী এক অন্য সাজে সেজেছে। শহুরে বন্ধনহীন বক্ষ ঢাকা কমলা রঙের শাড়ির আঁচলে। শাড়িটা ফুলির বিয়ের শাড়ি। ওর লম্বা সিল্কি চুল চুড়ো করে খোঁপা বেঁধে দিয়েছে ফুলি। তাতে আগুন রঙা পলাশ ফুলের মালা জড়ানো। হাতে পলাশ মালার চুড়ি। ঘুরে ঘুরে নাচ শিখছে দেহাতি মেয়েদের কাছে। নীল রঙ্গিনীর মুখ থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। নামহীন সম্পর্কটাকে নাম দেওয়ার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে।
সন্ধে হতেই হাঁড়িয়া পান শুরু হয়ে গেছে। নীল,রঙ্গিনী,শুকরা,ফুলি সবাই হাঁড়িয়া পানে মগ্ন। রাত বেড়ে চলেছে,ছোঁ-নাচ,বাদ্য যন্ত্র সব শেষে শুরু হয়েছে দেহাতি মেয়েদের নাচ। ফুলির হাত ধরে রঙ্গিনীও নেচে চলেছে আগুনের চারপাশে। আগুনের তাপে আর নাচের পরিশ্রমে ওর মোমের শরীর গলে যাচ্ছে। নীল ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে মিশে যাচ্ছে বিন্দুতে। আগুনের শিখার ফাঁকে ফাঁকে জেগে উঠছে ঘামে ভেজা চকচকে শুকরার শরীরটা, নেশারু দৃষ্টির গভীর তীক্ষ্ণ ভাষা। জেগে উঠছে আদিম যৌবন। শুকরার গায়ের ঘামের আদিম গন্ধের নেশায় ঝিমঝিম করছে রঙ্গিনীর মাথা। জেগে উঠছে তীব্র,মিষ্টি নেশা। কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া রঙ্গিনী মিশে যাচ্ছে সেই মিষ্টি নেশার স্রোতে। নীলাঞ্জন ক্রমশ মিশে যাচ্ছে বিন্দুতে। রঙ্গিণীর চোখে নীলাঞ্জন এখন হাড়-পাঁজর বের করা একটা কিংক্রিটের কাঠামো মাত্র।



Wednesday, 2 January 2019

অবসর

অবসর
রুমকি রায় দত্ত
টেবিলের উপরে সযত্নে রাখা এক দিস্তা সাদা পাতা। আলগা পাতাগুলো হাওয়ায় ফরফর করে উড়ছে। উপরের পাতার উপর রাখা খোলা কলমটাও তালে তালে নাচছে। অনেক পুরানো নিব লাগানো কালিকলমটা। খোলা মুখের সাথে পাতার ঘর্ষণে একটা অদ্ভুত আঁকিবুকির সৃষ্টি হয়েছে সাদা পাতাটার গায়ে, যেন শুভ্রর জীবন থেকে কালো অক্ষরের ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়ার ইতিহাস লিখেছেন বিধাতা-পুরুষ।
 টেবিলের বাঁ-পাশে দক্ষিণ খোলা জানালাটা, মেঝে থেকে প্রায় ছাদ পর্যন্ত লম্বা। আগেকার দিনের জানালার মতো দেখতেযদিও শুভ্রর এই বাড়িটির গঠন একেবারে আধুনিক কিন্তু তিনতলার ছাদে ওঠার আগেই ডানদিকের এই ঘরটি, শুভ্র একেবারে নিজের মত সাজিয়েছে। একটা প্রাচীনতার ছোঁয়া, ঠিক ওর ছোটোবেলার ফেলে আসা বাড়িটার মত। দক্ষিণে লম্বা খোলা জানালা,উত্তরে টানা লম্বা ব্যালকনি,পশ্চিমের জানালার পাশে একটা মেহগনি কাঠের খাট। জানলাগুলোর মাথার উপরে লাল সাটিনের ঝালর, দু’পাশ থেকে নেমে এসেছে সাদা নেটের পর্দা। মাঝখানটা বাঁধা। খাটটা অবশ্য সেই পুরোনো বাড়ি থেকে আনা কিন্তু বাড়িটা আজ আর নেই! বাবার রমরমা ব্যবসায় হঠাৎ কীভাবে যেন ভাঁটা নেমে এসেছিল।

