ঐ যে। ঐ পোটলাটা, ওটার মধ্যে কী আছে? ভাদো
আছে গো...ভাদো! পুরো একটা বছর ধরে ওটার মধ্যে ভাদো রাখা আছে। ভাদোর একটা নিজস্ব মানে
আছে। ভাদো মানেই রহস্য! ভাদো মানে পুরোনো স্মৃতি আবিষ্কারের আনন্দ! ভাদো মানে প্রকৃতির
জাগরণ। বর্ষা গেলেই পোটলা খুলে বাইরে আনতে হয় ভাদোকে। শ্রাবণ যায়,ভাদো আসে। মেঘের ভেলায়
চেপে ভাদো আসে। সঙ্গে আনে মুঠো মুঠো সোনালি রোদ্দুর, ঘন নীল আকাশ! পোটলা খুলে ভাদোকে
আদর করে কোলে তুলে নিতে হয়। ভাদোর গায়ে তখন ভারি শ্যাওলাধরা গন্ধ! ছাতারে গন্ধ! ভাদোকে
তখন রোদে সেঁকে শিউলিগন্ধ বাতাস দিয়ে স্নান করাতে হয়। সাদা কাশের চামর দিয়ে বাতাস দিতে
হয়। দু’গাছি কচি ধানের শিষ দাঁতে কেটে ভাদো পিঁড়িতে বসে শুরু করে গল্প।
মাঝে মাঝে সুখের স্মৃতিগুলো ভুলে যেতে হয়।
ছেলে বেলার স্মৃতি গুলো ভাদোর মতো পোটলায় ভরে,একটু ন্যাপথালিন দিয়ে গুটিয়ে রেখে দিয়ে,
তারপর ভুলে যেতে হয়। দীর্ঘদিন সুখ-যাপনে,সুখের উপর নোনা ধরে,জিভের উপর জমা সাদা আস্তরণের
মতো। ভুলে যেতে হয়, কারণ- পুরোনো জামা-কাপড়ের মতো,পুরোনো স্মৃতি গুলো নতুন করে আবিষ্কারের
সুযোগ দিতে হয় নিজেকে। আবিষ্কারের যেমন নানা দিক, তেমনি আনন্দটাও তো ভিন্ন। পুরোনো
আবিষ্কারের আনন্দটায় একটা অদ্ভুত মাতাল করা নেশা আছে। ন্যাপথালিনের তুলতুলে গন্ধ পুরোনোর
ভাঁজে ভাঁজে রহস্যের নেশা জাগায়!কখনও কখনও পুরোনো আবিষ্কার নতুনের থেকেও মোহময়ী! কোনও
ভাঙা দুর্গের প্রাচীরের আড়ালে থাকা পুরোনো অথবা মাটির স্তরের নীচে প্রাচীন সভত্যার
স্মৃতিমাখা পুরোনো অথবা আলমারির কোণে স্মৃতির স্তর বুকে নিয়ে জমে থাকা পুরোনো,সে যাইহোক...সব
পুরোনই আসলে আবিষ্কারের নেশা জাগায়।
ভাদো এলেই ঘর আর প্রকৃতির সমস্ত রহস্যময় স্থানেই
যেন আলো ঢুকে রহস্য উন্মোচন করে। বন্দরের দাঁড়ানো রহস্যময় জাহাজের মতো আলমারিটা পাল্লা
দুটো হাট করে খোলা। একে একে বেরিয়ে আসে জামা-কাপড়! তারই মাঝে নতুন করে পুরোনো আবিষ্কারের
নেশা। বিশ বা তিরিশ বছর আগের পুরনো, নরম হয়ে যাওয়া বেনারসি আর নকশা ধুতির দাম্পত্য
দেখে, ন্যাপথালিন মাখা মিষ্টি-মেদুর স্মৃতির
ছাতার নীচে দু’দন্ড জিরিয়ে নেওয়া। সযত্নে একমুঠো ভাদুরে রোদের ছোঁয়াতে স্মৃতির আয়ু
বেড়ে যায় আরোও। আবার একটা বছর পর বেরিয়ে আসবে সবাই।ছড়াবে স্মৃতির সেই পুরোনো উষ্ণতা!
নতুন ভাদো কথা কবে বিগত ভাদোর সাথে।দাঁতে তার একগুচ্ছ কচি ধানের শিষ।
No comments:
Post a Comment