পুরনো বাড়ি থেকে ওরা যখন ভাড়া বাড়িতে উঠে আসে, তখন সঙ্গে ফার্নিচার বলতে শুধু এই খাটটা ছিল। মা’র কাছে শোন মায়ের দাদু নাকি এই খাটেই শুতেন। প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনোতো হবেই। বর্তমান বাজারে নিলামে উঠলে কোটিরনীচে দাম হবে না। 

মিলির আধুনিক মহলে যে এখাটের জায়গা হবে না সেটা শুভ্র ভালো করেই জানত,তাই শহর ছাড়িয়ে একটু একান্তে থাকার ইচ্ছায় এই অঞ্চলে যখন বাড়িটা তৈরি করে, তখনই নিজের একান্ত জগৎটাকে সাজিয়ে নেবে বলেই এই ঘরটা তৈরি। কত জল্পনা কল্পনা,অবসরে নিরালায় কলম আর অক্ষরের সাথে একান্ত যাপন করবে এখানে। লিখতে লিখতে লেখা থামিয়ে ব্যালকনি বেয়ে উঠে আসা মানিপ্ল্যান্টটার দিকে চেয়ে থাকবে। মাথার ভিতরে এলোমেলো হয়ে থাকা গল্পগুলো ফুলের মালার মতো সাজানো হলেই গালে লেগে থাকা কলম আবার সচল হয়ে উঠবে। 

উফ্‌! কোন অশুভক্ষণে যে এই লেখক হওয়ার স্বপ্নটা শিলালিপির মতো খোদিত হয়ে গিয়েছে ওর মনে! অখন্ড অবসরের আশায় কবে যেন ব্যালকনির বাম দিকে লাগানো মানিপ্ল্যান্টটা আর ডানদিকে লাগানো মাধবীলতা বড় হয়ে দোতলায় পৌঁছে গিয়েছে সে সময়ের হিসাব মেলাতে পারে না শুভ্র। প্রতিদিন ভোরে একটুকরো অবসর কোথাদিয়ে যেন কেটে যায় খোলা ছাদে গাছেদের সাথে। ভোরের ঐ একটুকরো টাটকা বাতাসই সারাদিন ওকে সময়ের সাথে যুদ্ধ করতে শক্তি দেয় 

এখন অবসরটা শুভ্রর কাছে মরুভূমিতে মরীচিকার সমান অথবা ঘন কালো মেঘের মাঝে এক ঝলক বিদ্যুৎ; যার আলো, অন্ধকারে পথ হারানো পথিককে পথ চলার আশা তো দেখায় কিন্তু পথ দেখায় না। হাতের ফাঁকে ধরে রাখা একমুঠো বালুকণার মত একটু একটু করে ফসকে যায় সময়। আজ গাছেদের কাছ থেকে সময় চুরি করেছে শুভ্র। সকালে ছাদে না গিয়ে এসে ঢুকেছে ওর এই একান্ত নিজের ঘরটিতে।
 
গত রাতে ঘুমের মধ্যেই টের পাচ্ছিল মস্তিষ্কের উর্বরতার। অনেকেরই এমন নাকি হয় মাঝে মাঝে। অবচেতন মনে সঞ্চিত তথ্য স্বপ্নে গল্প হয়ে ওঠে। ঘুম ভাঙার পর আসন্নপ্রসবার মতো ভিতরটা অস্থির হয়ে ওঠে। শুভ্রর ভিতরের সেই অস্থির প্রবণতা জমতে জমতে পাহাড় হয়ে উঠেছে। সকালে ছাদে যাওয়ার আগে কিছুটা নিজের অজান্তেই যেন কোনো এক অমোঘ আকর্ষণে ঢুকে পড়েছে এই ঘরে। দক্ষিণের খোলা হাওয়ায় ওর সাদা পাঞ্জাবিটা পতপত করে উড়ছে। শুভ্র এতক্ষণ ঐ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল উন্মুক্ত প্রকৃতির দিকে। হাওয়ায় উড়তে থাকা সাদা পাতাগুলোর শব্দে ঘুরে তাকালো টেবিলের দিকে। যেন সাদা পাতা গুলো ওর দিকে তাকিয়ে উপহাস করছে। নিজের অর্জিত বিদ্যাকে যান্ত্রিক ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে ফেলে পিষে মুঠো মুঠো টাকা উৎপাদন করে চলেছে।

হ্যাঁ, এই যান্ত্রিক জীবন ও স্বেচ্ছায় বেঁছে নিয়েছে ঠিকই,কিন্তু সে সময় পরিস্থিতি তো এমনই ছিল, অর্থের কাছে হার মেনে ছিল অক্ষর। সেদিন যদি সে অক্ষরকে বিসর্জন না দিত, তবে আজকের এই এত সামাজিক সম্মান, এত অর্থ,গাড়ি-বাড়ি সব যে অধরা থেকে যেত। পারত কি মিলির মুখে ফোটাতে সফল স্বামীর গর্বে গর্বিণীর  হাসি,মেয়েকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করতে? আজকাল কে আর ঘরে বসে গল্প-উপন্যাস লিখিয়েদের সম্মান দেয়। নিদেন পক্ষে একটা বই ছাপাতেও তো টাকা লাগে। তাই, বাধ্য হয়েই তো ও নির্বাচন করেছে  অর্থকে হেসে ওঠে শুভ্র। ওর মতো সফল মানুষ এ সমাজে কটা আছে? লোকে ওর সফলতাকে দেখে ঈর্ষা করে, কিন্তু সবটাই যে ওর বাইরের আবরণ। ওর অন্তরটা যে ফেলে আসা এক সুপ্ত ইচ্ছা নিয়ে নিশিদিন হাহাকার করে,সেই অন্তরটা তো সকলের অজানা। এমনকি মিলিও জানে না, কোনদিন জানতেও চেষ্টা করেনি।
একপা একপা করে এগিয়ে আসে টেবিলের কাছে। পাতা গুলো উড়তে উড়তে থেমে যায়, শুভ্রর গায়ে আড়াল হয়েছে হাওয়া। চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ে। আড়াল সরতেই দমকা হাওয়ায় আবার নড়তে থাকে কাগজগুলো। পেনটা হাতে তুলে নেয়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় আজ কাজের কাছ থেকে চুরি করবে অবসর। আজ লিখবে ও অনেক লিখবে। ঠিক কতগুলো দিন,নাকি মাস বা বছর কাগজ কলমের থেকে দূরে আছে মনে নেই। মনে করতেও চায় না। ভিতরটা আকুলিব্যাকুলি করছে,গুলিয়ে যাচ্ছে সব কথা। অক্ষরগুলো যেন এলোমেলো ছোটাছুটি করছে কে আগে জন্মাবে। শুভ্র গালে পেন ঠেকিয়ে ব্যালকনি থেকে উঠে আসা মানিপ্ল্যান্টের দিকে তাকিয়ে প্লট সাজাতে লাগলো। টেবিলে রাখা ঘড়িটাকে উলটে দিল। আহা! একটা অদ্ভুত তৃপ্তির আকুলতাএ আকুলতা অক্ষরের সাথে সহবাসের।
বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে টুকটুক শব্দ ভেসে আসতেই বিরক্তিতে সামান্য ভ্রূ কুঁচকে গেল শুভ্রর। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো মিলি।
উফ্‌! এখানে এসে বসে আছো, আর আমি ছাদে গিয়ে খুঁজছি তোমায়।
কেন? এই সময় তুমি হঠাৎ আমাকে খুঁজছো যে!
হুমম, খুঁজছি। রমা ছাদে চা দিতে গিয়ে খুঁজে পায়নি তোমায়, তাই বাধ্য হয়ে আমাকেই আসতে হলএই নাও তোমার চা। হাতে ধরা কাপপ্লেটটা আর মোবাইলটা নামিয়ে রাখলো টেবিলে। শুভ্রর ফোনটাও টেবিলে রেখে এগিয়ে গেল উত্তরের ব্যালকনির দিকে। থোকা থোকা মাধবীলতা ঝুলে আছে। গন্ধে ম ম করছে চারপাশটা। শুভ্রর কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ভিতরে ভিতরে। মিলির উপস্থতিটা অনাহূতের মত অসহ্য লাগছে এই মুহূর্তে কিন্তু গিলে নিতে হচ্ছে বিরক্তিমিলিতো ওর কোনো অধস্তন কর্মচারী নয়, সে এই মহলের সর্বময় কর্ত্রী
ব্যালকনি থেকে উচ্চস্বর শোনা গেল মিলির, ‘শুনছো, তোমার ফোনটা একবার সময় করে দেখে নিওদু-বার ফুল রিং হয়ে কেটে গেছে’
শুভ্র রাগের চোটে মোবাইলটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেললো বিছানায়। আজ সকাল থেকেই একটা বিদ্রোহ যেন চেপে বসেছে ওর মাথায়। দেখবে না মোবাইল। যার ফোনই হোক ধরবেনা, শুধু এখন মিলি ঘর থেকে বেরোলে হয়। মিলি বেরোলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সাদা পাতাগুলোর উপর কামার্ত প্রেমিকের মতো।
মিলি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গুনগুন করে গান করছে। এক থোকা মাধবীলতা ফুল হাতে ধরে প্রাণ ভরে গন্ধ নিল। এগিয়ে গেল মানিপ্ল্যান্টটা’র দিকে। হলদে কচি পাতাগুলো বড্ড আকর্ষণীয়। আবার উচ্চস্বরে ব্যালকনি থেকে বললো, ‘তুমি কিন্তু এই ঘরটা দারুণ সাজিয়াছ শুভ্র! আমি ভাবতেও পারিনি প্রাচীনত্বের এত আভিজাত্য থাকে। বিশেষ করে এই ব্যালকনিটা ফ্যান্টাস্টিক!’
শুভ্র ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠছে। বেশ আট-দশ লাইন লিখে ফেলেছে এর মধ্যেই তবুও মাথাটা কিছুতেই স্থির হচ্ছে না। ব্যালকনির দিকে তাকাতেই দেখতে পেল মিলির লাল রঙের শাড়ির আঁচলটা উড়ছে। বাহ্‌, এই শাড়ির আঁচল নিয়েই তো কত কিছু লিখে ফেলা যায়! আরো খানিকটা উর্বর হয়ে উঠলো মাথাটা। মিলি আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। শুভ্র গুছিয়ে লিখতে বসলআজ তিতলির স্কুল ছুটি, স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস না কি যেন একটা আছে! বাজার-হাট করা আছে সবই। একটু পরে উঠে ফোনটা সুইচ অফ করে দেবে। মনে মনে ছোট্ট একটা প্ল্যান সাজিয়ে গুছিয়ে লিখতে বসে শুভ্র। দু’লাইন লিখতে না লিখতেই মোবাইলটা আবার বেজে ওঠে। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ওঠে শুভ্রর। ফোনটা পুরো বেজে বন্ধ হয়ে আবার বেজে উঠতেই শুভ্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে যায় খাটের কাছে। সুইচ অফ করতে গিয়েও পারে না,রিসিভ করে ফোনটা। নিমেষে বদলে যায় মুখের আদল। প্রায় উদ্ভ্রান্তের মতই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পোশাক বদলে বেরিয়ে পড়ে গাড়ি নিয়ে।
নির্মীয়মান বারোতলা বিল্ডিং নক্ষত্র হাইটসশুভ্রর স্বপ্নের প্রজেক্ট। গাড়ি থেকে নেমেই চোখে পড়ল নক্ষত্র হাইটস এর নিচে অসংখ্য মানুষের ভিড়। একটা চাপা উত্তেজনা,কোলাহল। প্রায় ছুটেই গেল সেই দিকে। দু’হাতে ভিড় ঠেলে পৌঁছালো ভিতরে। একচোখ দেখেই আঁতকে উঠলরক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে একটা শ্রমিকযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। কোমরের কাছে শরীরটা দু’পাশে সরে গিয়েছে। উফ্‌, বিভৎস! কিন্তু কি করে এমন দুর্ঘটনা হতে পারে! সুরক্ষার সবরকম ব্যবস্থা নিয়েই তো কাজ চলছে। ও নিজে সব দেখে নিয়েছে। কি করে পড়ে যেতে পারে লোকটা এগারো তলা থেকে! চারিদিকের গুঞ্জন বলে দিচ্ছে বিক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। শুভ্র হসপিটালে ফোন করে।
 লোকটাকে সকলে মিলে ধরে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছে। দৃশ্যটা কেমন যেন মস্তিষ্কের ফ্রেমে বন্দি হয়ে যায় শুভ্রর। হ্যাঁ, প্লট...এটা দিয়েই একটা গল্প লিখে ফেলতে পারে শুভ্রঅ্যাম্বুলেন্সের পিছনে পিছনে ছুটছে শুভ্রর গাড়ি। হসপিটালের করিডর পেরোতেই ডাক্তার শ্রমিকটিকে মৃত বলে ঘোষণা করে। শুভ্র বুঝতে পারে সামনে অনেক কঠিন সময় ওকে পেরোতে হবে। শ্রমিকটির মৃত্যু ওকে কাঠগড়া পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওর পুরো কনফিডেন্স আছে নিজের প্রতি। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সময় লাগবে না। সেফটি সিস্টেমে কোনো গণ্ডগোল ছিলনা এটা নিশ্চিত শুভ্র,তবে কিভাবে ঘটলো এমন ঘটনা? বিদ্যুতের ঝলকের মত ক্ষণিক সময়ের জন্য মাথায় খেলে গেল মৃত্যু রহস্য নিয়েই লিখে ফেলা যেতে পারে আরেকটা গল্প। উফ্‌! এত প্লট অথচ একটু সময়! সামান্য একটু সময় মানে একটা দিন যদি পেত,তবে গুছিয়ে লিখে ফেলতে পারত
সারা রাত কেটে গেল অফিসের কেবিনে বসেশুভ্র দোতলার জানালা দিয়ে দেখল, বাইরে অফিসের সামনে ইউনিয়নের লোকজন দলবেঁধে পাহারা দিচ্ছে। নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য ঘেরাও করেছে অফিস কর্তাদের। দশটার পর বোর্ড মিটিং বসবে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়ে। তার আগে তদন্ত কমিশন গঠন করে ঘুরে দেখা হবে ঘটনাস্থল। প্রজেক্ট হেড হিসাবে তদন্ত কমিশনের সদস্য হয়ে ওর ও থাকার কথা,কিন্তু এক্ষেত্রে তদন্তটা হবে ওর বিরুদ্ধে। এইখানেই একটা কেমন যেন মানসিক একটা চাপ অনুভব করছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও সবার চোখেই কেমন যেন একটা প্রশ্নচিহ্ন দেখতে পাচ্ছে। একটু সামনের খোলা ব্যালকনিতে দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে। বেরোতে গিয়েও থমকে গেল শুভ্র। এখন সব রাগ যে ওর উপর সেটা ভালোই টের পাচ্ছে ওদের স্লোগান শুনে। খোলা জায়গায় ওকে পেলে যেকোনো রকম দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বদ্ধ ঘরে দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে ওর। কাজহীন এভাবে বসে থাকাও যেন এক শাস্তি। শুধু ফোনের পর ফোন আর একই বিষয়ে বকবক। অদ্ভুত এক গিলে খাওয়া অবসর, আনপ্রোডাক্টিভ। কথাটা মনে হতেই নিজের মনেই হেসে উঠল শুভ্র। অবসর আর আনপ্রোডাক্টিভ কেমন যেন শোনাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা দৌড়াচ্ছে। অফিসের অন্দরের কাজ কর্ম শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। সূর্য মাঝ গগন থেকে পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। শুভ্র জানালার কাচ দিয়ে বাইরেটা দেখলএক গাড়ি পুলিশ এসে সরিয়ে দিচ্ছে বিক্ষোভকারীদের। এবার মুক্তির সময় আগতপ্রায়।
দীর্ঘ মাসখানেকের অস্থিরতা,থানাপুলিশের টানাটানি, কেমন যেন ঝলসে গিয়েছিল জীবনটা। শুভ্রর সামনে এখন দশদিনের অখন্ড অবসর। উত্তরাখণ্ডের এক নির্জন পাহাড়ে,প্রকৃতির কোলে এই দশটাদিন অবসর যাপনের জন্য এসেছে শুভ্র। হোটেলের সবুজ লনে আরামকেদারায় বসে দেখছে সূর্যোদয়। খাদের কোলজুড়ে বয়ে চলেছে মেঘসমুদ্র। শুভ্র বসে আছে একদিস্তা সাদা খাতা হাতে,গালে ঠেকানো পেন। গত দু’দিন ধরে এই একই ভাবেই সাধনা করে চলেছে অক্ষরের কিন্তু সব কিছু যেন কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে মাথার ভিতরে। অক্ষরও বুঝি নিরুদ্দেশের পথে হারিয়ে গিয়েছে অবসর যাপনে।